.
মাদ্রি দি ডিয়াস কোয়েলিম্যান-এর বন্দরে এসে নোঙর ফেলল। দাসেরা সবাই ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে ডেক-এর ওপর অপেক্ষা করতে থাকে। তাদেরকে বণিকদের নিজস্ব নৌকোয় করে উপকূলে নিয়ে যাওয়া হলো না বরং আলাদা একটা নৌকোয় একসাথে বারজন করে নিয়ে যাওয়া হলো।
হাল সাগরের কোমল শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে আছে এখন। সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে : যদি একবার সে সুযোগ পায় তবে বারোস-এর শরীর থেকে হাড়-মাংস আলাদা করে ফেলবে।
তারা যখন উপকূলে পৌঁছাল তখন হাল এবং অন্যান্য দাসকে লাইন করে দাঁড়ানোর জন্য বলা হলো। তাদের প্রত্যেকের হাতে এবং গলায় শেকল দিয়ে বাঁধা আছে। সেই শেকলগুলো আবার আরেকটা শেকল দিয়ে সংযুক্ত, একজনের গলায় বাঁধা শেকল থেকে আরেকটা শেকল বেরিয়ে পেছনের জনের হাতের শেকল-এর সাথে সংযুক্ত হয়ে আছে। শুধু মাঝের দুজন এভাবে সংযুক্ত নয়। তাদের দুজনের মাঝে একটা কাঠের ভারী খণ্ড লাগানো আছে। সেই খণ্ড থেকে আবার একটা জোয়াল দুজনের কাঁধে এমনভাবে লাগানো আছে যেন তারা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে বাধ্য হয়।
প্রথম নৌকোতে চড়েই বারোস উপকূলে পৌঁছে যায়। দাসদের সারির দিকে তাকিয়ে সে হ্যাট মাথায় একজন লোকের সাথে কথা বলতে থাকে। হ্যাট মাথায় লোকটাকে দেখে হাল-এর কন্সাল গ্রে-এর কথা মনে পড়ে যায়।
“তাকিয়ে দেখুন, সেনোর কাপেলো,” বারোস তাকে বলতে থাকে। জাঞ্জিবার-এর বাজার থেকে আমরা খাঁটি জিনিসই কিনেছি। আমার মনে হয় সেনোর লোবো এদের কাজের গতি এবং শক্তি দেখে বেশ সন্তুষ্ট হবে।
“এদের মধ্যে একজন সাদা, কাপেলো হাল-এর দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে। সাদারা বেশিদিন টেকে না।”
“ওকে নিয়ে আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই,” বারোস তাকে আশ্বস্ত করে। “ওটা বেশ খাঁটি জিনিস। ষাড়ের মতোই শক্তিশালী।”
কাপেলো অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু বারোস-এর কথা কিছুটা মেনেও নেয়। সে মিউল-এর ওপর থেকে নেমে দাঁড়ায় এবং হাল-এর দিকে এগিয়ে যায়। এরপর ভালভাবে হালকে পরীক্ষা করে দেখে। হাল-এর ঊরু, বাইসেপস, চোখ, জিহ্বা সব ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখে। “আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার কথায় আমি একে নিচ্ছি।” কাপেলো বলতে থাকে। কিন্তু সে যদি ঠিকমতো কাজ করতে না পারে তবে আমি একে ফিরিয়ে দেব এবং তুমি আমাকে এর বদলে অন্য একজন কালো দাস দেবে। কিন্তু তখন তোমাকে কোনো পয়সা দেয়া হবে না।”
“অবশ্যই, অবশ্যই। বারোস বলতে থাকে। কিন্তু এখন কী আপনি একে নিতে চান?”
“অবশ্যই,” কাপেলো তার মিউলটার দিকে এগিয়ে যায়, এরপর মিউল এর পিঠের বস্তা থেকে একটা থলে বের করে নিয়ে আসে। সেই থলে ভর্তি পয়সা ঝনঝন করতে থাকে। যা বলা হয়েছিল তার সবটুকুই এটাতে আছে। তুমি চাইলে গুনে নিতে পার”।
“কোনো প্রয়োজন নেই,” বারোস একটা হাসি দিয়ে বলল। “আমি জানি আপনি কিংবা মাননীয় লোবো কখনোই আমার সাথে বেইমানি করবেন না। তাহলে আমি এখন আপনাকে বিদায় জানাচ্ছি। খনির দিকে আপনার যাত্রা শুভ হোক সেই প্রত্যাশা রইল।”
বারোস সরে আসে। কাঁপোলো তার মিউল-এর ওপর চড়ে বসে। এরপর গার্ডদেরকে নির্দেশনা দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই হাল তার পিঠে সেই পরিচিত চাবুকের আঘাত অনুভব করে। সে বুঝতে পারে তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়া হচ্ছে। এরপর দাসদের লাইন আফ্রিকার বুকের ওপর দিয়ে যাত্রা শুরু করে দেয়।
শেকল দিয়ে বাঁধা একসারি মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেও একটু সময় লাগে। তাড়াহুড়ার কারণে অনেকে পড়ে যেতে থাকে। সেই সাথে আরেকজনের হাতেও টান পড়তে থাকে। গার্ডরা যদিও আফ্রিকান কিন্তু তারা স্বজাতির প্রতি কোনো মায়া-মমতা দেখাচ্ছে না। যাদের নড়াচড়া কিংবা হাঁটা তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না, তাদের পিঠেই চাবুক দিয়ে আঘাত করছে লোকগুলো।
*
জুডিথ-এর সমস্ত শক্তি প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসছে। তার শরীরের প্রতিটা মাংসপেশি ব্যথায় টনটন করছে। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। মাথাটাকে তার পাথরের মতো ভারী মনে হচ্ছে। সে অন্যান্য দাসের সাথে একটু দূরত্ব রেখে এগিয়ে যাচ্ছে।
উপকলের কাদামাটি এবং জলাভূমির অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে শুষ্ক পথের দেখা পাওয়া গিয়েছে। দীর্ঘসময় পানিতে এবং নরম কাদামাটিতে থাকার ফলে জুডিথের পাদুটো পানিতে ভেজানো পাউরুটির মতো নরম হয়ে গিয়েছে। তাই সে যখন প্রথম শুষ্ক মাটিতে পা রাখে তার পায়ে ফোঁসকা পড়ে যায় এবং রক্ত ঝড়তে থাকে। কিন্তু সেগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। কখনো কখনো সারাটা দিন হাঁটার পর শেষদিকে তার মনে হচ্ছিল যে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তবুও সে এগিয়ে চলছিল। কারণ যে করেই হোক তার পেটের মূল্যবান সম্পদকে তার বাঁচাতে হবে।
সে সামনে এগিয়ে যায়, পেটের বাচ্চাটা যেন তাকে বলতে থাকে : ওদের কাছে হেরে যেও না। আমরা বিপদ কাটিয়ে উঠব। আমি যদি লড়তে পারি তবে তুমি কেন পারবে না।
অ্যানকেও অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে, যদিও তার নিজের এই করুণ অবস্থা তারপরও সে অ্যানকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। সাহস দেয়ার চেষ্টা করছে। অ্যান যখন হাঁটু ভেঙে পড়ে যেতে শুরু করে তখন তাকে ধরে ফেলল সে। এরপর অ্যান আবার চলতে শুরু করে। অ্যানকে দেখে মনে হচ্ছিল সে শুয়ে পড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে প্রস্তুত তবুও আর হাঁটতে রাজি নয়।
