অবশেষে পেট শুনতে পায় যে একটা নৌকো নিচে নামানো হচ্ছে। যদিও অনেকটা নীরবতার সাথে করা হচ্ছে পুরো কাজটা যেন ব্যাপারটা সম্পর্কে তারা কাউকে অবগত করতে চাচ্ছে না। কিন্তু যখনই নৌকোটা নিচে নামানো হলো তখন জাহাজে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের কথায় একটু বিতর্কের আভাস পাওয়া গেল। ব্যাপার যাই হোক, এটা নিশ্চিত যে তারা পেটকে নিয়ে কোনো কথা বলছে না বা পেট-এর দিকে কোনো মনোযোগ দিচ্ছে না।
আর তাই সে বিনা পরিশ্রমে তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সে আস্তে আস্তে সামনে এগোতে শুরু করেছে। তার পায়ের ব্যথাকে উপেক্ষা করে সে শিকারী চিতাবাঘের মতো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
পেট খুব নীরবে সতর্কতার সাথে এগিয়ে যেতে লাগল যেন শব্দ শুনে শিকার সজাগ না হয়ে যায়। লোকটা হঠাৎ পেট-এর আগমন দেখে শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল; সে বুঝতে পারছে যে সে কোনো একটা বিপদের ভেতর রয়েছে। সে পেট-এর দিক থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। প্রায় অন্ধকারের মধ্যেও লোকটার ভয়ার্ত সাদা চোখ চকচক করছিল। পেছনে যেতে যেতে লোকটা জাহাজের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফেলল, আর বুঝতে পারল যে খুন করার উদ্দেশ্যেই কেউ কারও দিকে এভাবে এগোয়।
পেট সামনে এগুতে থাকে। সে যখন তার ভয়ার্ত শিকার ধরে ফেলতে যাচ্ছিল তখনই তার পায়ের শেখলে টান পড়ে। সে বিপদ বুঝতে পেরে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত লোকটির পা ঝাঁপটে ধরে ফেলে সে। লোকটি পা নাড়া দিয়ে পেটকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু পেট শক্তভাবে ধরে লোকটিকে নিজের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করতে থাকে। লোকটিও খুব শক্তভাবে জাহাজের ডেক ধরে রাখার চেষ্টা করে। আঙুলগুলো হুক-এ ঢুকিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে সে। কিন্তু এই বন্ধ ঘরে দেয়াল মেঝে সবকিছু ইঁদুরের বিষ্ঠায় পিচ্ছিল হয়েছিল। তাই লোকটির আর কিছুই করার ছিল না।
লোকটি আবারও জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে। তার কণ্ঠ ভয়ে ভেঙে যাচ্ছিল। সে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা বোধহয় ওর প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। তার হয়ত অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল। সেই স্বর্গীয় দূত আর অন্যান্য ফেরেশতারা হয়ত পেট-এর পক্ষ হয়ে প্রার্থনা করছিল। এখন পেট-এর মুখ লোকটির দুর্গন্ধময় উরুর কাছাকাছি চলে এসেছে। এরপরেও পেট ক্রমাগত তাকে নিজের দিকে টেনে আনছে। সত্যটা হচ্ছে যে তার নিজের জীবনও এটার ওপর নির্ভর করছে।
“চুপচাপ থাক। তাহলে আমি দ্রুত কাজ সেরে ফেলতে পারব,” পেট এমনভাবে বলল যেন সে তার নিঃশ্বাসের অপচয় করছে। লকলকে চিকন আঙুলগুলো পেট-এর মুখে থাবা দিল; লোকটি প্রাণপণে চেষ্টা করছিল পেটকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পেট লোকটির থাবা সরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের হাত লোকটির শরীরের উপরের দিকে উঠাতে থাকে। একসময় লোকটির কণ্ঠনালী পেয়ে যায় সে। এরপর নিজের হাত দিয়ে লোকটির স্বরনালী চেপে ধরে।
অপুষ্টিতে ভুগলেও বন্দি নাবিকটির শক্তির অভাব ছিল না। অনেক বছর সমুদ্রে কাটানো, মাস্তুল বেয়ে উঠা-নামা করা, যুদ্ধ করা সবমিলিয়ে লোকটি বেশ শক্তিশালী ছিল। সে পেট-এর থাবা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে আততায়ীর হাত। কিন্তু উইলিয়াম পেট অত্যন্ত কৌশলী লোক। সে এর আগে বহুবার এই কাজ করেছে। সে জানে কোন মুহূর্তে কী ধরনের বাধা আসতে পারে। সে জানে যে এই মুহূর্তে শুধু আর একটু সময় হাতের থাবাটাকে আটকে রাখতে হবে। শুধু আর একটু সময়।
এই ধরনের কাজে পেট একজন বিশেষজ্ঞ বটে; অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার হাতে। দক্ষ লোকের মতোই সে তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। লোকটির হাত আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকে। ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায় লোকটি।
পেট এখনো শক্ত করে ধরে আছে লোকটার গলা। মৃত লোকটি শেষবারের মতো কেঁপে উঠল। এরপর সবকিছু শেষ।
ভালভাবে কাজ সম্পন্ন করেছে, সেই স্বর্গীয় কণ্ঠটি ফিসফিস করে বলে উঠল, …”কিন্তু তুমি একটা জাহাজে আছ। এরপর থেকে কোনো একটা লম্বা কাঠের টুকরা বা ধাতব পিন কান-এর ভেতর দিয়ে ব্রেইন-এ ঢুকিয়ে দিবে। তাহলে আর সন্দেহ করার মতো কোনো চিহ্ন থাকবে না, আর কাজটাও দ্রুত সম্পন্ন হবে।”
স্বর্গীয় কণ্ঠটি ঠিকই বলেছে। এরপর থেকে এভাবেই ভাববে সে। কিন্তু এখন তাকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
তার আগে মৃত লোকটিকে একপাশে এমনভাবে রেখে দিতে হবে যেন দেখে মনে হয় যে ঘুমের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু শেকলে বাঁধা থাকার কারণে পেট লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে বেশিদূর নিয়ে যেতে পারল না। তাই সে মৃত লোকটির শরীরটাকে উল্টিয়ে দেয়, যার ফলে সে উপুর হয়ে পড়ে রইল মেঝেতে।
এরপর পেট নিজের জায়গায় সরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
*
হাল আস্তে ধীরে অনেকটা নমনীয় নির্ভরতার সাথে মাস্তুলের উপরে উঠতে লাগল। যখন সে একেবারে চূড়ায় নাবিকের বসার জায়গাটিতে উঠে আসে তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় চাঁদের আলোর ফাঁকে এক চিলতে মেঘ দেখা যাচ্ছে। তার নিঃশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা দ্রুত হয়ে এসেছে যেটা এক সময় দিনে দুই-তিন বার মাস্তুলে উঠা-নামা করার সময়ও হত না। কিন্তু এখনো বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার আনন্দটা শেষ হয়ে যায়নি। স্নিগ্ধ, কোমল নরম বাতাসকে এখনো সর্বরোগের ওষুধ মনে হয়। জাহাজে পালের ভেজা, বাসি গন্ধ, সাগরের পানির ওপার থেকে ভেসে আসা আফ্রিকার মাটির মিষ্টি গন্ধ এখনো এক অন্যরকম অনুভূতি জাগায় হাল-এর মনে।
