“কারণ যুদ্ধের কাউন্সিল-এর জন্য দুইমাস আমরা একত্রে ছিলাম। তোমার কী মনে পড়ছেনা…”
“ওহ্, অবশ্যই আমার মনে আছে। বেশ ভালভাবেই মনে আছে…”
এরপর থেকে আমার ঋতুস্রাব হয়নি এবং আজকে সকালে আমি একরকম অসুস্থ বোধ করছি। আমি যদি বাড়িতে থাকতাম তাহলে মা, খালা কিংবা বাড়ির অন্যকোনো মহিলা আমাকে এই কথাটা বলে দিত যেটা এখন আমি তোমাকে বলছি,” সে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বলল। “সম্ভবত আমি তোমার মতো শক্তিশালী, সুদর্শন এবং দয়ালু কোনো ছেলের মা হতে যাচ্ছি।”
“কিংবা একটি মেয়ে যে কি-না তার মায়ের মতই সুন্দরী মায়াময় এবং সাহসী।”
কিছু সময়ের জন্য তারা দুজনেই একটা মোহের মধ্যে দিয়ে সময় পার করতে লাগল-অল্প বয়সি দুজন বালক-বালিকা প্রথম প্রেমের সন্ধান পেয়ে যেমন মোহের মধ্যে থাকে, অনেকটা সেরকম। পৃথিবীটাই তাদের কাছে এখন নতুন মনে হচ্ছে।
হাল-এর মোহাচ্ছন্ন ভাবটাই প্রথমে কাটে। হঠাৎ করেই সে মুখের অভিব্যক্তি বদলে ফেলে কেবিনের জানালা দিয়ে দূরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“তোমার হঠাৎ কী হল?” জুডিথ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী কোনো সমস্যায় পড়েছ?” “তুমি ভয় পেয়ো না। আমি তোমার সন্তানকে নিরাপদে রাখব।”
“না, ঠিক সেটা নিয়ে ভাবছি না”, হাল উত্তর দেয়। অন্য কিছু ভাবছি।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। এরপর দ্রুত জামাকাপড় আর জুতা পরতে শুরু করল। গায়ের জামা খোলা রেখেই নিচু হয়ে জুডিথ-এর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমি অন্য একটা ব্যাপার দেখতে যাচ্ছি। চিন্তা করো না। এটা হয়ত তেমন কোনো ব্যাপার না।” জুডিথ-এর দুশ্চিন্তাভরা মুখ দেখে আশ্বস্ত করার জন্য ছোট্ট একটা হাসি দিল হাল। “আমাকে তুমি আজকে আমার জীবনের সেরা খবরটা দিয়েছ। আমি তোমাকে আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালবাসি। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে ফিরে আসব।”
যদিও হাল জাহাজের ডেক-এর দিকে যাচ্ছে, কিন্তু তার মনটা পড়ে রয়েছে বিছানায়।
দুইদিন আগে পাহারাদার একটা ডার্চ কারাভাল দেখতে পায় স্টারবোর্ড থেকে কয়েক কি. মি. দূরে। বাতাসের গতির পরিবর্তনের কারণে সেটা কখনো দেখা যাচ্ছিল আবার কখনো দেখা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ওরা হয়ত গোল্ডেন বাউকে নজরে রাখছে। যদি যুদ্ধের সময় হত তাহলে এটা খুব দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল। যদিও কারাভেলটা গোল্ডেন বাউ-এর চেয়ে অনেক ছোট। কিন্তু অনেক সময় অনেক বড় বড় শক্তিশালী জাহাজও ওত পেতে থাকলে দেখা যায় না। কিন্তু ইংল্যান্ড ও হল্যান্ড-এর মধ্যে অনেকদিন ধরেই শান্তি বিরাজ করছে। তাই হাল দুশ্চিন্তার কোনো কারণ দেখে নি। এছাড়া সকাল হওয়ার সাথে সাথেই কার্নিভেলটা অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু হাল-এর মন থেকে সেই অস্বস্তির ভাবটা যায়নি।
এখন আবার হালের মনে সেই একই রকম অস্বস্তি কাজ করছে। কিছু একটা তাকে জানাচ্ছে যে সেই ডাচম্যানটা এখনো সেখানে আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কারাভেল-এর ক্যাপ্টেন-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না। হাল জাহাজের ডেক-এ উঠেই একটা স্নিগ্ধ পরিবেশ অনুভব করে। ঠাণ্ডা নরম বাতাস বইছে। রুপালি চাঁদের আলোতে সাগরের পানি চকচক করছে। ডেক-এর পাশে অ্যামাড়োডা যোদ্ধারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে। এরা সবসময় এরকম খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। নেড টেইলর জাহাজের হালের মধ্যেই ছিল। সে ক্যাপ্টেনকে বলে, “এ সময়ে আপনি এখানে কেন ক্যাপ্টেন?” “আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে আপনি আপনার সঙ্গিনীর ওপর বিরক্ত হয়ে এত রাতে নিজের কেবিন ছেড়ে এখানে এসেছেন।”
“মোটেও না,” হাল একটু হেসে জবাব দেয়। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে সেই ডাচ্ কারাভেলটা এখনো সেখানে আছে।”
“টম ছেলেটা তো কোনোকিছুই বলেনি। সে খুবই ভাল ছেলে। ডিউটি বাদ দিয়ে ঘুমানোর মতো ছেলে সে নয়।”
টম মার্লি হচ্ছে নাবিকদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি। বেশ দুরন্ত কিন্তু দায়িত্ববান ছেলে। তবুও হাল নিশ্চিত হতে চায় যে সে সঠিক লোককে দায়িত্ব দিয়েছে। তাকে এখানে নিয়ে আসুন, মি. টেইলর।”
“ঠিক আছে, স্যার।”
নেড মাস্তুলের ওপর দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে একটা চিকন শিস বাজাল। সাথে সাথেই টম মার্লি মাথা বাঁকিয়ে নিচের দিকে তাকাল। তাকে নিচে নেমে আসার জন্য ইশারা করল নেড়। টম মার্লি নির্ভয়ে খুব দ্রুত নামতে থাকল। টম মার্লিকে নামতে দেখে হাল-এর অতীত জীবনের কথা মনে পড়ে গেল। বেশিদিন আগের কথা নয় যখন হালকে বাবার আদেশে দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার এভাবে উঠা-নামা করতে হতো।
মার্লি ডেক-এ নেমে খুব দ্রুত নেড-এর কাছে চলে আসল। এরপর পেছনে হাত দিয়ে খুব বিচলিত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“চিন্তার কিছু নেই, টম,” তুমি কোনো ভুল করনি। হাল এই কথা বলার পর ছেলেটির কাধ অনেকটা শিথিল হয়ে যায়। “আমি শুধু জানতে চাচ্ছি গত দুই-এক দিনের মধ্যে তুমি ডাচদের কোনো জাহাজ বা নৌকো দেখেছ কি-না। অথবা সন্দেহজনক কোনো কিছু?”।
টম মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “না স্যার, আমি কিছু দেখি নি। আমি সবসময় আমার চোখ খোলা রেখেছি। কখনো একটুও ঘুমাই নি।”
“আমি জানি তুমি ঘুমাও নি। এখন যাও দেখ, রাঁধুনি হয়ত এতক্ষণে কিছু বেঁধেছে। খেয়ে নাও।”
