এরপর হাল আর লড়াই করার চেষ্টা করল না। এখন আর কিছুই করার নেই। ভাল কোনো সুযোগের জন্য নিজের শক্তিটুকু জমিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। আরেকবারের জন্য ভয় তাকে ঘিরে ধরে। এই ভয় তার বর্তমান অবস্থার চেয়ে বরং ভবিষ্যতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে সেই কারণে। কিন্তু এই লোকগুলোকে কিছুতেই দুর্বলতা বুঝতে দেয়া যাবে না। তার নিঃশ্বাসের গতি আস্তে আস্তে কমানোর চেষ্টা করল সে। একই সাথে তার মনোযোগ এই পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে অন্যকোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। সে সাগরের কথা চিন্তা করল, তার জাহাজের কথা মনে করল, তার বাবার সেই অমানবিক কষ্ট এবং দুঃসহ জীবনের কথা ভাবল যে জীবন মৃত্যুর পূর্বে তার বাবাকে কাটাতে হয়েছে। তবুও তার পিতা তার সম্মান এবং মর্যাদাকে বিসর্জন দেন নি। হাল বুঝতে পারছে এখন তাকে সেই পথই অনুসরণ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার হৃদস্পন্দন বুঝতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে হাল ছেড়ে দেবে না।
সে বুঝতে পারছে কেউ একজন এসে তার হাতের বাঁধন কেটে দিচ্ছে। হাতের বাঁধন কাটা শেষ হলে একজন তার বাম হাত সামনে টেনে নিয়ে একটা লোহার রিং পরিয়ে দিল। রিং-এর সাথে লাগানো শেকলের কারণে হাতটাকে তার বেশ ভারী মনে হচ্ছে।
আবারো তার মনে ভয় ফিরে আসতে শুরু করলে সে উচ্চস্বরে বলে উঠল, “আমার নাম কার্টনি” যতটা না লোকগুলোকে শোনানোর জন্য, তারচেয়ে বরং নিজের উদ্দেশ্যেই কথাটা বলল সে। লোকগুলো তার কথার উত্তরে কিছুই বলল না। লোকগুলো হয়ত বুঝতেই পারেনি হাল কী বলেছে।
বাইরের দিক থেকে আসা লোকগুলোর গোলমাল এবং হৈ চৈ বাড়তেই থাকে। শেষবারের মতো চিৎকার এবং বশির আওয়াজ শোনা যায়। হাল বুঝতে পারে ডগফাইট শেষ হয়েছে।
হাল অনুভব করে তার গলার শেকল ধরে কেউ টানছে এবং তার মাথাটাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করছে। তার উচ্চতার প্রায় অর্ধেকটা বাকা হতে হয় তাকে। তখন সে বুঝতে পারে যে এই দরজাগুলো নিশ্চয়ই কুকুরগুলোর প্রবেশের জন্য রাখা হয়েছে।
বাইরে বেরিয়ে আসার পর তার পৃথিবী হঠাৎ করেই হৈ চৈ এবং লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচিতে ভরে উঠল।
বাতাসে তাজা রক্তের গন্ধ পেয়ে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। মানুষের আনন্দের জন্য এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটছে এটা সে মনে স্থান দিতে চাচ্ছে না। ঠিক তখনই সে কাছাকাছি আরেকটা শব্দ শুনতে পায়। অন্য একজন মানুষ গার্ডদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য তর্জন গর্জন করছে।
“ভদ্রমহোদয়গণ আপনাদের সবাইকে স্বাগতম,” অ্যারাবিক ভাষায় একজন চিকন লোক উচ্চস্বরে আনুষ্ঠানিক উপস্থাপনা শুরু করল। তার কথা শুরু হতেই ভিড়ের মাঝে সবাই চিৎকার শুরু করে দিল। “নতুন কিছু দেখার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করুন। এরকম রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা এর পূর্বে কখনও আপনারা উপভোগ করেননি। এখানে কোনো দৌড়াদৌড়ি হবে না। লুকোচুরি হবে না। শুধু রক্তের বন্যা বয়ে যাবে।”
হাল শুনতে পায় একটি কষ্ঠ তার পাশ থেকে বলছে, “এই নাও, এটা ধর” এবং একটি তলোয়ার-এর বাট তার ডান হাতের তালুতে চাপ দিতে থাকে। সে যখন তলোয়ার-এর বাটটা ধরে তখন অ্যাবোলির কথাগুলো তার মাথায় বাজতে থাকে। তলোয়ার শিক্ষা দেয়ার সময় অ্যাবোলি এই কথাগুলো তাকে বলেছিল।
“তলোয়ারটাকে হাত দিয়ে গাছের ডাল ধরার মতো শক্ত করে ধরবে না গাল্ডওয়েন। তাহলে তলোয়ারটা তোমার কাছে ভারী এবং মৃত অস্ত্র বলে মনে হবে। আঙুল দিয়ে তলোয়ারটাকে খুব আলতো করে ধরবে। তাহলে আঙুল দিয়ে তলোয়ারটাকে তরল পদার্থের ন্যায় নাড়াচাড়া করতে পারবে।”
সে তলোয়ারটা তুলে ধরে হাতের মধ্যে এর অবস্থান নিশ্চিত করল। তলোয়ারটা একবার উঠিয়ে একবার নামিয়ে, নাড়াচাড়া করে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে সেটা ঠিক করে নিল সে।
“গুড, গান্ডওয়েন,” হাল অ্যাবোলির কণ্ঠ শুনতে পায়, “এখন তুমি খুব সহজেই তোমার আক্রমণের দিক পরিবর্তন করতে পারবে। এভাবে ধরে রাখলে তলোয়ারটা তোমার হাতে জীবন্ত থাকবে।”
সে তলোয়ারটা মুখের সমান উচ্চতায় তুলে আনল। চোখবাধা অবস্থাতেই কিছুক্ষণ তলোয়ারটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তলোয়ারটা গালের সাথে লাগিয়ে এর ধার এবং গঠন বোঝার চেষ্টা করল। এরপর বাতাসে কয়েকবার তলোয়ার চালিয়ে অনুশীলন করার চেষ্টা চালালো। সেই সাথে এটাও ভাবতে লাগল যে তার সামনের প্রতিদ্বন্দ্বীও নিশ্চয়ই একই কাজ করছে।
“আজকে দাসের বাজারে আপনারা নিশ্চয়ই অনেকে নাস্তিক বেশ্যা নাজেকে দেখেছেন,” সমবেত জনতা চিৎকার করে উঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আগুন লেগে যাওয়ার কারণে তার বিক্রি শেষ হয়নি। কিন্তু নাজেত হুত করেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। বাতাসে হারিয়ে গিয়েছে।”
“না”, কাপড় মুখে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে উঠল হাল। “সে হারিয়ে যেতে পারে না। তাকে পুনরায় কেউ আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমরা যখন মিলিত হব তখন একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। তাকে আর দৃষ্টির আড়াল হতে দেব না।”
“কিন্তু আমরা আপনাদের জন্য এরচেয়ে ভাল কিছুর আয়োজন করেছি : এল তাজার-এর হত্যাকাণ্ড। আপনারা জানেন বা দেখেছেন যে সে একজন ভাল যোদ্ধা। এখানেও তার জন্য যুদ্ধের আয়োজন করা হয়েছে। একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে সে যুদ্ধ করে যাবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। জনতার চিৎকার থেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ঘোষণাকারী অপেক্ষা করল। এরপর আবার বলতে শুরু করে দিল। তোমরা কেউ যদি চোখের বাধন এবং মুখের গ্যাগ খোলার চেষ্টা কর তবে তোমরা যেখানেই দাঁড়িয়ে আছ সেখানেই তোমাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হবে এবং কুকুরকে খেতে দেয়া হবে।”
