হায়েনাটা তার পিছু পিছু যেতে থাকে। “না,” জুডিথ চিৎকার করে উঠল, এরপর টিগার-এ টান দিল। বন্দুকটা গর্জে উঠল সাথে-সাথে।
অন্ধকার ভেদ করে আগুনের গুলি এগিয়ে যেতে থাকে। আগুন দেখে হায়েনাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু তারপরও জুডিথ-এর হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ অ্যান দৌড় দেয়ার ফলে তার স্থির লক্ষ্যবস্তু চলন্ত লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তাই সে ব্যর্থ হয়। সে দেখতে পায় হায়েনাটা দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় অ্যান-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, এরপর বাম উরুতে কামড়ে ধরল শক্ত করে। অ্যান-এর চিৎকার হায়েনাগুলোর গর্জন এবং হুড়োহুড়ির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। বন্দুকের গর্জন ভুলে গিয়ে হায়েনাগুলো তাদের দলনেতাকে অনুসরণ করা শুরু করে দিল।
জুডিথ বন্দুকটা হাতে নিয়ে ব্যারেলটা দুহাত দিয়ে ধরে হায়েনাটার পেছনে তীব্রভাবে আঘাত করল। সেটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে অ্যানকে ছেড়ে দিয়ে জুডিথ-এর দিকে তাকায়। বাকি হায়েনাগুলো অ্যান-এর রক্তের নেশায় মগ্ন হয়ে আছে। সেগুলোর সমস্ত মনোযোগ এখন অ্যান-এর দিকে। একটা প্রাণী ভিড়ের মাঝ থেকে মুখ তুললে জুডিথ দেখতে পায় সেটার মুখে রক্ত লেগে আছে।
“ওর কথা ছেড়ে দাও,” পেটের শিশুটি আবার বলতে শুরু করে। “আমাদের আর কিছুই করার নেই। কিন্তু আমরা যদি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকি তবে আমাদেরকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে এরা।”
“হেল্প মি”, এখনো অ্যান-এর চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
অ্যান-এর চারদিকে হায়েনাগুলো একটা ক্ল্যান তৈরি করে ফেলেছে। জুডিথ তার এই জীবনে অনেক যুদ্ধ ক্ষেত্র দেখেছে। কিন্তু কোনোটাকেই এটার সাথে তুলনা করা যায় না। হঠাৎ তার বমি বমি ভাব শুরু হলো। সে বাঁকা হয়ে ঘাসের ওপর বমি করে দিল। একটা হায়েনা তার বমির গন্ধে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। সে বন্দুকটা দিয়ে হায়েনাটাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়। কিন্তু হায়েনাটার মনোযোগ তার দিকে না, মাথা নিচু করে হায়েনাটা ঘাসের ওপর থেকে বৃমি চেটে চেটে খাচ্ছে।
ঠিক তখনই একটা তলোয়ার এসে হায়েনাটার মাথা ভেদ করে দিল। হায়েনাটা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। জুডিথ মাথা ঘুরিয়ে দেখে যে মুখোশ পরা লোকটা এসে উপস্থিত হয়েছে ওখানে।
“ওকে সাহায্য কর”, জুডিথ বলতে থাকে।
জুডিথ এবং হায়েনার মাঝে এসে দাঁড়াল তলোয়ার হাতে লোকটা। এরপর অন্যান্য পর্তুগীজ নাবিক এবং দুজন উপজাতি জুডিথকে রক্ষা করার জন্য রুখে দাঁড়াল। জুডিথ চিৎকার করে উঠল, “কেউ ওকে সাহায্য কর,” ঈশ্বরের দোহাই লাগে কেউ ওকে বাঁচাও।”
মুখোশ পরা লোকটা কোনো কথাই বলল না। সে তার মাথাটা ঘুরিয়ে তাদের সামনে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনার দিকে তাকিয়ে দেখছিল।
“তোমার তলোয়ারটা আমাকে দাও,” “আমি ওকে সাহায্য করব,” জুডিথ বলল।
লোকটি আড়চোখে জুডিথ-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার মুখ বন্ধ করে শুধু দেখে যাও।” এরপর সে একজন নাবিককে ইশারা করল জুডিথ-এর হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নেয়ার জন্য।
একটা হায়েনা লাফ দিয়ে অ্যান-এর বাহুতে কামড় দিয়ে ধরেছে। হায়েনাটার ভারে অ্যান চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। জুডিথ শেষবারের মতো আকুতিভরা অ্যান-এর চোখদুটো দেখতে পায়। এরপর সব শেষ হয়ে যায়, “প্লিজ।” জুডিথ কাঁদতে থাকে। কিন্তু সে জানে এখন আর কোনো আশা ভরসাই নেই। হায়েনাগুলো তাকে জীবন্ত খেয়ে ফেলল। জুডিথ হায়েনাগুলোর মুখের কচুমচ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে।
যতক্ষণ পর্যন্ত না মুখোশ পরা লোকটা সবাইকে যাওয়ার জন্য আদেশ করল ততক্ষণ পর্যন্ত সে তাকিয়েই রইলো।
“আপনার ভাগ্য ভাল যে, আমাদের একজন আপনার বন্দুকের আগুন দেখতে পেয়েছিল, “ধূসর দাঁড়িওয়ালা অফিসারটা বলল। নয়ত ওই শয়তানগুলো আপনাকে এবং আপনার পেটের সন্তানকে খেয়ে ফেলত। জুডিথ কিছু বলল না। এ মুহূর্তে তার বলার মতো কোনো কথা নেই। সে শুধু হাতদুটো তার পেটের ওপর রাখল। সে হাত দিয়ে পেটের ওপর চাপ দিতে থাকে যেন সে বাচ্চাটার হাত-পা ছুঁড়ে নিশ্চিত হতে চাচ্ছে যে বাচ্চাটা এখনো নিরাপদে আছে।
যদিও তার মন এই নির্ভরতা মেনে নিতে চাচ্ছে না। প্রতিটা ইন্দ্রীয় তাকে বলছে যে এ পর্যন্ত সে যত কষ্ট ভোগ করেছে সেই কষ্টগুলো সামনে এগিয়ে আসা কষ্টের তুলনায় কিছুই না।
*
হাল সময়ের নিশানা হারিয়ে ফেলেছে। সে এখন বলতে পারবে না যে কতটা সময় তারা দ্বীপের ভেতর দিয়ে হেঁটেছে। যদিও সে স রাতের বেলা চাঁদের আলোর দিকে খেয়াল রাখতে পেরেছে। চাঁদের আবার দুই তৃতীয়াংশ কমে এসেছে। এ থেকে সে ধারণা করতে পারল যে প্রায় তিন সপ্তাহ যাবত তারা সামনের দিকে এগুচ্ছে।
সামনে এগুতে এগুতে তারা ভূমির ওপর বড় বড় গ্রানাইট পাথর দেখতে পায়, পূর্বদিকে বড় বড় পাহাড়ও তাদের নজর এড়ায়নি। তারা বুঝতে পারে যে তারা মিয়েম্বো ফরেস্ট-এ পৌঁছে গিয়েছে।
মাঝে মাঝে রাতের বেলা বৃষ্টি তাদের পথ রুখে দাঁড়ায়। তারা তখন গাছের ডালপালা দিয়ে অস্থায়ী তাবু বানিয়ে আশ্রয় নেয়। আগুন ছাড়া তারা কখনোই বিশ্রাম নিত না কারণ বহুদূর থেকেও বন্য পশুপাখিরা আগুনের গন্ধ পায়, ভয় পায়।
“শুধু সিংহ বাদে,” অ্যাবোলি তাকে একসময় বলেছিল। “সিংহ ক্যাম্প ফায়ার-এর কাছাকাছি ঘুরাঘুরি করে দেখার চেষ্টা করে যে সেখানে কী ঘটছে?”
