এরপর আরেকটা হাঙর এগিয়ে আসতে থাকে ওর দিকে। ওর খর্ব আর বলিষ্ঠ গড়ন, চওড়া আর পাতলা নাক দেখে হাল বুঝতে পারে যে এটা বুল শার্ক। ওটা লেজ নাড়াতে নাড়াতে হাল-এর দিকে এগিয়ে আসে। হাঙরটা যখন হালকে আঘাত করতে উদ্যত হলো, সে তখন আবারো পানির নিচে চলে গেল। হাঙরটা হাল-এর এত কাছাকাছি ছিল যে সে ঐ বিস্ময়কর সৃষ্টির চোখদুটো খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিল। তারপর হাঙরটা আরো দূরে সরে গেল। হাল তার শরীরটাকে বাঁকিয়ে উপরে তুলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আবারো পানির নিচে ডুব দিল।
এর পরের হাঙরটা মুখ খুলে হালকে আক্রমণ করতে আসলো। এর করাতের মতো দাঁতগুলো পানির ভেতরেও চকচক করছিল। এইরকম ভয়ের মুহূর্তেও হাল-এর জুডিথ-এর কথা মনে পড়ে গেল। কারণ এটাই হয়ত তার জীবনের বেঁচে থাকার শেষমুহূর্ত। তবুও সে মৃত্যুর কাছে এত সহজে হার মেনে নিল না। সে চিৎকার করে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাঙরটাকে লাথি দেয়ার চেষ্টা করল। এরপর কোনো না কোনোভাবে হাঙরটা ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে পড়ল।
এই রকম ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হালকে প্রায় এক ঘন্টার কাছাকাছি সময় পার করতে হয়েছিল। সে হাঙরগুলোর নাকে আর চোখে আঘাত করছিল। কোনো না কোনোভাবে হাঙরগুলোর হা করা গ্রাস থেকে হাল বেঁচে গেল। হালের এতক্ষণ মনে হচ্ছিল যে আফ্রিকান লোকটিও হয়তো তার মতো একইভাবে প্রতিহত করে যাচ্ছে। কিন্তু যখন তার বাম কাঁধে তীব্র আঘাত লাগল তখনই তার সেই ভাবনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। লোকটি আর চিৎকার করছে না। হয়ত সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হয়ত সে হাঙরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে। হাল যখন নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য পানির ওপর ভেসে উঠল তখন জাহাজের ওপর থেকে তীব্র চিৎকার শুনতে পেল। ক্যাপ্টেন বারোস আফ্রিকান লোকটির রশি ধরে রাখা নাবিকদের ওপর চিৎকার করছিল। শুনে মনে হচ্ছিল যে ওকে হাঙরদের খাবার হতে দিয়েছে বলে ক্ষেপেছে সে। বোকা লোকটা কী প্রত্যাশা করেছিল?
হাল তখন শুধু নিজের কথাই ভাবছিল। পানিতে আফ্রিকান লোকটির রক্ত আর মাংস হাঙরগুলোকে যেন পাগল করে তুলেছে, তারা শিকারের জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। যদি হালকে সময়মত উঠিয়ে ফেলা না হত তাহলে হয়ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব হত না।
এরপর সে বুঝতে পারে যে সে আস্তে আস্তে মাদ্রি দি ডিয়াস-এর কাছাকাছি যাচ্ছে। তারা হালকে উপরে উঠিয়ে নিচ্ছে। উপরে উঠাতে উঠাতে হালকে যখন লারবোর্ড-এর উপরে টেনে তোলা হয় সে তখন প্রায় মৃত। তার খুব একটা বোধশক্তিও ছিল না।
হাল-এর পায়ে যখন লোহার বেড়ি পরানো হচ্ছিল তখন বাধা দেয়ার মতো বিন্দুমাত্র শক্তিও ছিল না ওর শরীরে।
“অভিনন্দন, ইংলিশম্যান, তুমি অনেক সাহসিকতার সাথে হাঙরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে,” বারোস হালকে উদ্দেশ্য করে বলল।
উত্তর দেয়ার মতো কোনো সামর্থ্য হাল-এর ছিল না। কিন্তু সে বেঁচে আছে এখনো-এটাই দেখার বিষয়।
৭. খোলা আকাশ দেখার জন্য
জুডিথ খোলা আকাশ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। দীর্ঘদিন যাবত সে এরূপ নোংরা কর্দমাক্ত জায়গায় আটকে আছে। সূর্যের আলো এখানে প্রবেশ করে না। মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে না সে।
তারা মোট দশ জন এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছে : পেরেরিয়া নামে পেলিকান এর সেই পর্তুগীজ, আর তার সাথে আছে তিনজন পর্তুগীজ নাবিক যাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে বন্দুক আর একটা করে চাবুক রয়েছে; দুজন আফ্রিকান নাবিক যাদেরকে দারোয়ান-এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে; জুডিথ আর অ্যান; সবশেষে রয়েছে মুখোশ পরা সেই লোকটা এবং তাকে সেবা প্রদানকারী দাস। জুডিথ কিছুতেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না যে, কেন এই লোকটা এরূপ মুখোশ পরেছে। কেন এইরকম অদ্ভুত কদাকার মুখোশের ভেতর চেহারাকে বন্দি করে তালা লাগানো হয়েছে। তবে জুডিথ নিশ্চিত যে লোকটি ইচ্ছে করে এরূপ মুখোশ পরেনি। কোনো কিছুর শাস্তিস্বরূপ তাকে এটা পরানো হয়েছে। এমনকি তার একহাতে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার মতো শক্তি থাকার পরও খাবার এবং পানির জন্য সে দাসের ওপর নির্ভরশীল।
একদিন সন্ধ্যায় জুডিথ তার অন্ধকার জগতে কোনরকমে একটু আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করছিল। হালকা ধোয়ার মধ্যে সময় কাটাচ্ছিল সে। এমন সময় বুজার্ড আসলে সে বুজার্ডকে জিজ্ঞেস করে যে কেন সে তার এই মুখোশ খুলে ফেলে নি, “অসহ্য গরম পড়েছে। এই গরমে এটা পরে থাকা অসম্ভব। এ অবস্থায় তুমি কীভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছ?”
“ওহ। আমি যদি এটা খুলে ফেলি তখন কী হবে? আমি হয়ত এটা দিয়ে কাউকে ভয় দেখাতে পারি। কিন্তু এটা ছাড়া আমি চেহারাবিহীন এক পঙ্গু ছাড়া আর কিছুই নই।”
“তোমার জন্য বেশ আফসোস হচ্ছে,” জুডিথ তার কণ্ঠে কোনোরকম অনুভূতি না ফুটিয়ে তুলেই কথাটা বলল।
বুজার্ড সামনে ঝুঁকে জুডিথ-এর কথার উত্তর দিল। আমার জন্য আফসোস করা বাদ দিন। আপনার আফসোেস আপনার নিজের জন্য যত্ন করে রেখে দিন।
.
তারা পেলিকান থেকে ছোট্ট একটা পানসিতে করে যাত্রা শুরু করে। সাগর এবং ভূমির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ছোট ছোট উপনদী দিয়ে তারা অগ্রসর হতে থাকে। স্থলপথের চেয়ে জলপথের আঁকাবাঁকা রাস্তায় পথ চিনে নেয়াটা মানুষের জন্য আরও বেশি দুর্বোধ্য। কিন্তু বুজার্ড এবং সোনালি দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ পেরেরিয়া সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে সঠিকপথে নৌকো চালানোর। তারা ম্যানগ্রোভ গাছের ডাল ভেঙে পথের চিহ্নস্বরূপ সেগুলোকে নদীর পাশে পুঁতে রেখে যাচ্ছে যাতে ফেরার সময় তারা যেন পথ ভুলে অন্য কোনো উপনদীতে প্রবেশ না করে। মাঝে মাঝে তারা তর্কে লিপ্ত হচ্ছে যে তাদের কোনপথে যাওয়া উচিত। আর অন্য সময় তারা যেকোনো একটা পথের ব্যাপারে একমত হয়ে লোকজনকে সেই পথে নৌকো চালাতে নির্দেশ দিচ্ছে।
