.
ক্যাপ্টেন জানে যে তার জাহাজটা এখন এক অর্থে নাবিকদের জীবন্ত কঙ্কাল দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তার কাছে জমানো যা টাকা ছিল তা প্রায় শেষের পথে। যতটা সস্তায় সবকিছু চালানো সম্ভব সেই চেষ্টাই করছে সে।
বিস্কিট ও অন্যান্য শুকনো খাবার যা ছিল উপকূল ত্যাগ করার পূর্বেই তাতে ছত্রাক ধরে ফেলেছে। সবজি যা কিছু ছিল সব পচে গিয়েছে। শুকনো মাংস যা ছিল তা এতটাই শুকিয়ে গিয়েছে যে, তার চেয়ে ববং জুতোর চামড়া ছিঁড়ে খাওয়া ভাল। সে এবং তার নাবিকেরা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন পার করছে। তারা এমন কোনো সভ্য বন্দরের খোঁজ পাচ্ছে না যেখানে জাহাজ থামিয়ে তারা কিছু কিনতে পারে বা নতুন কোনো যোগানদারের সন্ধান পেতে পারে যার টাকা পরে শোধ করা যাবে। সহজ কথায় ক্যাপ্টেন নতুন কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না। কিন্তু আরো একটা সমস্যা তার মাথার ওপর কড়া নাড়ছে। ক্যাপ্টেন বুঝতে পারে পরিস্থিতি খুব খারাপ হতে যাচ্ছে যখন সে কাকের বাসস্থানের মতো কর্কশ স্বর শুনতে পায়। ক্যাপ্টেন! সমুদ্রে কিছু একটা ভাসতে দেখা যাচ্ছে। জাহাজের দক্ষিণ পাশে, সামনের দিকে। দেখতে কাঠের মতো…অথবা…উল্টানো নৌকোর মতো।”
ক্যাপ্টেন মাথা ঝাঁকাল, এরপর বিড়বিড় করে বলল, “আমাকে কেন এটা বলার প্রয়োজন পড়ল?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেকবার চিৎকারের মাধ্যমে সে তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল। “ওখানে কিছু একটা নড়ছে। আরে…একটা মানুষ! সে আমাদের দেখতে পেয়েছে মনে হচ্ছে…আর…সে আমাদের দিকে হাত ইশারা করছে।”
ক্যাপ্টেন বুঝতে পারছিল যে পঞ্চাশ জোড়া ক্ষুধার্ত চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কোনো ইচ্ছেই হচ্ছিল না নতুন করে আরও এক জোড়া চোখ বাড়াতে। লোকটাকে তার ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে চাইছিল সে। জাহাজের সর্বশেষ যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে খাবার দেয়ার মতো আরেকজোড়া মুখ। এরপরেও, নিজেকে সে খুব সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করতে না পারুক, কিন্তু একেবারেই খারাপ লোক সে নয়। সে পাষণ্ড হতে পারে, তবে এতটাও নিষ্ঠুর নয়।
ক্যাপ্টেন তার জাহাজটাকে ঘোরানোর নির্দেশ দিল, এরপর লোকটিকে উঠিয়ে আনার জন্য একটি নৌকো নিক্ষেপ করতে বলল। “দুঃখ পেও না বন্ধুগণ” সে বলল, “যদি আমাদের এই বাস্টার্ডটাকে পছন্দ না হয় তাহলে আমরা তাকে গুলি করে মেরে খেয়ে ফেলব।”
কিছুক্ষণ পরে কাদা-ময়লা কাপড় পরিহিত, রোদে পোড়া মাঝারি উচ্চতার একজন লোককে সাগর থেকে উঠিয়ে আনা হল। সেও তার নাবিকদের মতোই হাল্কা-পাতলা। ক্যাপ্টেন তার জায়গা থেকে নিচে নেমে এল লোকটির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। ক্যাপ্টেন হাল তার মাতৃভাষায় লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “গুড ডে স্যার। আপনার পরিচয় জানতে পারি?”
লোকটি অল্প করে মাথা ঝাঁকিয়ে একই ভাষায় জবাব দিল, “গুড ডে টু ইউ ই ক্যাপ্টেন। আমার নাম উইলিয়াম পেট।”
*
হাল এর সাথে পুনর্মিলনীর দিন কী পোশাক পরা যায় সেটা জুডিথকে ক) বেশ চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সে স্টীলের ব্রেস্টপ্লেট পরে যুদ্ধের যে দীক্ষা নিয়েছে সেটাতেই বরং সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সেটাতেই বরং তার শারীরিক গঠন ভালভাবে এঁটে যায়, যেটার ওপর লাল, হলুদ, এবং সবুজ রঙের মিশ্রণের সিল্কের এক ধরনের কাপড় পরানো থাকে। সেটার ওপর বিভিন্ন রকমে জুয়েলারি পিন দিয়ে আটকানো থাকে। রাজা তাকে ডামাস্কাস স্টীলের তৈরি বিশেষ এক ধরনের তরবারি দিয়েছে যেটা মহিলাদের গঠন এবং শক্তির সাথে ঠিকভাবে মানিয়ে যায়। অলংকৃত। জিনিসটা যখন সে পেছন দিক থেকে ঝুলিয়ে রেখে গোল্ডেন বাউ-এর ডেকে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন বোঝা যাবে যে সে শুধুই কোনো অসহায়, নমনীয় নারী নয়। বরং সে একজন শক্তিশালী যোদ্ধা।
আর একজন নারী যোদ্ধা হিসেবে সে যেমন চায় পুরুষেরা তাকে সম্মান করুক তেমনি চায় কোনো পুরুষ তাকে ভালবাসুক, তাকে প্রত্যাশা করুক। যদিও এটা প্রকাশ করতে সে কুণ্ঠাবোধ করে কিন্তু তার জন্য নিজেকে সে সুন্দর রাখতে চায়। এক মাস আগে যখন তাদের দুজনকে যুদ্ধের কাউন্সিলে ডাকা হয়েছে তখনও তারা দুজন একত্রে একঘণ্টা কাটিয়েছে। এমনকি যদি তারা এক মুহূর্ত সময়ও একত্রে কাটানোর সুযোগ পায় তারা চায় সেই মুহূর্তটাই যেন তাদের জীবনের সেরা মুহূর্ত হয়। এ কারণে আলাদা থাকার সময়টুকু তাদের কাছে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে চায় না যে হাল আর তার। মাঝখানে কোনো কিছু আসুক, তাই দূরে কোথাও যাওয়ার সময় যদিও তার সাথে অস্ত্র, মিলিটারি পোশাক ইত্যাদি থাকে কিন্তু এরপরেও সে গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা সাদা রঙের ইথিওপিয়ান ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে থাকে যার গলায় আর হাতায় সোনালি রঙের এমব্রয়ডারি করা আছে। সে সোনার ওপর অ্যাম্বার পাথর বসানো নেকলেস পরিধান করে, কানে পাথর বসানো সোনার দুল পরে।
তার চুলগুলো মাথার পেছনে উপরের দিকে খোঁপা করা আছে যার ওপর মণিমুক্তা খচিত অলংকার লাগিয়ে রাখা হয়েছে। মাথার একপাশে ঝুলানো আছে এক ধরনের বড় দুলের মতো গহনা। কপালের ওপর দিয়ে সারা মাথা ঘুরিয়ে এক ধরনের মোটা সোনার চেইন আটকানো আছে যেটা থেকে বিভিন্ন রঙের পাথর ঝুলে আছে। এগুলো ছাড়াও তার মাথার ওপর থেকে কাঁধ পর্যন্ত একটা সাদা রঙের লিলেন কাপড় পরা আছে। শালীনতাস্বরূপ এই কাপড় তার ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করেছে। সে তার প্রিয় মানুষটির সামনে যাই করুক না কেন প্রকাশ্যে সে তার জাজ্বল্যমান ব্যক্তিত্বকে বজায় রাখতে চায়।
