যদিও বেশ গরম পড়েছিল তবুও চাঁদ এবং তারার আলোতে রাতের পরিবেশ ভালই দেখা যাচ্ছিল। তখন তারা স্বর্গীয় এসব জিনিসের মহত্ত্ব বুঝতে পারছিল। একদিন সকাল বেলা দেখতে পায় হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা লেক-এর ধারে চলে এসেছে। যদিও শুকনো মৌসুমের কারণে পানি নিচে নেমে এসেছে, ফলে জায়গাটা বন্য জলহস্তীদের জন্য বেশ ভাল আবাসস্থল হিসেবে কাজ করছে। লেক-এর ধারে কুমিরও রয়েছে। এরা সম্ভবত ঊষালগ্নে সূর্যের তাপ সেবন করার জন্য জল থেকে উঠে এসেছে। এগুলোকে আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে খুব একটা সংবেদনশীল মনে হচ্ছে না। যখন সাদারঙের এক ঝাঁক পাখি ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে দক্ষিণ দিকে উড়ে যায় তখন কুমিরগুলো পানিতে নেমে আসে।
অবশেষে কাপেলো ক্যাম্প বানিয়ে রাতটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। হাল এবং অন্যান্য দাসের হাতের শেকল আলগা করে দেয়া হয় যেন তারা কাজ করতে পারে। ক্যাম্পের চারপাশে শক্ত বেড়া প্রস্তুত করতে বলে যেন অকস্মাৎ শিকারীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারে। আরও সুরক্ষার জন্য তারা ক্যাম্প ফায়ার প্রস্তুত করে। মোটা লোকটার মনের ভাব এখনো খুব একটা ভাল মনে হচ্ছে না। তাই দেখে একজন গার্ড জিজ্ঞেস করে বসলো, “আপনার কী হয়েছে সেনোর?”
“আমাদের কেউ অনুসরণ করছে,” কাপেলো জবাব দিল।
“আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন, স্যার?” গার্ড প্রশ্ন করল। “আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।”
“কেউ আমাদের পেছনে আসছে এটা বোঝার জন্য কাউকে দেখার প্রয়োজন নেই।”
ওদের থেকে দশ গজ দূরে অ্যাাবোলি তার দলবল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন পূর্বেই সে কৃতদাসদের এই সারিটাকে খুঁজে পেয়েছে। এখন আক্রমণ চালিয়ে কাপেলোর দলবল এবং গার্ডদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়া কোনো ব্যাপার না। কিন্তু তারপর কী ঘটবে?
শুধু হালকে উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়। জুডিথকেও উদ্ধার করতে হবে। অ্যাবোলি এরইমধ্যে তার দুজন লোককে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছিল। তারা জানিয়েছে যে খনি এখান থেকে প্রায় একদিনের পথ। তারা একজন রমণীসহ আটজনের একটা দল খুঁজে পেয়েছে যারা ঐদিনই খনিতে পৌঁছেছে।
আর একদিনের মধ্যে হাল এবং জুডিথ একই জায়গায় পৌঁছাবে। তখনই তাদেরকে উদ্ধার করার উপযুক্ত সময়। ততক্ষণ পর্যন্ত অ্যাবোলি তার উপস্থিতি গোপন রাখছে। হালকে আরও কিছুটা সময় দাস হয়ে জীবনযাপন করতে হবে-যত কষ্টই হোক না কেন।
.
বুজার্ড এবং জুডিথ কোনো ব্যাপারে একমত হয়েছে খুব কমই। যদিও কেউ কোনো কথা বলছে না তবুও তারা জানে যে অপরজনের মনেও ঠিক একই প্রশ্ন উদয় হয়েছে : “এটাই কী বালথাজার লোবো?”
এই কী সেই ব্যক্তি যে আফ্রিকার বুকে নিজের রাজত্ব তৈরি করেছে? পাহাড়ের নিচে সোনা খুঁজে পেয়েছে এবং দাসদেরকে কিনে এনে বাধ্য করছে সোনার খনিতে কাজ করার জন্য? জুডিথ ভেবেছিল লোবো হয়ত কোনো শক্ত সামর্থ্য মোটাসোটা, দেখতে বিদঘুঁটে ধরনের লোক হবে। তার বদলে চিকন পাতলা রোগা একটা মানুষকে দেখতে পেল সে। লোবোর নিচের চোয়ালটা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। জুডিথ তার ইউরোপ ভ্রমণের সময় হাবসবার্গ বংশের লোকদের গল্প শুনেছে যারা বিভিন্ন সময় স্পেইন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া এমনকি সমগ্র রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছে। এই বংশের লোকেরা সামনের দিকে বাড়ানো কুৎসিৎ রকমের নিচের চোয়ালের জন্য বিখ্যাত ছিল। লোবো হয়ত সেই হাবসবার্গ লাইনের কোনো জারজ সন্তান। বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্যই হয়তো বা আফ্রিকায় এসে ঘাঁটি বসিয়েছে।
“তা হলে,” জুডিথ-এর দিকে বেশ সন্তুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলা শুরু করল লোকটা। জুডিথ দেখতে পায় লোকটার মুখের কোণা থেকে একটা চিকন লালা গড়িয়ে পড়ছে। “তুমিই তাহলে সেই সুন্দরী রমণী যে আমার পরবর্তী বউ হতে যাচ্ছ? কিন্তু এতটা রাস্তা ভ্রমণ করে আসার ফলে তোমাকে খুব একটা ভাল দেখাচ্ছে না। তুমি ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নাও প্রিয়তমা। তোমার ঘর প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। তোমার জন্য বিয়ের পোশাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এটা এর পূর্বে মাত্র দুবার ব্যবহার হয়েছে। তোমার ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়া হবে। যাও আজকের মধ্যে গিয়ে নিজেকে প্রস্তুত কর। বিশ্রাম নাও ইচ্ছেমতো। কাল সকালে প্রস্তুত হয়ে আমার সামনে হাজির হবে। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নেব যে তোমাকে নিয়ে কী করা যায়।”
সে পুনরায় জুডিথ-এর ওপর দৃষ্টি স্থির করে তাকিয়ে দেখতে লাগল। জুডিথ হঠাৎ করেই বুঝতে পারল যে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ইচ্ছে পূরণের জন্য কতটা বল প্রয়োগ করতে পারে এই লোক, সেই সাথে কতটা নির্মম হতে পারে।
“হুম,” সে তার মাথাটা একপাশে বকিয়ে দেখতে থাকে। “বেশ সুন্দর বুক, গোলগাল পেট, পাগুলো বেশ চিকন। আচ্ছা, তুমি আবার গর্ভবতী নও তো, মেয়ে?”
জুডিথ কিছু বলল না।
“সে গর্ভবতী কি-না তাতে কী এসে যায়?” বুজার্ড জিজ্ঞেস করল। আমি ব্যাপারটা নিয়ে হাইপোথিটিক্যালভাবে কথা বলছি। ধরুন সে কোনো সাদা লম্বা কোনো ইংরেজের বাচ্চা পেটে ধরেছে। ধরুন আপনার বিয়ের পর সে সেই বাচ্চার জন্ম দিল। তাহলে সেই বাচ্চা আপনার হবে। আপনি তার পেটে বীজ বপন করেছেন কি-না সেটা কী বড় কোনো ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে?”
