“ওয়েস্টবারিতেও নিরাপদ”, অ্যান পূর্বের কথার জের ধরে আবার বলতে শুরু করে। সেখানে হলি ট্রিনিটি নামে একটা চার্চ আছে। যেখানকার যাজক আমাকে বেল টাওয়ার-এর চূড়া পর্যন্ত উঠতে দিত। বেলটা দেখতে অনেক সুন্দর ছিল। জুডিথ মেয়েটাকে হতাশা করে না। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে বাড়ির কথা চিন্তা করাটা তার মনে সাহস যোগাচ্ছে। একারণে জুডিথ তাকে কল্পনার জগতে বসবাস করতে দেয়। সে হয়ত অ্যান-এর ইচ্ছে সম্পূর্ণরূপে পূরণ করতে পারবে না।
তাছাড়া তারা যদি উপকূলে পৌঁছে কোনো ক্যাপ্টেনকে তাদের কষ্টের কথা বলে এবং সেই ক্যাপ্টেন যদি তাদেরকে তাদের জন্মভূমিতে পৌঁছে দেয় তবেই কী জুডিথ সুখী হবে? হালকে ছাড়া একা একা পৌঁছে সে কী সুখী হতে পারবে?
আমি কী বোকার মতো কাজ করেছিলাম, জুডিথ মনে মনে চিন্তা করল। জাঞ্জিবার-এ গিয়ে আমি যদি বাউ-এর উপরে থাকতাম তবে কতই না– নিরাপদে থাকতে পারতাম। হাল যদি তার জন্য ভুল ওষুধ নিয়ে আসত তবে এমন কী আর ক্ষতি হত। সে তখন যদি অসুস্থ হয়েও পড়ত তবে সেটা কী আজকের অবস্থার চেয়ে খারাপ হত?
কিন্তু এখন সেটা নিয়ে চিন্তা করার সময় ফুরিয়ে গিয়েছে। সে তার শত্রুর ফাঁদে পড়েছে। তার সন্তান কোনোদিন তার বাবাকে চিনবে না। তার বোকামির জন্য তাকে এই শাস্তি পেতে হচ্ছে।
“ওই দিকে তাকিয়ে দেখুন,” অ্যান-এর কথায় জুডিথের শোকাত্মক চিন্তা ভাবনায় বাধা পড়ল। অ্যান উত্তর-পূর্ব দিকে হলুদ ঘাসের মাঝে কালো কিছু একটা নড়াচড়া করতে দেখল। “এটা কী?” সে জিজ্ঞেস করল। “দেখতে অনেকটা পাখির মতো। কিন্তু বেশ বড়,” সে সূর্যের আলো থেকে চোখ বাঁচিয়ে ভালভাবে দেখার চেষ্টা করছে।
“শকুন”, জুডিথ চোখ বড় বড় করে দেখল। যখন সে দেখল যে একসাথে থাকা বড় কালো বস্তুটা ভেঙে কয়েকটা পাখি হয়ে গিয়েছে, তখন জুডিথ-এর হার্ট প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হলো।
এরপরই অ্যান কয়েকটা সিংহ দেখতে পেল। অ্যানও ভয়ে জুডিথ-এর মতো বরফ হয়ে যেতে শুরু করল।
তাদের দুজনের পা যেন মাটির সাথে আটকে আছে। একটুও নড়াতে পারছে না।
একটা সিংহ মাথাটা ঘুরিয়ে দুটো শকুনের দিকে হুঙ্কার দিচ্ছে, কারণ শকুন দুটোও তাদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছে। শকুন দুটো একটু দূরে সরে গেল-যদিও বেশিদূর না। জুডিথ এক-দুই করে পাঁচটা পর্যন্ত সিংহ গুনতে পারল। কিন্তু ঘাসের মধ্যে আরও দুই একটা শুয়ে থাকতে পারে যেগুলো হয়তো দেখা যাচ্ছে না।
“তারা তাদের নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। তারা যেন কিছুতেই আমাদেরকে দেখতে না পায়।” জুডিথ অনেক আশা নিয়ে কথাটা বলতে থাকল। একটা বুশবাক এবং ছোট কুড়ুর মৃতদেহ নিচে পড়ে আছে। সিংহদুটো তাদের মাংস টেনে ছিঁড়ে খাচ্ছে। এখনো বেশ অনেকটা মাংস বাকি আছে। “খাও ভালমত খাও। এতটা ভালভাবে যেন নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়,” অ্যান সিংহগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে।
জুডিথ এবং অ্যান দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাদের যাত্রা চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের খাবার পানি প্রায় ফুরিয়ে আসছে। শরীর বেয়ে ঘাম চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। অ্যান-এর সাদা শরীর লাল হয়ে যেন ফোঁসকা পড়ে যাচ্ছে তবুও অ্যান কোনো কথা বলছে না।
যেতে যেতে একসময় তারা একটা উঁচু জায়গার পাশ দিয়ে চলা শুরু করল। উঁচু জায়গাটা যেখানে ডানদিকে মোড় নিয়েছে সেখানে তারা একটা ঝর্নাধারা দেখতে পেল। আনন্দে ভরে উঠল তাদের মন। তারা ফ্লাক্স ভর্তি করে পানি নিল।
“আমরা এখানে ক্যাম্প বানাতে পারি। এখানে খাবার পানিও আছে,” অ্যান বলল।
“না”, জুডিথ তার মাথা নাড়াল। “ওদিকে তাকিয়ে দেখ।” জুডিথ দক্ষিণ দিকে হাত উঠিয়ে বলল যেদিকে ঝরনাটা অনেক চওড়া হয়ে গিয়েছে। সেদিকে একডজন বা তারও বেশি সরীসৃপ জাতীয় বন্য প্রাণী পানি পান করছে। জুডিথ এবং অ্যান যতটা তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি পান করছে ওরাও ঠিক ততটা পিপাসা নিয়েই পান করছে। “চিতাবাঘ কিংবা সিংহ যেকোনো সময় এই প্রাণীগুলোর খোঁজ পেয়ে এখানে চলে আসবে। তাই এই জায়গাটা আমাদের জন্য নিরাপদ নয়।”
এত কষ্টের ভেতরেও অ্যান মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। “ওয়েস্টবেরীতে থাকলে আমাদেরকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হত না।” “আমার মায়ের বিশাল টম ক্যাট সবকিছু একাই সামাল দিয়ে দিত।”
অ্যান-এর কথা শুনে জুডিথও না হেসে পারল না।
তারা যখন তার বানানো শেষ করল তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। জুডিথ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আগুন জ্বালাবে। যদি সিংহের ভয় না থাকত সে কখনোই এই ঝুঁকিটা নিত না। তাছাড়া সে আর আন অনেকটা সময় ধরে সামনে এবং পেছনে তাকিয়ে দেখেছে কোথাও মুখোশ পরা লোকটার চিহ্ন দেখা যায় কি-না। কিন্তু তারা কোনো চিহ্ন দেখতে পায় নি।
জুডিথ মৃত পর্তুগীজ সৈন্যটার কাছ থেকে ধনুক এবং তরবারি নিয়ে এসেছে সেগুলোর সাহায্য নিয়ে কোনোভাবে একটা পাখি শিকার করল। সেই পাখির চামড়া ছাড়িয়ে মাংস আগুনে ঝলসে খাওয়ার ব্যবস্থা করল। জুডিথ মাটিতে বেশ খানিকটা গর্ত করে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে যেন আগুনের আলো বেশিদূর না যায়। সেই সাথে আগুনের চারপাশটা ডালপালা দিয়ে ঢেকে দেয়ার ব্যবস্থা করল।
“কী অদ্ভুত কাণ্ড দেখেছেন, ছোট্ট একটু আগুন চারপাশটাকে কেমন জীবন্ত করে তুলেছে,” অ্যান বলে উঠল। তার মুখের হাসিটা আগুনের আলোতে জ্বলজ্বল করছে। বন্য পোকামাকড়ের গুনগুন শব্দে চারপাশটা মুখরিত হয়ে উঠেছে। জুডিথের মনে হচ্ছে সে আগুন জ্বালিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছে।
