নদীর পাড়ে বিভিন্ন কুঁড়ের ফাঁকে ফাঁকে বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোকে জরিপ করল সোয়ে। বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে কোনটা বেশি দরকার স্পষ্ট নয় ওর কাছে: একটা ঘোড়া নকি প্যাক মিউলের পিঠ থেকে সৈনিকের নামানো ফোলা পানির চামড়ার ব্যাগ। অবশেষে যখন ঘোড়াই বেছে নিল সে, কুঁড়ের বাইরে তাইতার বেঁধে রাখা মেয়ারটাকেই সন্দেহাতীতভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী ও চমৎকার ঠেকল তার। ওটার সাথে বাচ্চা থাকলেও সোয়ের প্রথম পছন্দ হবে ওটাই, যদি কাছে ঘেঁষতে পারে।
শিবিরে দারুণ কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ছে। ঘোড়াগুলোকে দানাপানি খাইয়ে দলাইমলাই করা হচ্ছে। নদীর পুকুর থেকে তামার গামলা বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, লোকেরা ব্যস্ত হাতে খাবার রান্না করছে যেসব চুলোয় সেগুলোয় পাচ্ছে। খাবার তৈরি হওয়ার পর চারটি ভিন্ন ভিন্ন দলে ভাগ হয়ে দলীয় পাত্র ঘিরে আলাদা বৃত্ত তৈরি করে বসে পড়ল সেনাদল। থিতু হওয়ার মতো সামান্য ছায়া খুঁজে নিয়ে আশ্রয় নিতে নিতে সূর্যটা মাথার বেশ উপরে উঠে এলো। গোটা শিবির জুড়ে এক ধরনের গাম্ভীর্যপূর্ণ নীরবতা নেমে এলো। সতর্কতার সাথে শান্ত্রীদের অবস্থান জরিপ করল সোয়ে। সীমানা বরাবর নিয়মিত বিরতিতে চারজন প্রহরী রয়েছে। বুঝতে পারছে, শুকনো নদীর তলদেশই তার এগিয়ে যাবার সেরা উপায়, তাই ওদিকের প্রহরীর দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিল। লোকটা বেশ অনেকটা সময় নড়াচড়া করছে না দেখে সোয়ে ধরে নিল ঝিমোচ্ছে সে। চৌহদ্দীর আরও সতর্ক প্রহরীদের চোখের আড়ালে থেকে পাহাড়ের কিনারা থেকে পিছলে নেমে এসে শিবিরের আধা লীগ নিচ দিয়ে নদীর শুকনো তলদেশ ধরে আগে বাড়ল, নিঃশব্দে এগিয়ে চলল উজানের দিকে। শিবিরের ঠিক উল্টোদিকে আসার পর আস্তে করে নদীর কিনারার উপরে মাথা ওঠাল।
মাত্র বিশ কদম দূরে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে এক শান্ত্রী। চিবুকটা বুকের কাছে ঝুলছে, চোখবন্ধ। ফের কিনারার নিচে গা ঢাকা দিল সোয়ে। গা থেকে জোব্বা খুলে বগলদাবা করল। খাপে ভরা ড্যাগারটা খুঁজে নিল নেংটির নিচে। তারপর তীরের উপরে উঠে এলো। দৃঢ় পায়ে মেয়ারটা যে কুঁড়ের পিছনে বাঁধা ছিল সেটার দিকে এগিয়ে গেল। সামান্য নেংটি আর স্যান্ডেল পায়ে নিজেকে সৈন্যদেরই একজন হিসাবে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে স্থানীয় মিশরিয় ভাষায় জবাব দিতে পারবে; বলবে, ব্যক্তিগত কাজে নদীর ধারে গিয়েছিল। অবশ্য কেউ চ্যালেঞ্জ করতে গেল না ওকে। কুঁড়ের কোণে পৌঁছে ওটার পেছনে গা ঢাকা দিল।
খোলা দরজার ঠিক ওধারেই বাধা রয়েছে মেয়ারটা। দেয়ালের ছায়ায় একটা পানি ভর্তি চামড়ার ভাণ্ড রাখা। মেয়ারের পিঠে চেপে বসতে কয়েক সেকেন্ডের বেশি লাগবে না। সব সময়ই বিনা জিনে ঘোড়া হাঁকায় সে, তাই জিন, লাগাম বা রেকাবের দরকার হয় না। পা টিপে টিপে মেয়ারের কাছে চলে এলো সে, ওটার ঘাড়ে হাত বোলাল। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে হাতের গন্ধ শুকল ঘোড়াটা। অস্থিরভাবে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু মৃদু কণ্ঠে সোয়ে ওর সাথে কথা বলতেই ফের শান্ত হলো, ওর ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল সোয়ে। এবার চামড়ার পানির ভাণ্ডের দিকে এগিয়ে গেল সে। ভারি ওটা, তুলে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল। ওটাকে বেঁধে রাখা দড়িটা খুলে নিল। পিঠে উঠতে যাবে, এমন সময় খোলা দরজা থেকে একটা কণ্ঠস্বর থামাল ওকে। মিথ্যা পয়গম্বর থেকে সাবধান। তোমার ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করা হয়েছে, সোয়ে।
চমকে ঘাড়ের উপর দিয়ে তাকাল সে। দরজা পথে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাগাস। নগ্ন। আরও তরুণ কারও মতো পেশীবহুল ছিপছিপে দেহ তার; কিন্তু কুঁচকির কাছে খোঁজা করার পুরোনো দাগ রূপালি লাগছে। মাথার চুল ও দাড়ি অবিন্যস্ত। কিন্তু চোখজোড়া আরও উজ্জ্বল। সতর্ক করার সুরে কণ্ঠস্বর আরও চড়াল ওঃ আমার কাছে এসো! প্রহরী! হিলতো, হাবারি! মেরেন! এখানে, শাবাকো! নিমেষে ডাকে সাড়া মিলল। সারা শিবিরে প্রতিধ্বনি উঠল তার।
আর দ্বিধা করল না সোয়ে। উইন্ডস্মোকের পিঠে চেপে বসেই আগে বাড়ার তাগিদ দিল ওটাকে। ওটার পথে ছুটে এলো তাইতা, হাতে তুলে নিল দড়িটা। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল মেয়ার, ফলে ছিটকে ওটার ঘাড়ে সরে এলো সোয়ে। বুড়ো গাধা, পথ ছাড়ো! রাগের সাথে চিৎকার করে উঠল সে।
ওর কাছে ছুরি আছে। ফেনের সাবধানবাণী প্রতিধ্বনি তুলল তাইতার মাথার ভেতর। সোয়ের ডান হাতে ড্যাগারের ঝিলিক দেখতে পেল, ঘাই মারার জন্যে উইন্ডস্মোকের পিঠ থেকে সামনে ঝুঁকে পড়ল সে। আগেই ওকে সতর্ক করা না হলে ঠিক গলায় লাগত আঘাতটা। কিন্তু বাউলি কেটে একপাশে সরে যাবার মতো যথেষ্ট সময় পেয়ে গেল ও। ওর কাঁধ ছুঁয়ে গেল ড্যাগারের ডগা। পেছনে হোঁচট খেল ও। ঘাড়ের একপাশ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। হোঁচট খেয়ে পেছনে সরে এলো ও। ওকে চাপা দেওয়ার জন্যে মেয়ারটাকে তাগিদ দিল সোয়ে। ক্ষতস্থান চেপে ধরে তীক্ষ্ণ শিস বাজাল তাইতা। ফের থমকে দাঁড়াল উইন্ডস্মোক। তারপর হিংস্রভাবে লাফ দিয়ে উঠল, বাস্পের হিসিহিস তোলা মেঘে পানির পাত্রটাকে উল্টে দিল। হামাগুড়ি দিয়ে উত্তপ্ত কয়লা থেকে সরে এলো সোয়ে। কিন্তু সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই দুজন দশাসই সেনা ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর উপর। বালির উপর চেপে ধরল তাকে।
