তারা দুর্গের দূরের পথ দিয়ে দৌড়াতে থাকে। তাদেরকে এখনো কেউ দেখতে পায়নি। দাস বিদ্রোহ কতক্ষণ স্থায়ী হবে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এটা হালকে অতিরিক্ত সুযোগ এনে দিয়েছে। তারা দুর্গের কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন একটা দেয়ালের কাছে তারা পৌঁছল যেখানে কোনো পাহারাদার দেখতে পাচ্ছে না সে। অ্যাবোলি বলল, “আমাকে প্রথমে যেতে দাও, গান্ডওয়েন। আমার গায়ের রং দেখে কেউ বুঝতে পারবে না।”
হাল সম্ভবত সেটা শুনতে পায় নি। “আমার প্রথমে যাওয়া উচিত অ্যাবোলি।” হাল বলে উঠল, যেন বুঝাতে চাইলে যে সে সবার সামনে না থেকে সবাইকে ভালভাবে গাইড করতে পারবে না। সে দড়ি এবং হুকটা অ্যাবোলির কাছ থেকে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে দিল। এরপর সে পাঙ্গাটা কোমড়ের বেল্টে খুঁজে রাখল। তারপর সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে পরবর্তী মেঘের খণ্ডে চাঁদটা ঢেকে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল।
মেঘ চলে এসেছে। এখনই তাকে কাজটা করতে হবে।
সে অমসৃণ মাটির ওপর দিয়ে দুর্গের দেয়ালের দিকে দৌড়াতে থাকে। যে লোক মাস্তুলের ওপর উঠে অভ্যস্ত তার কাছে এটা কোনো উচ্চতাই নয়। সে জানে সে এটার ওপর উঠতে পারবে। সে হোয়াইটওয়াশ করা মাটির দেয়ালের দিকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় লাফ দিল।
হাল কান পেতে কোনো মানুষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে কি-না তা শোনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু, সৌভাগ্যবশত দেয়ালের উপরের লোকেরা তাদের পেছনের বিপদ সম্পর্কে অসচেতন। হাল ছায়ার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে। তার বক্ষপিঞ্জরের নিচে হার্টবিট দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। হাল পেছন ফিরে অ্যাবোলির দিকে তাকিয়ে হা-সূচক মাথা নাড়ায়। এরপর রশিটা নিয়ে হুকটাকে এক, দুই, তিনবার ঝুলিয়ে ওপর দিকে ছুঁড়ে দেয় দেয়ালের উপরে।
সতর্কতার সাথে রশিটাকে টানতে থাকে হাল। রশিটা আসতে আসতে এক পর্যায়ে থেমে যায়। তার মানে হুকটা দেয়ালের সাথে আটকে গিয়েছে। আর এটাই হাল-এর প্রয়োজন। সে উঠতে শুরু করে। উঠতে উঠতে যখন একেবারে দেয়ালের চূড়ায় পৌঁছে যায় তখন সে তার পাঙ্গাটা কোমড় থেকে টেনে হাতে নেয়। এরপর সে তার বামহাতটা মুখের ওপর গোল করে রেখে নিশাচর পাখির মতো ডাক দেয়-এটা এক ধরনের সিগন্যাল যার অর্থ হল তারা এবার হালকে অনুসরণ করতে পারে। হাল মাথা নিচু করে একা একা দেয়ালের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকে এবং মাথা ঘুরিয়ে দেখে যে অ্যাবোলিরা প্রায় সবাই দেয়ালের ওপর উঠে গিয়েছে।
কিন্তু তখনই দেয়ালের ওপারের উঠোনে দাঁড়ানো লোবোর একজন লোক সবকিছু দেখতে পেল। সে দেখতে পেল যে দেয়ালের ওপর দিয়ে ছায়ার মতো কিছু লোক হেঁটে যাচ্ছে। সে চিৎকার দিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়। সাথে সাথে বন্দুকের গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। দেয়ালের শেষ মাথায় হাল একটা সিঁড়ি দেখতে পায়। সিঁড়ির নিচ থেকে লোবোর সৈন্যদের একজন তলোয়ার হাতে হাল-এর দিকে এগিয়ে আসছে। হাল দেয়াল থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে লোকটির তলোয়ার ধরা হাত নিজের বাম হাত দিয়ে ধরে ডান হাতে লোকটির মুখে আঘাত করল। এরপর পাঙ্গা দিয়ে লোকটিকে মেরে বসলো সে।
“গান্ডওয়েন”, অ্যাবোলি চিৎকার দিয়ে ওঠে। হাল ঘুরে তাকিয়ে দেখে দ্বিতীয় আক্রমণকারী তার দিকে তেড়ে আসছে। সে যদি সময়মত সরে না যেত তাহলে আক্রমণকারীর তরবারি তার বুকের পাঁজর ভেদ করে চলে যেত। সে ভেতরের দিকে সরে গিয়ে নিজের তরবারির বাঁট দিয়ে আক্রমণকারীর মুখে আঘাত করল। এরপর আরও একজন তার দিকে তেড়ে আসতে থাকল। একপাশে সরে গিয়ে নিজের তরবারিটা লোকটির গলায় বসিয়ে দিল হাল। অ্যাবোলি তিনজন আক্রমণকারীকে প্রতিহত করল, আর একজনকে মেরেই ফেলল। তখনই হাল শুনতে পেল বুজার্ড তার নাম ধরে গর্জন করে উঠছে এবং একজনের মাথার ওপর দিয়ে নিজের তলোয়ারটা তাক করে আছে। লোবোর লোকেরা তাদের দুজনের মাঝে ভিড় করে হাল–এর সাথে যুদ্ধ করছে। হাল যদি যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে না যায় তবে বুজার্ড তার কাছে আসতে পারবে না।
তখনই দুটি গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। হাল-এর পেছন থেকে এগিয়ে আসা গুলি দুটি তার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল। সেই সাথে বন্দুক হাতে লোবোর দুজন লোক ছাদের ওপর থেকে পড়ে গেল।
হাল ঘুরে তাকিয়ে গুলির আওয়াজ-এর উৎস খুঁজতে থাকে। আর সাথে সাথে তার মন আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠল।
সেখানে জুডিথ দাঁড়িয়ে আছে!
জুডিথ তার রুমের ছাদের ওপর দিয়ে পায়ের আনাগোনা শুনেই বুঝতে পেরেছিল যে তাকে উদ্ধার করতে হাল পৌঁছে গিয়েছে। সে তখন আশেপাশে খুঁজে সুবিধামত পোশাক পেয়ে নিজের পোশাকটা দ্রুত পাল্টে ফেলল। কারণ সে জানে তাকে যদি আফ্রিকার জঙ্গল দিয়ে দৌড়াতে হয় তবে এই পোশাক মোটেও উপযুক্ত নয়।
সে যখন দরজা খুলে বাইরের দিকে উঁকি দেয়, তখন দেখতে পায় হাল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পাশে অ্যাবোলিও ছিল। আশেপাশে পরিচিত অ্যামাড়োডাদের মুখ দেখতে পায় জুডিথ।
জুথিড-এর পায়ের কাছেই লোবোর একজন লোক মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। তার হাতে একটা তলোয়ার এবং বেল্টে দুটি পিস্তল আটকানো আছে। জুডিথ একটা পিস্তল উঠিয়ে চল্লিশ ফিট উপরে ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন সৈন্যকে গুলি করে দিল। সে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পূর্বেই দ্বিতীয় পিস্তলটি উঠিয়ে আরেকজনকে গুলি করল জেনারেল জুডিথ নাজেত।
