বুজার্ড যখন জলন্ত দৃষ্টি দিয়ে ভিড়ের দিকে তাকাল তখন আর কেউ কোনো কথা বলার সাহস পেল না। তার কথা মতো ছেলেটাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হলো। তার বালকসুলভ দুঃসাহস চেহারা থেকে হারিয়ে গেল। তার বদলে ওখানে ফুটে উঠল ভয়ে কাঁপতে থাকা এক শিশুর চেহারা, যাকে সৈন্যরা জোর করে মাথা নিচু করাচ্ছে যেন তার ঘাড়ের পেছনে জায়গামত তলোয়ার বসাতে পারে বুজার্ড।
বুজার্ড নিচের দিকে তাকিয়ে তার নিশানা ঠিক করতে থাকে। এরপর সমস্ত শক্তি দিয়ে ডানহাতে ধরে রাখা তলোয়ারটা ঘাড়ে বসিয়ে দেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে।
কিন্তু তার নিশানা ব্যর্থ হয়। তার বদলে তলোয়ারটা মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকার মাঝখানে আঘাত হানে। তীব্র আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মেরুদণ্ডে আটকে যাওয়া তলোয়ারটা একটানে উঠিয়ে ফেলে বুজার্ড। এরপর পুনরায় আঘাত করে সে। তারপর আরো একবার।
নিশানামত তলোয়ারটা বসাতে তিনবার আঘাত করতে হয় তার। অবশ্য ততক্ষণে বালকটির দেহ নিথর হয়ে গিয়েছে।
এক পা পিছিয়ে আসে বুজার্ড। তার বুক ধরফর করছে। মাথাটা তিনশত ষাট ডিগ্রি কোণে ঘুরিয়ে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা দেখতে থাকে সে। এরপর সেনাপতিকে আদেশ করে, “আমাকে প্রাসাদে নিয়ে চল।”
সৈন্যরা যখন তার কথামত প্রাসাদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন সে মনে মনে একটা কথাই বলছিল, “এতেই হবে। আমার যা দেখানোর, দেখিয়ে দিয়েছি আমি।”
২. কর্তব্যরত অবস্থায়
কর্তব্যরত অবস্থায় একজন জাহাজের ক্যাপ্টেনকে সবসময় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। রাত অথবা দিনের যে কোনো মুহূর্তে তার ডাক পড়তে পারে। হাল যখন সমুদ্রে জাহাজ ভাসায় তখন জুডিথ-এর উপস্থিতি তার কাজের ব্যাঘাত ঘটাক এটা সে চায়নি। একারণেই তার নাবিকেরা তাকে সম্মান আর প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখে। এমনকি জুডিথও সেটা চায় না। কারণ সে জানে একজন নেতাকে কি রকম হতে হয়। সে হাল এবং তার দায়িত্বের মাঝে আসতে চায় না। এমনকি হাল যদি তা চাইত তাহলে হয়ত বা সে হালকে এখনকার মতো এতটা সম্মান করত না।
কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত এক ঘণ্টা তারা একে অপরকে উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এ সময় অন্য কোনো কাজ নয়, অন্য কোনো চিন্তা ভাবনা নয়। এই সময়টুকু তারা তখনই বেছে নেয় যখন জাহাজ শান্ত থাকে। বাতাস আর সমুদ্র নীরব থাকে। যেন শান্ত এবং নীরব পরিবেশে তারা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে-সেটা কথায় কিংবা কাজে অথবা উভয়ের মাধ্যমে।
জুডিথ-এর প্রতি তার ভালবাসা ছিল অপরিসীম-এ আকাক্ষা কখনোই পুরোপুরি মিটবার নয়। জুডিথের মাঝে ডুবে থাকতে তার খুব ভাল লাগে। আর সেই আদিম প্রেমের গভীরতা এতটাই বেশি যে কোথায় গিয়ে তার শরীর শেষ হয় আর জুডিথের শুরু হয় সেটাই সে মাঝে-মাঝে বুঝতে পারে না। শুধু বুঝতে পারে যে এরকম আশীর্বাদপুষ্ট সময়ের সাথে পৃথিবীর আর কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। এখন পর্যন্ত হাল-এর হৃদয়ের সবচেয়ে প্রশান্তির মুহূর্ত হলো জুডিথকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া। অন্ধকার কেবিনেও সে জুডিথের চেহারা দেখতে পায়। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। জুডিথও হাল-এর কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করে। তার বিশ্বাস এবং ভালবাসার গভীরতা এতই বেশি যে হাল সারাজীবন তাকে রক্ষা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মিতসিওয়া থেকে এক হাজার মাইল দূরে আফ্রিকার উপকূলে যখন ওরা আট দিনের জন্য অভিযানে বের হয় তখন একদিন সকালে গোঙানির শব্দে হাল জেগে উঠে। সে চোখ খুলে দেখতে পায় জুডিথ তার পাশে শান্তিতে ঘুমিয়ে নেই। বরং বাঁকা হয়ে পাদুটো বুকের কাছে নিয়ে তার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। সে যে আওয়াজ করছে তা থেকে বোঝা যায় সে কোনো রকম শারীরিক অসুস্থতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
“ডার্লিং, তুমি কী ঠিক আছ?” হাল জিজ্ঞেস করল। কণ্ঠে দুশ্চিন্তার আভাস লুকোতে ব্যর্থ হয় সে।
“ এটা কোনো ব্যাপার না, ঠিক হয়ে যাবে”, জুডিথ উত্তর দেয়। কিন্তু তার শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠে, এরপর বমি করার জন্য উদ্যত হয় সে। কিন্তু তার কণ্ঠ দিয়ে গরগর জাতীয় শব্দ ছাড়া কিছুই বের হয় না।
“তুমি তো অসুস্থ”, অস্থির হয়ে জুডিথের কপালে হাত রেখে বলে হাল। “তোমার শরীর গরম। তোমার কী জ্বর এসেছে?”
জুডিথ ঢোক গিলে হাল-এর দিকে পাশ ফিরে। সে কনুই-এ ভর দিয়ে বসে এবং অন্য হাতটা হাল-এর ওপর রাখে। “চিন্তা করো না। আমি অসুস্থ নই। এমনকি এর চেয়ে বেশি সুস্থ আমি জীবনে কখনো ছিলাম না।”
হাল জুডিথের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “প্লিজ, ডার্লিং”, আমি জানি তুমি অনেক সাহসী, কিন্তু…”
“শসস্” সে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে। “আমি তোমাকে বললাম তো, এখানে দুশ্চিন্তার কিছু নেই…” একটু মৃদু হাসার চেষ্টা করে আবারো বলে, “অবশ্য যদি তুমি তোমার পিতৃত্ব নিয়ে চিন্তিত হও তো…”
“পিতৃত্ব…?” সে অবাক হয়ে বলে, “তুমি…তার মানে তুমি…?”
“হ্যাঁ, ডার্লিং। আমার মধ্যে তোমার সন্তান বেড়ে উঠছে। আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি…”
“সত্যিই অসাধারণ একটা খবর দিলে,” হাল উল্লসিত হয়ে বলে উঠে। পরমুহূর্তেই আবার সন্দেহের সুরে বলে, “কিন্তু তুমি কী নিশ্চিত? তুমি কিভাবে জান যে এটা সত্যি খবর?”
