প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভিড়ের মধ্যে থাকা জনতা চিৎকার করে উঠল, নানারকম অঙ্গভঙ্গি করতে শুরু করল, সেই সাথে আধখাওয়া মাংসের টুকরা তারদিকে ছুঁড়ে দিতে লাগল প্রবল আক্রোশে।
ঠিক তখনই তীব্র এবং তীক্ষ্ণ এক চিৎকার শোনা গেল। জনতা এলোমেলো হয়ে এদিক সেদিক পালাতে শুরু করে দিল। এমনকি যে গার্ডরা হালকে নিয়ে যেতে এসেছিল, তারাও ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। তখনই সে বুঝতে পারে কেন সবাই এমন করছে। অন্তত ত্রিশ জনের মতো একটা সৈন্যবাহিনী মাঠে প্রবেশ করেছে। ভিড়ের মধ্যদিয়ে চাবুক চালিয়ে তারা তাদের জায়গা করে নিচ্ছে। হালকে ধরে রাখা গার্ডরাও এদিক সেদিক পালাতে শুরু করে দিয়েছে। হালও দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিল। কিন্তু তার পূর্বেই সৈন্য দল তাকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলল। কমান্ডর-এর পোশাক পরিহিত লোকটি সামনে এগিয়ে এসে মাথার হেলমেট খুলে বলল, “ক্যাপ্টেন কার্টনি। দয়াকরে আমাদের সঙ্গে চলুন। মাননীয় মহারাজা সাদিক খান জাহান আপনার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।”
*
প্রিন্স জাহান আসার পূর্বের কয়েক ঘণ্টা হালকে একটা সেল-এ বন্দি করে রাখা হলো। কঠিন এবং নিষ্ঠুর প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার জন্য হাল নিজেকে প্রস্তুত করছিল কিন্তু জাহানের প্রথম প্রশ্ন শুনে তাকে বেশ অবাক হতে হলো।
“তোমার স্বদেশী, প্রিন্স শুরু করল, “বুজার্ড নামে সেই লোকটার কথা বলছি। সে কি আগে থেকেই এরকম শুকরের মতো নৈতিকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে? এমনকি সে যখন মানুষ ছিল তখনও?”
হাল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। “সে জন্যই নিয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা এবং চৌর্যবৃত্তির প্রবণতা নিয়ে। এটা তার রক্তে মিশে আছে।”
“হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। সে জুডিথ নাজেতকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। এতে আমি খুবই রাগান্বিত হয়েছি কারণ সে আমার সম্পত্তি ছিল…”
“সে কারও সম্পত্তি ছিল না। সে একজন স্বাধীন মানুষ।”
“কিন্তু স্যার হেনরী, সে আর স্বাধীন নয়। জাহান বলতে থাকে, সে এখন বুজার্ডের জাহাজের একজন বন্দি, যে জাহাজ দক্ষিণ দিকে যাত্রা করেছে। এটা। আমার ভুল। আমার তাকে আরও ভালভাবে জানা উচিত ছিল, যে লোক এধরনের কাজ করতে পারে তার কোনো লজ্জা-শরম থাকে না। সে যদি একজন মুসলমান হত তাহলে তার এটা জানার কথা যে সে নবি ও পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার সাথে প্রতারণা করেছে। সে যদি হাজার বারও মৃত্যবরণ করত তবুও তার পাপের শাস্তির। সমান হত না। কিন্তু তুমি আলাদা। তুমি তোমার ঈশ্বরের জন্য যুদ্ধ করেছ।”
“আমার ঈশ্বরের জন্য, স্বাধীনতার জন্য এবং সেই রমণীর জন্য যাকে আমি ভালবাসি।”
জাহান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়াতে থাকে। “আহ, আমি সেজন্য তোমাকে দোষারোপ করছি না। রমণীদের মধ্যে সে হচ্ছে রাণী। সে যখন আমার হারেমে ছিল আমার সেরা উপপত্নীটাও তাকে হিংসা করত। তার সৌন্দর্যকে হিংসা করত। ভয় পেয়ো না, আমি তাকে কলুষিত করি নি। যদিও আমি অন্য যে কোনো জীবিত পুরুষের মতোই প্রলুব্ধ হয়েছিলাম।”
“তাহলে কেন করেন নি? আপনি চাইলেই তাকে কলুষিত করতে পারতেন। কী আপনাকে বাধা দিয়েছে?”
“এটা একটা ভাল প্রশ্ন করেছ,” জাহান বলল। “তুমি ঠিক বলেছ। এই দেয়ালের ভেতরে এমনকি বাইরে আমার যা ইচ্ছে আমি তাই করতে পারি। কিন্তু আমি ঠিক কি চিন্তা করছিলাম…?” প্রিন্স কয়েক মুহূর্তের জন্য থামল, এরপর আবার বলতে শুরু করল। আমি তার সাথে কথা বলেছি। আমি তাকে বলেছি যে তোমাকে ধরার পূর্ব পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করব। আমি বলেছি সে যদি বাধা দেয় তাহলে আমি জোর করবো। তখন তুমি এবং সে দুজনেই মারা যাবে। কিন্তু সে নিজের জন্য মোটেও চিন্তিত ছিল না।”
“অনেক পুরুষের চেয়েও সে বেশি সাহসী। কিন্তু সে চায় না যে তুমি তার জন্য কষ্টভোগ কর।”
ঘৃণায় হাল-এর কণ্ঠ ভারী হতে শুরু করে। আপনি কী নারীদের এভাবেই প্রলুদ্ধ করার চেষ্টা করেন? তারা যদি অস্বীকার করে তবে তাদেরকে এভাবেই হুমকি দেন?”
জাহানের অমায়িক প্রতিক্রিয়া বরফের মতো ঠাণ্ডা হতে শুরু করে। “তুমি হয়ত খুব সাহসী নয়ত খুব বোকা যে কারণে তুমি এ ধরনের কথা বলতে পারছ। তুমি জানো, এ কথার কারণে আমি তোমাকে হত্যা করতে পারি?”
“কোনো কারণ ছাড়াই আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেন এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনি কী এটাই চান?”
“হ্যাঁ,” প্রিন্স একমত হয়। “কিন্তু তুমি যাই চিন্তা কর না কেন আমি জীবন মৃত্যুর ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হতে চাই না। এমনকি আমি আমার ইচ্ছে পূরণের জন্য নারীদের বাধ্য করি না বা আঘাতও করি না। যেমন ধর, আমার হারেমের নারীরা আমার সম্পত্তি। আমার খুশির জন্য তাদেরকে রাখা হয়েছে। এটা তাদের দায়িত্ব এবং অবশ্যই তাদের এটা পালন করতে হবে। কিন্তু আমি তাদেরকে কখনও আঘাত করিনি বা হুমকি দেইনি। বরং আমি যখন একজনকে বেছে নেই, তখন অন্যরা হিংসাবোধ করে। তাই জুডিথ নাজেতকে বাধ্য করে আমি কোনো আনন্দ পেতাম না। যদিও আমার বাহিনীকে পরাজিত করায় তার প্রতি রুষ্ট ছিলাম আমি কিন্তু সে কারণে আমি তাকে ঘৃণা করি না। আমি তাকে সম্মান করি। একজন নারী হয়েও সে সত্যিকার যোদ্ধার মতো যুদ্ধ করেছে। আমি যদি তাকে হুমকি দিতাম কিংবা বাধ্য করতাম তবে আমি নিজের অবস্থানটা অনেক নিচুতে নামিয়ে ফেলতাম।”
