“আমি কখনো কোনো মানুষকে গাছ খেতে দেখিনি,” অ্যান মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলে উঠল।
“আমার দেশে এই গাছ হচ্ছে বিখ্যাত,” জুডিথ জবাব দেয়। এমনকি এই গাছ পুরো আফ্রিকা জুড়েই বিখ্যাত। সে গাছের একটা পাতা ছিঁড়ে অ্যান-এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও। এটা মুখে নিয়ে দেখ!”
অ্যান গাছের পাতাটা নেয়। সেটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে দেখে। এরপর সে এটা মুখে নিয়ে আস্তে আস্তে এমনভাবে চিবাতে থাকে যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে। জুডিথ হেসে বলে, “ছাগল যেভাবে জাবর কাটে ঠিক সেভাবেই আমাদের দেশের লোকদের সবসময় খাট গাছের পাতা চিবাতে দেখা যায়।”
“আমি বুঝতে পারছি না কেন”, অ্যান তার ঠোঁটগুলোকে নিচের দিকে বাকিয়ে বলল, “এটার স্বাদও তেমন একটা ভাল মনে হচ্ছে না।”
জুডিথ মাথা নাড়ায়। কিন্তু এটা তোমাকে শক্তি দেবে। তুমি বেশ ভাল অনুভব করবে। একটু অপেক্ষা কর তবেই দেখেতে পাবে।”
তাদেরকে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। অ্যান-এর পাতা চিবানো দেখে জুডিথ-এর গ্রামের সেই টিয়া পাখিটার কথা মনে পড়ে যায়, যে টিয়া পাখিটা লম্বা গাছের ওপর বসে বসে পাতা খেত। এরপর যান তার সাহসী স্বামীর গল্প বলে, তার স্বামী তাকে কতটা ভালবাসতো সেই গল্প বলে, তাদের কীভাবে প্রথম দেখা হয়েছিল সেই গল্প বলে।
এরপর কোনো শিশু যেভাবে বারবার তার ঘুমপাড়ানি রূপকথার গল্প শুনতে চায় অ্যানও জুডিথ-এর কাছে ঠিক সেভাবে হাল-এর গল্প শুনতে চাইলো।
জুডিথ তাদের প্রথম পরিচয়ের গল্প বলল। সে যখন ইথিওপিয়ার ক্রিশ্চিয়ান সৈন্যদের নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল তখন তাদের প্রথম পরিচয় হয়। অ্যান-এর অভিব্যক্তি সব সময়ের মতো অবিশ্বাস্য এবং শ্রদ্ধাভক্তি মিশ্রিত। তার অবিশ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে গেল যখন সে জানতে পারল যে “জুডিথ একসময় হলি গ্রেইল-এর গার্ডিয়ান ছিল।”
“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আপনার মতো এক মানবীর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে।” অ্যান বলতে থাকে। এছাড়া আমরা দুজন এখানে এভাবে বনের মধ্যে আটকা পড়ে আছি। দুই বোনের মতো পাশাপাশি আছি। যদিও ব্যাপারটা বেশ মজার কারণ আমাদের গায়ের রং আলাদা। নিরাপদ জায়গামত পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত আমরা একসাথে থাকব। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন।
“ঘটনা যাই ঘটুক না কেন।” জুডিথ সম্মতি জানায়।
কিছু সময়ের জন্য জুডিথ অ্যানকে কথা বলতে দেয়। যদিও এরপর তাকে আর কোনো পাতা খেতে দেয় না সে। তাহলে হয়ত সে সারারাত কথা বলতেই থাকবে। অ্যান-এর একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। জুডিথও একটু ঘুমানোর জন্য চেষ্টা করছে। কিন্তু সে জানে শারীরিক এবং মানসিক উভয় দিক থেকেই সে অ্যান-এর চাইতে শক্তিশালী। তারমধ্যে দুটি জীবনশক্তির স্পিরিট কাজ করছে। এক, তার পেটের সন্তান যে কি-না পৃথিবীর আলো দেখার জন্য লড়াই করছে। আর এক তার নিজের জীবন যে কি-না তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে।
এখানে শুধু মুখোশ পরা লোকটাই ভয়ের বস্তু নয়। এই জঙ্গলে আরও অনেক জন্তই তাদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই জুডিথকে এক চোখ খোলা রেখে হলেও সারারাত জেগে থাকতে হবে।
সূর্যের আলো ফুটে উঠার সাথে সাথেই তারা প্রস্থান করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। রাতের তীব্র ঠাণ্ডা কিছুটা কমতে থাকে। ফ্লাক্স থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অল্প একটু পানি দিয়ে তারা গলাটা ভিজিয়ে নেয়। নিরাপদ খাবার পানি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটুকুই হচ্ছে তাদের অবলম্বন। জুডিথ মনে-মনে অ্যান এর ধৈর্য এবং সামর্থ্যের প্রশংসা করল। জুডিথ-এর মতো এই মেয়েটি এতটা কঠিন পরিশ্রম করতে প্রস্তুত নয়। তবে আজকে তাকে দেখে বেশ সতেজ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে তার মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। তাকে দেখে জুডিথ-এর মনে একটু আশা জাগে যে তারা শেষ পর্যন্ত হয়তো বা উপকূলে পৌঁছাতে পারবে। তারপর তারা কোনো না কোনো জাহাজের দেখা পাবে যেটাতে করে মুখোশ পরা লোকটার কাছ থেকে বহুদূর চলে যেতে পারবে।
“আমরা কোনো না কোনো ইংরেজ ক্যাপ্টেনকে খুঁজে পাব। কিংবা কোম্পানির কোনো জাহাজ, অ্যান বেশ উৎফুল্ল হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে। সে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার জুতোজোড়াও যেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে। বাম পায়ের একটা আঙুল বের হয়ে রক্তাক্ত হয়ে আছে। আমি তাকে আমাদের গল্প বলব। সে নিশ্চয়ই আমাদের কলকাতা পৌঁছে দেবে কিংবা সরাসরি ইংল্যান্ডে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবে। এরপর সে জুডিথের দিকে তাকিয়ে বলল যে তার পেটের সন্তান সেখানে নিরাপদ থাকবে। তার চেহারায় পূর্বের খুশি খুশি ভাব অব্যাহত রেখে বলল। তোমরা দুজনেই সেখানে আমার সাথে থাকবে। “ব্রিস্টল-এর কাছেই আমার পরিবার থাকে। সেটা বেশ শান্তিপূর্ণ আর নিরাপদ জায়গা”, সে আশেপাশে তাকিয়ে এই জায়গার সাথে তুলনা করে বলল। তার চোখে যেন সেই জায়গাগুলোর ছবি ভাসছে।
দক্ষিণ দিকে তারা কয়েকশ মহিষের পাল দেখতে পায়। পুরো জায়গাটা কালো করে সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেই সাথে মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। জুডিথ প্রথমে ভাবে এদেরকে অনুসরণ করলে হয়ত খাবার পানির দেখা মিলবে। কিন্তু পরে আবার সিদ্ধান্ত বদল করে। তাদেরকে পূর্বদিকে যেতে হবে। আলো থাকতে থাকতে যে করেই হোক তাদেরকে উপকূলে পৌঁছতে হবে। মহিষের পাল এখনো তাদের কাছ থেকে অনেক দূরে আছে।
