বুজার্ড বুঝতে পারল মহারাজা জাহান তার দিকে তাকিয়ে আছে-এতে মনে মনে সে আরও কুণ্ঠাবোধ করল। সে তার হাতে ধরে রাখা বস্তাটা বার বার উপরে নিচে করতে লাগল। তার পেশিগুলো অবশ হয়ে আসছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। তার ক্ষত থেকে পুঁজ এবং রক্তমিশ্রিত পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল কিন্তু তবুও সে থামছিল না। সে সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। জাহানের একজন কর্মচারী ভেতরে প্রবেশ করল সাথে সাথে। বুজার্ডকে দেখে সে তার বিস্ময় এবং হতবাক অবস্থা লুকাতে ব্যর্থ হলো। কিন্তু অতি দ্রুত সে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বলল, “মহারাজ, আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে। সে বলছে তার নাম আহমেদ এবং সে চামড়ার কাজ করে। কিন্তু কী কারণে এসেছে তা আমাকে বলেনি। সে বলেছে আপনি তাকে যে কাজ দিয়েছিলেন তা সে পূর্ণ করেছে। বলেছে সে শুধু আপনার কাছেই তা বলবে।”
জাহান হেসে বলল, “ঠিক আছে, তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।” এরপর সে বুজার্ড-এর দিকে তাকায়। বুজার্ড-এখনো তার হাঁটুতে হাত রেখে নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্রাণপণে চেষ্টা করছে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য। জাহান বুজার্ডকে ডেকে বলে, “মহান সৈনিক, আমি আপনার জন্য ছোট্ট একটা উপহার আনিয়েছি। আশা করি সেটা আপনার ভাল লাগবে। যদিও একটু কষ্টকর।”
.
জাঞ্জিবারের সালতানাত-এর রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম গ্রে মহারাজা সাদিক খান জাহান আলীর প্রাসাদের বাইরে একজন অনুনয়কারী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সে আজ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানাতে এসেছে যে কী দুর্ভাগ্য আর কী অবিচার-এর কারণে আজ তার এই অবস্থা হয়েছে। অথচ জাঞ্জিবার-এ থাকাকালীন সময়ে জাহানের প্রাসাদে সে কত সম্মানিত অতিথি ছিল। জাঞ্জিবার সমাজে সে সবচেয়ে ধনী শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল। শুধু ইউরোপের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুতুপূর্ণ সম্রাটই ছিল না সে, বরং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতও হয়েছিল। সিদ্ধান্তটা ছিল তার ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নেয়া। সে ভেবেছিল খ্রিস্টিয়ান সমাজের বাইরে গিয়ে বহুদূর যেতে পারবে। তারপর জাঞ্জিবার-এর সেই দুরাত্ম আর্ল অব কামব্রা উপাধিপ্রাপ্ত অ্যাঙ্গাস কোকরান-এর আবির্ভাব ঘটে। এর পরপরই আসে তরুণ কুরশাবক হেনরি কাটনি। যে সহজ এবং সম্মানের জীবন অনেক বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তুলেছিলেন গ্রে, তা নিমিষেই গুঁড়িয়ে যায়।
বুজার্ড আসার পরপরই গ্রেকে নিজের দলে টানার চেষ্টা করে, যেন সে ওমানের সুলতানের পক্ষ নিয়ে ইথিওপিয়ার রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। স্কটল্যান্ডের এই জলদস্যু যুদ্ধের বাজারে ক্রিশ্চিয়ানদের কাজ থেকে ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে ধনী হতে থাকে। সেই সাথে গ্রে-কে যথেষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়া শুরু করে। গ্রে-ও এত পারিশ্রমিক পেয়ে বুজার্ড-কে দেয়া কথা রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। যখন শত্রুর জাহাজ আক্রমণ করার চিঠি তার হাতে পৌঁছায় সে হর্ন অব আফ্রিকার উদ্দেশ্যে পাল উড়ায় এবং তাকে দেয়া কাজ পালনের জন্য প্রতিজ্ঞা করে।
এর পাঁচ সপ্তাহ পরে যুবক কার্টনি ওখানে পৌঁছায়। সেও বুজার্ডের মতোই ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। সেও শত্রুর জাহাজ আক্রমণের জন্য চিঠি পায়। কার্টনি যুদ্ধের সবকিছু শোনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিল। আর্ল অব কামব্রা তারই পথে যুদ্ধ করছে, এটা জেনে সে খুব বিস্মিত হয়। কিন্তু গ্রে, কার্টনির আগ্রহের ব্যাপারে খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না।
কেনই বা হবেন? মুসলিমরা এখানে বড় ধরনের যুদ্ধ করতে চায় যাতে অ্যারাবিয়া এবং আফ্রিকার উপকুলের মাঝে অবস্থিত বিশাল জলরাশির ওপর তাদের আধিপত্য বিস্তার হয়। আর যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করবে তাকে তারা বন্ধু হিসেবেই আলিঙ্গন করে নেবে।
এর মধ্যে কার্টনি এসে জাঞ্জিবারে নোঙর গাড়ে, এরপর স্কটম্যানকে খুঁজে বেড়ায়। সেই সাথে ইথিওপিয়ার রাজা আর জেনারেল নাজেত-এর হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে অনেকটা অকৃতজ্ঞ, কপট, দ্বিমুখী বিশ্বাসঘাতক-এর মতো। খুব দ্রুতই এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে কার্টনির আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বুজার্ডকে ধ্বংস করা, কারণ সে আসলে তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিছু সময় পরে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে কার্টনি সেই স্কটম্যানকে খুঁজে পেয়েছে, এরপর তাকে যুদ্ধে আহবান জানিয়েছে। আরও গল্প তৈরি হতে থাকে যে বুজার্ড তার সর্বোচ্চটা দিয়ে যুদ্ধ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি, জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়ে জাহাজের সাথেই পানিতে তলিয়ে গিয়েছে।
পুরনো দিনে হয়ত গ্রে এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে পারত আর তাতে হয়ত আসল ঘটনা উন্মোচন হতে পারত। কিন্তু সেটা এখন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ কার্টনি আরব জাহাজগুলো আক্রমণ করে ডুবিয়ে দেয়া শুরু করেছে। ফলে জাহাজ মালিকরা তাদের কার্গো থেকে কোনোরকম লভ্যাংশ পাচ্ছে না। এই লোকগুলো তাদের এই ক্ষতির জন্য গ্রে-কে দায়ী করছে, সেই সাথে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
জাঞ্জিবার-এর প্রতিটি দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে কফি শপ-এ বসে গল্প করা ছাড়া তার আর কোনো কাজই নেই। সবচেয়ে বেশি তার যা করার আছে তা হল মহারাজার প্রাসাদে আসা, অপেক্ষা করা, এরপর আশা করা যে মহারাজা সাদিক খান জাহান হয়ত একদিন তার দিকে সদয় দৃষ্টি দিবেন, তার অবস্থার উন্নতি করতে সচেষ্ট হবেন। এভাবেই একদিন মহারাজার জন্য অপেক্ষা করতে করতে গ্রে, নারী ব্যবসায়ী ওসমানকে দেখতে পায় যার সাথে এককালে সে ব্যবসা করেছিল। ওসমান-এর মতো দুপয়সার লোকও কিনা শেষ পর্যন্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে যে গ্রে-র মতো লোকের সাথে সে আর ব্যবসা করতে ইচ্ছুক নয়!
