চারদিকে শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে। জুডিথ মৃতদেহটার কাছ থেকে দূরে সরে আসে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য হাঁপাতে থাকে ও। সে যুদ্ধে বহু মানুষ হত্যা করেছে। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম ব্যাপার হয়েছে। তার নিজেকে ফিরে পেতে কিছুটা সময় লাগল।
“তাড়াতাড়ি,” সে অ্যান-এর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। “বন্দুকটি নাও।” অ্যান ঘাসের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে মৃত লোকটির অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করে নিল।
জুডিথ লোকটির কোমড় থেকে বেল্ট খুলে নেয়। বেল্ট-এর সাথে আটকানো গুলির বক্স এবং ফ্লাক্স খুলে নিল সে। লোকটির তরবারিটাও নেবে বলে ভাবল, কিন্তু এটা আসলে তাদের জন্য বেশ ভারীই হয়ে যাবে। ভারী কোনো জিনিসই এখন নেয়া যাবে না। বন্দুক এবং গুলিই তাদের জন্য যথেষ্ট।
“পানি,” সে ফিসফিস করে বলে উঠে। অ্যান মাথা নাড়ায়, এরপর পানির ফ্লাস্কটা জুডিথ-এর ঠোঁটের কাছে ধরে। যদিও জুডিথের নিজের ফ্লাস্ক আছে। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে যুক্তিতর্কে যাওয়ার সময় নয়।
জুডিথ আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে সবকিছু একটু বোঝার চেষ্টা করে। আর তারপর দৌড়াতে শুরু করে একযোগে। তারা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। মুখোশ পরা লোকটা হয়ত ধারণা করবে যে তারা পূর্বদিকে গিয়েছে যেদিক দিয়ে তারা এসেছে। জুডিথ-এর উদ্দেশ্যও পূর্বদিকেই যাওয়া কিন্তু সেটা সে কেবল তখনই করবে যখন একটা নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করতে পারবে ওরা।
পালানোর উত্তেজনায় তাদের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তারা বন্যপ্রাণীর মতো দৌড়াতে থাকে।
*
পানসিটা অ্যাবোলি এবং আরও আটজন অ্যামাডোডা সৈন্যকে কোয়েলিমান-এর উত্তরে একটা বীচ-এ এনে নামিয়ে দেয়। তারা থে তাদের সাথে প্রয়োজনীয় কোনো জিনিসই নিয়ে আসে নি। তারা যে ভূমিতে নেমেছে সেটা হয়ত সাদা লোকদের কাছে বৈরী পরিবেশ হতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে এটা বন্ধুসুলভ পরিবেশ। অস্ত্র হিসেবে হয়ত তাদের কাছে কোনো বন্দুক ও গুলি নেই। কিন্তু তাদের কাছে বল্লম, শিল্ড, তীর ধনুক রয়েছে যেগুলোর সাথে তারা ছোট বেলা থেকেই পরিচিত।
ওপাশের পৃথিবী থেকে অ্যাবোলি শুধু একটা জিনিসই নিয়ে এসেছে। একটা লম্বা প্যাচানো রশির মাথায় একটা বাঁকানো লোহা। গোল্ডেন বাউ-এর নাবিক হিসেবে সে এটা শত্রুর জাহাজে ওঠার কাজে ব্যবহার করত। জুডিথ কিংবা হালকে উদ্ধার করার জন্য শত্রুর বিল্ডিং-এ উঠতে হলে হয়ত এটা তার প্রয়োজন পড়বে।
বিগ ডেনিয়েল পানসির লোকদেরকে আদেশ করেছে তারা যেন অ্যামাডোডা সৈন্যদের উপকূলে নামিয়ে দিয়ে আসে। নিজের আবেগের বহিঃপ্রকাশ করা হয়ত ডেনিয়েল-এর স্বভাববিরুদ্ধ, কিন্তু যখন সে দেখতে পায় অ্যামাডোডারা চলে যাচ্ছে তখন সে অ্যাবোলিকে জড়িয়ে ধরে। এরপর পেছনে সরে গিয়ে অ্যাবোলির কাঁধ চাপড়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠে, “ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। যাও, যেখান থেকে পার আমাদের ক্যাপ্টেন এবং তার স্ত্রীকে খুঁজে বের করে নিয়ে এসো।”
অ্যাবোলি কিছু বলল না। শুধু মাথাটা এদিক ওদিক নাড়াল। এরপর অ্যামাডোডা সৈন্যরা দৌড়াতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে পাম গাছের আড়ালে হারিয়ে যায়।
*
সেই রাতে পর্তুগীজ নাবিককে হত্যা করার পর জুডিথ এবং অ্যান যেন পাখির মতো উড়ে বেড়িয়েছে। ভয়ে আতংকিত হয়ে নিজেদের এ জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজে বেড়িয়েছে। শারীরিক পরিশ্রম তখন তাদের কাছে কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু পরবর্তী দিনটা ছিল আরও কঠিন; সূর্যের তাপ এত বেশি ছিল যে মনে হচ্ছিল মাটি থেকে ছয় ফিট উঁচুতে সূর্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুন করার সেই উত্তেজনা উধাও হয়ে যায় নিমিষেই। দুর্বলতা এবং ক্লান্তিবোধ তাদেরকে ঘিরে ধরে। কথা বলে শক্তি অপচয় করার মতো সামর্থ্যও যেন তাদের নেই। তারা দুজন দুজনের চিন্তায় মগ্ন থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না জুডিথ বলে যে তাদেরকে এখন বিশ্রাম নিতে হবে।
দ্বিতীয় রাতে তারা একটা খাট গাছের নিচু ডালে জড়োসডো হয়ে বসে ছিল। ঠাণ্ডা বাতাস এবং শীতে কাঁপছিল ওরা। এমন সময় হঠাৎ তারা দূর থেকে কান্নার মতো আওয়াজ শুনতে পায়। কান্নার আওয়াজগুলো তীক্ষ্ণ চিৎকারে গিয়ে শেষ হয়। অ্যান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জুডিথ-এর বাহু খামচে ধরে। তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
“এটা শেয়ালের শব্দ,” জুডিথ অ্যানকে বোঝানোর চেষ্টা করে। প্রাণীটা দেখতে কুকুরের মতো কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। সে ব্যাখ্যা করে বলতে থাকে। “এরা ইদুর, পাখি এবং ফলমূল খায়। এমনকি পোকামাকড়ও খায়। জুডিথ এটা উল্লেখ করে না যে শেয়াল ছোট ছোট হরিণও খেয়ে ফেলতে পারে। এরপরও অ্যান জুডিথের বাহু খামচে ধরে আছে। যতবার শেয়াল চিৎকার দেয় ততবার তার নখ জুডিথের মাংসের মধ্যে যেন গেঁথে যাচ্ছে।
জুডিথের তীব্র ইচ্ছে হচ্ছিল আগুন জ্বালিয়ে নিজের শরীরকে গরম করতে। তাদের কাছে যে বন্দুক আছে সেটা দিয়েই আগুন জ্বালানো যেতে পারে। কিন্তু গুলির শব্দ কিংবা আগুনের শিখার আলোতে তাদের উপস্থিতি হয়ত কেউ না কেউ টের পেয়ে যাবে। তাই সে কাঁপতে থাকে এবং সূর্য উঠার জন্য প্রার্থনা করতে থাকে।
জুডিথ অ্যান-এর ওপর ভরসা করতে পারছে না যে অ্যান জেগে থাকবে এবং পাহারা দেবে। তার নিজেকেই এ কাজ করতে হবে। তাই সে খাট গাছ থেকে একটু বাকল ছিঁড়ে মুখে নিয়ে চিবাতে থাকে। ইংরেজ মেয়েটি তার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে এখন।
