পাথর ঘষতে ঘষতে জুডিথ-এর হাত কাঁপতে থাকে।
“আমরা মারা যাচ্ছি।” সে অ্যান-এর ফোপানো কান্না শুনতে পায়। এরপর… অবশেষে…বহুচেষ্টার পর একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গ খড়খুটোর গায়ে লাগল। খড়খুটোর কুণ্ডলীটাকে সে হাতের ওপর উঠিয়ে নিয়ে ফুঁ দিতে শুরু করল। জুডিথ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দম আটকিয়ে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে।
“জুডিথ!”
পুরনো খড়খটোর মধ্যে অবশেষে আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। আগুন দেখে হায়েনার দল কিছুটা পিছিয়ে পড়ল। জুডিথ মাথা তুলে আশেপাশে তাকাল কিন্তু অ্যানকে দেখতে পাচ্ছে না সে। দুই ডজন কিংবা তারও বেশি হায়েনা অ্যান-এর আশেপাশে পাক খাচ্ছে। ছাই-এর পাশে আরেকটা ছোট কাঠি পড়ে আছে। কিন্তু এটা দিয়ে আগুনকে বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখা যাবে না।
কিন্তু জুডিথ-এর কাছে এখনো হাত বন্দুকটা রয়েছে।
“ঈশ্বর আমাদের সাহায্য কর,” জুডিথ মনে মনে এই প্রার্থনা করতে থাকে। এরপর সে হাত বন্দুকে আগুন লাগানোর ম্যাচ কর্ডটাকে আগুনের শিখায় ধরল। একই সাথে হাত বন্দুকটা এবং পাউডার ফ্ল্যাক্সটা শক্ত হাতে তুলে নিল। হাতবন্দুক-এর প্রিমিং প্যানটা খুলে ফেলে ফ্ল্যাক্স-এর স্টপারটা দাঁত দিয়ে টেনে ধরে যথেষ্ট পরিমাণ পাউডার প্যান-এর মধ্যে ঢেলে দিল। এরপর প্যান-এর কভার লাগিয়ে অতিরিক্ত পাউডার সরিয়ে ফেলল, তারপর সে হাত বন্দুক-এর বাটটা মাটিতে রেখে সেটার মাজুল-এ পাউডার প্রবেশ করালো।
“আমি আসছি, অ্যান”, সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে কিছু ঘাস হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে নিল। এরপর সেই ঘাসগুলো মুখে দিয়ে চিবাতে থাকল। তাকে যেহেতু নিচের দিকে তাক করে গুলি করতে হবে তাই শুট করার আগেই গুলিটা বন্দুক থেকে গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। আর তাই শুট করার আগ পর্যন্ত গুলিটাকে ওখানে ধরে রাখার জন্য কিছু একটা দরকার। চিবানো ঘাসটা মুখ থেকে বের করে মাজল-এর মুখ আটকে দিল জুডিথ, যাতে শুট করার আগ পর্যন্ত বুলেটটা ব্যারেল থেকে বেরোতে না পারে।
“ওদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও”, অ্যান জুডিথকে অনুনয় করে বলতে থাকে। জুডিথ জ্বলতে থাকা কাঠিটাকে বন্দুকের স্টক-এ লাগিয়ে গুলি করার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করল। বন্দুকটা নিজের বুকে ঠেকাল সে। কিন্তু সমস্ত গান পাউডার ঢেলে দেয়ার ফলে একবারই সে গুলি করতে পারবে। আরেকবার গুলি করার জন্য বন্দুকটাকে হয়ত সে প্রস্তুত করার সময় পাবে না।
“ওর চিন্তা বাদ দাও! জন্ম না নেয়া বাচ্চাটা যেন জুডিথ-এর পেটের ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠে। আমরা হয়ত একবারই গুলি করার সুযোগ পাব। ওই মেয়েটার জন্য সেটা নষ্ট করো না। এটা রেখে দাও। তাকিয়ে দেখ হয়েনাগুলো আমাদের দিকেও এগিয়ে আসছে।
জুডিথ আবারও অ্যান-এর দিকে তাকায়। ওর চারপাশে হায়েনাগুলো ঘোরফেরা করছে। কোনোটা তার শক্ত থাবা অ্যান-এর গায়ে ঠেকিয়ে দিচ্ছে আবার কোনোটা পিছিয়ে আসছে।
সে ক্যাম্পের মধ্যে ম্যাচকর্ডটা ঠিকমত লাগিয়ে টিগার ধরে টান দেয়। এরপর চোখের দৃষ্টিতে দূরত্ব মাপতে থাকে।
“দূর হ।” সে চিৎকার দিল। “দূর হ।” একপা সরে গিয়ে জুডিথ তার খুব কাছের হায়েনাটার দিকে ব্যারেল তাক করল। সে তার বন্দুকটাকে চারদিকে ঘুরিয়ে হায়েনাগুলোকে সরে যেতে হুমকি দিল যদিও সে গুলি ছুড়ল না।
এখনো পর্যন্ত গুলি ছুঁড়েনি জুডিথ। সে আবারো অ্যান-এর দিকে তাকায়। অ্যানের দিকে এগিয়ে আসা সবচেয়ে বড় হায়েনাটার দিকেই তার নজর। এটাই নিশ্চয়ই দলনেতা। সে যদি এটাকে হত্যা করতে পারে তাহলে বাকিগুলো নিশ্চয়ই পালিয়ে যাবে।
“কিন্তু তুমি যদি ব্যর্থ হও? পেটের বাচ্চা আবারও বলে উঠল। তখন কী ঘটবে?”
“হত্যা করুন”, অ্যান চিৎকার করে উঠল। “এটাকে গুলি করুন।”
জুডিথ বন্দুকটা তার কাঁধের ওপর রেখে বড় হায়েনাটার দিকে তাক করল। সে জানে তার পেছনেও হায়েনাগুলো ওত পেতে আছে। হায়েনাগুলো সবখানেই আছে। এরা চারদিকটা ঘিরে ফেলেছে। জুডিথ হায়েনাগুলোর নিঃশ্বাস অনুভব করছে। রাতের ঠাণ্ডা বাতাস ভেদ করে গরম বাতাস এসে জুডিথ-এর গায়ে লাগছে।
কিন্তু বড় হায়েনাটা এক জায়গায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে নেই। এখানে সেখানে ঘুরছে ওটা। তাই সেটার দিকে লক্ষ্য স্থির করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“এই দিকে তাকা, শয়তান”, জুডিথ তার মাতৃভাষা অ্যামহারিক-এ চিৎকার করে উঠল। এই দিকে তাকিয়ে দেখ তোর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে।” সে এবার অ্যানকেও দেখতে পাচ্ছে। অ্যান-এর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তার চোখে ভয়ের আতঙ্ক উপচে পড়ছে। ঠিক তখনই সে পায়ের নিচে কিছু একটা অনুভব করল। নিচে তাকিয়ে দেখল যে অ্যান-এর ফ্ল্যাক্সটা নিচে পড়ে আছে। সেটা নিচের থেকে তুলে সমস্ত শক্তি দিয়ে বড় হায়েনাটার দিকে ছুঁড়ে মারল।
হায়েনাটা গর্জন করে তার দিকে ফিরে তাকাল।
এটাই জুডিথ চেয়েছিল। তার হার্টবিট বাড়তে থাকে। সে জানে এর চেয়ে ভাল সুযোগ সে হয়ত আর নাও পেতে পারে। তাদের ভাগ্যের চাকা হয়ত ঘুরেও যেতে পারে। এ যাত্রায় হয়ত তারা বেঁচেও যেতে পারে। ইতোমধ্যেই বন্দুকের টিগারে জুডিথ-এর আঙুলগুলো বাকা হতে শুরু করেছে।
ঠিক তখন অ্যান তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল। দৌড় দিল মেয়েটা।
