ওসমানকে যখন সে গেটের দারোয়ান-এর সাথে কথা বলতে দেখে তখন গ্রে রাগে টগবগ করছিল। লোকজনের ভিড়, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি এবং শরীরের গন্ধ সবকিছুই তার কাছে অসহ্য লাগছিল। গ্রে অনেকদিন ধরেই উপকূলে বসবাস করে। ইংরেজদের আঁটসাট মোটা কোটের চেয়ে অ্যারাবিয়ানদের লম্বা আলখাল্লা তার কাছে বেশি আরামদায়ক মনে হয়। ধর্মীয় কারণের চেয়ে ভৌগোলিক পরিবেশগত কারণেই তার এমনটা মনে হয়। চামড়া ব্যবসায়ী আহমেদকে যখন প্রাসাদের ভেতরে যাবার অনুমতি দেয়া হলো তখন গ্রে লজ্জায় আর অপমানে ঘামতে থাকে, তার শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। আহমেদ একটা বড় বক্স বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। ওটা অনেকটা মহিলাদের হেডগিয়ার বহন করার বক্সের মতো দেখতে। গ্রে অবশ্য সেটার প্রতি ততটা মনোযোগ দিল না।
কিছু সময় পরে একজন প্রাসাদের কর্মচারী বেরিয়ে এসে গার্ডদের সাথে কথা বলতে থাকে। একসময় তিনজন লোক ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এসে তাদের হাতে ধরা কাঠের লম্বা লাঠি দিয়ে লোকজনকে সরিয়ে জায়গা করে নিতে থাকে। একসময় গ্রে দেখে যে তারা ওরই দিকে এগিয়ে আসছে। সে ভয় পেয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভিড়ের কারণে সে পালাতে পারে না। ঘর্মাক্ত অবস্থায় প্রচণ্ড ভয়ে সে চিৎকার করে উঠল যখন সে দেখল যে কয়েক জোড়া হাত তাকে টেনে-হিঁচড়ে প্রধান গেইটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খানিক বাদেই সে নিজেকে প্রাসাদের টাইলস করা মেঝেতে আবিষ্কার করল।
গ্রে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। সেই কর্মচারীটি ওকে এখানে নিয়ে এসেছে যে একটু আগে আহমেদকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। “আমার সাথে আসুন, এফেন্দি, মহারাজা আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।”
সে যখন উঠে আস্তে আস্তে ভেতরের দিকে এগোতে থাকে তখন দেখতে পায় মধ্যদুপুরে ঝরনার পানি চকচক করছে। গ্রে বুঝতে পারে সেই গার্ড তিনটা তার পিছু পিছু আসছে। তাদের হাতে এখন আর সেই লম্বা কাঠের লাঠি নেই। কিন্তু তার বদলে কোমড়ের বেল্টে আটকানো আছে বাকানো তলোয়ার।
ঠিক ঐ মুহূর্তে কনসাল গ্রে বুঝতে পারে যে মহারাজার সাথে দেখা করতে পারাটাকে সে যতটা সৌভাগ্যের বিষয় মনে করেছিল, সেটা হয়তো অতটা সৌভাগ্যের নাও হতে পারে।
*
বুজার্ডের সব ইদ্রিয় সময়মতো এখনো ভালভাবে কাজ করে না। কিন্তু তার নাকের নিচ দিয়ে একটি ইঁদুর হেঁটে গেলে সে সেটা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারে। এই নাস্তিক জাহানটা কিছু একটা করতে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা কী? এরকম স্বর্গীয় নামধারী একজন লোকের চামড়ার ব্যবসায়ীর সাথে কী কাজ থাকতে পারে?
প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। জাহান বলে উঠে, “আসুন।” এরপর যে ঘরে প্রবেশ করে ভয়ে তার চেহারা থকথকে জেলির মতো মনে হয়। জাঞ্জিবার-এর মাননীয় কনসাল ঘরে প্রবেশ করে। বুজার্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু জাহান আগন্তুককে স্বাগত জানায়। “গুড মর্নিং মি গ্রে। আপনার সাথে আবার দেখা হবে এটা কখনো ভাবিনি।”
মানুষ তাকে দেখার পর যে বিস্ময়, ঘৃণা আর বমি করার মতো এক্সপ্রেসান দেয়, তাতে বুজার্ড ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে দেখার পর গ্রে এর মুখের যে অবস্থা হলো, সেটা অন্য সবার এক্সপ্রেসানকেও ছাড়িয়ে গেল। বিস্ময়ে লোকটার মুখ হা হয়ে গেল, বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে যেন সে কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু কথা বলার জন্য যথেষ্ট বাতাস সে ফুসফুসে নিতে পারছে না। অবশেষে তার মুখ দিয়ে কথা বেরোয়। “কিন্তু…কিন্তু… আপনি তো মৃত।”
বুজার্ড তার ছেচে যাওয়া ঠোঁটের অংশটক দিয়ে হাসার চেষ্টা করে। “হয়ত সেটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সর্বশক্তিমান বিধাতা আমাকে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
“সত্যিই আল্লাহ তাআলা অনেক দয়ালু ও সবজান্তা,” গ্রে বলে উঠে। এই ফাঁকে সে জাহান-এর দিকেও এক পলক তাকিয়ে নেয় তার অভিব্যক্তি বোঝার জন্য।
জাহান কথা বলা শুরু করে। “এখন আপনারা দুজন পুনরায় একত্রিত হয়েছেন। আমাকে এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে দিন। হেনরি কার্টনির কারণে আপনাদের দুজনের এবং আমাদের লোকদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সম্পর্কে আমি জানি। আমি এবং আমার ভাই গ্রান্ড মোগল-এর ইচ্ছে আপনারা দুজন একত্রিত হয়ে এটার প্রতিশোধ নিবেন।”
“আমার ভাই কিছুদিন আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে একটা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। চুক্তিটা ভূমি সংক্রান্ত বেশ বড় ধরনের চুক্তি। আমার ভাই মনে করে এই চুক্তি বেশ সুফল বয়ে আনবে। তাই এরকম সময়ে সে ইংল্যান্ডের এরকম একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকের পেছনে সরাসরি লাগতে চাচ্ছে না। এতে তার ধনী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।”
“কার্টনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে,” বুজার্ড মনে মনে চিন্তা করল। কথাটা তাকে বেশ অবাক করল।
“একারণে আমাদের হয়ে কাজ করার জন্য মাধ্যম হিসেবে কোনো বিচক্ষণ ও ধূর্ত লোককে আমাদের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আপনাদের দুজনের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কে হতে পারে? ক্যাপ্টেন কার্টনিকে ঘৃণা করার পেছনে আপনাদের দুজনেরই যথেষ্ট কারণ আছে। এই লোক সম্পর্কে আপনারা দুজনেই বেশ ভাল করেই জানেন। তার চিন্তাভাবনা গতিবিধি সবই আপনাদের জানা। আপনার উচিত, নিজেদের ব্যর্থতার জন্য অনুশোচনা করা, এবং নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করা, কারণ এই আমার জায়গায় যদি অন্য কোনো রাজা হতো, তাহলে ব্যর্থতার দায়ে আপনাদেরকে সে অনেক আগেই হত্যা করার আদেশ দিত।”
