এরপর অনুষ্ঠানের প্রধান আহ্বায়ক তাদের উদ্দেশ্যে বলল, “প্রস্তুত হও।”
হাল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। পা দুটোর মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে এক পা সামনে এগিয়ে নিল সে। এরপর হাঁটু দুটোকে সমকোণে বাঁকিয়ে দাঁড়াল যেন অভিকর্ষজ তুরণের কেন্দ্রবিন্দু পায়ের গোড়ালি বরাবর থাকে।
হাল চিৎকার সমবেত জনতার চিৎকার শুনতে পায়, “ফাইট,” “ফাইট”, “ফাইট।”
হাল জানে তার প্রতিপক্ষ এগিয়ে আসছে তার দিকে। তাই সে ডানদিকে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখটাকে আঘাতের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য তলোয়ারটাকে মুখ বরাবর তুলে ধরে। প্রতিপক্ষের তলোয়ারটা ঝনঝন শব্দে হাল-এর তলোয়ার এ আঘাত করল। এরপর লোকটি আবারও দূরে সরে যায় এবং হাল-এর শেকলে টান পড়ে।
হাল চারদিকে এত আওয়াজ-এর মাঝেও কান পেতে রাখে যদি এমন কিছু শুনতে পারে যেটা তাকে সাহায্য করবে। প্রতিপক্ষের পদধ্বনি এবং নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছু শুনতে পায় না সে। তবে এ থেকেই সে প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে কিছু ধারণা পায়। সে সামনের দিকে এগোতে থাকে যেন তার শেকলটা কিছুটা শিথিল হয়। এরপর কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সে পিছিয়ে পড়ে এবং শরীরটাকে বাঁকাতে থাকে। এতে করে শেকলে পুনরায় টান পড়ে; প্রতিপক্ষের শরীর এটাকে বাধা দিচ্ছে। এরপর সে তার তলোয়ারটাকে বাতাসের মধ্যে ডানে বায়ে উপরে নিচে সবদিকে চালনা করতে থাকে।
কিন্তু সে কোনো কিছুকেই আঘাত করতে সমর্থ হয় না। সেই সাথে এটাও বুঝতে পারে না যে প্রতিপক্ষ কী তার কাছাকাছি এসেছে? প্রতিপক্ষের তলোয়ার কী তাকে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছে?
“কোথায়, তুমি বন্ধু? এদিকে আস, আমরা খেলা শেষ করি।” হাল তার ডানপাশে একটা কিছুর নড়াচড়া বুঝতে পারে। তলোয়ারটা ভূমির সমান্তরালে ডান থেকে বামে ঘোরাল; প্রতিপক্ষের মাথা কেটে ফেলার চেষ্টা করছে সে। তখনই সে দুই তলোয়ার-এর ঘর্ষণ-এর আওয়াজ শুনতে পায় এবং বুঝতে পারে তার প্রতিপক্ষও তার কাছাকাছি অবস্থানে থেকে আক্রমণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এরপর হাল নিজের তলোয়ারটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের গতিরোধ করে দ্রুত তার মাথায় আঘাত করল। এবার সে ঘোঙানির মতো আওয়াজ শুনতে পায়, সেই সাথে তার তলোয়ারটা নরম কিছু একটাকে আঘাত করেছে। প্রতিপক্ষ তার তলোয়ার দিয়ে হাল-এর তলোয়ারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
তার প্রতিপক্ষ আঘাত পেয়েছে। এই সুযোগ তাকে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিপক্ষ এই আঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই তাকে আঘাত করতে হবে। সে শেকলের লাইন বরাবর এগিয়ে যায় এবং তলোয়ারটা ডানে বায়ে দ্রুত ঘোরাতে থাকে।
ক্লান্তিতে তার বুক ধরফর করতে থাকে, পেশিগুলো অবশ হয়ে আসছে। তার ওপর মুখে গ্যাগ লাগানো থাকায় সে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। শুধু নাক দিয়ে বাতাস নিতে পারছে যেটা তার শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারছে না। একদিকে তার শরীর অক্সিজেন নেয়ার জন্য যুদ্ধ করছে আর অন্যদিকে তার মন দৃষ্টিহীনতার জন্য ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ছে। তার মন তাকে চিৎকার করে বলছে তলোয়ার দিয়ে মাংস কেটে নিজেকে ছোট করে ফেলতে যেন সে সহজেই কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এখানে লুকানোর কোনো জায়গা নেই, নেই কোনো রাস্তা।
অ্যাবোলি তাকে শিখিয়েছে তলোয়ার হচ্ছে হাতের বাড়তি একটা অংশ। তাই তলোয়ার হচ্ছে জীবন্ত একটা কিছু যেটা রক্তের জন্য হাহাকার করে। কিন্তু এইবার তার তলোয়ার মাংস নয় শক্ত কোনো স্টীল বা লোহাকে আক্রমণ করল যার কম্পন তার বাহুতে কাঁপিয়ে পুরো পেশিতে ছড়িয়ে পড়ল। এবার অন্যলোকটি শেকলটা উপরের দিকে টানতে থাকে। এতে করে হাল সামনের দিকে ধাক্কা খায়। লোকটি হাল-এর ডান বাহুর পাশ দিয় এসে শেলকটা হাল এর গলায় প্যাচিয়ে ফেলল।
মাটিতে পড়ে গেল হাল। সে নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। সে বুঝতে পারে যে লোকটি তার দিকেই এগিয়ে আসছে, তার অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। লোকটির কনুই হাল-এর পেছনে ধাক্কা দিচ্ছে। লোকটি নিজের পা দিয়ে হালকে প্যাচিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তার প্রতিপক্ষ বেশ শক্তিশালী। হাল লাথি দেয়ার চেষ্টা করল, এরপর গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করল। হাল-এর মুখ ফুলে গেল। এখন সে মাথায় অনেক চাপ অনুভব করছে যেন যে-কোনো মুহূর্তে মাথাটা ফেটে যাবে। চোখগুলো বের হয়ে আসবে।
চারপাশে কোনো কোলাহল বা হৈ চৈ শোনা যাচ্ছে না। চারদিকে নীরবতা বিরাজ করছে। নিজের হার্টের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে হাল যেটা আস্তে আস্তে ধীরগতি সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে।
“আমি মারা যাচ্ছি।”
“না, হেনরি। তুমি এখানে মারা যাবে না।” আমি নিষেধ করছি।
“বাবা?”
“উঠ, উঠ হেনরি। নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াও। এই লোকটিকে হত্যা কর। তোমাকে পারতেই হবে।”
এখনো কী সে তলোয়ার হাতে ধরে আছে? হ্যাঁ। কিন্তু তার শক্তি আস্তে আস্তে কমে আসছে। তাকে এখনি শক্তভাবে আঘাত করতে হবে। সে তার তলোয়ার ধরা হাতের মুষ্টি আস্তে-আস্তে আলগা করল। আঙুল দিয়ে তলোয়ার এর হিল্ট শক্তভাবে অনেকটা হাতুরির মতো করে ধরল। এরপর মুখে গ্যাগ লাগানো অবস্থাতেই সে চিৎকার করে তরবারির পমেল দিয়ে লোকটির মাথায় আঘাত করল।
