অ্যাবোলি সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় সারস পাখির লম্বা পালক দিয়ে তৈরি এক ধরনের মুকুট পরে আছে সে। তাকে দেখে সাধারণ মানুষ বলে মনেই হচ্ছে না, বরং দেখতে অনেকটা জঙ্গলের দেবতার মতো লাগছে। তার হাতে বড় ব্লেডযুক্ত একটা বল্লম ধরে আছে এবং কোমড় থেকে চিতাবাঘের লেজ দিয়ে তৈরি একধরনের ঘাগরা পরে আছে।
তার পেছনে কয়েকজন অ্যামাডোড়াও রয়েছে। তার গোত্রের এই কয়জন অ্যামাডোডা গোল্ডেন বাউ-এর সেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এরা সমুদ্রেও ঠিক ততটা শক্তিশালী ও মারাত্মক যতটা শক্তিশালী তারা বনে এবং তাদের নিজভূমিতে ছিল। তারাও মাথায় সারস পাখির পালক পরে এসেছে। যদি ওদেরকে অ্যাবোলির মতো ততটা লম্বা লাগছে না। অ্যাবোলিকে ওদের দলনেতা বলেই মনে হচ্ছে।
তারা সামনে এগিয়ে আসতে আসতে সমস্বরে গান গাইতে লাগল। তাদের গানে বীরত্ব, ভ্রাতৃত্ব এবং দায়িত্বের স্বার্থে ইচ্ছামৃত্যুর কথা ধ্বনিত হচ্ছে। জাহাজের অন্যান্য নাবিক অবাক হয়ে দেখছে, কারণ তারা অ্যামাছোঁড়াদের কখনও এভাবে দেখে নি। হাল এবং জুডিথ-এর কাছাকাছি আসার আগ পর্যন্ত লোকগুলো পায়ের তালে এগিয়ে আসতে লাগল। অনেকটা নাচের তালে এবং অনেকটা প্রকৃত যোদ্ধার মতো পায়ের তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল।
তাদের গান শেষ হওয়ার পর সবাই তাদের প্রশংসা করতে লাগল। জুডিথ এর জন্য ব্যাপারটা সবার চেয়ে বেশি আনন্দের ছিল। কারণ সে আফ্রিকান। যদিও সে গানের কথাগুলো খুব একটা ভাল বুঝতে পারছিল না। কিন্তু ওরা যে চেতনা দিয়ে গানটা গাইছিল সেটা বুঝতে পারছিল।
অ্যাবোলি সামনে এগিয়ে এল। এরপর মাথায় পরা পালাকের মুকুটটা পাশে রেখে হাঁটু গেড়ে জুডিথ-এর সামনে বসল। জুডিথ-এর হাতটা আলতো করে টেনে নিয়ে চুমু খেল।
এটা অভিজাত বংশীয় কারও তার রানীর প্রতি সম্মান জানানোর রীতি। জুডিথও সম্মানের যথাযথ উত্তর দেয়। সে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকে অ্যাবোলির হাতটা ধরে রেখে বলে, “ধন্যবাদ অ্যাবোলি। আমার হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে তোমাকে ধন্যবাদ।”
এরপর হালও অ্যাবোলি’র হাত ধরে বলল, “ধন্যবাদ পুরনো বন্ধু, সবকিছু অসাধারণ ছিল।”
অ্যাবোলি হেসে বলে, “আমি অ্যামাডোডাদের প্রিন্স। এর চেয়ে কমে আমার পোয় না।”
এরপর অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। খাওয়া-দাওয়া আনন্দ ফুর্তি, গান-বাজনা চলতেই থাকে। জুডিথ হালকে ধরে ফ্লোর-এর বাইরে নিয়ে যায়, এরপর বাজনার তালে তালে নাচতে থাকে। কিছু স্থানীয় রাধুনীরা খাবার পরিবেশন করছে। নাচের জন্য কিছু মেয়েও রয়েছে। কিন্তু হাল কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছে যাতে ওদের নিয়ে কোনোরকম বিদ্রূপ বা ঠাট্টা-তামাশা না করা হয়। যখন সূর্য প্রায় অস্তগামী তখন হাল সিঁড়ির ওপর উঠে দাঁড়ায়, তারপর সবাইকে চুপ হতে বলে।
“সবাই থাম এবার। আমার কিছু কথা বলার আছে,” হাল চিৎকার করে বলতে থাকে। সে খুব উচ্চস্বরে চিৎকার করে নিজের পরিচয় দেয়া শুরু করে, “আমার নাম…আমার সঠিক নাম স্যার হেনরি কার্টনি।”
“ক্যাপ্টেন, আমরা সবাই এটা জানি,” একজন নাবিক বলে উঠল।
“ভাল। তবে তোমাকে বুঝতে হবে যে আমার এটা বলার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো একটা কারণ আছে। কিন্তু প্রথমে আমি বলতে চাই যে, আগামীকাল আমরা ইংল্যান্ড-এর উদ্দেশ্য রওনা দিব।”
নাবিকদের মাঝ থেকে একটা তীব্র গর্জন শোনা গেল “অবশ্যই।” হাল আবার বলতে শুরু করল, “এই জাহাজের সদস্যদের মধ্যে যাদের বাড়ি এই আফ্রিকায় তারা বাড়ি ফিরে যেতে পার। কিন্তু তার আগে আমাদের একটা কাজ সম্পন্ন করতে হবে।”
“তোমরা অনেকেই জানো, আমার বাবা স্যার ফ্রান্সিস কার্টনি, এখানে তোমাদের অনেকের সহযোগিতায় ডাচদের পতাকাতলে অনেক জাহাজকে ভূপাতিত করেছেন,..”
সবাই সম্মতিসূচক চিৎকার দিল।
“…এবং এতে করে তিনি অনেক ধন সম্পদ আহরণ করেন। সেইসব সোনা, রুপা এবং মূল্যবান জিনিস আমরা খুঁজে বের করব। তোমরা সবাই বয়স এবং কাজের বিচারে তার ভাগ পাবে।”
হাল আনন্দের সাথে তার গলা আরও উপরে তুলে বলল, “তোমাদের প্রত্যেকেরই এই পুরস্কার প্রাপ্য। তোমাদের চেয়ে সাহসী, অনুগত নাবিক আমি আর কোথাও পাব না। তোমরা নাবিক এবং যোদ্ধা হিসেবে তোমাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তোমরা তোমাদের প্রতিজ্ঞা রেখেছ। এখন আমি আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করব। আমি তোমাদেরকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। এবং সেখানে তোমরা যাতে ভালভাবে বাঁচতে পার সেই ব্যবস্থা করব। কিন্তু তার আগে আমি তোমাদেরকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। তোমরা কী সেই রমণীর জন্য নিজেদের গ্লাস উঁচু করে ধরে উল্লাস জানাবে না যাকে আমি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি? সেখানে সে হবে আমার মাননীয়া স্ত্রী। প্রিয় নাবিকরা, তোমাদের প্রিয় জেনারেল জুডিথ হবে ভবিষ্যতের লেডি কার্টনি।”
যখন মদ্যপান করতে করতে এক একজন নাবিক প্রায় মাতালের পর্যায়ে চলে গিয়েছে তখন হাল এবং জুডিথ তাদের কোয়ার্টারের দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। এখন আর কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নেই যেটার জন্য গোল্ডেন বাউ-এর নাবিকদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন বাঁকানো ডেস্ক-এর ওপর ক্যাপ্টেনদের লগবুক পূরণ করার জন্য যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। পার্সিয়ান কার্পেট-এ অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য যথেষ্ট সুব্যবস্থাও রয়েছে।
