হাল তার অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে দাসরা সবসময় একধরনের নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করে যেন কোনোভাবেই তাদের জীবন বিপন্ন না হয়। সবসময় মাথা নিচু করে চলার চেষ্টা করে, চোখদুটোকে অবনত করে রাখে। কিন্তু এই লোকটি সরাসরি ক্যাপ্টেন-এর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পেশিবহুল পুরো শরীরই প্রায় নগ্ন। শুধু কোমড়ের নিচের অংশে এক টুকরো কাপড় প্যাচানো আছে। হাল মনে মনে ভাবতে লাগল এর বিপরীতে সে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।
কিন্তু ক্যাপ্টেন বারোস-এর মনে যে প্রতিযোগিতার কথা খেলা করছে সেটা কোনো শারীরিক যুদ্ধ ছিল না।
হাল এবং পেশিবহুল দাসটার চারপাশ থেকে লোকজন দূরে সরে যেতে থাকে। ওদের দুজনের জন্য ডেকের ওপর বেশ খানিকটা জায়গা ছেড়ে দেয়া হয়। ওরা দুজনেই বেশ গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। এই নিঃশ্বাস ভয় কিংবা পরিশ্রমের জন্য নয়। এতদিন বন্দী থাকার পর মুক্ত বাতাস পেয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে দুজনেই।
“তোমরা আমাদের জন্য নাচবে,” বারোস বলতে শুরু করল। “তোমরা ফার্নান্দেজ-এর সুরের তালে তালে নাচবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সুর বাজানো বন্ধ করবে ততক্ষণ তোমরা নাচতেই থাকবে।”
“তবে কেউ ক্লান্ত হয়ে গেলে নাচ থামিয়ে দিতে পার। তবে মনে রেখ যে আগে নাচ থামাবে সে তার ফল পাবে।”
হাল-এর পেছনে দাঁড়ানো দাসটি ক্যাপ্টেন বাতোস-এর একটি কথাও বুঝতে পারে নি। জাহাজের একজন আফ্রিকান নাবিককে ডেকে এনে বারোস এর কথাগুলো তার ভাষায় বুঝিয়ে দেয়া হলে দাসটি সবকিছু বুঝতে পারে।
“কী ফল পাবে?” হাল জিজ্ঞেস করে।
বারোস একজন অফিসার-এর দিকে তাকাল যে তার একটা পা রেলিং এর পাশে রাখা একটা রশির কুণ্ডলীর ওপর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। যে প্রথম নাচ থামাবে তাকে রশির এক প্রান্তে বেঁধে জাহাজ থেকে পানিতে ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর বারোস তার লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা যারা এই নাচের ফলাফলের বাজিতে হেরে যাবে তারা মাছ ধরে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেবে।” এরপর সে হাল-এর দিকে তাকিয়ে দুই বাহু প্রসারিত করে বলল, “আমি ওদের বিনোদনের দিকটা সবসময় খেয়াল রাখি, দেখেছ? একারণেই আমার নাবিকেরা আমাকে এত ভালবাসে।”
তার পেছনে এরই মধ্যে বাজির পণ নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়ে গিয়েছে।
হাল মাদ্রি দি ডিয়াস-এর প্রধান মাস্তুল-এর দিকে তাকায়। একই সাথে বারোসও সেদিকে তাকায়।
“আহ!” বারোস আক্ষেপ করে বলে উঠে।” “আপনি মনে করছেন আট নটের এই স্পিড আমরা ধরে রাখতে পারব না, তাই না?”
হাল মনে মনে এই জাহাজের পেছনে আসা হাঙরগুলোর কথা চিন্তা করতে লাগল।
“আমরা হিসাব করে দেখেছি যে সাধারণত হাঙরদের গতি হচ্ছে দুই নট। ক্যাপ্টেন বারোস বলতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে সে তার গতি অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এরপর সে তার অফিসারদের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমরা কী মনে কর?”
“আমরা হাঙরের গতি আট নটের উপরে পর্যন্ত রেকর্ড করেছি, ক্যাপ্টেন। কিন্তু এই গতি হাঙর বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না,” কোয়ার্টারমাস্টার বলে উঠে।
বারোস মাথা নাড়ায়, এরপর হাল-এর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। “অবশ্য এসব আপনাদের চিন্তার বিষয় নয়। আপনারা যতদূর সম্ভব নেচে যাবেন। এরপর বারোস পায়ের গোড়ালি বাঁকিয়ে ফার্নান্দেজ-এর দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং হাত ছড়িয়ে ইশারা করে। ফার্নান্দজ আপনি শুরু করুন। তবে এমন সুর বাজাবেন যেন ইংলিশম্যান-এর পছন্দ হয়।”
ফার্নান্দেজ তার বাদ্যযন্ত্রের তারে আঙুল চালানো শুরু করে।
আফ্রিকান লোকটি আর হাল উভয়েই পরস্পরের দিকে তাকাল।
“শুরু করুন”, ক্যাপ্টেন বায়োস বলে উঠে।
চাবুক হাতে ধরা লোকটি হাল এবং আফ্রিকান লোকটাকে আঘাত করতে উদ্যত হলো। কোনো উপায় না দেখে নাচতে শুরু করে দিল হাল।
.
“আমার তো মনে হচ্ছে কোয়েলিম্যান অথবা উপকূলের কাছাকাছি কোনো বন্দরেই আমরা নোঙর ফেলতে পারব না। বেনবুরি বুজার্ড-এর দিকে তাকায়। তারা দুজনেই পেলিকান-এর কোয়ার্টার পেক-এর রেলিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে তাকিয়ে বুজার্ডের মাথা নাড়ানো এবং বোট উঠানামা দেখছে, “প্রায় সব বন্দরই পর্তুগীজদের নিয়ন্ত্রণে। তারা নিজেরা এবং আরবদের ছাড়া অন্য কাউকে সেখানে বাণিজ্য করতে দিবে না। উপকূলে একটা দাস নিয়ে যাওয়াও তাদের কাছে ব্যবসা।”
“চুরি করে কোনো দাসকে উপকূলে নিয়ে যাওয়াটা এখানকার আইন অনুযায়ী মারাত্মক ধরনের অপরাধ,” বুজার্ড তার ফেসফেসে কণ্ঠে বলে উঠে। “তুমি কী চিন্তা করেছো তাহলে?”
“পেরেরিয়া নামে আমার আরেকজন সঙ্গী আছে। সে জানে খনিগুলো কোথায় অবস্থিত। যদি তার কাছে একটা সেক্সট্যান্ট যন্ত্র থাকত তবে সে বলে দিতে পারত যে খনিগুলো কোথায় অবস্থিত। একবার যদি তুমি সেখানে যাও তবে সে তোমাকে ভাষাও বুঝিয়ে দেবে। আমি জানতে পেরেছি যে এই লোবা লোকটার পর্তুগীজ এবং স্থানীয় কিছু ভাষা ছাড়া অন্য কোনো মাতৃভাষা নেই। ডেল্টা নদী হয়ে আমি তোমাকে উপকূলে রেখে আসব। সেখানে সাদা চামড়ার কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না। আমি তোমাকে কোয়েলিম্যান এ নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বরং এদিক দিয়ে গেলে তুমি খনির অনেক কাছাকাছি চলে যেতে পারবে।”
“আমাদের কাউকে না কাউকে যেতেই হবে”, বেনবুরি যুক্তি দেখাল। ‘‘আমি এই জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যাব।”
