“কিন্তু পরবর্তীতে সেই ঘৃণা তোমার কাছে শূন্য মরুভূমিতে এক বিন্দু বালির মতো মনে হবে। একমাত্র আমিই সেই ঘৃণাকে বদলে দিতে পারি, তৃপ্ত করতে পারি যদি তুমি আমার কাজ কর।”
“এবং তোমার জন্যেও একই কথা মি গ্রে…” এরপর জাহান ঠাণ্ডা এবং কঠোর কণ্ঠে রাষ্ট্রদূত-এর দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল। “তুমি এখনি আমার বাড়ি থেকে চলে যাবে। আর কখনো আসবে না-যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি হেনরি কার্টনির ছিন্নমস্তক একটা বড় পাত্রে করে নিয়ে আসতে পারবে অথবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে ধ্বংস করে দিতে পারবে। তুমি যখন এই দুটোর কোনো একটা করতে পারবে কেবল তখনি তুমি আবার এইখানে দাঁড়াতে পারবে। আবার সেই পূর্বের সম্মান ফিরে পাবে। এর আগ পর্যন্ত এখানে তুমি রাস্তার লোক বলেই গণ্য হবে। তুমি এখন যেতে পার।”
গ্রে-কে অবনত মস্তকে বের হয়ে যেতে দেখে বুজার্ড-একটু হাসার চেষ্টা করল। জাহান পুনরায় বুজার্ড-এর দিকে ফিরল। “আমার এই মাত্র মনে পড়ল যে তুমি এখন নপুংসক। আমি তোমাকে একটা সুযোগ দেব যেটা আমি কখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ পুরুষকে দেইনি। যখন আমি আমার প্রিয় উপপত্নীদের সাথে রাতের খাবার খেতে যাব তখন তুমি আমার সাথে থাকবে। তারা এক একজন নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারী যাদেরকে ইন্ডিয়া, পার্সিয়া কিংবা রাশিয়া এমনকি তোমার নিজের উপকূলের দ্বীপ থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে। তারা তোমার সাথে দেখা করতে পারলে আনন্দিত হবে। যদিও তুমি তাদের স্পর্শ করতে পারবে না, খাবার খেতে পারবে না, কোনো কিছু পান করতে পারবে না। কিন্তু তুমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবে এবং তোমার বেঁচে যাওয়া চোখটা দিয়ে সব কিছু দেখতে পারবে। যেদিন হেনরি কার্টনির মৃত্যু হবে সেদিন আমি তোমাকে আমার উপপত্নীদের মাঝ থেকে একজনকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেব। তুমি তাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে। তুমি ভেবে দেখ কিভাবে তুমি তোমার মনের ইচ্ছে পূরণ করবে। এবার তুমি ভেবে দেখ, ওদের মতো সুন্দর রমণীরাও কী তোমাকে হেনরি কার্টনির মৃত্যু দেখার চেয়ে বেশি আনন্দ দিতে পারবে?”
.
তিনদিন পর বুজার্ডকে প্রথমবারের মতো বাইরের পৃথিবীতে বের হওয়ার আদেশ দেয়া হয়। কালো রঙের এক ধরনের পোশাক পরিয়ে ছয়জন গার্ডসহ বুজার্ডকে বের করা হয়। এদের কাজ যেমন বুজার্ডকে রক্ষা করা, তেমনি যাতে সে পালিয়ে যেতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখা। তাদেরকে বলা হয়েছে যেন তারা যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বুজার্ড-এর সাথে হাঁটে যাতে লোকজন বুজার্ডকে ভালভাবে দেখতে পায়।
জাহান যেমন ধারণা করেছিল তেমনি জাঞ্জিবার-এর রাস্তায় বুজার্ড-এর উপস্থিতি সাধারণের মাঝে ভয়ের উদ্রেক করল। মহিলারা পালিয়ে যেতে থাকে, সাথে থাকা ছেলেমেয়েদের চোখ বন্ধ করে ফেলে। আর বুজার্ড যখন পুরুষদের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের মাঝে কেউ কেউ মাটিতে থুতু দিতে থাকল, কেউবা শয়তানের কুনজর থেকে বাঁচার জন্য পকেট থেকে রক্ষা কবচ বের করে হাতে তুলে নিল। সবশেষে সে যখন একটা জায়গার চারপাশে গড়ে উঠা দোকানগুলোর সামনে দিয়ে যাচ্ছিল তখন ওই মুহূর্তে তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল একটি অল্পবয়সি ছেলে। ছেলেটি পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা নর্দমার কাছে চলে যায়। নর্দমার পাশে। ফেলে রাখা ময়লা আবর্জনা থেকে বাম হাত দিয়ে একটা ময়লার ব্যাগ তুলে বুজার্ডের মুখে ছুঁড়ে মারে। সৌভাগ্যবশত সেই ময়লা বুজার্ডকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তবে খুব দ্রুত দুজন গার্ড ভিড়ের মধ্যে ছেলেটিকে ধরে ফেলে সে পালিয়ে যাওয়ার আগেই। রাগে অপমানে গজরাতে থাকে বুজার্ড, আর তাকিয়ে দেখে যে রাস্তার মাঝখানে জাহানের আদেশ পালনকারী সেনাপতি দাঁড়িয়ে আছে।
যখন বিছু শয়তানটাকে ধরে আনা হয় তখন দেখা যায় যে তার বয়স বড়জোড় চৌদ্দ কি পনের হবে। দেখেই বোঝা যায় সে তার তারুণ্যের ঝোঁকে পড়ে কাজটা করেছে। পরিণতি কি হতে পারে সেটার কিন্দুমাত্র চিন্তাও করে দেখেনি সে। সেনাপতি ইতস্তত করতে লাগল। তার নিজেরও একটি ছেলে আছে। এই বয়সের একটি ছেলেকে যে কোনো পরিবারের বুক থেকে আলাদা করতে তার বিবেকে বাধছে।
বুজার্ড সেনাপতির দোটানা মনোভাব বুঝতে পারে। সে ভিড়ের মধ্য থেকে ক্ষমা প্রার্থনার কান্না শুনতে পায়। বুজার্ডের সহজাত প্রবৃত্তি সক্রিয় হয়ে উঠল। সে বেশ বুঝতে পারছিল যে এই সময়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এই মুহূর্তেই নির্ধারণ হবে যে লোকজন কী এখন থেকে তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করবে, নাকি ভয়ংকর দানবের মতো ভয় পাবে। আর বুজার্ড জানে যে দুটোর ভেতর সে কোনটা বেশি চায়।
“আমার তলোয়ারটা এদিকে দাও,” তীব্র গর্জন করে সেনাপতিকে আদেশ দিল সে। এরপর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল। সেনাপতি তর্ক করার আগেই তার হাত থেকে তলোয়ারটা নিয়ে নিল বুজার্ড।
তীক্ষ্ণ এবং জলন্ত দৃষ্টি দিয়ে সে সৈন্য দুটির দিকে তাকাল যারা ছেলেটাকে ধরে আছে। “তোমরা দুজন ওর হাতদুটো পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেল,” বুজার্ড আদেশ করল। “নিজেদের দায়িত্ব পালন করো, বুঝলে? নইলে মহারাজাকে গিয়ে বলে দেব।”
লোকদুটি ভয় পেয়ে অতি দ্রুত বুজার্ড-এর আদেশ পালন করে ফেলে। বুজার্ড শুনতে পায় যে ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন ছেলেটির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছে।
