তারা বিভিন্ন গাছ থেকে সংগ্রহ করা ফলমূল খেতে থাকে। জুডিথ অ্যানকে বলে যে এটার নাম হচ্ছে মাঙ্কি বেড। এরপর জুডিথ কিছু রেখে দেয়া খাট গাছের ছাল চিবুতে থাকে। কিন্তু সেগুলো জুডিথকে জাগিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলো।
আগুনের শেষ শিখাটা নিভে যাওয়ার পরও অনেকটা সময় বাকি ছিল সূর্য উঠার।
আর ঠিক তখুনি হায়েনারা এলো।
*
দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের পিছু ধাওয়া করা শেষ হয়েছে। জুমু নামে বুজার্ডের ব্যক্তিগত দাস বুজার্ডের শুষ্ক মুখে পানি তুলে দিচ্ছে। শুধু এই সময়টাতেই বুজার্ডকে খুব অসহায় মনে হয়। জুমু এটা জানে। অন্য সময় বুজার্ড যতই তার ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন এ সময় সে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। পানি পান করার শত ইচ্ছে থাকার পরও সে পানি পান করতে পারে না যদি না কেউ তার মুখে তুলে দেয়। এই সময়টা তার সাথে কথা বলার জন্য বা কোনো অনুরোধ করার জন্য উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু মুটে দুজন জুমুকে কথা বলার জন্য এতবার করে প্ররোচনা দিতে থাকে যে জুমুর আর কিছুই করার থাকে না।
“মাস্টার, সে আস্তে আস্তে বলতে শুরু করে। সুবিধার ব্যাপার এই যে নল মুখে নিয়ে বুজার্ড পানি পান করা শুরু করলে অনেকক্ষণ যাবত কথা বলতে পারবে না। এই সময়ের মধ্যে কথাটা বলে ফেলা যাবে। “আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু আমি আমার ভাইদের হয়ে কিছু কথা বলতে চাইছি। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে আমরা সেই মেয়েটার খুব কাছাকাছি রয়েছি। আমরা যদি আরও একটু সামনে এগিয়ে যাই তবে এই অন্ধকারেও আমরা তাকে খুঁজে বের করে ফেলতে পারব।”
বুজার্ড তার মাথা ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। “তুমি বলছ, আমরা তাদেরকে হয়ত খুঁজে পাব?”
“হ্যাঁ, মাস্টার।”
“যদি তাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তখন?”
“মাস্টার, ভবিষ্যতে কী ঘটবে এটা বলাটা অসম্ভব। সেটা ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ীই হবে। কিন্তু আমার এমনটাই মনে হচ্ছে।”
“তোমার কী মনে হচ্ছে না যে তাদেরকে সকালে খুঁজে বের করাটা আরো সুবিধাজনক হবে?”
“হ্যাঁ, মাস্টার।”
“তাহলে আমরা তা-ই করব। এখন কালো বেলুনের মতো আমার সামনে বকবক না করে খাবারের ব্যবস্থা কর, যাও।”
জুমু তার মনিবের জন্য নরম খাবার প্রস্তুত করতে চলে গেল।
কয়েক ঘণ্টা পর সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। দেখল যে বুজার্ড গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তার কাঁধ ঝাঁকিয়েও তাকে জাগানো যাচ্ছে না। অবশেষে দানবটা ঠোঁট ঘুরিয়ে জ্বলন্ত চোখে জুমুর দিকে তাকাল।
বুজার্ড কথা বলার পূর্বেই জুমু দ্রুত বলে উঠল। “মাস্টার! মাস্টার! আমাদের এখনই যেতে হবে…সেই মেয়েটা!”
“তুমি কী বলতে চাইছ?” বুজার্ড জিজ্ঞেস করল।
“শুনুন, মাস্টার! কান পেতে শুনুন।”
বুজার্ড কিছুক্ষণ চুপ করে শোনার চেষ্টা করে। এরপরই সে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। উঠ! উঠ!…সবাই তৈরি হও। সে চিৎকার করতে করতে তার তলোয়ার হাতে নেয় এবং রাতের অন্ধকারের ভেতর দৌড়াতে শুরু করে।
.
দুটি হায়েনার গোঁ গোঁ আওয়াজ এবং হুঙ্কারে জুডিথ জেগে উঠে। এত বড় হায়েনা জুডিথ-এর পূর্বে কখনও দেখেনি। সে এবং অ্যান যেখানে শুয়ে আছে। তার সামনেই হায়েনা দুটো উত্তেজিত হয়ে সামনে পেছনে লাফাচ্ছে। হায়েনা দুটোর উত্তেজনা দেখে জুডিথ-এর রক্ত প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
অ্যান জেগে উঠে হায়েনা দেখে চিৎকার করে উঠে, “দূর হ এখান থেকে।” সে হামাগুড়ি দিয়ে পেছনে যেতে থাকে। “দূর হ এখান থেকে শয়তান।”
তার এই চিৎকার বা ধমক হায়েনাগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়া তো বহু দূরের কথা বরং সেগুলোকে আরও উত্তেজিত করে তুলল। সেগুলো রাগে গজরাতে থাকল।
ভয়ে এবং শীতে কাঁপতে কাঁপতে জুডিথ আগুনের দিকে এগিয়ে গেল। সে একটা কাঠি তুলে ছাইগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে কিন্তু সেটাতে সে কোনো অঙ্গার দেখতে পায় না।
“ওদেরকে গুলি করুন,” অ্যান চিৎকার করে উঠল। “একটাকে গুলি করলে অন্যটা পালিয়ে যাবে।”
কিন্তু আগুনের শিখা ছাড়া হাত বন্দুকটা একদম অকেজো; ওটার ম্যাচ কর্ড-এ আগুন না ধরালে শুট করা যায় না।
সে তার কোমড়ে গুঁজে রাখা চামড়ার থলেটা হাতে নিয়ে সেটা থেকে পাথরের টুকরা এবং স্টীলের পাতটা বের করে আনল। হাঁটুর ওপর পাতটা রেখে পাথর দিয়ে ঘষে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করতে লাগল সে।
আগুনের গন্ধ তার নাকে আসতে থাকে।
“তাড়াতাড়ি,” অ্যান বলে উঠল। জুডিথ আশপাশ থেকে দ্রুত কয়েকটা শুষ্ক খড়খুটো নিয়ে সেটার ওপর স্টীলের পাত এবং পাথর রেখে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাতাসে কয়েকটা স্ফুলিঙ্গ দেখা গেলেও সেটা আগুন জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
“জুডিথ, দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন।”
অধিকাংশ হায়েনাই মানুষের সামনে আসলে ভীত হয়ে যায়। বিশেষত যেগুলোর গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে। কিন্তু এগুলোর গায়ে ধূসর চামড়ার কোট পরানো আছে। তার ওপর গাঢ় বাদামি রঙের দাগ আছে। একটা হায়েনা অ্যান-এর খুব কাছাকাছি চলে এসে ওপর নিজ মাথা নাড়াচ্ছে আর হাসছে।
অ্যান চিৎকার দিয়ে উঠে। অ্যান-এর চিৎকারে জম্ভটা নড়ে উঠে কিছুটা পিছিয়ে যায়।
“ওহ, গড”, অ্যান কেঁদে ফেলল। “ও গড, আমাদেরকে সাহায্য কর।”
হঠাৎ রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে বন্য চিৎকার শোনা যায়। জুডিথ মাথা তুলে তাকিয়ে দেখার চেষ্টাও করল না। আসলে তাকিয়ে দেখার কোনো প্রয়োজনও নেই। সে জানে প্রথম হায়েনা দুটি চিৎকার দিয়ে তাদের দলকে ডাকছে এই হত্যাযজ্ঞে যোগ দেয়ার জন্য।
