“আমার মনে হয় না আফ্রিকার আবহাওয়ায় এই ভ্রমণে জুডিথ নাজেত এর সৌন্দর্যের কোনো উন্নতি হবে। বরং অবনতি হবে।” বুজার্ড অজুহাত দেখাল।
“ওহ, সেটা নিয়ে চিন্তা করো না। সে সাদা চামড়ার কোনো মানুষ নয়। অন্যান্যের মতো সেও কালো চামড়ার অধিকারী। সে ওখানে ভালই থাকবে।”
*
হাল ফার্নান্দেজ-এর সুরের তালে তালে নাচতে আরম্ভ করে। যদিও ক্যাপ্টেন সুরটাকে আরও মেলোডিয়াস করতে বলছিল। ধূসর দাড়িযুক্ত বৃদ্ধ লোকটি তার চিকন নড়বড়ে হাতের আঙুলগুলো বাদ্যযন্ত্রের তারের ওপর দিয়ে ছন্দের তালে-তালে নাড়িয়ে যাচ্ছে। সে এতটাই সহজে সুর উঠাচ্ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো রমণী বাথটাবের গরম পানিতে গোসল করতে করতে বাদ্যযন্ত্রের তারগুলোকে স্রেফ নাড়িয়ে যাচ্ছে, আর ওগুলো নিজে থেকেই মেলোডি সৃষ্টি করে ফেলছে।
হাল নিজেও এই সুরের তালে তালে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অপমান ভুলে পেশিতে শক্তি আনার চেষ্টা করছে। হাল বাধ্য হয়ে এসব কিছু করছে শুধু একটা কারণেই। সেটা হচ্ছে জুডিথ। ওর জন্য তাকে বেঁচে থাকতেই হবে।
হাতদুটো পেছনে নিয়ে ক্রমানুসারে পায়ের গোড়ালি এবং আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নাচার চেষ্টা করছে সে। এভাবে তালে তালে পায়ের পাতা উঠা-নামা করাতে জাহাজের ডেক-এর ওপর এক ধরনের মৃদু ছন্দ তৈরি হয়েছে।
তবে ফার্নান্দেজ-এর বাজানো সুরটা হাল-এর পরিচিত হওয়াতে তার জন্য একটু সুবিধাই হয়েছে। কিন্তু আফ্রিকান দাসটাকে দেখে মনে হচ্ছে ভায়োল ডি ম্যানো নামক বাদ্যন্ত্রটি সে ইতপূর্বে কখনো দেখেনি।
বাদ্যযন্ত্রটিতে নতুন এক ধরনের সুর তোলা হয় যেটা হাল চিনতে পারছে না। কিন্তু এরপরেও সে সহজতালে এলোমেলোভাবে নৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে। নাবিকেরা সারাদিন পরিশ্রমের পর যেভাবে ঘুমে ঢুলতে থাকে, এই নাচ অনেকটা সেরকম। সে তার শরীরটাকে শক্তভাবে ধরে রেখে সুদক্ষ কৌশলে হাতদুটো উঠা-নামা করানোর চেষ্টা করছে। সে তার পাদুটোকে এক-দুই-তিন তালে উঠিয়ে-নামিয়ে এমনভাবে নাচার চেষ্টা করছে যেন দর্শকরা দেখে মুগ্ধ হয়। এরপর সে যখন আফ্রিকান লোকটির দিকে তাকাল, তখন দেখতে পেল যে সে পাখি যেভাবে ডানা ঝাঁপটায় অনেকটা সেরকম ভঙ্গিতে নেচে যাচ্ছে। এমনকি আফ্রিকান লোকটিকে দেখে খুব একটা ঘর্মাক্তও মনে হচ্ছে না। অথচ হাল-এর শরীর থেকে ঘাম-এর ফোঁটা ডেক-এর ওপর এসে পড়ছে।
পর্তুগীজ অফিসাররা এসব দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল। তাদের কেউ কেউ হাসছিল এবং হাততালি দিচ্ছিল সুরের তালে তালে। তাদের মাঝে কেউ হাল এর দিকে তাকাচ্ছে আবার কেউ আফ্রিকান লোকটির দিকে তাকাচ্ছে, সেই সাথে নিজেদের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে কেন তার বাজিতে জেতা উচিত। ক্যাপ্টেন বারোস-এর মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। বাকি নাবিকেরা রেলিং-এর পাশে জড়ো হয়ে নাচ দেখছে।
হাল যেন গানের তালে হারিয়ে যাচ্ছে। তার পায়ের তাল দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে ডেক-এর ওপর আছড়ে পড়ছে। ঠিক যেমনটা ফার্নান্দেজ-এর আঙুলগুলো বাদ্যযন্ত্রের তারের ওপর দ্রুত থেকে দ্রুততরভাবে নেচে বেড়াচ্ছে।
“নিগ্রো লোকটা যেন কোবরার মতো নেচে যাচ্ছে, পর্তুগীজ একজন অফিসার বলে উঠে।
“দেখে মনে হচ্ছে সে তার ঈশ্বরের জন্য ধ্যান করতে করতে নাচছে।” আরেকজন অফিসার বলে উঠে। সূর্য এখন মধ্য আকাশ থেকে কিরণ দিচ্ছে। সাগরের ওপর দিয়ে ভেসে আসা উত্তাপ মাদ্রি দি ডিয়াস-এর স্টারবোর্ড-এর ওপর পড়ছে। এতটাই তাপ অনুভূত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছে, স্টারবোর্ড-এর ওপর জলন্ত অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। হাল-এর নিঃশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। তার পাদুটি আস্তে আস্তে ভারী হয়ে আসছে। পানির জন্য তার ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে। তার ঘর্মাক্ত শরীর থেকে পানি পড়ে পায়ের কাছে ডেকের অংশটা ভিজে যাচ্ছে। সে ভয়ে আফ্রিকান লোকটার দিকে তাকাচ্ছে না। যদি সে দেখতে পায় যে লোকটা এখনো তার চেয়ে শক্তিশালী এবং দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে তাহলে হয়ত তার আত্মবিশ্বাসটুকু আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে। সে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। যদিও এখনো সে আফ্রিকান লোকটার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
এরপর সে আবারো মনোযোগ দিয়ে নাচতে লাগল।
ব্যথা তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। পায়ের ছোট ছোট হাড় থেকে শুরু করে উরুর শক্তিশালী পেশিতে, এমনকি গলা পর্যন্ত। মাথাটা তার কাছে বিশাল ভারী কোনো বস্তু মনে হচ্ছে। তারপরও আফ্রিকান লোকটার জন্য তার মায়া হচ্ছে। কারণ হাল নাচছে তার স্ত্রী এবং আগত সন্তানের জন্য। এছাড়া সাগরের বুকে থাকতে থাকতে তার শরীর শক্তিশালী এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তার পেশি এবং টেনডন যে কোনোরকম শারীরিক পরিশ্রম মেনে নিতে পারে।
কিন্তু তবুও সেই যন্ত্র এখন আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসছে। কিছুতেই নাচের গতি এবং তাল ধরে রাখতে পারছে না। ভায়োলা ডা মানো থেকে যে সুর বের হচ্ছে সেটার সাথে কিছুতেই ছন্দ মিলছে না। সে শুনতে পাচ্ছে তার দিকে তাকিয়ে সবাই হাসছে। সে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে। তাকে কেমন দেখাচ্ছে আসলে? মনে-মনে ভাবল হাল। ব্যথায় এবং তৃষ্ণায় তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে ভাবতে লাগল যে তাকে হয়ত সাহারা মরুভূমি দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো নেতিয়ে পড়া বুড়োর মতো লাগছে। যদিও তার শরীর তাকে থামিয়ে দিতে চাচ্ছে কিন্তু তার হাঁটু থামছে না। তার নড়াচড়া যদিও কোনো প্যারোডি নাচের মতো হচ্ছে তবুও কেবল মৃত্যুই এটাকে একেবারে থামিয়ে দিতে পারে।
