“না স্যার, আমি কিছু জানি না।”
“কেউ কিছু জান?”
নাবিকেরা সবাই মাথা নাড়িয়ে চোখ বাঁকিয়ে জবাব দিল যে তারা কিছুই জানে না। নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছিল যে সবাই কিছু একটা লুকাচ্ছে এবং এই খেলাতে জুডিথ বেশ মজাই পাচ্ছিল।
“সে না আসায় আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি,” জুডিথ বলে উঠে। এরপর আস্তে আস্তে গিয়ে হাল-এর পাশে বসে। “কক্সওয়েল, এবার আমাদেরকে জাহাজে ফিরিয়ে নিয়ে চল।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে ম্যাডাম,” বিগ ডেনিয়েল বলে। এরপর সে সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কাজের তাগিদ দিতে থাকে।
“জাহাজটাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে” হাল-এর দিকে তাকিয়ে বলল জুডিথ। এরপর একদৃষ্টিতে গর্বিত হালকে দেখতে লাগল।
“আমি এবং আমার লোকেরা এটাকে নতুনভাবে সাজিয়েছি,” হাল বেশ আনন্দের সাথে জানাল।
“ম্যাম, আমরা সবাই মিলে গত এক সপ্তাহ জুড়ে দিন রাত পরিশ্রম করেছি, ডেনিয়েল জাহাজটার দিকে তাকিয়ে বলল।
“বেচারা ডেনিয়েল, আমার জানা ছিল না যে আপনাদের কাপ্টেন এতটা নিষ্ঠুর,” জুডিথও একটু মজা করে বলল।
“না ম্যাম, আপনি জানেন না ক্যাপ্টেন কার্টনি কি ধরনের মানুষ। উনি তার বাবার মতোই হয়েছেন। তার বাবার পরে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যে জাহাজটাকে শক্ত হাতে চালিয়ে নিতে পারেন।
হাল-এর প্রশংসার কথা হয়ত অনেকেই বলতে পারে কিন্তু জুডিথ জানে সে হালকে যতটা জানে অন্য কেউ তার চেয়ে বেশি ভাষায় প্রকাশ করে বোঝাতে পারবে না। জুডিথ হাল-এর হাতে জোরে চাপ দিয়ে তার সেই অনুভূতিটা হাল-এর মাঝে ছড়িয়ে দিল। তারা যখন গোল্ডেন বাউ-এর কাছাকাছি আসল ডেনিয়েল উপস্থিত জনতাকে চিৎকার চেঁচামেচি থামাতে বলল। জাহাজের ব্লেডগুলোকে থামিয়ে দাঁড়গুলোকে সোজা করে রাখতে বলল। এরপর জীবন রক্ষাকারী নৌকোগুলোকে নিরাপদে জাহাজের পাশে থামিয়ে রাখার আদেশ দিল, একইসাথে জাহাজ থেকে কতগুলো মোটা নেট নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিতে বলল যাতে নৌকোয় থাকা লোকগুলো নেট বেয়ে উপরে উঠে যেতে পারে। যখন জুডিথ উঠে দাঁড়িয়ে নেট-এর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল তখন হাল তাকে থামিয়ে দিল। এরপর চিৎকার করে বলল, “আস্তে আস্তে সুইং-টা নিচে নামাও।”
জুডিথ উপরে তাকিয়ে দেখল একটা কাঠের দোলনার মতো জিনিস নিচে নামানো হচ্ছে।
“আমরা এটাকে বড় আর ভারি জিনিসপত্র জাহাজে উঠানোর জন্য ব্যবহার করি। তবে মনে হচ্ছে আজকে এটার সঠিক ব্যবহার হবে,” হাল বলল।
কাঠের দোলনাটাকে নানানরকম স্থানীয় ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। এটার নিচ থেকে নানান রকম সাজানো ফিতা ও কাপড় আর সিগন্যাল ফ্ল্যাগ ঝুলে আছে। স্লিংটা যখন নিচে নামানোর পর হাল ওটার ওপর জুডিথকে বসতে সাহায্য করল।
“দেখো, সে যেন নিরাপদে উঠতে পারে, সে ডেনিয়েলকে আদেশ দিল! তারপর জুডিথ-এর গালে টোকা দিয়ে বলল, “তোমার সাথে ডেক-এ দেখা হবে। মাই ডালিং।”
হাল-এরপর নেট-এর দিকে এগিয়ে গেল এবং এরপর নেট ধরে আস্তে। আস্তে উপরে উঠতে লাগল। হাল-এর উপরে উঠা দেখে সে গাছ বেয়ে উঠা বানরের কথা মনে করে মনে মনে হাসতে লাগল। এরপর সে যখন ব্লিংটা শক্ত করে ধরে বসল তখন ডেনিয়েল আদেশ দিল, “উপরে উঠাও।” জুডিথ-এর চেহারা থেকে জেনারেল নাজেত-এর সমস্ত চিহ্ন অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন তাকে শুধুই একজন সাধারণ নারী মনে হচ্ছে। যেন তার নতুন জীবনের শুরুতে সে বিস্ময়াভিভূত হয়ে আছে। যখন কাঠের দোলনা উপরে উঠানোর এলার্ম বাজানো হল তখন জুডিথ অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। সে দেখতে পেল হাল উঠতে উঠতে একেবারে ডেক-এর কাছাকাছি চলে গিয়েছে। এরপর লাফ দিয়ে ডেক-এ নেমে পড়ল সে। জাহাজের অন্যান্য লোক তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
“থ্রি চিয়ার্স ফর দ্য ক্যাপ্টেন লেডি” বাউ-এর বৃদ্ধ দাঁড়চালক নেড টেইলার চিৎকার করে উঠল।
ডেক-এর ওপরে যখন জুডিথকে উঠতে দেখা গেল তখন খুশির জোয়ার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। হুররে… বলে একজন তার মাথার ক্যাপটা উপরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
দ্বিতীয়বারের মতো সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল যখন জুডিথকে বহনকারী কাঠের দোলনাটাকে জাহাজের ডেকের ওপর নামিয়ে আনা হল। নেড টেইলার যখন “হিপ হিপ হুররে…” বলে চিৎকার দিয়ে উঠল তখন জুডিথ দোলনাটা ছেড়ে দিয়ে দক্ষ দড়িবাজের মতো লাফ দিয়ে ডেক-এ নেমে এল এবং হাল এর বাহুতে নিজেকে আবিষ্কার করল। তৃতীয়বারের মতো সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল এবং এবারের চিৎকার বেশ কিছু সময়ের জন্য স্থায়ী হল। কারণ হাল জুডিথকে দুই হাত দিয়ে ধরে তার ঠোঁটে ছোট্ট করে চুমু খেয়েছে। সেটার রোমাঞ্চ জুডিথ-এর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু একই সাথে একটা হতাশা তাকে ঘিরে ধরছে, কারণ তাকে আরও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
হাল জুডিথ-এর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, “তুমি অ্যাবোলির কথা জিজ্ঞেস করছিলে। দেখ, এটা তোমার ভাল লাগবে।”
এরপর হাল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করল যেগুলো শুনে জুডিথের মনে হলো যে ওগুলো আফ্রিকান শব্দ, কিন্তু সে যে কি বলছে সেটাই বুঝতে পারল না জুডিথ। কিছুক্ষণ পরে পেছন থেকে এর জবাব এল। কেউ একজন তীক্ষ্ণস্বরে স্তবগান গাইতে শুরু করেছে। এই কণ্ঠের উত্তরে আবার একটা গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠ ‘হাহ্!’ বলে জবাব দিল। সাথে সাথে ডেক-এ দাঁড়ানো নাবিকেরা পায়ের তালে তালে ডেক-এ আঘাত করতে লাগল। প্রথম কণ্ঠটি তার স্তবগান চালিয়ে যেতে লাগল। জুডিথের সামনে দাঁড়ানো নাবিকেরা সরে গিয়ে সামনের রাস্তা ফাঁকা করে দিল। সামনের দৃশ্য জুডিথকে এত বেশি রোমাঞ্চিত করে তুলল যে সে শক্ত করে হাল-এর হাত ধরে ফেলল।
