হাল ভেবে দেখল ছয়দিন যাবত তারা জাঞ্জিবার থেকে বাইরে আছে।
“এই বদমাশটা এখন আবার কী খুঁজে বেড়াচ্ছে?” হাল আড়চোখে জাহাজের লণ্ঠন বাতিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে জিজ্ঞেস করল।
পর্তুগীজ নাবিকেরা তাদের কনুই-এর বাকে নাক টেকে সামনে এগুতে থাকে। শুকিয়ে প্রায় কাঠ হয়ে যাওয়া একজন আফ্রিকান লোক মাথা নিচু করে বসেছিল। পর্তুগীজ নাবিকেরা তার কাছাকাছি চলে আসলেও যখন দেখতে পায় লোকটি নড়ছে তখন নিচু হয়ে লোকটিকে পরীক্ষা করে দেখতে থাকে। এরপর মাথায় ধাক্কা দিলে লোকটি চোখ বড় বড় করে নড়েচড়ে উঠে। এরপর তাকে ছেড়ে দিয়ে ওরা অন্য একটা আফ্রিকান-এর দিকে এগুতে থাকে।
“একে দেখতে বেশ ঋষ্টপুষ্ট মনে হচ্ছে,” চাবুক হাতে নেয়া একজন পর্তুগীজ অন্য একজনকে উদ্দেশ্য করে বলে।”
“দেখ, আমি এইখানে আরেকটা পেয়েছি”, অন্য নাবিকটি বলে উঠে। একে দেখতে বেশ শক্ত সামর্থ্য মনে হচ্ছে। হাল পর্তুগীজদেরকে খুব ভালভাবে জানত। তাই সে কোনোরকম নড়াচড়া করল না বা খুব একটা অগ্রাহ্য ভাব নিয়ে তাকাল না। নাবিকটি তার আরও কাছে এসে বলল, “আরে, এ তো দেখি সাদা চামড়ার লোক।”
“এদেরকে নিয়ে এস,” চাবুক হাতে লোকটি বলল।
হাল এবং আফ্রিকান লোকটি পর্তুগীজ নাবিকদের পিছু পিছু যেতে থাকে। পায়ের শেকল না খুলেই মই দিয়ে ওদের দুজনকে উপরে উঠতে বলা হয়।
“আহ, এ যে দেখছি সেই ইংরেজটা,” ক্যাপ্টেন বারোস বলে উঠে।। এরপর সে পেশিবহুল অন্য দুজন দাস-এর দিকে ফিরে বলল, “বাহ এদেরকে দেখতে বেশ শক্তিশালী ও ঋষ্টপুষ্ট মনে হচ্ছে। খুব ভাল, অসাধারণ পছন্দ। সাদার বিপরীতে কাল…”
ক্যাপ্টেন বায়োস তার অফিসার এবং তার কেবিন বয়-এর সাথে প্রধান মাস্তুলের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের প্রত্যেকের মাথায় সূর্য থেকে বাঁচার জন্য বড় হ্যাট পরা রয়েছে। বালকটি দেখতে অনেকটা বাতোস-এর মতই দেখতে এবং বারোস-এর মতই মাথা টান টান করে ঔদ্ধত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। হাল প্রায় নিশ্চিত যে এটা বারোস-এর ছেলে।
“তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে চল, ফার্নান্দেজ, বায়োস একটা ধূসর চুলের খোঁড়া লোককে ইঙ্গিত করে বলল, যার একটা পা কৃত্রিমভাবে লাগানো। আমি প্রতিজ্ঞা করছি তুমি যদি এর চাইতে আস্তে চল তবে তোমার আরেকটা পা কেটে ফেলা হবে।”
“আমি কী সার্জনকে বলব তার কাটার যন্ত্র নিয়ে আসতে?” একজন লম্বা চেহারার অফিসার বলতে থাকে। এরপর আমরা সেটাকে বাজি হিসেবে ব্যবহার করব।” অন্যান্যের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায় এমনকি সেই বালকটাও হাসতে থাকে।
খোঁড়া লোকটি ছয় তারযুক্ত একটা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে যাচ্ছে। পর্তুগীজ-এর স্পানিশ ভাষায় যেটাকে ‘ভায়োলা ডা ম্যানো বলা হয়। যার অর্থ হচ্ছে হাতের বেহালা। এরূপ নামকরণের পেছনে কারণ হচ্ছে এটা কাঠির বদলে আঙুল দিয়ে বাজানো হয়। খোঁড়া লোকটি রাগে ফেটে পড়ে জবাব দেয়,” আমি যতটা দ্রুত সম্ভব তত দ্রুতই আসছি, বারোস।” সে রাগে গজ গজ করতে করতে প্রধান মাস্তুলের কাছে পৌঁছে যায়।
ক্যাপ্টেন বারোস ক্লান্ত দৃষ্টিতে হাল-এর দিকে তাকায়। নোংরা ভিখারীর মতো লোকটা কেন তার সাথে এভাবে কথা বলছিল সেটা হল বুঝে উঠতে পারে না। আমি তার এইভাবে কথা বলার দুঃসাহস মেনে নিয়েছি কারণ সে আমার বাবার বন্ধু ছিল এবং সে খুবই ভাল একজন মিউজিশিয়ান, “বারোস ঝুঁকে পড়ে বৃদ্ধ লোকটার হাতে ধরা বাদ্যযন্ত্রটা ভালভাবে তাকিয়ে দেখল। ওটার বাকানো পাশে ছয় জোড়া তার লাগানো আছে। “সে সম্ভবত এই ভায়োলা ডা ম্যারোস এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। আমি যতদূর জানি এটা তার দাদার ছিল।”
“গ্রেট গ্রান্ডফাদার। এমনকি উনার সময়ও এটা প্রায় পুরানোই ছিল।” ফার্নান্দেজ তাকে শুধরে দেয়।
ক্যাপ্টেন বারোস হাল-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মনে হয় না আমাদের যুবক ইংরেজটা কখনো এ ধরনের বাদ্যযন্ত্র দেখেছে, তাই নয় কী?”
“শুধু ছবিতে দেখেছি”, হাল জবাব দেয়। তাদের কথোপকথন দেখে মনে হচ্ছে দুজন ভদ্রলোক বড় কোনো বিশ্রামাগারে বসে কথা বলছে, একজন বন্দি এবং একজন ক্যাপ্টেন-এর মধ্যকার কথোপকথন বলে মনেই হচ্ছে না।
বারোস মাথা নাড়াল। “হ্যাঁ, এটা খুবই লজ্জার ব্যাপার যে ভায়োলা ডা ম্যানো অনেক দিন যাবতই ফ্যাশন জগতের বাইরে রয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো এটা ব্যবহার করি তাই না। ভদ্রমহোদয় গণ?” পাঁচজন অফিসার মাথা নাড়ায় এবং দাঁত বের করা হাসি দেয়। “তোমরা ইংরেজরা হচ্ছ সভ্য জাতি। যে কোনো সভ্যতার চিহ্ন হচ্ছে সংগীতের প্রতি তার ভালবাসা। তুমি কী তাই মনে কর না ইংলিশম্যান?”
এরপর বারোস ক্যাট ও টেইলার নামক চাবুকটি হাতে ধরা লোকটির দিকে তাকায়, এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে হাল-এর গোড়ালিতে লাগানো লোহার বেড়ির দিকে ইঙ্গিত দেয়। লোকটি তার কোমড় থেকে চাবি বের করে লোহার বেরি খুলে দিয়ে হালকে বন্ধনমুক্ত করে দিল
“তোমরা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ,” বারোস পেশিবহুল কালো চামড়ার দাসটাকে দেখিয়ে বলল। “সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমার শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেলবে।”
“এখন খুব সূক্ষ্ম একধরনের প্রতিযোগিতা হবে, তার সামনে দাঁড়ানো আরেকজন অফিসার ভ্রূ কুঁচকে বলে।
