যেভাবেই হোক লোকটি এখনো হাল-এর গলায় শেকল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু শেকলের টান আস্তে আস্তে হালকা হয়ে আসছে। হাল-একটার পর একটা আঙুল শেকলের নিচ দিয়ে গলার চামড়ার ওপর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এটুকুই নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য যথেষ্ট। তার শরীরে নতুনভাবে রক্তচলাচল শুরু হয়েছে। ভাল হাত দিয়ে আবারো সে তলোয়ারটা উপরে উঠিয়ে আনে এবং লোহার হিল্ট দিয়ে লোকটির মাথায় দ্বিতীয়বার আঘাত করে। বাম হাতের পুরোটাই সে শেকলের নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সে এবার একটানে শেকলটা গলা থেকে উপরে ফেলে দিয়ে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াল। যদিও এখনো তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
হাল মাটিতে পড়া শেকলের লাইন অনুসরণ করতে থাকে। গ্যালারিতে সমবেত জনতার চিৎকার বাড়ছে। যতই সে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, ততই চিল্কারের তীক্ষ্ণতা বাড়ছে। আর তখনই, শেকলের ঝনঝন আওয়াজ পাওয়া গেল। হাল বুঝতে পারে লোকটি কোনোভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে। তাই সে তার তলোয়ারটা সামনের দিকে চালনা করল। প্রতিপক্ষের তলোয়ার-এ আঘাত করল ওটা। এরপর কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলতে থাকে। রক্তের ছিটেফোঁটা এসে ওর শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাল বুঝতে পারল যে তার প্রতিপক্ষের শক্তি শেষ হয়ে আসছে।
পরবর্তী আক্রমণটা প্রতিপক্ষের মাংস ভেদ করে হাড়-এ গিয়ে লাগল। হাল শক্তভাবে তলোয়ারটা পুনরায় পেছন দিকে টান দিয়ে সরিয়ে ফেলল। আশেপাশের চিৎকার আস্তে আস্তে কমতে থাকে। হাল বুঝতে পারে খেলা শেষ হয়েছে। জিতে গিয়েছে সে। তাই সে রক্তমাখা তলোয়ারটা বাম বাহুর নিচে রেখে ডানহাত দিয়ে চোখের বাঁধন মাথার ওপর উঠিয়ে ফেলল।
এরপর সে তলোয়ারটা ফেলে দিয়ে দুহাত দিয়ে মুখের গ্যাগ খামচে ধরে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। কারণ তার পেটের সবকিছু উল্টে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে।
গ্যাগ সরে যাওয়ার পর তার চোখের সামনে সে যা দেখল সেটার জন্য ও মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
তার সামনে পড়ে থাকা আহত ব্যক্তিটা হচ্ছে ক্যাপ্টেন ট্রোম্প।
ওলন্দাজ লোকটা হাঁটুগেড়ে বসে আছে। তার কপাল থেকে রক্ত ঝড়ছে। হাল তরবারির পমেল দিয়ে যে আঘাত করেছিল সেখানে থেকে রক্ত পড়ছে। তার কাঁধে আঘাত লেগেছে। নাকের হাড় ভেঙে এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে ক্ষতটা তার শরীরে হয়েছে সেটা তার বুকের ওপর। বুকের খাঁচার কয়েকটা হাড় বের হয়ে আছে।
হাল-এর মনে মিশ্র ধরনের অনুভূতি কাজ করতে থাকে। ভয় এবং অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করল। সে তার বন্ধুসম মানুষটাকে শেষ করে দিয়েছে। তার মধ্যে লজ্জাবোধও কাজ করছে এই কারণে যে এই লোকটাকে সে প্রতারক ভেবেছিল। অথচ ট্রোম্প তার বিশ্বস্ততার পুরস্কার এইভাবে পেল। হাল-এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে ট্রোম্প-এর সামনে বসে পড়ল। ট্রোম্প প্রাণপণে চেষ্টা করছে চোখের বাধন খুলে ফেলতে। হাতের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কারণেই হোক কিংবা কৌশল না জানার কারণেই হোক সে সেটা খুলতে পারছে না। হাল বুঝতে পারছে না তার কি করা উচিত। ট্রাম্পের চোখের বাঁধন খুলে দিতে যে খুব লজ্জা বোধ করছে সে। ট্রোম্প যদি এভাবে মৃত্যুবরণ করে তাহলে অন্তত সে কোনোদিন জানতে পারবে না কে আসলে তার হত্যাকারী।
“তাকে এভাবেই মরতে দাও,” হাল আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরবে চিৎকার করে উঠল। আকাশটাও মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।
সে যুদ্ধক্ষেত্রের চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকল যেন সে তার মনে জমা অজস্র প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে পারে আশেপাশে। কিন্তু অপরিচিত কতকগুলো শক্রর চেহারা ছাড়া সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অস্ত্রসস্ত্র সজ্জিত চারজন মানুষকে সে দেখতে পায় যারা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে এসেছে। এরপর হাল একটা শিশুর অপূর্ণ চোখ দেখতে পায়। চোখদুটি তার কাছে পরিচিত মনে হয়। কিন্তু এতক্ষণ ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণে তার মস্তিষ্ক কিছুতেই খুঁজে বের করতে পারছে না যে কোথায় দেখেছে সে শিশুটিকে। তার বদলে এখন তার কি করা উচিত সেই দিকে মনোনিবেশ করল সে। হাল কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রোম্প-এর কাছে পৌঁছায়, এরপর তার চোখের বাধন খুলে দেয়।
“আমি দুঃখিত,” হাল বিড়বিড় করে বলল। আমি খুবই দুঃখিত…ঈশ্বরের দোহাই আমাকে ক্ষমা কর…বন্ধু।
ট্রোম্প তীক্ষ্ণভাবে হাল-এর দিকে তাকানোর চেষ্টা করল কিন্তু তার চোখের পাতার শক্তি আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সে সামনের দিকে পড়ে যেতে শুরু করে, কিন্তু তার আগেই হাল তাকে ধরে ফেলল। হাল ট্রোম্প-এর মাথার পেছনের বাঁধন খুলে ওর মুখ থেকে গ্যাগটা সরিয়ে ফেলল। কোনো কথা না বলে ট্রোম্পকে সে মরতে দিতে চায় না। কিন্তু ট্রোম্প-এর মুখ থেকে কোনো কথাই বের হলো না।
হাল তার বন্ধুকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে যখন অশ্রুসিক্ত চোখে মাথা সোজা করল, তখন সে দেখতে পেল অস্ত্র হাতে চারজন লোক তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
“তাকে কেনেল-এর ভেতরে নিয়ে যাও। অনুষ্ঠানের প্রধান আহবায়ক ঘোষণা করল। দুজন লোক তাকে টানতে টানতে সোজা করে দাঁড় করাল। হাল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে তীব্র কণ্ঠে গর্জন করে বলে উঠল, “আমি এখনো বেঁচে আছি। তোমরা আর কী করতে চাও? ইউ বাস্টার্ডস?”
