তবে এটা খুবই অবাক করার বিষয় যে ফার্নান্দেজ এখনো সমান তালে বাজিয়ে যাচ্ছে। তাকে দেখে মোটেও ক্লান্ত মনে হচ্ছে না। তবে সেটা হাল-এর চিন্তার বিষয় না। হাল-এর হাত দুটো যেন অকেজোভাবে শরীরের পাশে লেগে আছে এবং থুতনিটা সে কিছুতেই বুকের কাছ থেকে উঠাতে পারছে না।
“চালিয়ে যা কুত্তা!” কেউ একজন গর্জে উঠল। সাথে-সাথে একটা চাবুক আফ্রিকান লোকটার পেছনে এবং কাঁধে এসে আঘাত করল। লোকটার রক্তের ছিটেফোঁটা হাল-এর ঠোঁটে এসে লেগেছে।
“মনে হচ্ছে আজকে রাতের ডিনারের জন্য হাঙরগুলো কিছু কালো মাংস পেতে যাচ্ছে। একজন অফিসার বলে উঠে।
“এখনো খেলা শেষ হয়নি,” আগেরজনকে থামিয়ে দিয়ে আরেক অফিসার বলল, “তোমার ইংরেজকেও খুব একটা তরতাজা মনে হচ্ছেনা।”
দর্শকরা সবাই কথা বলছিল, সেই সাথে চিৎকার দিয়ে উঠছিল। কিন্তু সেসব শোনার মতো শক্তি হাল-এর ছিল না। তার লম্বাচুলগুলো পেছনে থেকে সরে এসে তার মুখের ওপর পড়ছিল। তার পাদুটো কী নড়ছিল নাকি দাঁড়িয়েছিল সেটা অনুভব করার সামর্থ্য যেন তার ছিল না। সে আবারো বাতাসে চাবুক দিয়ে আঘাত করার শব্দ শুনতে পায়। এবার হয়ত চাবুক তার দিকেই এগিয়ে আসছে। তারপরই সে হোঁচট খায় এবং এক হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে পতন ঠেকিয়ে দেয়। তার মন চিৎকার করে উঠে : যে করেই হোক দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে তাই করে। কিন্তু যখন সে উঠে দাঁড়িয়ে তার বাঁ দিকে তাকায়, তখন সে দেখতে পায় আফ্রিকান লোকটি নিচে পড়ে যাচ্ছে। তার মাথা ঝুলে পড়েছে এবং সে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য হাহাকার করছে।
হাল চারদিক থেকে আনন্দধ্বনি শুনতে পায় এবং বুঝতে পারে এই চিৎকার তার জন্য। কিন্তু তারপরও সে নাচতে থাকে।
প্রথমে পায়ের গোড়ালি, এরপর পায়ের বুড়ো আঙুল। বাম পা সামনে, ডান পা সামনে, বাম পা পেছনে, ডান পা পেছনে। এভাবে সে তালে তাল মিলিয়ে এখনো নেচে যাচ্ছে।
“যথেষ্ট হয়েছে, কোয়ার্টারমাস্টার চিৎকার দিয়ে উঠে।
“আচ্ছা, এবার থাম, ইংলিশম্যান, তুমি জিতে গেছ”, ক্যাপ্টেন বারোস তার হ্যাটটা খুলে উপরের দিকে ধরল-খেলা শেষ হওয়ার ইংগিত। “তোমার দেশীয় লোকজন নিশ্চয়ই তোমাকে নিয়ে গর্বিত হবে।”
“পায়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াও। তোমাকে হাঙরের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হবে আজ।” চাবুক হাতে থাকা লোকটি আফ্রিকান-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে। “আমি বলছি”, উঠে দাঁড়াও। চাবুক-এর আঘাত পুনরায় আফ্রিকান লোকটির ওপর পড়ল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল হাল, এরপর চাবুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রবল আক্রোশে। তারা দুজনেই নিচে পড়ে গেল। লোকটির গলা প্যাচিয়ে ধরল হাল।
“কাপুরুষ”, হাল চিৎকার দিয়ে উঠে। রাগে এবং ক্ষুধায় তার মনে হচ্ছিল সে এই ঘৃণ্য শয়তানটাকে খুন করে ফেলবে। আফ্রিকান লোকটির প্রতি তার প্রতিযোগিতার চেয়ে বরং সহমর্মিতা বেশি প্রখর হয়ে উঠেছে। সে মাথা নিচু করে চাবুক হাতে ধরে রাখা লোকটির নাকে জোরে আঘাত করল।
“আমাকে ছেড়ে দাও,” লোকটি চিৎকার করে উঠে। তবুও হাল তাকে ছাড়ল না। লোকটিকে শূন্যের ওপর তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। এরপর আবার তার ওপর গিয়ে পড়ল হাল।
“তাকে এভাবে ধরে রাখ”, বারোস চিৎকার করে উঠল। ইতোমধ্যেই কয়েকজন অফিসার এসে হালকে টেনে চাবুকওয়ালার কাছ থেকে সরিয়ে এনেছে। তাদের মাঝে একজন লোক হাল-এর চুলগুলো নিজের হাতে প্যাচিয়ে পেছন দিকে টেনে ধরল।
“বদমাশ ইংরেজ”, বাতোস আবারো চিৎকার দিয়ে উঠে। “তুমি কী চাও এই নিগ্রোটার সাথে তোমাকেও খুন করা হোক?” এরপর সে হালকে আঘাত করে বসলো। হাল-এর ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়তে থাকে দরদর করে।
“আমি তোমাকে খুন করে ফেলব,” হাল গর্জে উঠল। তার মাথা থেকে জুডিথ এবং তার সন্তানের চিন্তা কিছু সময়ের জন্য দূর হয়ে যায়। সে কেবল আফ্রিকান লোকটির কথাই ভাবতে থাকে।
সে জানে এরপর তার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে। সে তার পেটের পেশি শক্ত করে ফেলে যখন দেখে বারোস-এর মুষ্টি তার দিকে এগিয়ে আসছে। বাতাস ভেদ করে বারোস-এর মুষ্টি হালকে আঘাত করে। কিন্তু তারপরও হাল বারোসকে স্প্যানিশ বেশ্যার দুগ্ধজাত সন্তান বলে গালি দিতে থাকে।
বারোস কোনো জবাব না দিয়ে রেলিং-এর দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে মোটা কাঠের টুকরো তুলে এনে হাল-এর কানের উপরে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করল সে।
হাল-এর দৃষ্টিসীমার মধ্য থেকে সাদা আলো সরে গিয়ে সবকিছু অন্ধকার হতে শুরু করল। “ইংলিশম্যান, তোমার মধ্যে একজনকে পেলে সামুদ্রিক প্রাণীরা বড় খুশি হবে,” এরপর সে তার লোকদের দিকে ফিরে বলল, “আরেকটা রশির ব্যবস্থা কর।”
তারা হাল এবং আফ্রিকান লোকটার বুকের ওপর খুব শক্ত করে রশি বেঁধে ফেলল। হাল এরপর আর কোনোরকম প্রতিরোধ গড়ে না তুলে আত্মসমর্পণ করাটাই উত্তম বলে ভাবল। কিন্তু আফ্রিকান লোকটা এরপরও বাধা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এরপর হাল এবং আফ্রিকান লোকটাকে নিচে নামাতে লাগল ওরা। রশির একপাশ জাহাজের নাবিকেরা ধরে আছে এবং অন্যপাশে হাল আর আফ্রিকান লোকটা ঝুলে আছে। হাল তার হাতের এবং পায়ের পেশি ব্যবহার করে রশি ধরে জাহাজে আটকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু রশি নামাতে নামাতে যখন তাকে সাগরের পানিতে পৌঁছে দেয়া হলো, তখন সে তীব্র চিৎকার করে উঠল।
