মাদ্রি দি ডিয়াস-এর লোকেরা যখন রশিটাকে ছাড়তে ছাড়তে সাগর পর্যন্ত নামিয়ে ফেলল তখন হাল এবং আফ্রিকান লোকটি সাঁতার কাটার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ। সাগরের পানি দুদিকে সরিয়ে মাথাটা ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করা ছাড়া ওদের আর কিছুই করার ছিল না। হাল শরীর বাঁকিয়ে লাথি দিয়ে পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হলো না।
সে অন্যদিকে তাকিয়ে যখন দেখল যে আফ্রিকান লোকটি এখনো ডুবে যায়নি তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আফ্রিকান লোকটি এতটাই টানটানভাবে রশিটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে যে দেখে মনে হচ্ছে তার হাতের পেশি ফুলে গিয়েছে।
“ধরে রাখ”, সে চিৎকার করে উঠল। সে তার হাত দিয়ে কোনো কিছু শক্তভাবে ধরে রাখার মতো ইশারা করে দেখাল যাতে লোকটি যদি তার কথা শুনতে না পায় তবুও যেন তার ইশারা দেখে বুঝতে পারে। “ভালভাবে ধরে রাখ। তারা শীঘ্রই আমাদেরকে উপরে উঠিয়ে নেবে।” হাল-এর মনে হচ্ছে ক্যাপ্টেন বায়োস নিশ্চয়ই এতটা বোকা লোক নয় যে তাদের মতো শক্তিশালী দুজনকে দাস হিসেবে খাটানোর বদলে হাঙরের খাবার হতে দেবে।
জাহাজের অফিসাররা তাদের মাথার হ্যাট খুলে সামনের দিকে ঝুঁকে হাল এবং আফ্রিকান লোকটাকে দেখছে। তারা সবাই জাহাজের পেছন দিকে রেলিং এ জড়ো হয়েছে। হাল তাদের সবাইকে দেখতে পাচ্ছে। সেই সাথে মাদ্রি দি ডিয়াস-এর পালও দেখছে পাচ্ছে সে। অন্তত দুই ডজন নাবিক মাস্তুলের রশি বেয়ে উপরে উঠছে এখন।
সে হয়ত জাহাজের গতি কমানোর চেষ্টা করছে, হাল ভাবল। সাথে-সাথে সে সতর্ক হয়ে পড়ল, কারণ সে জানে যে জাহাজের গতি দুই থেকে তিন নট কমে গেলে কী হবে। কিন্তু সে জাহাজের উপম্যাস্টম্যানকে প্রধান মাস্তুলের ওপরে দেখতে পায়। তারা সবাই উপগ্যালান্ট গোটানোর চেষ্টা করছে। যখন তা সম্পন্ন হয় তখন জাহাজের গতি অনেকটা কমে যায়। এরফলে সহজেই হাল তার মাথাটা পানির ওপর ভাসিয়ে রাখতে পারে। সে যখন আফ্রিকান লোকটির দিকে তাকায় তখন দেখল যে লোকটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
বোকাটা ভাবছে আমরা বেঁচে গিয়েছি! আপন মনে ভাবল হাল। ও এখনো মনে করছে যে আমরা কোনোমতে এই ট্রায়ালটা পার হয়ে আবারো জাহাজে ফেরত যেতে পারব!
আর এরপরই, হালের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে পেছনে ফিরে তাকানোর ইশারা করল। রশিটাকে শক্ত করে ধরে পেছনে ঘুরে তাকাল হাল।
আর ঠিক তখনই সে তার পেছনে কয়েক গজ দূর থেকে ভেসে আসা হাঙরের ডানাটাকে দেখতে পেল।
ওপর থেকে জাহাজের লোকেরা চিৎকার করছে। তারা সবাই জাহাজের রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়েছে দেখার জন্য।
“গড, হেল্প আস”, হাল বিড়বিড় করে বলতে থাকে। টাইগার শার্ক-এর ঝক এখন তার থেকে মাত্র কয়েক হাত পেছনে আছে।
সমুদ্রে ভ্রমণের ফলশ্রুতিতে সে বিভিন্ন প্রজাতির শার্ক দেখেছে ইন্ডিয়ান। সাগরে : ব্ল্যাক টিপ শার্ক, হ্যাঁমারহেড শার্ক, দ্য গ্রেট হোয়াইট শার্ক। এর মধ্যে গ্রেট হোয়াইট শার্ক আস্ত মানুষ খেয়ে ফেলতে পারে। তবে নাবিকদের কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে এই নাক বোচা টাইগার শার্ক। কারণ এরা হচ্ছে সবচেয়ে অতৃপ্ত এবং অসন্তুষ্ট। হাল পঁচিশ ফিট লম্বা টাইগার শার্কও দেখেছে। সে এই টাইগার শার্কদের পুরো লংবোট তছনছ করে সবাইকে খেয়ে ফেলতেও দেখেছে।
আফ্রিকান লোকটি ভয়ে চিৎকার করছে। কিন্তু তাকে দেয়ার মতো কোনো উপদেশ হাল-এর কাছে নেই। এখন আর করার মতো কিছুই নেই শুধু আশাকে জিইয়ে রাখা ছাড়া। যদি ওটা এগিয়ে আসে, তবে সামথ্যের শেষটা দিয়ে লড়াই করব। হাল ভাবল।
মাদ্রি দি ডিয়াস-এর গতি অন্তত চার নট-এর মতো কমেছে, যার ফলে হাল-এর মনে হলো, বারোস হয়ত ফোরমাস্ট থেকে কিছুটা ক্যানভাস নামানোর আদেশ দিয়েছে। তবে যাই ঘটুক না কেন, এতে করে হাল-এর রক্ত সাগরের পানির চাইতে আরও অনেক ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে আশা করতে থাকে যে পর্তুগীজরা হয়ত তার সাথে মজা করছে। হাঙর আক্রমণ করার পূর্বেই তাদেরকে হয়তো উপরে উঠিয়ে নিবে ওরা।
কিন্তু বণিক নাবিকেরা এখনো তাদেরকে নিয়ে বাণিজ্য করা বন্ধ করেনি। তাদেরকে বাজির পণ বানিয়ে জুয়া খেলছে ওরা।
হাল টেরও পেল না যে কখন একটা হাঙর তাকে আক্রমণ করে বসেছে। একটা বড় পাখার মতো মাথা হঠাৎ করেই তার ডান উরুতে আঘাত করল। এরফলে হাল-এর শরীর ডানদিকে পুরোটা ঘুরে গেল। তার হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে এখন। হাল আবার ভেসে উঠে ফুসফুসটা বাতাসে পূর্ণ করে নিল। হাঙরটা তাকে আরো একবার ধাক্কা দিল। হাল পানির নিচে ডুবে গিয়ে হাঙরটাকে খুঁজতে থাকে।
পানির নিচে ওটাকে দেখতে পেল সে। প্রায় ত্রিশ গজ পেছনে মাথা নাড়িয়ে সাঁতার কাটছে ওটা।
এখন নিশ্চয়ই লোকগুলো তাকে জাহাজের ওপর উঠিয়ে নেবে? তারা নিশ্চয়ই হাঙর-এর আক্রমণ দেখতে চেয়েছে। এবার যারা বাজিতে জিতে গিয়েছে তারা নিশ্চয়ই তাকে উঠিয়ে নিতে বাধ্য করবে।
কিন্তু তারা এখনো তা করছে না। আর তখনই হাল-এর ভয় চরমে পৌঁছে। গেল। কারণ আরও একটি হাঙর এগিয়ে আসছে আক্রমণ করার জন্য। এটার লেজ হালকে এমনভাবে চাপা দিতে থাকে যেন হালকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। পানির নিচেই চিৎকার করে উঠল হাল, এরপর পুরো শরীরটাকে বাকিয়ে দানবটার কাছ থেকে সরে আসলো। সে তার বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে হাঙরটার লম্বা নাকে আঘাত করে বসলো। ফলে হাঙরটা সরে গিয়ে জাহাজের কাত হওয়া অংশের নিচে তলিয়ে গেল।
