মিতসিওয়া পোর্ট-এ বহনকারী ক্যারিয়েজে সে উঠে বসেছে। রাজার ব্যক্তিগত সৈন্যদল তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সৈন্যদলের সবাই আনুষ্ঠানিক ইউনিফর্ম পরে আছে। কাঁধের ওপর থেকে লম্বা একটা কাপড় বাঁকা করে ঝুলানো আছে যেটার ওপর ইথিওপিয়ান সিংহের ছবি আঁকা আছে। জুডিথকে বহনকারী যানটা যখন ডকসাইডে গিয়ে থামে তখন সৈন্যদল ক্যারিয়েজের চারপাশে সুবিন্যস্তভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে যাতে জনগণ তাদের জাতীয় বীরের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়। তাদের সবার কাছেই পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো কারণ তাদের পৌরাণিক গল্পের নায়িকা জেনারেল জুডিথ তাদের মাঝে এসেছে! একজন অশ্বারোহী গার্ডম্যান তার অশ্ব থেকে নেমে জুডিথকে বহনকারী গাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে দরজা খুলে একটা সিঁড়ি নামিয়ে আনল। এরপরে সে সরে দাঁড়াল যাতে জুডিথকে সবাই দেখতে পায়।
শেষমুহূর্তে জুডিথ অনুমান করতে পেরেছিল যে তার উপস্থিতি অনেক লোকের আগমন ঘটাতে পারে। সেই সাথে সে চেয়েছিল তার বিজয়ের আনন্দের কিছু অংশ জনগণকে দিতে। তাই সম্মানসরূপ পাওয়া সব স্মারক এবং মেডেল সে সাথে করে নিয়ে বের হয়েছিল। যখন সে বাইরে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখন মধ্যগগনের সূর্যের আলোতে তার গায়ে জড়িয়ে থাকা সমস্ত মণিমুক্তা ও ব্যাজ চকচক করতে থাকে। তাকে এতটাই উজ্জ্বল আর আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল যে ঐ মুহূর্তে তাকে যতটা না সাধারণ মানবী মনে হচ্ছিল, তারচেয়ে বেশি মনে হচ্ছিল স্বর্গীয় দেবীর মতো। সে গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই চারদিক থেকে উল্লাস ধ্বনির রব উঠল। যদিও সে স্মিত হেসে হাত নাড়িয়ে উপস্থিত জনতার সম্মান গ্রহণ করছিল কিন্তু তার দৃষ্টি এবং হৃদয় তখন অন্য আর একজনের কাছে পড়েছিল।
হাল কার্টনি সিঁড়ির ধাপের নিচে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। যদিও সে যুদ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন কিন্তু সে কোনো পদমর্যাদার ব্যাজ পরা ছিলনা। যদিও সে গোল্ডেন লায়ন অব ইথিওপিয়ার সম্মানিত সদস্য, সেন্ট জর্জ-এর নউটিনিয়ার নাইট অব টেম্পল উপাধির অধিকারী, সেই সাথে তার বাবার মতো সেও হলি গ্রেইল-এর রক্ষাকারী কিন্তু তবুও সে কোনো পদমর্যাদার ব্যাজ পরেনি। তার পরিবর্তে সে শুধুই একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তার প্রিয় মানুষটার জন্য অপেক্ষা করছে। তার চুলগুলো পেছনে রাবার ব্যান্ড দিয়ে শক্ত করে বাঁধা এবং গায়ে একটা সাদামাটা লিলেন-এর জামা পরা, হাল-এর কোমড়ের পেছন থেকে টলেডো ব্লেড-এর তৈরি একটি তলোয়ার বাট-এ আঁটকানো আছে। তরবারির বাঁটটা সোনা ও রূপার মিশ্রণে নকশা করা এবং এর উঁচু অংশে একটা বড় স্যাফায়ার পাথর বসানো আছে। এই তরবারিটা হাল-এর গ্রেট গ্রান্ডফাদারকে এলিজাবেথান নৌ-সেনাধ্যক্ষ স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক দিয়েছিলেন।
যখন জুডিথ তার মনের মানুষটিকে দেখতে পেল সে এক ধরনের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল।
যুদ্ধের দাবদাহে জুডিথ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত। দুইগুণ বা তিনগুণ বয়সে বড় কাউন্সিল মেম্বারদের সামনে সে নিজেকে শক্তহাতে ধরে রাখত। যে কাউন্সিল মেম্বাররা শারীরিক গঠনে এবং সম্মানে তার চেয়ে অনেক এগিয়ে। তারা তো বটেই, এমনকি তার শত্রুরাও কখনও তাকে ভয় দেখাতে পারত না। অথচ এখন হাল কার্টনির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব মনে হচ্ছে, পা দুটোর সমস্ত শক্তি যেন নিস্তেজ হয়ে আসছে। সে কোনোভাবেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার কাছে মনে হচ্ছিল তার চারপাশের সবকিছু ঘূর্ণায়মান। হাল যদি সময়মত ধরে না ফেলত তাহলে সে হয়ত মাটিতে পড়েই যেত। হাল তাকে ধরে ফেলার পর তাকে স্বাভাবিক হতে একটু সময় দিল। হয়তো বা তার এমন মধুর অসহায়ত্ব তাকে উপভোগ করার একটু সুযোগ দিল হাল! তাকে দেখে মনে হচ্ছিল চারপাশের এত লোকের ভিড়ে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এমন কি হাল যে কি বলছে সেটাও সে ঠিকমত শুনতে পাচ্ছে না।
হাল তাকে উৎসুক জনতার মাঝখান দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ঘোড়ায় চড়া গার্ডেরা জনতার মাঝে পথ করে দিয়ে তাদেরকে জেটির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। জুডিথ চারপাশ থেকে এল তাজার” দ্য বারাকুলা ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল। শত্রুর জাহাজ আক্রমণের বীরত্বের কারণে হাল-এই নামে পরিচিত ছিল। এরপর সে হাল-এর হাত শক্ত করে ধরল। হাল তাকে সাবধানে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। যখন জুডিথ গোল্ডেন বাউ-এর সিঁড়িতে পা রাখল, তখন দেখতে পেল যে এর প্রতিটা দাঁড়-এ একজন করে তোক দাঁড়িয়ে আছে তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য। জাহাজের একমাত্র পালটি গুটিয়ে রাখা আছে। জাহাজের রাডারের ওপর দাঁড়িয়ে বিগ ডেনিয়েল ফিশার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
“ম্যাম, আপনাকে জাহাজে স্বাগতম,” বিগ ডেনিয়েল বলতে লাগল। “আপনি হয়ত আমাকে খেয়াল নাও করতে পারেন কিন্তু আপনি অনেকদিন ধরেই আমাদের সবার কাছে অনেক প্রিয় মানুষ।”
“ধন্যবাদ ডেনিয়েল,” জুডিথ একটু হেসে জবাব দিল। এরপর সে এদিক সেদিক তাকিয়ে হাল-কে জিজ্ঞেস করল, “অ্যাবোলি কোথায়? তাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না এরকম একটা অনুষ্ঠানের দিন সে অনুপস্থিত।”
হাল কাঁধ ঝাঁকিয়ে না জানার ভান করল। এরপর হাতের ইশারা করে কিছু একটা বোঝাল ডেনিয়েলকে। চোখ বড়বড় করে চেহারায় নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে বলল, “আমি জানি নে সে কোথায় আছে। ডেনিয়েল তুমি কিছু জান?”
