যেখানে পানির গতি কমে গিয়েছে সেখানে তারা কিছু বিশাল আকারের জলহস্তী ভেসে থাকতে দেখে। বুজার্ড তার নাবিকদেরকে অস্ত্র হাতে নিতে বলে এবং জন্তুগুলোকে এড়িয়ে যেতে বলে। জুডিথ জলজ এসব প্রাণীকে খুব ভালভাবেই চিনত। দক্ষিণ ইথিওপিয়ায় যাত্রার পথে সে এগুলোকে প্রায়ই দেখতে পেত। অ্যান এগুলোকে প্রথম বারের মতো দেখছে। সে বুঝতে পারছে না যে মুখোশ পরা লোকটা হঠাৎ করে এত সতর্ক হয়ে উঠেছে কেন আর আফ্রিকান লোকগুলোও এই প্রাণীগুলোকে এত বেশি ভয় পাচ্ছে কেন।
“ওগুলোরে দিকে তাকিয়ে দেখুন,” অ্যান মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলে। “ওগুলো ওখানে শুয়ে শুয়ে মাথাটাকে একবার ভাসাচ্ছে একবার ডুবাচ্ছে। এদের অর্ধেকটা পানির নিচে আর অর্ধেকটা পানির উপরে। চোখ আর নাকগুলো যেন একটু পর পর পানির নিচ থেকে উঁকি মেরে ভেসে উঠছে। ওদের কান নাড়ানোর ভঙ্গিটাও দেখতে বেশ মজার। দেখুন ওদের একটার মাথায় পাখি বসে আছে।”
“ওরা যদি একবার আক্রমণ করে তবে তোমার সব হাসি বন্ধ হয়ে যাবে।” জুডিথ বলতে থাকে। “একটা রাগান্বিত ষাড় কিংবা একটা গরু যদি আক্রমণ করে তাহলে হয়ত তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। ভূমির ওপর অনেক লোক ওদেরকে চষে বেড়ায়। কিন্তু এগুলোর একটা যদি একবার আক্রমণ করে তবে তোমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারবে।”
ঠিক তখনই একটা জলহস্তী বিশাল এক হাই তুলে তার বাঁকা দাঁতগুলো দেখিয়ে দিল। অ্যান-এর মুখ থেকে সমস্ত হাসি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সাথে সাথে।
কিন্তু তারপরও ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা বিশাল আকারের পশুগুলোর কাছ থেকে আসেনি, বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা-মাকড়ের কাছ থেকে এসেছিল। বিশেষ করে রাতের বেলা বন্য পোকামাকড়ের কামড়ে শরীরের খোলা অংশ লাল হয়ে যাচ্ছিল। যে করেই হোক সমস্ত শরীর কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছিল সবাইকে।
অন্তত স্বস্তির ব্যাপার এই যে ওদের খাবারের কোনো কমতি পড়েনি। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ঝিনুক এবং কাঁকড়ার কোনো অভাব ছিল না আশেপাশে। পাখি শিকারীরা কিছু সামুদ্রিক পাখি শিকার করে নিয়ে আসে। সেই সাথে বন্য মধু। জুডিথ আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করে কিছু সবুজ রঙের জলপাই পাতা জোগাড় করে নিয়ে এলো। পেটের পীড়া কমানোর জন্য এগুলোর মিশ্রণ সে পান করবে। কিছু অপরিপক্ক ঔষধি ফলও জোগাড় করল সে; এগুলোর রস সে পোকামাকড়ের কামড়ের ওপর লাগাবে।
নদীর মোহনায় দ্বিতীয় দিন কাটানোর সময় একজন নাবিক একটা অদ্ভুত প্রাণী হত্যা করে নিয়ে আসে, যেটার লেজ এবং ভদ্র চেহারা দেখতে অনেকটা ডলফিনের মতো। আবার প্রাণীটি দেখতে অনেকটা কুকুরের মতোও বটে। দেখে মনে হচ্ছিল যেন মুখটা বাঁকা হয়ে হাসি ফুটে আছে। “এটার নাম হচ্ছে ডুগং,” বুজার্ড এতই সামাজিকভাবে কথাটা বলল যেটা ঠিক ওর চরিত্রের সাথে। যাচ্ছিল না। এরা ঘাস খায়। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে এটার মাংস তোমরা বেশ উপভোগ করবে।
অদ্ভুত প্রাণীটাকে টেনে আনতে তাদের পাঁচজন লোক প্রয়োজন হয়। তারা এটার চামড়া ছাড়িয়ে মাংসে লবণ মাখিয়ে রাখে। পরবর্তী কয়েক দিনের জন্য তাদের নিশ্চিত খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। বুজার্ড-এর কথা সত্য প্রমাণ করে সবাই প্রাণীটার মাংস বেশ উপভোগ করল। অনেকে তর্ক করতে থাকল। তর্কের বিষয় : ওটার স্বাদ কী গরুর মাংসের মতো নাকি শূকরের মাংসের মতো।
সময়ের সাথে সাথে ডুগং-এর মাংসের শেষ অংশটুকুও শেষ হয়ে যায়। এক সময় তারা নৌকো ছেড়ে দিয়ে পায়ে হাঁটা পথে যাত্রা শুরু করল। নদীর নাব্যতা এতটাই কমে এসেছে যে নৌকোকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই তাদেরকে পায়ে হেঁটে পথ চলতে হচ্ছে। নোংরা কর্দমাক্ত পথে অনেক সময় তাদের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল। এক সময় তারা একটু জায়গা পেয়ে গাছের ডালপালা জোগাড় করে আগুন জ্বালাল, এরপর সেই আগুনে মাছ পুড়িয়ে তাদের খাবার জোগাড় করল।
সাদা রঙের বানর তাদের আশেপাশে গাছের ওপর কিচিরমিচির করতে থাকে। সাপ এবং অন্যান্য সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী ফোঁস-ফাস শব্দ করতে করতে তাদের পথ ধরে চলে যাচ্ছে। সারারাত ধরে এখানে সেখানে বাদুড়ের পাখা ঝাপটানোর পতপত আওয়াজ পাওয়া যায়। দিনের আলোতে উজ্জ্বল রঙের মাছরাঙা পাখি দেখা যায়।
কিন্তু দিনের পর দিন চলে গেলেও কেউই বুঝতে পারে না যে বুজার্ড তাদেরকে আসলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিংবা বুজার্ডের আসল উদ্দেশ্যে কি। জুডিথ শুধু এটুকুই জানে যে সে যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই হাল-এর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে যেতে যেতে কিছু একটা খুঁজে পেল সে। একজন পর্তুগীজ নাবিক গাছের ডাল কেটে কেটে তলোয়ার দিয়ে তীক্ষ্ণ করে মাছ ধরার যন্ত্র বানাচ্ছিল। একটা ভাল যখন সে বেশি তীক্ষ্ণ করে ফেলেছিল তখন সেটার মাথাটা ভেঙে যায়। সেই ডাল ফেলে দিয়ে নাবিকটি তখন আরেকটা ডাল খুঁজতে চলে গিয়েছিল। জুডিথ তখন সেই তীক্ষ্ণ ডালটা নিজের কাছে রেখে দেয়।
এটাকে যদিও অস্ত্র বলা যায় না। এটা তাকে বুজার্ডের তলোয়ার থেকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু তারপরও…তার হাতে অন্তত একটা কিছু তো রইলো যেটা থেকে ক্ষীণ আশা জাগতে পারে।
