আরেকবার কারিগর-এর হাত অনুভব করে বুজার্ড। চামড়ার বড় একটা কলার তার গলায় আটকিয়ে পেছনে তালা লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। বুজার্ড শুনতে পায় জাহান বলছে, “যি. গ্রে, আপনি কী একটা আয়না এনে আপনার স্বদেশীর সামনের ধরবেন। আমার মনে হয় আর্ল নিজেকে আয়নায় দেখে বেশ খুশি হবেন।”
“উম…ম… আমি?” গ্রে তোতলামি করে জবাব দেয়।
“প্লিজ!” জাহান আবার ঠাণ্ডা স্বরে জবাব দেয়। “আমাকে কী আবার মনে করিয়ে দিতে হবে যে, আপনি আমার অনুরোধ অস্বীকার করলে কী পরিণতি হবে?”
বুজার্ড শুনতে পায় গ্রে-র পায়ের শব্দ তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সৈন্যরা তার হাত ছেড়ে দিল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল বুজার্ড। সে যখন মাথাটা তোলে তখন সরাসরি আয়নায় নিজেকে দেখতে পায়। সে এখন নিজেকে দেখতে পাচ্ছে ঠিক সেভাবেই, যেভাবে পৃথিবী তাকে দেখছে। রাগে বিতৃষ্ণায় সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে।
তার পুরো মাথাটা চামড়ায় ঢাকা। নানান দিক থেকে সেলাই করে মুখোশটা বানানো হয়েছে। চামড়ার ওপর আঁকা বড় বড় আইতে তাকে দেখতে ভয়াবহ লাগছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখটার ওপর সাদা কালো রঙ দিয়ে চোখ আঁকা রয়েছে, যেটা আরো কিছু ভয়াবহতা যোগ করেছে। মুখোশের নাকটা পাখির ঠোঁটের মতো ছুঁচালো যেটা সম্ভবত তার নামটাকে কটাক্ষ করার জন্যই বানানো হয়েছে। এছাড়াও সেলাই করা মুখোশের ওপর দাঁতাল দানবীয় হাসি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুই পাটি দাঁতের মাঝখানে অল্প একটু ফাঁক রয়েছে। এটুকু দিয়ে সে কথা বলতে আর খেতে পারবে।
বুজার্ড একসসময় পর্তুগীজ এক দাস বিক্রেতার বাড়িতে এরকম একটা মুখোশ ঝুলানো দেখেছিল। ঐ লোক ওটাকে এক উপজাতীয় জাদুকর ডাক্তার এর কাছ থেকে পেয়েছিল। আর এখন একইরকম একটা মুখোশ তাকে পরানো হয়েছে।
অসহ্য ব্যথা আর হতাশায় সে চিৎকার করতে থাকে। বেঁচে যাওয়া অবশিষ্ট আঙুলগুলো দিয়ে তালা ধরে এদিক সেদিক টানতে থাকে যেন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সে এটা ভেঙে ফেলবে। এসময় সে অপমানের সর্বশেষ স্তরটাও দেখতে পায়। তার গলায় থুতনির নিচে একটা ধাতব রিং ঝুলানো আছে। মুহূর্তেই সে বুঝে ফেলে এটা লাগানোর অর্থ কি। সে যদি জাহান-এর কথামত না চলে কিংবা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে এটাতে চেইন লাগিয়ে কুকুরের মতো রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।
বুজার্ড ভগ্ন হৃদয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সে এমন এক মানুষ যে আগুনে পুড়ে এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার পরও এখনো বেঁচে আছে। সূর্য এবং সাগর যখন তাকে সম্মিলিতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে তখনও সে জীবনের সাথে যুদ্ধ করেছে। যেকোনো মরণশীল মানুষের চেয়ে বেশি কষ্ট সে সহ্য করেছে, সেই সাথে মানুষের ঘৃণা সহ্য করেছে। তার সর্বশেষ ধাক্কা হয়তো এটাই।
ধীরে ধীরে বুজার্ড-এর দিকে এগিয়ে আসতে থাকে জাহান। তার হাতে নকশা করা একটা সাদা এনামেল-এর কাপ। সে এতটাই নরম সুরে কথা বলে উঠল যে, শুনে মনে হচ্ছিল সে যুদ্ধে আহত হওয়া রাগান্বিত কোনো ঘোড়াকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। “এই নাও এটা পান কর, ঠাণ্ডা মিষ্টি শরবত।”
বুজার্ড কাপটা হাতে নেয়, এরপর মুখে দেয়ার চেষ্টা করে। বুজার্ড কাত হয়ে যতবারই শরবত পান করার চেষ্টা করল ততবারই ওটা মুখোশের সাথে ধাক্কা খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেল। সে মাথা ঘুরিয়ে নানান রকম উপায়ে ওটা পান করার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু একফোঁটা শরবতও তার মুখে গেল না। ভিন্ন উপায়ে মাথা ঝাঁকিয়ে, কিংবা মুখোশ নাড়িয়ে কোনোভাবেই এটা পান করার কোনো উপায় সে বের করতে পারছিল না।
ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা অন্য লোকগুলো প্রথমে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। খানিক বাদে পুরো ব্যাপারটায় খুব মজা পেতে থাকে তারা। এক পর্যায়ে সবাই খুব উচ্চস্বরে হেসে উঠল। বুজার্ড এসব কিছু সহ্য করতে না পেরে হাতের কাপটা এত জোরে ছুঁড়ে মারল যে ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল সাথে সাথে। জাহান আবার কথা বলা শুরু করল বুজার্ডকে উদ্দেশ্য করে। “তুমি শুধু জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে শিখেছ। কর্তৃত্ব করতে শিখেছ। কিন্তু মানুষ হতে শিখনি। উঠে দাঁড়াও, আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব কিভাবে পানি পান করতে হয়।”
আবারো দুই হাতে তালি বাজাল জাহান, আর সাথে সাথে কালো আফ্রিকান এক চাকর হাতে পিতলের একটা জগ নিয়ে হাজির হলো। পিতলের জগে এক ধরনের নল লাগানো আছে যেটা দেখতে অনেকটা গাছে পানি দেয়ার নলের মতো। চাকরটা ভীতসন্ত্রস্ত চোখে বুজার্ডের দিকে তাকাতে তাকাতে এগুতে থাকে। এরপর সাধ্যমত দূরত্ব বজায় রেখে জগটা বুজার্ডের দিকে এগিয়ে দেয় যেন নলটা বুজার্ডের মুখের ভেতর যায়। বুজার্ড ঠোঁট দিয়ে নলটা ধরে তৃষ্ণার্ত পশুর মতো পানি পান করতে থাকে। জাহান পুনরায় যখন তালি বাজাল তখন এক ধাক্কায় নলটা বুজার্ভের মুখ থেকে সরিয়ে নেয়া হলো।
“তোমাকে খাওয়ানো এবং পানি পান করানো হবে দাসদের দ্বারা, যাদেরকে শাস্তিস্বরূপ এই দায়িত্ব দেয়া হবে আরকি। যখন তুমি রাস্তায় বের হবে মহিলারা তোমার দিক থেকে ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিবে। বাচ্চারা যারা দুষ্টামি করবে তাদেরকে রাতে তোমার ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো হবে। যুবক ছেলেরা একজন আরেকজনের সাথে বাজি ধরবে যে কে তোমার দিকে সবার আগে পচা সবজি ছুরে মারতে পারবে। যখন তারা কেউ ভুলবশত এটা করে ফেলবে তখন আমার লোকেরা তাদেরকে শাস্তি দিবে। আর এভাবে…তুমি সত্যিকার অর্থে ভয় আর ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হবে।”
