কিন্তু তখনই সে একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পায়। মুহূর্তেই সে বুঝতে পারে যে এটা গুলির আওয়াজ। এরপর একের পর এক কয়েকটা গুলির আওয়াজ হয়। তারপর অনেক গুলির আওয়াজ একত্রে পাওয়া যায়। আস্তে আস্তে গুলির আওয়াজের শব্দ, কম্পন এবং সংখ্যা বাড়তে থাকে। হঠাৎ জুডিথ-এর মনে একটা অদ্ভুত চিন্তা আসলো। সারা আফ্রিকাতে সে-ই সম্ভবত একমাত্র মেয়ে যে বিয়ের সাজে বসে বসে গুলির আওয়াজের হিসাব করছে।
বাইরে কী ঘটছে সে বুঝতে পারছে না। বুজার্ড তাকে বলল, “এখানে থাকুন। আপনার নিরাপত্তার জন্য আমি গিয়ে দেখে আসছি বাইরে কী ঘটছে। আবারো বুজার্ডের কথার সাথে তর্ক করার মতো কোনো কিছু সে খুঁজে পেল ।
হাল সামনের দিকে ইশারা করল। অ্যাবোলি বুঝতে পারল যে হাল কী। দেখাতে চাচ্ছে। ড্রব্রিজটার দুপাশে যে গেটপোস্ট রয়েছে সেটা রাইনোর খাঁচা পর্যন্ত উঠে গিয়েছে। টানা দেয়া ব্রিজটা থেকে একটা রশি ঝুলে আছে যেটাতে টান দিয়ে ব্রিজটাকে উপরে উঠানো যায় এবং নিচে নামানো যায়। দড়িটা আবার একটা কপিকল-এর সাথে প্যাচানো আছে। হাল কোনোভাবে কপিকলের কাছে। পৌঁছে দড়িটা টান দিয়ে ধরল। অ্যাবোলি আর অ্যামাডোডারা সবাই মিলে হাল-এর চারদিকে প্রাচীর তৈরি করল।
অনেকদিন এর রোদ, বৃষ্টিতে রশির তণ্ডুগুলো আরও শক্ত এবং মজবুত হয়েছে। বারবার চেষ্টা করেও পাঙ্গার ব্লেড দিয়ে সে রশিটা কাটতে পারছিল না। ওদিকে প্রায় বিশগজ দূরে প্রতিপক্ষের সৈন্যরা তাদের মাক্সেটকে গুলি করার জন্য প্রস্তুত করছে।
কার্তুজ-এর মুখে ওরা কামড় বসিয়েছে তাড়াতাড়ি। প্যান-এর মধ্যে গান পাউডার ভরছে। কিন্তু দড়িটা এখনো কাটছে না।
মাক্সেট-এর ব্যারেল-এ হাত বসিয়েছে শক্ররা। আর এরপরেই গান ফায়ার-এর শব্দ শোনা গেল।
“ইয়েস!”
তারা অবশেষে দড়িটা কাটতে পেরেছে। ড্রব্রিজটা নিচে নেমে এসেছে। অ্যামাডোডারা ওদের অবস্থান ছেড়ে বিজ্রের ওপর দিয়ে দৌড়ে রাইনোর খাঁচার দিকে যেতে থাকে।
ওদের পেছনে একের পর এক বন্দুকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
ওরা কাজটা করতে পেরেছে। ওদের উদ্দেশ্য এখন একটাই-রাইনোটাকে জাগিয়ে তোলা।
.
রাইনোসোরাস-এর চোখের দৃষ্টি খুবই ক্ষীণ। কিন্তু তার শ্রবণ এবং ঘ্রাণশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ। তাই এটা দিনের বেলায় যেমন বিপদজনক রাতের বেলায়ও ঠিক তেমনই। দিন এবং রাতের যে-কোনো ঘণ্টায় যে-কোনো মুহূর্তে এটা সমান তালে আক্রমণাত্মক এবং ভয়ঙ্কর।
ওটা হয়ত অ্যাবোলির তলোয়ার-এর নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু আফ্রিকান লোকটার বনের ভাষা তার ইন্দ্রিয়কে ঠিকই জাগিয়ে তুলেছে।
সম্ভবত রাইনোটা বুঝতে পেরেছে যে তাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। তাই সে তার পাঁচ ফিট লম্বা শিংটা নাড়িয়ে অ্যাবোলিকে স্যালুট জানিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল। এরপর ওটা অ্যাবোলির দিকে সোজা তেড়ে এলো। চিতাবাঘের মতো লাফ দিয়ে দূরে সরে গেল অ্যাবোলি, এরপর উদ্ধত চিতার ন্যায় আবারো দাঁড়িয়ে পড়ল। জানোয়ারটা হয়ত হাল-এর সমস্ত হাড় মাংস গুড়ো করে দিত যদি না সে সময় মতো সরে যেত।
জন্তুটা কাদামাটির ওপর দিয়ে বিশালকার পা ফেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অ্যামাডোডাদের মাঝখান দিয়ে ড্রব্রিজটার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ওদিকে হাল এবং অ্যামাড়োডোদের খুঁজতে আসা লোকগুলো ততক্ষণে দেরি করে ফেলেছে। তারা বুঝে ফেলেছে যে তাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পেছন থেকে এগিয়ে আসা জনতার ভিড়ে সেটা সম্ভব হলো না।
ব্রিজটার ওপর যখন রাইনোর পা ফেলার শব্দ লোবোর লোকদের কানে গিয়েছিল তখনই তারা বুঝে ফেলেছিল যে তাদের জীবনের শেষ ঘণ্টাধ্বনি বেজে গিয়েছে। জটা তার শিংটা নিচু করে একজনের পেটে ঢুকিয়ে তাকে ছুরে ফেলে দিল। রাইনোটা কিছুসময়ের জন্য থেমে চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করল। এরপর ওটা নাক দিয়ে শব্দ করতে করতে চারদিকে ঘুরতে থাকে। তারপর জন্তুটা তার মাথা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে থাকে যেন ওটা মাথা দিয়ে সমস্ত মাটি সরিয়ে ফেলবে।
লোবোর একজন লোক চিৎকার করে উঠল “এখনি!” এরপর তারা অনেক বল্লম একের পর এক নিক্ষেপ করল। কিন্তু বল্লমগুলো জন্তুটাকে আরো বেশি উত্তেজিত করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারল না। জন্তুটা রেগে গিয়ে আগত লোকজনের ওপর এমনভাবে শিং চালাতে থাকল যেন মাটির ওপর দিয়ে লাঙল চষে যাচ্ছে।
এরপর আরেকবার লোবোর লোকেরা বন্দুক চালাতে শুরু করল। এতে করে জটা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। গার্ড এবং দাসদের ছাউনির দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে সে।
হাল, অ্যাবোলি এবং অ্যামাডোডারা দেখতে পায় তাদের আশেপাশে লোবোর কোনো লোক নেই। লোবোর দুর্গ এবং তাদের মাঝে এখন আর কোনো বাধা নেই। তারা ফিরে এসে পুনরায় টানা দেয়া ব্রিজটার ওপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। হাল অ্যাবোলির দিকে দেখিয়ে বলল, “দেখ! ওরা সবাই উপরে জড়ো হয়েছে।”
অ্যাবোলি মুখে একটা আফ্রিকান হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল, “তারা নিচে রাইনোটার দিকে তাকিয়ে আছে আর দেখছে যে কিভাবে তাদের লোকেরা রাইনোটার নিচে পদদলিত হয়ে মারা যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ, ওদের কপাল ভাল যে এসময় তারা নিচে নেই। কিন্তু ওরা এখানে জড়ো হওয়ার কারণে দুৰ্গটার তিন দিকেই এখন আর কোনো পাহারা নেই।”
