“তুমি শেষবার বাউ-এ আসার পর আমি আমাদের ঘুমানোর জায়গাটা নতুনভাবে সাজিয়েছি,” হাল জুডিথকে নিয়ে এসে তার কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলল। একারণে কাঠুরেদের গত একটা সপ্তাহ অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এখন তুমি তোমার চোখ একটু বন্ধ কর…”
হাল যেভাবে বলল, জুডিথও তাই করল। হাল দরজা খুলে জুডিথ-এর হাত ধরে তার ব্যক্তিগত কামরায় নিয়ে আসে। চোখ বন্ধ অবস্থায় সে আরও কয়েক কদম সামনে এগিয়ে গেল। হঠাৎ হাল তাকে থামতে বলে। “এখন তুমি তোমার চোখ খুলতে পার।”
তার সামনে একটা স্লিপিং কট ঝুলে আছে। সাধারণ বিছানার চাইতে দ্বিগুণ বড় ওটা। সচ্ছ সাদা রঙের পাতলা কাপড় দিয়ে চারদিকের ঝুলানো রশিগুলো প্যাচিয়ে রাখা হয়েছে, সিল্কের ধূসর রঙের বিছানায় চাদরের ওপর উজ্জ্বল সুতার কাজ করা এবং মিসরীয় সুতীর কাপড়ের বালিশ রাখা আছে।
“খুবই সুন্দর লাগছে, হাল”, জুডিথ একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে কথাটা বলল।
“আমি এই লিলেনগুলো পেয়েছিলাম আমাদের আঁটকে ফেলা একটা জাহাজে।” হাল হেসে ফেলে কথাগুলো বলল। “ক্যাপ্টেন বলেছিল এগুলো শেখের হারেমের জন্য নেয়া হচ্ছে। আমি বলেছিলাম এগুলোর এর চেয়ে ভাল ব্যবহার আমি করব।”
“ওহ, তাই?” জুডিথ একটু টিপ্পনি কেটে বলল। “তা এগুলোর কী ভাল ব্যবহারটা হচ্ছে শুনি…”
কিন্তু বেচারি তার প্রশ্নটা শেষ করার সুযোগ পেল না। তার আগেই হাল তাকে দু’হাত দিয়ে উঠিয়ে বিছানার ওপর ছেড়ে দিল। সেই সাথে মনে মনে কাঠুরেদের প্রশংসা করতে লাগল। ওরা বেশ মজবুতভাবেই খাটটা বানিয়েছে। মনে হচ্ছে যেকোনো ধরনের ভার এটা বইতে পারবে।
*
নিজের ভাগ্য অন্বেষণে আরবের হয়ে যখন বুজার্ড ইথিওপিয়ার উদ্দেশ্যে উত্তরমুখী যাত্রা শুরু করে তখন তার মনে কোনো য়ৈ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেনি। বরং এটার প্রধান কারণ ছিল অর্থ উপার্জন। অ্যারাবিক সে খুব সামান্যই বলে। সে এটাকে খুব নোংরা ভাষা মনে করত যেটা তার সম্মানের সাথে খাপ খায় না। কিন্তু অচিরেই সে তার ভুল বুঝতে পারে। তার এই অজ্ঞতাই তার জন্য অনেক অসুবিধা বয়ে আনে। কারণ তার আশেপাশের মানুষ তাকে ছাড়াই কথাবার্তা চালিয়ে যায়, যার কিছুই সে বুঝতে পারে না। তাই সে আরবি ভাষা শেখা শুরু করে। তার এই প্রচেষ্টা তার আরোগ্য লাভের সময়ও চলতে থাকে। সে কারণে মহারাজ সাদিক খান জাহান-এর চিঠি পড়া তার জন্য খুব একটা কষ্ট হয় না। চিঠিতে লেখা ছিল, “আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি এই আরোগ্য লাভের কারণে। স্বীকার করতেই হবে। তুমি যে সুস্থভাবে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে এটা আমার কল্পনার অতীত ছিল। কিন্তু এখন শুধু একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ।”
প্রিন্স জাহানের রাজত্বে বুজার্ড-একসময় বেশ দম্ভসহকারে ঔদ্ধত্য নিয়ে চলাফেরা করত। তাই এমন মধুর বাণী শুনতে বা মেনে নিতে বুজার্ড-এর মন সায় দিচ্ছে না। সেই সাথে মণিমুক্তা হীরা জহরত খচিত পোশাক পরিহিত কারো সামনে একবাহু একচোখ বিশিষ্ট বুজার্ডের নিজেকে গারগেইল ভূত-এর চেয়েও কুৎসিত মনে হচ্ছে। কিন্তু বুজার্ড এখন ভিক্ষুক। নত তাকে হতেই হবে। তাই সে কোনোভাবে মাথাটা নিচু করে বলে, “আপনার অনেক দয়া, মহারাজা।”
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠা তার অদম্য ইচ্ছেশক্তিরই একটা প্রমাণ। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় বুজার্ড তার শরীরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। সে শরীরের কী কী অংশ হারিয়েছে সেটার চেয়ে বরং কী কী অংশ অবশিষ্ট আছে সেটার প্রতিই ছিল তার সমস্ত মনোযোগ। তার পাদুটো এখনো ভাঙেনি যদিও বেশিরভাগ চামড়া পুড়ে গিয়েছে। কিন্তু চামড়া ও ক্ষতের নিচে মাংসপেশিগুলো এখনো তার শরীরের ভার বয়ে বেড়াতে পারবে। যদিও তার বাম হাত উড়ে গিয়েছে কিন্তু ডান হাতটা এখনো অক্ষত আছে। ডান হাত দিয়ে এখনো শক্তভাবে কোনো কিছু ধরার সামর্থ্য আছে তার। অর্থাৎ সে হয়ত কোনোদিন শক্তহাতে তলোয়ার ধরতে পারবে না। তার এক চোখের দৃষ্টিশক্তি এবং এক কানের শ্রবণশক্তি এখনো অক্ষত আছে। সে হয়ত শক্ত কোনো কিছু চিবাতে পারবে না, কারণ তার খাদ্যনালীর অবস্থা এমন হয়েছে যে, শক্ত কোনো খাবার হয়ত সে হজম করতে পারবে না। সব খাবারই হয়ত তাকে তরল জাতীয় মিশ্রণ বানিয়ে খেতে হবে। তার জিহ্বা হয়ত তাকে আলাদা আলাদা খাবারের স্বাদ দিতে পারবে না। কিন্তু এটুকুই তার জন্য যথেষ্ট যে সে খেয়ে বাঁচতে পারবে।
এসব ভেবেই বুজার্ড মানসিকভাবে শান্ত আছে। কিন্তু তার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা এবং সারা শরীরেও তা ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি কেটে পড়ে পাওয়া অঙ্গগুলো থেকেও সে ব্যথা অনুভব করছে। তবুও সে চিন্তা করতে পারছিল, পরিকল্পনা করতে পারছিল, হিসাব করতে পারছিল আর…ঘৃণা করতে পারছিল।
এসবের মধ্যে যে জিনিসটা তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তা হলো ঘৃণা। ওটাই তাকে উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। শরীরের হাল ধরতে শিখিয়েছে। তাকে শরীরের অবসন্নতা কাটিয়ে উঠতে শিখিয়েছে। এটাই তাকে খাবার তুলতে সাহস যুগিয়েছে যখন তার মনে হচ্ছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে এসিড তার ফুসফুসে প্রবেশ করছে।
বুজার্ড-এর মনের জ্বলন্ত আগুন জাহানকে বিমোহিত করেছে। “আমি আপনার কষ্ট দূর হওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি,” এইটুকু বলে সে আস্তে আস্তে তার অতিথির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। অতিথির এমন পুড়ে যাওয়া আর পচে যাওয়া শরীর দেখে যাতে তার মুখভঙ্গিতে কোনোরকম বিতৃষ্ণা প্রকাশ না পায় সেদিকে খেয়াল রাখল সে।
