“কিন্তু আমার দেখা এখনো শেষ হয়নি স্যার।”
“সেটা নিয়ে চিন্তা করো না” হাল, বলল। হঠাৎ তার মনে হল নিজ চোখে একটু দেখা প্রয়োজন। অন্য কারো ওপর ভরসা করার চেয়ে নিজ চোখে দেখা ভাল।
“আপনার কী মনে হয় ওখানে উঠা আপনার উচিত হবে। একটু ভেবে দেখুন, নেড় জিজ্ঞেস করে।
“আপনি কী বলতে চাচ্ছেন যে আমি জাহাজের অন্য যে কারও চেয়ে দ্রুত উপরে উঠতে পারব না।”
“না, স্যার। আমি শুধু বলতে চাইছি…”
“আচ্ছা, তাহলে চেয়ে দেখুন। আমি উঠছি।”
আর তারপর হাল মাস্তুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা মোটা রশি ধরে আকাশের দিকে উঠতে থাকে।
*
পেট অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিল। যদিও জাহাজের প্রত্যেকেরই অনেক খিদে পেয়েছিল। জাহাজের ডেক এমনকি প্রতিটা আনাচে কানাচে হ অন্তত একটা ইঁদুর খুঁজে পাওয়ার জন্য তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে। যদি কোনো গাংচিল বা সামুদ্রিক পাখি ভুলক্রমেও ডেক এর ওপর এসে বসেছে কিংবা ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছে তাহলে সেটাকে কোন তীর দিয়ে বা পাথর নিক্ষেপ করে অথবা অন্য যেকোনো উপায়ে সেটাকে হত্যা করা হয়েছে। যদি কোনো ডলফিন খেলার ছলে জাহাজের পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে গিয়েছে তবে সেটাকেও ছোট বন্দুক দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর কোনো হাঙর পাখিটাকে খেয়ে ফেলার আগেই জাহাজের নাবিকেরা সাঁতার কেটে সেটাকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে।
পেটও ক্ষুধার্ত ছিল তবে সেটা ছিল অন্যরকম। সে গত এক সপ্তাহ একটা অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ইঁদুরে কাটাকুটি করা ঘরে কাটিয়েছে। সে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে বলেছিল যে সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সিনিয়র অফিসার, সেই সাথে অনুরোধ জানিয়েছিল তাকে যেন একজন ভদ্রলোক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন তার কোনো কথা না শুনে তাকে বন্দি করার আদেশ দিয়েছিল।
“আপনাকে বুঝতে হবে যে আমার লোকেরা ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ শেষ করেছে সে বেশিদিন হয়নি। তাদের মনে হয়তো বা এখনো আপনাদের জন্য কোনো ভালবাসা নেই।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন ক্যাপ্টেন। “তাছাড়া এরা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। খাদ্য এখন তাদের কাছে খুবই আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। আমি কিভাবে নিশ্চয়তা দিব যে খাবারের জন্য তারা কোনো অমানবিক কাজ করে ফেলবে না। আপনার ভাগ্য ভাল যে আমি আপনাকে উদ্ধার করার আদেশ দিয়েছি। আমার লোকের অনেকেই যেটা চায় নি। কারণ ওরা চায় নি আরেকটা ক্ষুধার্ত মুখ বাড়াতে। আমি সেসময় তাদেরকে একটা হাস্যকর প্রস্তাব দিয়েছিলাম যার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমি ওদেরকে বলেছি যে যদি তোমরা ওকে পছন্দ না কর তাহলে তাকে খাবার হিসেবেও মজুদ রাখতে পার। আমার ভয় হচ্ছে যে তাদের মাঝে কেউ হয়ত বা সেটা করেও ফেলতে পারে।”
তখন থেকে ক্ষুধার চেয়ে বেঁচে থাকাটাই পেট-এর জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার শরীর শুকিয়ে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছে। মাংস চামড়া সবই একেবারে প্রায় হাড়ের সাথে লেগে গিয়েছে। কিন্তু পেট এমন মানুষ যার খাদ্যের প্রতি খুব একটা আগ্রহ কখনোই ছিল না। তাই খাদ্যের অভাবে তার বড় কোনো ক্ষতিই হয়নি। কিন্তু অন্য আরেকটা ক্ষুধা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। কখন সেই স্বর্গীয় কণ্ঠ তাকে আদেশ দিবে পৃথিবীকে পাপমুক্ত করার, তার নিজেকে সেই কাজের জন্য প্রস্তুত করার। পেট জানে না কখন সেই স্বর্গীয় স্বর আবারো ভেসে আসবে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে একমাস যাবত সেই কণ্ঠের কোনো খোঁজ থাকে না, আবার মাঝে মাঝে একদিন বা একসপ্তাহ পরেই সেই কণ্ঠ ভেসে আসে। সেই কণ্ঠ যখন আসে তখন চিৎকার করে বারবার তাকে একই আদেশ দিতে থাকে। “হত্যা কর, এখুনি।”
এই জাহাজে বন্দি থাকা অবস্থায় পেটকে মুক্ত করার মতো কেউই ছিল না। আর তখনি, অন্য সব বারের মতোই, ঐ স্বর্গীয় কণ্ঠের অধিকারী তার জন্য একজন সঙ্গী পাঠিয়েছেন।
সে ছিল তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া একজন নাবিক। তার অপরাধ ছিল সে ক্যাপ্টেন-এর কোয়ার্টার-এর লকার থেকে একটা মূল্যবান ধাতব পাত্র চুরি করেছিল। পেট-এর মনে হয় লোকটা অনেকটা উন্মাদ। নয়ত সে গুলি করে লকার খুলতে যেত না, যেখানে জাহাজের একপ্রান্তে গুলি করলে অন্যপ্রান্ত থেকে শোনা যায়। এমনও হতে পারে সে হয়ত কি ঘটতে পারে সে ব্যাপারে পাত্তাই দেয়নি। গত বার ঘণ্টা ধরে সে পেট-এর সামনে বসে আছে। মাঝে মাঝে আবোল তাবোল কথা বলছে। কখনো কেঁদে উঠছে, আবার কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ছে। পেট অনেক চেষ্টা করছে লোকটাকে থামিয়ে তার মনে একটু শান্তি দিতে। যদিও তাদের দুজনকেই নির্দিষ্ট দূরত্বে শেকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। পেট-এর হাতে লাগানো রিংটাকে আবার আরেকটা শেকল দিয়ে পায়ের সাথে আটকে রাখা হয়েছে। যার ফলে লোকটার কাছে গিয়ে তাকে আঘাত করা পেটের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবে পেট নিশ্চিত যে স্বর্গীয় দূত যেহেতু এই লোকটিকে এখানে এনেছে তাহলে নিশ্চয়ই এর কোনো একটা বিহিত হবেই। তবে এটা নিশ্চিত যে ঘটনা পেট এর দিকেই এগুচ্ছে।
জাহাজের দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি যে সবকিছু পরিষ্কারভাবে শোনা না গেলেও বেশ ভালই শোনা যাচ্ছিল। অনেক দৌড়ঝাঁপ এবং চলাফেরার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। হয়ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বা মালামাল উঠানোর জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছিল ওরা।
