মুখোশ পরা লোকটা প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর সবাইকে আধা ঘন্টা বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দেয়। অ্যান জুডিথের পেছনে বসে আছে। সে হাঁটুদুটো ভাঁজ করে হাঁটুর ভাঁজে মুখ ঢেকে বসে আছে।
“আজকে রাতে”, জুডিথ তার কাছাকাছি গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজকে রাতে আমরা কাজটা সম্পন্ন করব।”
আস্তে আস্তে করুণ চেহারা নিয়ে অ্যান তার মুখটা উঠায়। ক্লান্তিতে তার চোখদুটি মিটি মিট করতে থাকে। আপনি কী এবার সত্যি সত্যি বলছেন?”
তারা এর আগেও বহুবার পালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা-ভাবনা করেছে। কিন্তু শুধু আলোচনা করা ছাড়া বেশিদূর এগুতে পারেনি।
“এই আমি সত্যি বলছি। আমরা কাজটা করেই ছাড়ব,” জুডিথ তাকে আশ্বস্ত করল। গলার স্বর বেশি উপরে উঠাল না সে, কারণ পেলিকান-এর নাবিকেরা কিছুদর সামনে বসে পানি খাচ্ছে এবং অশ্লীল গল্পে মগ্ন রয়েছে।
“কীভাবে?” অ্যান-এর চোখ আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
জুডিথ নাবিকদের দিকে একবার নজর দিল এরপর বুজার্ডের দিকে তাকাল যে কিনা এরইমধ্যে তার কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়েছে। তলোয়ারটা তার মাথার কাছে বেশ সতর্কভাবে রাখা আছে। মুখোশের কারণে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না যে সে কী জেগে আছে নাকি ঘুমিয়ে গিয়েছে।
এরপর কোনোরকম আগাম বার্তা না দিয়ে হঠাৎ করেই উঠে বসল বুজার্ড। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে জুডিথদের প্রতিটি কথা শুনতে পাচ্ছে। তার ভয়ার্ত এক চোখ দিয়ে সে তাদেরই দিকে তাকিয়ে আছে এটা বেশ বোঝ যাচ্ছে।
“ওর দিকে তাকিও না,” জুডিথ নিচু স্বরে অ্যানকে বলল। সে দেখতে পায় অ্যান কাঁপছে। জুডিথ মেয়েটার হাত নিজের হাতে তুলে নেয় এবং পেটের ওপর রাখে। “ভান কর যেন আমরা বাচ্চা নিয়ে কথা বলছি, সে বলতে থাকে। অ্যান এখনো মুখোশ পরা লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। “অ্যান,” জুডিথ আবারো ফিসফিস করে ডাকতে থাকে। মেয়েটি তার মাথা ঘুরিয়ে ঠোঁট শক্ত করে জুডিথ-এর পেটের দিকে তাকাল যেন সে বাচ্চার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে।
আর এদিকে জুডিথ তাকে কীভাবে পালাবে সেই পরিকল্পনার কথা বলতে থাকে।
মধ্যরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে আছে তখন জুডিথ আর অ্যান তাদের থাকার জায়গা থেকে আস্তে আস্তে বের হয়। খুব সাবধানে পা ফেলে তারা। আগুনের আশেপাশে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা কেউ যেন ঘুম থেকে জেগে না উঠে। রাতে পাহারাদারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পেরেরিয়া নামের সেই লোকটিকে যে তাদের নৌকোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। লোকটি বেশ সতর্ক পাহারা দিচ্ছে, জুডিথ তার চোখ এড়িয়ে যেতে পারল না।
“অ্যানকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতে হবে,” জুডিথ ব্যাখ্যা করল “সে একা যেতে ভয় পাচ্ছে।”
পেরেরিয়া ক্যাম্পের পাশে একটা ভোলা জায়গা দেখিয়ে বলল, “ওখানে যাও।”
জুডিথ মাথা নেড়ে জবাব দিল, “না, না, মানুষের সামনে নয়।”
পেরেরিয়া খুব দ্রুত তাদের কথার প্রতিক্রিয়া দেখাল। “এখানে থাক, সে তার স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে আদেশ করে, এরপর আগুনের দিকে এগিয়ে যায়।
তারা অপেক্ষা করতে থাকে। জুডিথের ভয় হয় পেরেরিয়া হয়ত বুজার্ডকে জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু না, স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে পেরেরিয়া তা করে না। বরং সে সামনে এগিয়ে গিয়ে একজন পেলিকান নাবিককে জাগিয়ে তোলে। আগুনের আলোয় জুডিথ লোকটার ঘুমঘুম চেহারা দেখতে পায়। নাবিকটা তখন তার কম্বলটা সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সে আস্তে আস্তে জুডিথদের দিকে এগিয়ে আসে।
একহাতে তার বন্দুকটি ধরে অন্যহাতে জুডিথদেরকে ইশারা করে তাকে অনুসরণ করার জন্য।
“তুমি কী কোনোভাবেই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে না?” জুডিথ অ্যানকে জিজ্ঞেস করে। এসব সাজানো কথামালা তাদের পূর্বেই পরিকল্পনা করা।
“না, আমাকে এখনই যেতে হবে।” অ্যান তার কণ্ঠে জোর দিয়ে বলে।
জুডিথ মাথা নাড়ায়। সে অ্যান-এর কাছ থেকে এরকম উত্তরই প্রত্যাশা করছিল।
নাবিকটি তাদেরকে পথ দেখিয়ে জায়গা মতো নিয়ে যায়। ক্যাম্প থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরে। লম্বা লম্বা আগাছা জন্মে বেশ জঙ্গলের মতো একটা জায়গা হয়েছে। চাঁদের আলোয় পথঘাট বেশ পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে। ক্যাম্পের আগুনের আলো দেখা যাচ্ছে না যদিও কিন্তু আকাশে ধোঁয়া উড়ছে সেটার কিছুটা বোঝা যাচ্ছে।
“ওখানে গেলে চলবে?” নাবিকটি লম্বা লম্বা ঘাস যুক্ত একটা জায়গা দেখিয়ে বলল।
অ্যান লজ্জাবনত হয়ে একবার লোকটির দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার জুডিথ-এর দিকে তাকাচ্ছে। এরপর মাথা নাড়ল এবং বোঝাল, যে লোকটিকে এখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে। লোকটিও কোনো বাক্য ব্যয় না করে একটু দূরে সরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। অ্যান তার স্কার্ট ভাঁজ করে হাঁটু গেড়ে বসার ভান করল।
ওদিকে নাবিকটিও তার হাতের বন্দুকটা মাটিতে রেখে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসে গেল।
লোকটির তরল পদার্থ বিসর্জনের শব্দ শুনতে পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জুডিথ অপেক্ষা করে। এরপর সে নিঃশব্দে লোকটির পেছনে চলে যায় এবং তার স্কার্টের নিচে পায়ের সাথে বেঁধে রাখা তীক্ষ্ণ কাঠের ফলাটা আস্তে আস্তে বের করে। লোকটি উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত জুডিথ চিতাবাঘের মতো অপেক্ষা করতে থাকে। যখনই সে ঘুরে দাঁড়ায় তখনই জুডিথ তার অস্ত্রটা লোকটির গলায় ঢুকিয়ে দেয়। সেই সাথে পা দিয়ে লোকটির পায়ে আঘাত করে। এরপর বাম হাত দিয়ে এমনভাবে গলা প্যাচিয়ে ধরে আঘাত করে যে লোকটি কোনোরকম শব্দ করতে পারে না, শুধু গলা দিয়ে গার্গল করার মতো আওয়াজ বের হয়। আর সেটাও কিছুক্ষণ পর বন্ধ হয়ে যায়।
