কিছু সময় পার হওয়ার পর মেয়েটি কথা বলতে শুরু করল। “ওরা বলেছে যে আপনার গর্ভে সন্তান আছে। বেশিদিন হয়নি যে আমার নিজেরও একটি সন্তান ছিল।” মেয়েটি কথা শেষ করার পূর্বেই তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
জুডিথ মেয়েটিকে ডেকে তার সাথে খেতে বলল। প্লেট-এর খাবার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়েটি থামল না। এটা দেখে জুডিথ তার নিজের অংশটুকুও সেই মেয়েটিকে খেতে দিল। তার নাম হচ্ছে অ্যান মিসেন। সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বণিক-এর জাহাজে ছিল। সেই জাহাজ বোম্বের (মুম্বাই) পথে যাত্রা করছিল। মাদাগাস্কার-এর দক্ষিণাংশে এসে তারা পেলিকান জাহাজের পাশ দিয়ে যেতে থাকে। তাদের জাহাজটি মনে করে পেলিকান জাহাজ হয়ত কোনো বিপদে আছে। তারা ক্যাপ্টেন বেনবুরিকে আশ্বস্ত করে যে তারা তাকে যে কোনো রকম সাহায্য করতে রাজি আছে। ইন্ডিয়াম্যানদের জাহাজটি যখন পেলিকান জাহাজের খুব কাছে চলে আসে তখন পেলিকান-এর নাবিকের ইন্ডিয়াম্যানদের জাহাজ আক্রমণ করে। ধনসম্পদ লুট করে তারা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। অ্যানের স্বামী-যে কিনা কোম্পানির একজন কেরানি ছিল আরও উচ্চপদে যোগদানের জন্য বোম্বে (মুম্বাই) যাচ্ছিল। সে তার স্ত্রীর সামনে খুন হয়ে যাওয়ার পূর্বে প্রচণ্ড বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল।
“আমি কখনো জানতামই না যে তার এত সাহস আছে,” অ্যান জুডিথকে বলতে থাকে। তার গল্প বলা দেখে জুডিথ বুঝতে পারে সেই ঘটনার কারণে অ্যান এখনো স্তব্ধ হয়ে আছে। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গিয়েছে। জুডিথ-এর আর সাহস হয়নি বাচ্চাটির কথা জিজ্ঞেস করার। তারা নতুন জীবন শুরু করার জন্য ইংল্যান্ড ছেড়ে আসার পূর্বেই হয়ত বাচ্চাটি মারা গিয়েছে।
তারা যখন খাবার শেষ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, তখন তাদের মনে হচ্ছিল যে তারা পাঁচ বারের খাবার একবারে খেয়ে ফেলেছে। এরপর অ্যান বলল, “এবার আমাকে আপনার জীবনের গল্প বলুন।”
এর আগে একবার বুজার্ড জুডিথকে দেখতে এসে তাকে জেনারেল নাজেত বলে সম্বোধন করেছিল। আর তখন থেকেই জুডিথের অতীত জীবনের গল্প শোনার ব্যাপারে অ্যান-এর আগ্রহ বেড়েই চলছে। ইথিওপিয়ায় বেড়ে উঠা তার শৈশব। তার ইউরোপ ভ্রমণ, এরপর তার সৈনিক জীবন সবকিছুর ব্যাপারেই অ্যান-এর আগ্রহ। “আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে আপনি কিভাবে জেনারেল হলেন। মানে পুরুষরা কীভাবে তাদের পরিচালনার ভার আপনার হাতে তুলে দিল।”
“কারণ সম্ভবত এটাই যে আমি শুধু একজন নারীর জীবন বেছে নেয়ার জন্য বড় হইনি।” জুডিথ বলতে থাকে। “আমি আমার বাবার একমাত্র সন্তান। তার কোনো ছেলে সন্তান ছিলনা। তাই তিনি একটা ছেলেকে যা কিছু শেখাতে পারতেন তার সব কিছুই আমাকে শিখিয়েছেন। আমি ঘোড়ায় চড়তে শিখেছি। তলোয়ার চালনা করতে শিখেছি, যুদ্ধ করতে শিখেছি। বন্দুক চালাতে শিখেছি। আমাকে যখন রাতের বেলা গল্প শোনানো হত সেগুলো কোনো রাজপুত্রের গল্প ছিল না। সেগুলো ছিল মহাবীরদের গল্প-আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার, হান্নিবল এবং আফ্রিকান বিখ্যাত জেনারেলদের গল্প।
“এবং আপনিও। অ্যান বলল। কারণ ইতোমধ্যেই জুডিথ তার হিরোইন” এ পরিণত হয়েছে।
জুডিথ হেসে বলল, “আমি হানিবল নই! কিন্তু আমি শিখেছি কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়। কীভাবে যুদ্ধে জয়লাভ করতে হয়। কারণ, আমার বাবা ছিলেন উপজাতীয়দের প্রধান। তারা আমাকে আমার পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তাই আমার পিতা অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে যদি কখনো রাজার পক্ষ থেকে আরব আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার জন্য সৈন্যদলে ডাক পড়ত তখন আমি তাদের পরিচালনা করে নিয়ে যেতাম। প্রধান সেনাদলের সাথে যোগ দেয়ার পূর্বেই আমরা এল গ্যাং-এর কিছু লোকদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের প্রতিহত করেছিলাম। এই বিজয়ের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমরা যখন প্রধান সৈন্যদল-এর কাছে পৌঁছে যাই তখন সবাই আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে উল্লাসধ্বনি করতে থাকে। প্রধান সৈন্যদল আমাকে গ্রহণ করে অত্যন্ত আনন্দের সাথে। আমি হয়ে যাই তাদের নেতা। তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক। একসময় আমি নিজেকে দেখতে পেলাম সমগ্র সৈন্যদলের প্রধানরূপে। দেখলাম যে তারা সবাই আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে অনুসরণ করতে চাইছে না।”
“আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি সেসময়ে যেসব বৃদ্ধ জেনারেল ছিল তারা সবাই আপনাকে হিংসে করতো”, অ্যান বলতে শুরু করল। কিন্তু জুডিথ উত্তর দেয়ার আগেই তালা খোলার শব্দ পেলো। কেবিন-এর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেছে বুজার্ড, সেই সাথে তার শরীর থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধও।
“ঝড় আসছে,” বুজার্ড বলল। তার পেছনে কেবিনের দরজাটা দুলতে শুরু করে দিল। সে টেবিলের ওপর রাখা খালি প্লেট-এর দিকে একনজর তাকিয়ে দেখল, এরপর জুডিথ-এর দিকে তাকাল। অ্যান তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবিনের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায় যেন সে আগুন থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বুজার্ড তার দিকে লক্ষ করছে না।
“তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?” প্রতিবারের মতো এবারও জুডিথ একই প্রশ্ন করল।
“যেখানেই যাই না কেন, আপনি সেটা উপভোগ করবেন না, এটা নিশ্চিত।” বুজার্ড উত্তর দেয়। সে জুডিথকে এমনভাবে দেখতে থাকে যেন কোনো ক্রেতা নিলামে উঠা কোনো দাসকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
