হাল কাপেলোর কথার কোনো রকম প্রতিবাদ করার চেষ্টা না করে তাকে যা বলা হয়েছে তাই করল।
“চালিয়ে যাও। আমাকে অপমান করে তুমি যদি নিজেকে বড় মনে কর তবে তাই কর। আমি এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে টিকে ছিলাম”, হাল মনে মনে ভাবতে থাকে।
.
পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন প্রায় হেলে পড়ছে তখন তাদেরকে পাহাড়ের পাদদেশে কীটগছি যুক্ত পথের ওপর দিয়ে হাঁটতে বলা হয়। দাসরা সেখানে কাঠের লরি ঠেলে একটা নালার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লরিগুলোকে খনির ভেতর থেকে ধাতব পদার্থে ভর্তি করে নিয়ে আসা হয়েছে। এই ধাতব পদার্থগুলোকে এরপর নালার ভেতর ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এই নালা বা টানেল পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অনেক দূর বয়ে গিয়েছে। টানেলের অন্যপাশ থেকে এই ধাতব পদার্থ অন্যদাসেরা আবার সংগ্রহ করছে। এরপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে সোনাগুলো আলাদা করছে। এই কাজ চলার সময় কয়েকজন দাস মিলে জলন্ত কাঠের পাত্র বা জলন্ত কাঠ বয়ে বেড়াবে। এতে করে কর্মরত দাসরা আলোও পাবে এবং উষ্ণতাও পাবে।
এখানে সেখানে প্রত্যেক জায়গায় সাদা এবং কালো চামড়ার লোকেরা দাসদেরকে পাহারা দিচ্ছে। তাদের হাতে চাবুক, বন্দুক, ছুরি এবং নানা রকম অস্ত্র রয়েছে। তারা দাসদের কাজ দেখাশোনা করছে, সেই সাথে কেউ যেন সোনা নিজের পকেটে ভরতে না পারে সেদিকে নজর রাখছে।”
স্টকেড-এর ভেতরে লম্বা কাঠ দিয়ে তৈরি কতগুলো কুড়েঘর রয়েছে। দাসদের দলকে সেই কুড়েঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। এটাই হচ্ছে। তোমাদের থাকার জায়গা।” কাপেলো তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এটাই তোমাদের শেষ বাড়ি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তোমাদের এখানেই থাকতে হবে। শীঘ্রই তোমাদের শেকল খুলে দেয়া হবে। তারমানে এই নয় যে তোমরা মুক্ত। আমি তোমাদেরকে শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিচ্ছি যে তোমরা কেউ যদি পালানোর চেষ্টা কর তবে সেটার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। শীঘ্রই তোমাদের খাবার দেয়া হবে। যতটা পার খেয়ে নাও। কারণ আগামীকাল সকাল পর্যন্ত তোমাদের কোনো খাবার দেয়া হবে না। বরং ঐ অবস্থাতেই সকাল বেলা তোমাদেরকে কাজে লাগিয়ে দেয়া হবে।”
এরপর তাদের হাত এবং গলা থেকে শেকল খুলে দেয়া হয়। কাঠের বাটিতে তাদেরকে তরল জাতীয় এক ধরনের মিশ্রণ খেতে দেয়া হলো। হাল কেপ কলোনীতে থাকার সময় এইটুকু শিখেছে যে শ্রমিকদের কখনো খাবার ফিরিয়ে দিতে নেই তা সে যতই খারাপ হোক না কেন। সেই সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে খাবার শেষ করে ফেলতে হয় যেন খাবারের বিস্বাদটা মুখে লেগে না থাকে।
কুড়েঘরের ভেতরে কোনো বিছানা বা কোনো বাঙ্ক দেখতে পেল না সে। শুধু প্রায় ছয়ফিট লম্বা দুটো কাঠের টেবিল রাখা আছে ওখানে। টেবিল দুটি ঘরের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। যখন তারা সেখানে উপস্থিত হলো, তখন জায়গাটা তাদের সবার জন্য অপ্রতুল মনে হচ্ছিল। কিন্তু এরপর যখন আরও পঞ্চাশ জন দাস প্রবেশ করে নতুন আগত দাসদের সরিয়ে নিজেদের জায়গা করে নিতে থাকে তখন কুড়ে ঘরটার অবস্থা দাসভর্তি জাহাজের চেয়েও খারাপ মনে হচ্ছিল। হাল নিজেকে সরাতে সরাতে একেবারে দেয়ালের কাছে নিয়ে যায়। তার পাশের লোকটা তাকে এমনভাবে ধাক্কা দিতে থাকে যে একটি পেশিও নাড়াতে পারছে না সে।
কিন্তু এটাও তার কাছে কোনো ব্যাপার মনে হয় না। কারণ অবশেষে হাল সেই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে যেখানে তার জুডিথকে নিয়ে আসা হয়েছে। যদিও তাদের মাঝে এখন মাত্র কয়েকগজের দূরত্ব; কিন্তু হাল-এর মনে হচ্ছে দূরত্বটা কয়েক হাজার মাইলের। কিন্তু হাল এই দূরত্ব দূর করবে। হয়ত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে কিন্তু সে জুডিথকে উদ্ধার করেই ছাড়বে।
এসব চিন্তাভাবনা মনের মধ্যে রেখে সে দুচোখ বন্ধ করে ফেলে। কেপ কলোনীতে থাকার সময় সে আরেকটা শিক্ষা লাভ করেছে তা হলো যেখানেই বা যখনই সুযোগ পাওয়া যাবে একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। বেচে থাকার জন্য ঘুম খাবারের মতই জরুরি।
.
বুজার্ড এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিবাদী বিয়ের পাত্রীর সম্মুখীন হয়েছে। “এই পোশাকটা পরে নিন, নয়ত…”
“নয়ত কী?” জুডিথ জিজ্ঞেস করল। তুমি তোমার এক হাত দিয়ে কী করতে পারবে? আঘাত করবে? আমি তোমাকে এড়িয়ে যেতে পারব। তুমি কোনো দাসকে ডেকে আনবে চাবুক মারার জন্য? কিন্তু তাতে সেনোর লোলবার কাজের অপচয় হবে, যেটা সে হতে দেবে না। আমাকে হত্যা করবে? কিন্তু আমার মৃতদেহ থেকে তুমি কত টাকা আয় করতে পারবে?”
“এসব অনর্থক কথা বলা বন্ধ করুন। আপনি এখন কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই। শুধু বিছানা ছাড়া অন্য কোনো কাজে মাননীয় লোবোর নারীর প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটা দাসকে সে কোনো না কোনো কাজে লাগাতে পারবে। যখন বিয়ের ঘণ্টা বাজানো হবে তখন তৈরি হয়ে নিচে নেমে পড়বেন। নয়ত আপনি আপনার ফল ভোগ করবেন।”
এরপর বুজার্ড চেয়ারে বসে পড়ল। আঙুল দিয়ে শব্দ করে তার দাসকে ডেকে বলল আরও ওয়াইন দিয়ে যাওয়ার জন্য। “তাহলে”, বুজার্ড উচ্চ স্বরে আবারও বলতে শুরু করল। “আর মাত্র একঘণ্টার মধ্যে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কোন জীবন বেছে নেবেন। মাননীয় লোবোর সাথে বিলাসী জীবন নাকি সেই নোংরা ব্রিটিশ দাসটার সাথে কঠিন জীবন। ব্যক্তিগতভাবে আমি বুঝতে পারছি না কেন আপনার মনকে ঠিক করতে এতটা সময় লাগছে। আমি যদি আপনার জায়গায় হতাম তবে এমন বিলাসী জীবন পেলে বৃদ্ধ মাতাল লম্পটটাকে যা খুশি করতে দিতাম।”
