দাসদেরকে যে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে তার প্রবেশপথে দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। তারা বিপরীত দিক থেকে হেঁটে একজন আরেক জনকে অতিক্রম করছে। অ্যামাডোডা সৈন্যরা একটু দূরে বাওবাব গাছের আড়ালে লুকিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের হাতে শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি তীক্ষ্ণ ছুরির ন্যায় অস্ত্র রয়েছে যেটাকে বলা হয় নবকেরি। গার্ডটা হাঁটতে হাঁটতে যখন বাওবাব গাছের সামনে আসলো তখন একজন অ্যামাডোডা তার হাতের তীক্ষ্ণ কাঠের টুকরাটাকে গার্ডটার মাথা বরাবর ছুরে দিল। মাথায় আঘাত লাগার ফলে লোকটি নিঃশব্দে মৃত্যুবরণ করল।
এরপর একজন অ্যামাডোডা ছায়া থেকে বের হয়ে এসে গার্ডটাকে টানতে টানতে গাছের পেছনে নিয়ে গেল। তারপর গলায় ছুরি বসিয়ে দিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করল সে।
কয়েক মিনিট পরে দ্বিতীয় গার্ডটা যখন হাঁটতে হাঁটতে বাওবাব গাছের কাছাকাছি চলে আসলো তখন সে হতভম্ব হয়ে এদিকে সেদিক তাকাতে লাগল। হঠাৎ করে তার সহযোদ্ধা কোথায় হারিয়ে গেল সেটা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখনই একজন অ্যামাডোডা তার হাতে ধরা নবকেরিটা পূর্বের ন্যায় গার্ডটার দিকে ছুরে দিল। ফলাফল একই হলো।
গেট-এর অন্যপাশে দাঁড়ানো গার্ডগুলোও অ্যামাডোডাদের উপস্থিতি বুঝতে পারল না-যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিঃশব্দে গিয়ে গার্ডগুলোর গলায় ছুরি বসিয়ে দিল। মৃতদেহগুলোকে টানতে টানতে কাটাগাছের ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে গেল ওরা। এরপর দুজন অ্যামাডোডাকে বাইরে পাহারায় দাঁড় করিয়ে অ্যাবোলি বাকি অ্যামাডোডাদের নিয়ে কুড়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। তারা সবাই ঘুমন্ত দাসদের ভেতরে তাদের ক্যাপ্টেনকে খুঁজতে থাকে।
অ্যাবোলির উপস্থিতিতে দু-একজন দাস ঘুম থেকে জেগে উঠে।
“তোমাদের কোনো ভয় নেই”, অ্যাবোলি পরিষ্কার সাওহিলি ভাষায় নিচুস্বরে দাসদের উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে। যদিও এটা তাদের মাতৃভাষা নয় কিন্তু আফ্রিকার প্রায় সব লোক এই ভাষা বুঝতে পারে। “আমি সেই সাদা লোকটাকে খুঁজছি যে আজকে এখানে এসে পৌঁছেছে। আমাদের মনিব মাননীয় লেবো তার ব্যাপারে খুবই কৌতূহলী। তিনি তার সঙ্গে দেখা করতে চান। তোমরা কী বলতে পার আমি তাকে কোথায় পেতে পারি?”
সবাই দেয়ালের পাশে ঘুমিয়ে থাকা দাসটাকে দেখিয়ে দেয়। আরও কয়েকজন দাস জেগে উঠে এবং কথা বলতে শুরু করে। দু-একজন এতরাতে বিরক্ত করার জন্য রেগে উঠে এবং উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকে।
“চুপ কর সবাই”, তোমাদের কথায় অন্য কুড়েঘরে, ঘুমিয়ে থাকা তোমাদের ভাইয়েরা জেগে উঠবে। একথা বলার পর অ্যাবোলি হাল-এর বাহু ধরে টানতে টানতে বের করে নিয়ে আসে।
“আমরা যদি চুপ না করি তাহলে কী হবে? ওরা কেউ আমাদের ভাই নয়।” একজন তর্ক করতে থাকে। “তোমরা কারা? আমি তোমাদেরকে চিনি না।”
পরিস্থিতি আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঠিক আছে, “ঠিক আছে। আমরা এখন যাচ্ছি।” অ্যাবোলি এই কথা বলার পর হালকে নিয়ে দরজার দিকে এগুতে থাকে। একজন দাস উঠে এসে তাদেরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পেছন থেকে একটা নবকেরি এসে তার মাথাটাকে এফোড় ওফোঁড় করে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অ্যামাপোড়া সেই নবকেরিটা নিক্ষেপ করেছিল।
“দৌড়াও!” অ্যাবোলি ফিসফিস করে ইংরেজিতে বলে উঠল। তাদের দুজনের দেখা হওয়ার অনুভূতি বা আবেগ প্রকাশ করার সময় এখন নয়। পরে হয়ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু তার পূর্বে তাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে।
অ্যাবোলির হাতে একটা পাঙ্গা ছোরা রয়েছে যেটা সে একটু আগেই হত্যা করা একজন গার্ডের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। সেই পাঙ্গাটা সে হাল-এর হাতে দিল। এই সময়ের মধ্যে হাল আর অ্যাবোলি গেট-এ পৌঁছে গেল। হাল পেছন থেকে শুনতে পায় যে কুড়ে ঘরে সে ছিল সেখান থেকে দাসেরা বের হয়ে চিৎকার করছে, “আমরা মুক্ত। আমরা এখন মুক্ত।”
চিৎকার-এর শব্দ ছাপিয়ে বন্দুকের গুলির আওয়াজ পেল সে। হাল আর অ্যাবোলি এতক্ষণ কোনো সমস্যা ছাড়াই ব্যারাকের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু দাসদের চিৎকার-চেঁচামেচির কারণে তা আর হলো কই? সদ্য ঘুম থেকে জেগে উঠা গার্ডদের একজন পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল, “ওদেরকে ধরতে হবে। ঘোড়া নিয়ে আস।” যদিও ওদের কয়েকজন ঘোড়া আনতে চলে গেল, তবুও পায়ের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছিল। এরপর আরেকটা গুলির শব্দ শোনা যায়, সেই সাথে একজন অ্যামোডোডা চিৎকার করে উঠে মাটিতে পড়ে যায়।
“থামবে না, গাল্ডওয়েন!” অ্যাবোলি চিৎকার করে উঠল। “আমাদের এখন তার জন্য কিছুই করার নেই।”
হাল কোনো উত্তর দেয় না। তারা পেছন থেকে একের পর এক বন্দুকের আওয়াজ শুনতে পায়। সম্ভবত দাসেরা বিদ্রোহ শুরু করেছে এবং এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে। তবে এসব কিছু নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা হাল-এর নেই। এখন তার একমাত্র চিন্তা হচ্ছে একের পর এক পা ফেলে কীভাবে সামনে এগুবে। তার পায়ের পেশিগুলো জ্বালাপোড়া করছে। বুক ধড়ফড় করছে। সে তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
আর ঠিক তখনই সে দেখতে পেল লম্বা কিছু একটা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসছে। তার উদ্যম ফিরে এলো। এখনো তাহলে আশা আছে!
*
লোবোর ব্যক্তিগত দুর্গে বাধ্য হয়ে বিয়ের পোশাক পরতে রাজি হয়েছে জুডিথ। যদিও বার বার ব্যবহারের ফলে পোশাকটাতে নোংরা কাদামাটি, ময়লা লেগে আছে। কিন্তু সেটা খুব বেশি কিছু নয়। বুজার্ড যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে-যদিও তার এটা মানতে ঘৃণা হচ্ছে সেটা তর্কের বাইরে। যতদিন পর্যন্ত সে এই ব্যক্তিগত রাজত্বের শাসন মেনে নিবে সে ততদিন পর্যন্ত একটা আশা বেঁচে থাকবে। কিন্তু সে যদি এই দাসত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে আর কোনো আশাই অবশিষ্ট থাকবে না।
