“হাল কার্টনি তোমাকে খুন করে ফেলবে”, জুডিথ বলল। “সে তোমাকে খুঁজে বের করবে। এরপর তোমার অস্তিত্বকে বিলীন করে দেবে।”
এবার বুজার্ড সামনে এগিয়ে এলো-কিন্তু জুডিথ-এর দিকে নয়, অ্যান-এর দিকে। সে তার থাবা দিয়ে অ্যান-এর গলা প্যাচিয়ে ধরে তাকে কেবিনের দেয়ালের সাথে আটকে ফেলল। অ্যান চিৎকার করতে চাইছিল কিন্তু তার সে সামর্থ্য ছিল না। এরপর বুজার্ড তার সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত মুঠ করে অ্যান-এর পেট-এ আঘাত করে বসলো। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল অ্যান।
মুখোশ পরা দানবটা এবার জুডিথ-এর দিকে এগিয়ে এলো। জুডিথ তার পেট-এ হাত দিয়ে মুখটা উঁচু করে রেখেছে যেন সে তার পেট বাঁচিয়ে মুখে আঘাত করার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
“যতবার আপনি আমার কথার অবাধ্য হবেন, ততবার মেয়েটার এই অবস্থা হবে।” বুজার্ড-এর কথা তার মুখোশের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তার পেছনে অ্যান ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। নিঃশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল মেয়েটার।
“আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার বেশ বড়সড় কারণ আছে। কিন্তু…” বুজার্ড পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, “সে আমার কাছে কিছুই না। ওর কোনো মূল্যই নেই আমার কাছে। ওকে আমি যা খুশি করতে পারি।”
“তুমি একটা কাপুরুষ,” জুডিথ চিৎকার করে উঠল।
বুজার্ড ঘুরে আবারও মেয়েটির দিকে গেল। মেয়েটি উপুড় হয়ে এক হাত উঁচিয়ে নিজেকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে। বুজার্ড নিচু হয়ে বসে এবার মেয়েটির মুখে আঘাত করে বসলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আবারো জুডিথ-এর দিকে গেল দানবটা।
“আর কিছু বলবেন?”
জুডিথ দানবটার সাথে যুদ্ধ করার জন্য, ওকে শাস্তি দেয়ার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। কিন্তু খালি হাতে চোখের পানি ফেলা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই।
আর তাই, সে মাথা নাড়াল।
“গুড।” “যখন ঝড় আঘাত হানবে তখন আপনি নিরাপদে থাকার জন্য মেঝেতে বসে শক্তভাবে বিছানার খুঁটি ধরে রাখবেন। তাহলে কোনো ক্ষতি হবে না।” সে জুডিথ-এর বিছানার দিকে তাকিয়ে বলল। “অ্যান-এর কোনো বিছানা নেই। শুধু মেঝেতে একটা কম্বল পাতা আছে। অথবা আপনারা একজন আরেকজনকে ধরে রাখতে পারেন। এরপর সে দরজার দিকে পা বাড়াল। দরজায় পৌঁছে আবার একটু দাঁড়িয়ে জুডিথকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, “আপনি শুধু শুধু প্রার্থনা করে আপনার সময় অপচয় করবেন না। যদি মনে করেন আপনার নায়ক এসে আপনাকে উদ্ধার করবে, তো বলে রাখলাম, সে আশা কোনোদিনও পূরণ হবে না। সে বলতে থাকে, কারণ কার্টনি হয়ত এতক্ষণে মারা গিয়েছে। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তাকে অনেক আগেই ষাড়ের মতো বেঁধে কসাই খানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
আর এইটুকু বলেই সে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।
*
মাদ্রি দি ডিয়াস হচ্ছে তিন মাস্তুলযুক্ত পর্তুগীজ জাহাজ। সাগরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় এ জাহাজ। এই জাহাজের মাধ্যমে দাস থেকে শুরু করে হরেক রকম জিনিসপত্র ইস্ট ইন্ডিয়া, ওটোম্যান সাম্রাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। আর এত বড় ব্যবসার বাহক হওয়ার কারণে একে নিয়ে যেখানেই যাওয়া হোক না কেন এর মালিক ক্যাপ্টেন জা’আও বারোসকে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না।
মহারাজা সাদিক খান জাহান কার্টনি নামের এই ইংরেজটাকে কোয়েলিমান এ নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনোরকম সম্মানী দেন নি। তিনি শুধু একজন কর্মচারীকে এই লোকটার সাথে পাঠিয়েছেন। কর্মচারিটি ইংরেজটাকে জাহাজের ডেক-এর ওপর ছেড়ে দিয়ে বারোসকে আরবিতে বলেছে যে মহারাজা এই লোকগুলোকে আপনার জাহাজে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন।
“আচ্ছা, ঠিক আছে।” মুখের ওপর থাকা পুরনো দাগটার ওপর হাত বোলাতে বোলাতে জবাব দিল সে। এই পুরোনো অভ্যাসটা সে এখনো ছাড়তে পারেনি।
“সেনর লোবো খনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য ওদেরকে কিনে নিয়েছেন।”
“বুঝলাম।”
“খুব ভাল, আর…একেও ওদের সাথে যোগ কর। কর্মচারী লোকটি হালকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল। সে একজন ইংরেজ। মহারাজা একে সেনোর লোবোর জন্য বিশেষ পুরস্কার হিসেবে দিয়েছেন-যদি সে এই ভ্রমণে বেঁচে থাকে আরকি।”
“খুবই ভাল পুরস্কার।” বারোস বলতে শুরু করল। “সে একজন সাদা চামড়ার মানুষ বলে বলছি না, এই লোকটা দেখতেও খুবই শক্তিশালী আর স্বাস্থ্যবান। ভাল দাঁতও রয়েছে। আমি নিশ্চিত সেনোর লোবো এর কাছ থেকে ভাল ফলন ঘটাতে পারবে।”
“সেটার খুবই সম্ভাবনা আছে। কর্মচারীটি একমত হয় এবং আবার বলতে শুরু করে, “মহামান্য রাজা জানিয়েছেন যে সমুদ্র যাত্রায় যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এবং এই লোকের কোনো ক্ষতি হয় তবে এটার দায়ভার তোমাদেরকে নিতে হবে না।”
“তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন একে নিয়ে আমরা যা খুশি করতে পারি?”
“ঠিক তাই”। “মহামান্য রাজা এই লোকের ভাগ্য আল্লাহ তাআলার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী এবং অসীম দয়ালু।”
“বেশ মজার একটা বিধান জারি করেছেন উনি,” বারোস বলে উঠল। “আমি বিধানটা মনে রাখার চেষ্টা করব।”
এরপর হাল তার ছোট্ট জীবনে দ্বিতীয়বার-এর মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো। তাকে একটা অন্ধকার, উষ্ণ, মানুষের বিসর্জনকৃত তরল পদার্থের দুর্গন্ধময় স্থানে দাসদের থাকার জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা হলো।
