দ্য টাইগার’স প্রে

 ১. ডাওজার নামের জাহাজ

দ্য টাইগার’স প্রে – উইলবার স্মিথ / টম হারপার
অনুবাদ: অসীম পিয়াস

উৎসর্গ : বইটি উৎসর্গ করছি আমার প্রিয়তমা স্ত্রী নিসো-কে, দিন রাত্রির প্রতিটি ক্ষণ যে আমার পৃথিবী আলোকিত করে রেখেছে।

ভাষায় যতোটা প্রকাশ করা সম্ভব, তার চাইতেও অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায়।

.

.

ডাওজার নামের জাহাজটায় বিশাল বিশাল অনেকগুলো পাল। সেই সাথে মালপত্রে বোঝাই। উষ্ণ মৌসুমি বায়ু চাবুকের মতো বাড়ি দিয়ে সমুদ্রের নীল বুকে সফেদ রেখা একে দিয়ে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ নেই, ঝকঝকে। ফলে সূর্য কিরণ পড়ে দাগগুলো ঝিকমিক করে উঠছে। বাতাসে জাহাজের পালগুলো ফুলে আছে, মাস্তুলের সাথের বাঁধনগুলো এতো টানটান হয়ে আছে যে মনে হচ্ছে এখুনি ছিঁড়ে যাবে। ভারী জাহাজটা ভারত মহাসাগরের ঢেউয়ের তালে একবার উপরে উঠছে আর নামছে। আসলে জাহাজটা প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে।

ডাওজারের মাস্টার জোশিয়াহ ইঞ্চবার্ড জাহাজের পিছনে দাঁড়িয়ে পিছু ধাওয়াকারী জাহাজটার দিকে তাকিয়ে আছে। ভোরের আলো ফোঁটার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে ওটাকে। লম্বা, সরু জাহাজটা একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতোই ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। ওটার কালো গায়ে লাল রঙ করা কামানের চারকোণা খোপ চিহ্নিত করা। ধীরে ধীরে কমছে জাহাজ দুটোর

ইঞ্চবার্ড মাথার উপরের পালগুলোর দিকে তাকালো। বাতাস একধারে বয়েই চলেছে, পালগুলোও তাই এখনো টানটান হয়ে আছে। এভাবে যদি চলতেই থাকে তাহলে ছিঁড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে সময় লাগবে না, কিন্তু আবার এই ঝুঁকিটা না নিলেও সর্বনাশ হওয়াটা নিশ্চিত।

“মি. ইভান্স,” ফাস্ট মেট-এর দিকে হাক ছাড়লো জোশিয়াহ। “সবাইকে দ্রুত স্টেসেইল (জাহাজের আগা থেকে মাথা পর্যন্ত যে পাল খাটানো হয়) টাঙ্গাতে বলো।”

মিস্টার ইভান্সের বাড়ি ওয়েলশ। বয়শ তিরিশের শেষ দিকে। সে উপরের পালগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। “এই বাতাসের ভিতর স্যার? আর বেশি হলে মাস্তুল ভেঙে যাবে।”

“ঠিক বলেছো মি. ইভান্স, কিন্তু তোমার কাজ আমার কথার উপর কথা বলা না, তোমার কাজ আমার কথা শোনা। গতি আর আধা নট বাড়াতে পারলেও বেঁচে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকবে।”

ইঞ্চবার্ড প্রায় বিশ বছর যাবত এই সাগরে জাহাজ চালাচ্ছে। প্রতি পদে পদে মামা চাচার জোরওয়ালা লোকদের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজের যোগ্যতায় আজ ও এই অবস্থানে এসেছে। ভারত আর স্পাইস দ্বীপের জঘন্য সব বন্দরের এমন সব অভিযান থেকে ও বেঁচে ফিরে এসেছে যেসব অভিযানে অর্ধেক ক্রু তাদের বিছানাতেই সমাহিত হয়ে আছে। আর এখন, এই মুহূর্তে ও নিজের জাহাজকে বিপদে ফেলতে পারবে না।

“করছেন কি?”

কথাটা বললো একজন মহিলা। স্বরটা শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ। পিছন থেকে এসেছে কথাটা। কয়েকজন ক্রু দড়ি বেয়ে মাস্তুলে ওঠা থামিয়ে থমকে গেলো। সাগরের অথৈ জলের মাঝে তিন সপ্তাহ কাটানোর পর একজন মহিলার মুখ দর্শন সত্যিকার অর্থেই বড় মনোরম।

ইঞ্চবার্ড দ্রুত ঠোঁটের আগায় চলে আসা গালিটা আটকালো। “সেনোরা দুয়ার্তে। এসব আপনার ভাবার বিষয় না। আপনি বরং নিচের ডেকে থাকলেই ভালো করবেন।”

দুয়ার্তে উপরের দিকে তাকালো। বাতাসে ওর লম্বা কালো চুল উড়ছে। তার মাঝখানে ওর জলপাই রঙের সুন্দর মুখটা দেখা যাচ্ছে। ও এতোটাই হ্যাংলা যে দেখে মনে হচ্ছে আর একটু জোরে বাতাস দিলেই উড়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়বে। কিন্তু নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ইঞ্চবার্ড জানে যে মেয়েটা মোটেও ততোটা দুর্বল নয়।

“অবশ্যই এটা আমার ভাববার বিষয়,” দুয়ার্তে বললো। “জাহাজের কিছু হলে আমরা সবাই-ই মারা পড়বো।”

লোকগুলো তখনও ঝুলতে ঝুলতে ওকে দেখেই চলেছে। ফার্স্ট মেট ইভান্স তা দেখে চেঁচিয়ে উঠলো, “কাজে মন দে সবাই। নইলে হাতের রশি দিয়ে পিটাবো কিন্তু।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার উঠতে শুরু করলো সবাই। ইঞ্চবার্ড টের পেলো, এই মহিলার উপস্থিতি ওর খবরদারি ফলানোতে সমস্যা করছে।

“নিচে যান,” আদেশ দিলো ও। “জলদস্যুরা একটা মেয়েকে ধরতে পারলে কি করবে সেটা কি আমাকে বলে দিতে হবে?”

“সর্বনাশ,” মাস্তুলের মাথায় দাঁড়ানো লোকটা চেঁচিয়ে বললো। “ওরা পতাকা তুলে দিয়েছে। তারপর এতো জোরে যীশুর নাম ধরে ডাক দিলো যে নিচের সবাই শুনতে পেলো।

অবশ্য লোকটা না বললেও চলতো। সবাই দেখতে পেয়েছে ততোক্ষণে ওদের শত্রু জাহাজের মূল মাস্তুল থেকে একটা কালো পতাকা উড়ছে, তার নিচেই উড়ছে আর একটা লাল পতাকা।

এর মানে হচ্ছে, কাউকেই জ্যান্ত ছাড়া হবে না!

*

পতপত করে উড়তে থাকা পতাকা দুটো দেখতে পেয়ে ফাইটিং কক-এর ক্যাপ্টেন জ্যাক লেগ্রাঞ্জের মুখে ক্ষুধার্ত একটা হাসি ফুটে উঠলো। মাদাগাস্কারের উপকূলে প্রথমবার চোখে পড়ার পর থেকেই, গত তিন দিন ধরে ওরা সামনের মার্চেন্টম্যানটা (ব্যবসার উদ্দেশ্যে মালবাহী জাহাজ) ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে। জাহাজটা বন্দর ছাড়তে দেরি করে ফেলেছে, এ কারণে ভারত মহাসাগরের জলদস্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে যে পাহারাদার জাহাজের দলটা আছে সেটার সাথে আসতে পারেনি। রাতে প্রচুর বাতাস হয়েছে, সে কারণে লেগ্রাঞ্জ জাহাজের সবগুলো পালই তুলে দিয়েছে, আশা করছে ওর জাহাজটা সামনের পেটমোটা জাহাজটাকে সহজেই ধরে ফেলতে পারবে। জুয়াটা কাজে লেগেছে বলা যায়, ওরা আর এক কি দেড় লীগ পিছিয়ে আছে মাত্র। আর কিছু পরেই ধরে ফেলবে।

লেগ্রাঞ্জ নিজের জাহাজের দিকে তাকালো এবার। জাহাজটা শুরুতে ব্রিস্টল থেকে দাস আনা নেওয়ার কাজ করতো। পূর্ব আফ্রিকা থেকে আমেরিকার উপনিবেশ আর ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ সব জায়গাতেই চলাচল ছিলো ওটার। লেগ্রাঞ্জ ছিলো এটার ফাস্ট মেট। কিন্তু একদিন চুরি করতে গিয়ে ক্যাপ্টেনের কাছে ধরা পড়ে যায়। ক্যাপ্টেন ওকে পিটিয়ে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেয়। পরদিন রাতে, ক্ষতের ব্যান্ডেজের রক্ত শুকানোর আগেই ও ওর পক্ষের নাবিকদের নিয়ে জাহাজ আক্রমণ করে, আর জাহাজ দখল করে ক্যাপ্টেনকে মাস্তুল-এর কাঠে ঝুলিয়ে দেয়। ওরা জাহাজটাকে একটা জনশূন্য খাড়িতে নিয়ে যায়, তারপর জাহাজটার নাবিকদের থাকার জায়গাটা পুরো ভেঙ্গে ফেলে খোলের দুপাশে এক ডজন বন্দুকের খোপ তৈরি করে নেয়। নিজেদের বিনোদনের জন্যে সুন্দর কয়েকটাকে রেখে স্বাস্থ্যবান দাসগুলোকে বেঁচে দেয় ওরা। দুর্বল আর রোগাগুলোকে হাত পা বেঁধে ফেলে দেওয়া হয় সমুদ্রে। জাহাজের যেসব ক্রু ওদের দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায় ওদেরও একই পরিণতি হয়। জাহাজটা আগে শুধু নামেই যোদ্ধা ছিলো, এখন কাজেও হয়েছে। এখন ওটা এমন এক শিকারি যেটা সাগরের বুকের বড় বড় জাহাজগুলো বাদে আর সবকিছুকেই শিকার করতে পারে।

“বো চেজারটা (জাহাজের সামনে বসানো কামান) থেকে গোলা ছোড়ো,” আদেশ দিলো ও। “পাছায় বাড়ি খেয়ে ওটা আর কদ্দূর যেতে পারে দেখা যাক।”

“আর একটা পালও যদি ভোলা হয়, তাহলে ওদের বড় মাস্তুলটা ভেঙ্গে পড়বে,” পাশ থেকে মেট বললো।

লেগ্রাঞ্জ হাসলো। “একদম ঠিক!”

ওর লোকেরা বো চেজারটায় গোলা ভরতে লাগলো। জাহাজের সামনে পিছনে দুই দিকেই আছে কামান। জাহাজের পাটাতন কিছুটা বাড়িয়ে ওগুলো বসানোর জায়গা করা হয়েছে। বত্রিশ পাউন্ডের গোলা ছুঁড়তে পারে কামানগুলো। গোলন্দাজ লোকটা নিচ থেকে একটা ব্রেজিয়ারে (লোহার পাত্র) কয়লা এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলো। ওরা জাহাজ আর জাহাজের মালপত্র দুটোই চায় কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত হাত ফসকে যায়, তাহলে লেগ্রাঞ্জ দরকার হলে জাহাজটা পুড়িয়ে দেবে তবুও পালাতে দেবে না।

“ওটার কি হবে ক্যাপ্টেন?” মেট জিজ্ঞেস করলো।

জাহাজের পিছন দিকে বহুদূরে দিগন্তের কাছে আরো একটা জাহাজকে : ঢেউয়ের তালে দুলতে দেখা যাচ্ছে। লেগ্রাঞ্জ নিজের পাই গ্লাসটা সেদিকে তাক করলো। জাহাজটা ছোট, এক মাস্তুলের। রোদে পোড়া খোল। বাতাসের তোড়ে প্রায় উড়ে আসছে, মনে হচ্ছে হুমড়ি খেয়ে উল্টে পড়তে পড়তেও পড়ছে না। ওটার লোকজন সব জাহাজের ডেক-এ জড়ো হয়ে ওদের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। একজনের হাতে একটা টেলিস্কোপ দেখা গেলো, ফাইটিং কক-এর দিকে তাক করাপতাকা দেখে সম্ভবত ব্যাটা এতোক্ষণে নিজের পায়জামা ভিজিয়ে ফেলেছে, আর মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছে যে জলদস্যুরা ওদেরকে রেখে আরো দামী একটা জাহাজের পিছু নিয়েছে।

লেগ্রাঞ্জ মুখ টিপে হেসে হাতের টেলিস্কোপটা নামিয়ে রাখলো। “আগে এদের সাথে বোঝাঁপড়াটা করে নেই। তারপর ওটার দিকে নজর দেওয়া যাবে। আপাতত ওটা আমাদের কোনো ঝামেলা করতে পারবে না।”

*

টম কোর্টনী নিজের টেলিস্কোপ নামালো। লাল আর কালো পতাকাওয়ালা জলদস্যুর জাহাজটা দিগন্ত রেখার কাছে ছোট হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায়।

“মার্চেন্টম্যানটা আরো একটা পাল খাটাচ্ছে,” মন্তব্য করলো ও। “এবার সম্ভবত ওরা ওদেরকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে।”

জলদস্যুর জাহাজ থেকে আলো ঝলসে উঠলো। এক সেকেন্ড পরেই ওরা কামানের গোলার পানির উপর আছড়ে পড়ার মৃদু শব্দ শুনতে পেলো।

“এখনো সীমার বাইরে,” টমের পাশের লোকটা বললো। কামানের গোলার আঘাতে মার্চেন্টম্যানটার পিছনের কয়েক ক্যাবল দূরের পানি ছিটকে উঠেছে শুধু। লোকটা টমের চাইতে লম্বা, গা ভর্তি মাংস, নড়লেই কিলবিল করে। তার কালো মুখ ভরা অনেকগুলো কাটা দাগ, উঁচু নিচু হয়ে আছে। আফ্রিকার যে উপজাতিতে ওর জন্য সেটার শাস্ত্রীয় আচারের চিহ্ন ওগুলো। সেই ছোট থেকে লোকটা টমের সাথে আছে-এর আগে ছিলো টমের বাবা হাল-এর সাথে। অথচ ওর কালো শরীরটায় এখনো একটা ভাজ-ও পড়েনি কিংবা একটা চুলেও সামান্য পাক ধরেনি। যদিও মাথা সবসময়েই কামিয়ে রাখে।

“বেশিক্ষণের জন্যে না, আবোলি। এই মোটা শরীর নিয়ে জাহাজটা আর বড়জোর কয়েক নট পর্যন্ত নিরাপদে থাকবে।”

“ওরা আত্মসমর্পণ করলেই বুদ্ধির কাজ করবে। যারা বাধা দেয়ার চেষ্টা করে তাদেরকে জলদস্যুরা কি করে সেটা তো জানাই আছে।”

টম ওর পিছনদিকে তাকালো। সামনের দিকে টাঙ্গানো শামিয়ানার নিচে দুজন মহিলা বসে আছে। দুজনেই ওদের কথা কান পেতে শুনছে, আর সেটা লুকানোর কোনো চেষ্টাই করছে না।

“তার মানে আমাদের আসলে মার্চেন্টম্যানটাকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই,” অনিশ্চিত স্বরে বললো টম।

আবোলি জানে টমের মাথার ভিতর কি চিন্তা চলছে। “ওদের চল্লিশটা কামান আছে, আর আমাদের বারোটা,” সতর্ক করলো ও। “আর ওদের লোকও কমপক্ষে আমাদের দ্বিগুণ।”

“ওদের সাথে লাগতে যাওয়া চরম বোকামি হবে।”

মহিলাদের দুজনের একজন উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলো। তার নীল চোখ ঝকঝক করছে। মহিলাকে ঠিক প্রচলিত অর্থে সুন্দরি বলা যাবে : মুখের কাটা বেশি বড়, চোয়াল শক্ত, আর রোদে থাকতে থাকতে মসৃণ চামড়া তামাটে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু দেখে ভীষণ রকম প্রাণবন্ত মনে হয়, জীবনে ভরপুর। আশপাশের সবাইও সেই শক্তিতে আবিষ্ট হয়ে পড়ে। চেহারাটাও দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত। ফলে প্রথম দেখাতেই টম ওর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো বলা যায়।

“উজবুকের মতো কথা বোলো না টম কোর্টনী,” ঘোষণা দিলো সে। “তুমি আসলেই ঐ বেচারাদেরকে এই জলদস্যুদের হাতে মরতে ছেড়ে দেবে?” টমের হাত থেকে পাই গ্লাসটা ছিনিয়ে নিতে নিতে বললো ও। তারপর নিজের চোখে দিয়ে বললো, “যদূর জানি ঐ জাহাজে একজন মহিলাও আছে। দস্যুরা জাহাজটা দখল করে ফেললে তার কি অবস্থা হবে জানো না?”

যে লোকটা হাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে টম তার সাথে চোখাচোখি করলো। “তোমার কি মনে হয় ডোরি?”

ডোরিয়ান কোর্টনী ভ্রু কুঁচকে ফেললো। ওরা দুজন ভাই। যদিও খুব কম মানুষই সেটা ধরতে পারে। আরবের মরুভূমিতে থাকতে থাকতে ডোরিয়ানের গায়ের রঙ গাড় বাদামী হয়ে গিয়েছে। মাথায় একটা সবুজ পট্টি বাঁধা। ওর লাল চুলের পুরোটাই তাতে ঢাকা পড়েছে প্রায়। ঢিলেঢালা নাবিকদের পায়জামা পরনে ওর। কোমরে একটা বাকানো ছুরি ঝোলানো।

“আমিও ব্যাপারটা ঠিক মানতে পারছি না।” হালকা চালেই বললো ডোরি। কিন্তু সবাই জানে ওর কথার পিছনে আসলে কতোটা তিক্ততা লুকিয়ে আছে। মাত্র এগারো বছর বয়সে ওকে দস্যুরা ধরে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। প্রায় দশ বছর খোঁজার পর টম আবার ওকে খুঁজে পায়। সবাই ভেবেছিলো মারা গিয়েছে ও। ডোরিয়ানকে কিনেছিলো মাস্কটের এক হিতৈষী রাজকুমার। ও তার বাড়ির একজন প্রহরী হিসেবে কাজ শুরু করে। পূর্ব আফ্রিকার মরুভূমিতে আবার যখন ওদের দেখা হয় তখন টম ওকে চিনতেই পারেনি। বলা যায়, মাত্র এক চুলের জন্যে ওরা একজন আর একজনকে খুন করে ফেলেনি সেবার।

“ব্যাপারটা মোটেও সহজ হবে না ক্লিবি,” আবোলি সতর্ক করলো। টমকে ও ক্লিবি নামে ডাকে; ওর মাতৃভাষায় এর মানে হচ্ছে বাজপাখি। দাস ব্যবসায়ীদেরকে আবোলি ভয়াবহ মাত্রায় ঘৃণা করে। ও আফ্রিকার লোজি উপজাতিদের একজন। ওর দুজন স্ত্রী-জিতি আর ফাল্লা। তাদের গর্ভে ওর ছয়টা বাচ্চা জন্ম নেয়। একবার ব্যবসার কাজে আবোলি অনেক দূরে গিয়েছিলো। সেই ফাঁকে আরব দাস ব্যবসায়ীরা গ্রামে আক্রমণ করে ওখানকার লোকজনকে ধরে নিয়ে যায়। তার মাঝে জিতি, ফাল্লা আর আবোলির বড় দুই ছেলে-ও ছিলো। বাকি বাচ্চাদেরকে মেরে রেখে যায়। আবোলির ছোট ছোট চারটা ছেলেমেয়েকে গাছের গুঁড়ির সাথে আছাড় মেরে মাথা ফাটিয়ে মেরে ফেলা হয়। কারণ ওরা এতো ছোট ছিলো যে ওদেরকে পূর্ব তীরের দাস বাণিজ্যের এলাকায় জোর করে নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ হতো না।

টম আর আবোলি পুরো আফ্রিকা জুড়ে দস্যুগুলোকে খুঁজে খুঁজে মেরেছে। ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছেও হাল ছাড়েনি। এর মধ্যেই জিতি, ফাল্লা আর ওদের জীবিত দুই ছেলেকে মুক্ত করে ওরা। আর দাস ব্যবসায়ীদের উপর চরম প্রতিশোধ নেয়। ছেলে দুটো, মানে যামা আর তুলা এখন প্রায় তরুণ। আবোলি ইদানীং ওদের মুখেও ঐ শাস্ত্রীয় চিহ্ন দেওয়ার কথা ভাবছে। টম জানে ওরাও চিহ্নটা অর্জন করার জন্যে অধীর হয়ে আছে।

“জাহাজটা তো পুরো বোঝাই হয়ে আছে, ডোরিয়ান বললো। মনে হলো যেনো এইমাত্র ব্যাপারটা টের পেয়েছে ও। “মুক্তিপণ আদায়ের জন্যে একেবারে মোক্ষম জিনিস।”

আবোলি এর মধ্যেই ওর পিস্তল প্রস্তুত করা শুরু করেছে। “তোমার বাবা কি বলতেন জানো নিশ্চয়ই।”

“সবারই উপকার করো, কিন্তু করা শেষে নিজের ফী-টা নিতে ভুলো না।” টম হেসে বললো। “সে যা-ই হোক, কিন্তু মেয়েমানুষ সাথে থাকলে কোনো ঝামেলায় জড়ানো আমার ঠিক পছন্দ না।”

সারাহ ডেকের নিচে গায়েব হয়ে গেলো। একটু পরেই ফিরে এলো একটা সোনালি হাতলওয়ালা তরবারি হাতে করে। হাতলের মাথায় একটা নীলকান্ত মণি ঝিকমিক করছে।

“তুমি কি যাবে টম কোর্টনী? নাকি আমাকেই করতে হবে কাজটা?” জানতে চাইলো ও।

সাগর জুড়ে আরো একটা গোলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো। এবার অবশ্য মার্চেন্টম্যানটা থেকে কয়েক টুকরো কাঠ উড়ে যেতে দেখা গেলো।

‘হায় খোদা, মিসেস কোর্টনী, আমারতো মনে হয় এমনকি দস্যুরাও তোমার কথা অমান্য করার চাইতে বরং মুঘল সাম্রাজ্যের গুপ্তধনে ভরা ঐ জাহাজটাকে ছেড়ে দেওয়াই বেশি পছন্দ করবে। তুমি কি বলল, ইয়াসমিনি?” শেষের কথাটা ও বললো সারাহের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরি আরব মেয়েটাকে। ও হচ্ছে ডোরিয়ানের স্ত্রী, পরনে একদম ছিমছাম একটা পোশাক, মাথায় একটা সাদা ওড়না।

“একজন ভালো স্ত্রী সর্বাবস্থায় তার স্বামীকে মান্য করে,” বিনয়ী কণ্ঠে বললো ও। “আমি আমার ওষুধের বাক্সটা গুছিয়ে নিচ্ছি। সন্দেহ নেই আপনাদের কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমার কাজ শুরু হয়ে যাবে।”

টম নীল তরবারিটা কোমরে গুঁজে নিলো। ওটার নাম নেপচুন। একসময় তরবারিটা ছিলো ওর বাবার, তার আগে ওর দাদার। তবে এটার প্রথম মালিক ছিলো ওর পরদাদা চার্লস কোর্টনি। স্পেনের র‍্যাঞ্চেরিয়া জয়ের পর স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক তাকে এটা উপহার দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তরবারিটা পাওয়ার কারণে টম এখন টেম্পল অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য হলি গ্রেইল-এর একজন নাইট নটোনিয়ার। ওর উত্তরসূরিদের মতোই ও এটা দিয়ে অসংখ্য লোককে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে। তবে সেসব মৃত্যু ওদের পাওনা ছিলো। তরবারিটা একেবারে খাঁটি টোলেডো ইস্পাতের তৈরি, আর হাতলের নীলাটার জন্যে ফলার ওজনটাও চমৎকারভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।

টম খাপ থেকে তরবারিটা বের করলো, সূর্যের আলো ওটায় প্রতিফলিত হতে ওর চেহারাও আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।

“কামানগুলো রেডি করে ফেলো আবোলি। দুটো করে তিতির পাখি মারো ওদের দিকে।” তিতির পাখি হলো ছোট ছোট সীসার বল ভরা গোলা। মেঘের মতো ওগুলো ভেসে যায়, আর সামনে যেটা-ই পড়ে সেটা ধ্বংস করে ছাড়ে। “মি. উইলসন, বাতাসের দিকে আরো তিন পয়েন্ট ঘুরিয়ে দিন জাহাজের মুখ।”

*

দস্যুদের বো চেজার আবারও গর্জে উঠলো। একটা গোলা অনেক দূরে গিয়ে পড়লো, আর একটা পিছনদিকের একটা তক্তা ভেঙ্গে বেরিয়ে গেলো, টুকরো কাঠের গুঁড়োয় ভরে গেলো আশপাশ। ইঞ্চবার্ডের গালেও একটা টুকরো এসে লাগলো, উষ্ণ রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো সেখান দিয়ে।

দস্যুরা ওদের জাহাজের দিকে পরিবর্তন করে এমনভাবে বাকিয়ে নিলো যাতে ডাজারের সবগুলো মাস্তুল এক সারিতে চলে আসে। ঠিক নাইনপিন খেলার মতো।

“অতো দূর থেকে লাগানো সহজ হবে না,” শান্ত কণ্ঠে বললো মেট।

ওদের ধারণা ভুল প্রমাণ করতে ঠিক সাথে সাথেই উপর থেকে মড়াত করে একটা শব্দ ভেসে এলো। সবার চোখ ঘুরে গেলো উপর দিকে-দেখতে পেলো একগাদা কাঠ আর ক্যানভাসের কাপড় ওদের দিকে ধেয়ে আসছে। সবাই লাফিয়ে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করলোর কয়েকজন নড়তে দেরি করে ফেললো। হাল ধরে ছিলো যে লোকটা তার ঠিক চাদি বরাবর পড়লো মাস্তুল, মুহূর্তে ভেঙ্গে চুর চুর হয়ে গেলো মাথাটা। বাতাসের উল্টো দিকে ঘুরে গেলো জাহাজ। আর পালটা মৃত লোকটার উপর কাফনের কাপড়ের মতো করে ঢেকে গেলো।

“কেটে দাও ওটা,” চেঁচিয়ে বললো ইঞ্চবার্ড। “হুইলটাকে মুক্ত রাখতে হবে।” লোকজন কুড়াল হাতে ছুটে গিয়ে মাস্তুলের গোড়াটা কাটা শুরু করলো।

আর একটা গোলা ছোঁড়ার শব্দে ওর কথা চাপা পড়ে গেলো। ওর মুখের মাত্র এক ফুট দূর দিয়ে উড়ে গেলো কামানের গোলাটা। ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পাটাতনের উপর পড়ে গেলো ইঞ্চবার্ড। জাহাজটা এখন একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু। জাহাজের খোলটা কেঁপে উঠলো আবার। আরও একটা মাস্তুল ফাটার আওয়াজ পাওয়া গেলো। জুরা পাল-টাকে সরিয়ে ফেলেছে ততোক্ষণে। সদ্য মৃত লোকটার রক্তে লাল হয়ে আছে ওটা। নিচেই দেখা গুলো হুইলটাও টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে, মাস্তুলটা ঠিক ওটার উপরেই পড়েছিলো। আবার একটা বসাতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। আর ওদের হাতে মোটেও অতোটা সময় নেই।

এদিকে দস্যুদের জাহাজটা ক্রমেই কাছিয়ে আসছে, আর কিছুক্ষণের মাঝেই পাশাপাশি চলে আসবে। ইঞ্চবার্ড ওটার ডেক-এর লোকজনগুলোকেও দেখতে পাচ্ছে এখন। কয়েকজন তাদের হাতের তরবারি নেড়ে উল্লাস করছে, বাকিদের হাতেও ভয়ালদর্শন লম্বা তরবারি।

ইঞ্চবার্ড দাঁতে দাঁত পিষলো। “জাহাজে কাউকে উঠতে দেবে না।”

*

ফাইটিং ককের হালী ওটাকে ডাওজারের পাশাপাশি নিয়ে এলো। তারপর মাস্তুলের উপরের লোকেরা পাল গুটিয়ে নিলো, আর বাকি দস্যুরা জাহাজের কিনারের কাঠের উপর উঠে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগলো। ওদের লাফঝাপের চোটে জাহাজ দুটো একটা আর একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুলতে লাগলো। এখন ওদের মাঝে ব্যবধান মাত্র কয়েক ফুট পানি।

লেগ্রাঞ্জ লাফ দিয়ে রেইলের উপর উঠে দাঁড়ালো। পানির মতোই সহজে হয়ে গেলো কাজটা, সন্তুষ্টচিত্তে ভাবলো ও। মার্চেন্টম্যানের ডেক-এ তাকিয়ে দেখে ওখানে কেউ নেই। কু-রা নিশ্চয়ই ডেক-এর নিচে, পাগলের মতো নিজেদের মূল্যবান সম্পদ লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। খামাখা কষ্ট করছে : কিছুক্ষণের মাঝেই ওরা কান্নাকাটি করতে করতে জীবন ভিক্ষা দেওয়ার জন্যে অনুনয় করতে থাকবে, আর কোথায় কি রেখেছে সেসবও সুড়সুড় করে বলে দেবে।

ও কথা বলার জন্যে মুখের সামনে চোঙ্গাটা তুললো। “পতাকা নামিয়ে নাও আর অতিথিদের বরণ করার জন্যে প্রস্তুত হও।”

ওর লোকেরা উল্লাস করে উঠলো। লেগ্রাঞ্জ জাহাজের কামানগুলোর দিকে তাকালো। ওগুলোর একটাতেও কোনো গোলন্দাজ নেই। কক-এর কামানের বহরে এগুলো সংযুক্ত হবে এখন। অথবা ও ডাওজারকেই কিছুটা সংস্কার করে নিজের জাহাজের বহরে যোগ করে নিতে পারবে। দুটো জাহাজ পেলে পুরো সমুদ্রটাই ওর হয়ে যাবে। চিন্তাটা মাথায় আসতেই নেকড়ের মতো ধূর্ত একটা হাসি ফুটলো ওর মুখে।

চোখের কোণে রঙিন কিছু একটা ধরা পড়লো ওর : একটা কমলা আভা, যেন একটা কামানের গোড়ার কাছে কোনো ধাতুর উপর সূর্যের আলো পড়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। ও গলা বাড়িয়ে সেটা দেখার চেষ্টা করলো। ওটা সূর্যের আলো না। ওটা আসলে কামানের সলতেতে লাগানো আগুন, ধীরে ধীরে সেটা গোলার দিকে এগিয়ে চলেছে। দ্রুত বাকি কামানগুলোকে পরীক্ষা করতেই ওর রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। প্রতিটা কামানেই গোলা ভরা, আর সলতেতে আগুন লাগিয়ে ঠিক ওদের দিকেই তাক করে রাখা হয়েছে।

“মাথা নামাও সবাই,” চিৎকার করে উঠলো ও। গোলন্দাজবিহীন কামানগুলো থেকে একেবারে পয়েন্ট ব্লাংক থেকে কয়েকটা গোলা ছুটে গেলো। গোলার সাথে পেরেক ভরে দেওয়া হয়েছে। গোলাটা সোজা জাহাজের একটা পাশকে পুরো চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলো। একদম সামনে যে লোকগুলো দাঁড়িয়ে ছিলো তারা একেবারে কিমা কিমা হয়ে গেলো বলা যায়, রক্তের হোলি খেলা হলো যেন ওখানে। তাদের পিছনে যারা ছিলো তারাও প্লিন্টারের আঘাতে মারাত্মক আহত হলো। কয়েকটা মুহূর্ত নিঃসীম নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো, কিন্তু তারপরেই ডাওজারের লোকেরা হারে রে রে করতে করতে মাস্কেট আর পিস্তল হাতে দৌড়ে আসতেই আবার আকাশ বাতাস চিৎকার আর গুলির আওয়াজে ভরে উঠলো। ওরা লাফিয়ে কক-এর ডেক-এ উঠে এসে যারা তখনও বেঁচে ছিলো তাদেরকে গুলি করে মারতে লাগলো। কম আহতেরা পায়ের উপর উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই আবার গুলি খেয়ে শুয়ে গেলো। জাহাজ দুটো দূরে সরে যেতে শুরু করতেই ডাওজারের লোকজন উল্লাস করে উঠলো।

লেগ্রাঞ্জের শিকার হাত ফসকে যাচ্ছে। কিন্তু ফাইটিং কক-এ প্রায় দুইশ লোক আছে; আর ডাওজারে সর্বোচ্চ হলে একশোর কাছাকাছি লোক হবে। ফলে এতো ক্ষয় ক্ষতির পরেও দস্যুরা এখনো সংখ্যায় বেশি। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যে ওদের দরকার শুধু সাহস।

প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করে উঠে লেগ্রাঞ্জ একটা দুলতে থাকা রশি পাকড়ে নিজের কোমরে বেঁধে নিলো, তারপর মুক্ত হাতটায় একটা পিস্তল তুলে নিয়ে আবার রেইলের উপর উঠে দাঁড়ালো।

“কাউকে জ্যান্ত ছাড়বো না,” গর্জে উঠলো ও। তারপর দড়িতে ঝুলে ধোঁয়ার ভিতর দিয়েই ডাওজারের ডেক-এ গিয়ে নামলো। একজন নাবিক ওকে দেখতে পেলো, কিন্তু হাতের মাস্কেটের গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় সে একটা তরবারি তুলে নিতে গেলো। লেগ্রাঞ্জ একেবারে মুখে গুলি করে শুইয়ে দিলো তাকে। তারপর পিস্তলটা ছুঁড়ে ফেলে কোমর থেকে আর একটা তুলে নিলো। আর একটা নাবিক ওর সামনে পড়ে গেলো, লেগ্রাঞ্জ ওকেও গুলি করলো, তারপর নিজের তরবারি বের করলো।

একটু পরেই ডাওজারের ডেক জুড়ে লোহার ঝনঝনানি আর খালি পায়ের ধুপধাপ শব্দ শোনা যেতে লাগলো, কারণ লেগ্রাঞ্জের সাঙাতেরাও ওকে অনুসরণ করে এটায় এসে নামতে শুরু করেছে। প্রায় প্রত্যেকের গায়েই মৃত সঙ্গীদের রক্ত আর মাংস মেখে আছে, প্রথমেই ওরা হাত দিয়ে নাড়িয়ে ধোয়াটা পরিষ্কার করে নিলো। ডাওজারের লোকজন মুহূর্তের মাঝে দিশেহারা হয়ে পড়লো। এতো কিছুর পরেও দস্যুরা ওদের চাইতে সংখ্যায় এখনো অনেক বেশি। আর এই মুহূর্তে দস্যুরা সবাই একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্যে মারাত্মক ক্ষেপে আছে। একে একে ডাওজারের প্রায় সবগুলো ক্রু-কে হত্যা করা হলো। শুধু কয়েকজনকে জাহাজের লেজের কাছের হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা হলো।

লড়াই শেষ হয়েছে বোঝমাত্র কয়েকজন দস্যু ছুটে গেলো লুট শুরু করতে। বাকিরা ডাওজারের যে কয়জন জীবিত আছে তাদেরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইলো। হাতের তরবারি দিয়ে মাঝে মাঝে খোঁচা দিতে লাগলো, কিন্তু মেরে ফেলার কোনো চেষ্টা করলো না। কারণ ওরা জানে যে ওদের ক্যাপ্টেন এতে তাড়াতাড়ি সব শেষ করতে চাইবে না। ওদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এরা যা করেছে সেটার প্রতিশোধ নিতে হবে ধীরে ধীরে।

লেগ্রাঞ্জ ধীর পায়ে লাশগুলোর ফাঁক দিয়ে, রক্তে ভেজা ডেক ধরে এগিয়ে এলো। “তোদের মধ্যে ক্যাপ্টেন কে?” জানতে চাইলো ও।

ইঞ্চবার্ড লেংচে লেংচে সামনে এগিয়ে এলো। হাতের একটা কাটা থেকে রক্ত ঝরে ওর জামা লাল হয়ে আছে। “জোসিয়াহ ইঞ্চবার্ড, আমিই মাস্টার।”

লেগ্রাঞ্জ ওর ঘাড় ধরে সামনে টেনে এনে ধাক্কা দিয়ে ডেক-এ ফেলে দিলো। “আত্মসমর্পণ করলি না কেননা?” হিসহিসিয়ে উঠলো ও। “আমাদের সাথে লড়াই করিস, কতো বড় সাহস তোর!”

লেগ্রাঞ্জ কোমর থেকে একটা ছুরি বের করে ইঞ্চবার্ডের গালে চেপে ধরলো। আমি তোর জ্যান্ত চামড়া ছাড়িয়ে নেবো, তারপর তোর সামনে তোর নাড়িভুড়ি কেটে হাঙ্গরকে খেতে দেবো।”

পাশের লোকগুলো সব হেসে উঠলো। ইঞ্চবার্ড কাঁপতে কাঁপতে অনুনয় করতে লাগলো।

“আমরা মাদ্রাজ থেকে মশলা আর সুতি কাপড় নিয়ে এসেছি, সব জাহাজের খোলে আছে। আর বাইরে আছে মরিচ। সব নিয়ে নিন।”

লেগ্রাঞ্জ ওর দিকে মুখ এগিয়ে নিলো। “তাতো নেবোই। আমি তোর জাহাজের প্রতিটা তক্তা, প্রতিটা পেরেক খুলে ফেলবো। তারপর প্রতিটা লুকানো পয়সা পর্যন্ত খুঁজে বের করবো। কিন্তু সেজন্যে আমি তোকে কিছু করবো না, তুই শাস্তি পাবি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্যে, আমার লোকেদের যা করেছিস সেটার জন্যে।”

নিচে নামার সিঁড়ির মুখে একটা ধ্বস্তাধস্তির আওয়াজ হলো। লেগ্রাঞ্জ ঘুরে সেদিকে তাকাতেই দেখে ওর দুজন লোক এক বন্দিকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে। আসছে। বন্দিটা একজন মহিলা, সেটা চোখে পড়তেই সবাই শিষ দিয়ে উঠলো। মহিলার শরীরের উর্ধাংশের কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, হাত দিয়ে নিজের গলা আর বুক ঢেকে রেখেছে সে। লোক দুটো মহিলাটাকে ধাক্কা দিয়ে লেগ্রাঞ্জের সামনে ফেলে দিলো।

“ক্যাপ্টেনের কেবিনে পেয়েছি একে। এগুলো লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলো।” একজন দস্যু নিজের মুঠি খুলতেই একগাদা সোনার মুদ্রা গড়িয়ে পড়লো। বাকিরা তা দেকেহ আবারও শিষ দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করলো।

লেগ্রাঞ্জ মেয়েটার থুতনির নিচে হাত দিয়ে জোর করে ওর মুখটা নিজের দিকে ফেরালো। মেয়েটা কালো নিষ্কল্প চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে, চোখের মণিতে অপরিসীম ঘৃণা, অনুগ্রহ ভিক্ষার কোনো চিহ্ন সেখানে নেই।

“ব্রেজিয়ারটা নিয়ে এসো,” আদেশ দিলো লেগ্রাঞ্জ। তারপর চুল ধরে টেনে মেয়েটাকে দাঁড় করিয়ে আচমকা প্রচণ্ড জোরে দিলো একটা ধাক্কা। মেয়েটা পিছন দিকে সরে গিয়ে একটা রশিতে বেঁধে উল্টে পড়ে গেলো। পড়ে গিয়ে নড়ার আগেই চারজন দস্যু এগিয়ে গেলো ওর দিকে, তারপর ওর চার হাত পা চারদিকে টেনে ডেক-এর সাথে চেপে ধরে রাখলো।

লেগ্রাঞ্জ এগিয়ে গেলো ওর দিকে। তারপর হাতের ছুরি দিয়ে মেয়েটার স্কার্টের খানিকটা কেটে দিতেই ওর লোকেরা মেয়েটার দুই পা দুদিকে টেনে ধরলো। মেয়েটা মোচড়া মুচড়ি করতে লাগলো কিন্তু লোকগুলো শক্ত হাতে ওকে ধরে রাখলো। লেগ্রাঞ্জ স্কার্টের আরো খানিকটা উপরে তুললো, মেয়েটার মসৃণ উরু বের হয়ে গেলো তাতে। লোকজন অশ্লীল শব্দ করতে লাগলো।

লেগ্রাঞ্জ ইঞ্চবার্ডের দিকে তাকালো। “এ কি তোর বৌ? নাকি বেশ্যা?”

“একজন যাত্রী,” দাঁতে দাঁত চেপে বললো ইঞ্চবার্ড। ওনাকে ছেড়ে দিন হুজুর।”

“সেটা নির্ভর করবে ও আমাকে কেমন মজা দেয় তার উপর।”

দুজন লোক একটা লোহার তেপায়ার উপর একটা ব্রেজিয়ার নিয়ে এলো। ভিতরে কয়লা সামান্য আভায় জ্বলছে। লেগ্রাঞ্জ ওগুলোকে নিজের তরবারি দিয়ে নাড়তে লাগলো। একটু পরেই তরবারির ডগাটা গনগনে লাল হয়ে গেলো। তারপর ধোঁয়া ওঠা তরবারিটা তুলে এনে মেয়েটার উপর ধরে রাখলো। মেয়েটার চোখের দিকে তাকালো আবার। এখন আর সেখানে কোনো প্রতিরোধ নেই, আছে নিখাদ আতংক।

লেগ্রাঞ্জের ঠোঁটে একটা চিকন হাসি দেখা গেলো। ও তরবারিটা ঠিক মেয়েটার উরুর সংযোগস্থলের কাছাকাছি নামিয়ে আনলো। শরীরের মাত্র কয়েক ইঞ্চি উপরে হবে। মেয়েটা এক ফোঁটা নাড়াচাড়া করছে না। তরবারির ছোঁয়া লাগার ভয়ে মোচড়ামুচড়ি দূরে থাক যেনো নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছে। তরবারিটা থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছে।

লেগ্রাঞ্জ তরবারিটা আরো খানিকটা নামানো শুরু করতেই মেয়েটা আকাশ বাতাস ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে ছিলো ধোঁকাবাজি। এখন তরবারিটা মাত্র এক চুল উপরে বলা যায়। লেগ্রাঞ্জ হেসে উঠলো। ওর অত্যাচারে দাসী মেয়েটা মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক দিন ও এরকম মজা করার সুযোগ পায় না।

“সব নিয়ে নিন,” অনুনয় করলো মেয়েটা। “জাহাজ, স্বর্ণ, যা ইচ্ছা নিয়ে নিন।”

“নেবো,” লেগ্রাঞ্জ কথা দিলো। “কিন্তু তার আগে একটু মজা না করলে হয়!” তরবারির মাথাটা ততোক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। ও আবার সেটাকে ব্রেজিয়ারে ঠেসে দিলো। এবার আগের চাইতেও গরম হলে তারপর বের করে মেয়েটার চোখের সামনে ধরে রাখলো। মেয়েটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। “দেখতে পাচ্ছিস এটা? এটায় তুই মরবি না। কিন্তু আমি তোকে এমন শিক্ষা দেবো যা তুই কোনোদিন কল্পনাও করিসনি।”

“নরকের কীট, তুই নরকেই যা,” হিসিয়ে উঠলো মেয়েটা।

ওর কথা লেগ্রাঞ্জকে বরং আরো বেশি উসকে দিলো। ওর এরকম তেজী মেয়েই পছন্দ-যখন শেষ পর্যন্ত ও হাল ছেড়ে দেবে তখনকার তৃপ্তির সাথে আর কিছুর তুলনা হয় না। ও নিজের ঠোঁট চাটতেই রক্তের স্বাদ পেলো। নিচের তলা থেকে চিৎকার আর হাতাহাতির আওয়াজ শোনা গেলো, কিন্তু লেগ্রাঞ্জ তখন এই খেলায় এতো বেশি মজে ছিলো যে অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত ছিলো না। ভাবলো ওর লোকেরা হয়তো লুটের মাল নিয়ে ঝগড়া করছে। ওদেরকে পরে সামলানো যাবে।

ও নিজের খালি হাতটা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে নরম সুরে বললো, “তোকে আমি একটু একটু করে পোড়াবো, বুঝলি মাগী? পুরো শরীরে হ্যাঁকা দেবো। তারপর তোকে ভোগ করে আমার লোকেদের মাঝে ছেড়ে দেবো। ওরা তোকে নিয়ে তখন যা ইচ্ছে করবে।”

*

“দাঁড় ওঠাও,” শান্ত স্বরে আদেশ দিলো টম। সেন্টারাসের ডিঙ্গি নৌকাটা দস্যুদের জাহাজের কালো শরীরের নিচে আসতেই আটটা দাঁড়ের সবগুলো উঠে গেলো নৌকার ভিতরে। টম আস্তে নৌকার হাল ঘুরিয়ে দিলো। ও একবারের জন্যেও উপরে তাকালো না। সমস্ত মনোযোগ নিপে নৌকাটা জাহাজের সমান্তরালে নিয়ে আসা। নৌকার সামনে বসে আবোলি আর ডোরিয়ান ফাইটিং কক-এর ডেক-এর দিকে নিজেদের মাস্কেট তাক করে রেখেছে। কিনার থেকে দেখা গেলো একটা কামান বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ওদের দিকে তাক করে আছে। যদি দস্যুদের জাহাজে একজন দস্যুও থেকে থাকে, তাহলে সে এটা দিয়ে নৌকার সবাইকে ভর্তা বানিয়ে ফেলতে পারবে।

টম ঘাড় ঘুরিয়ে সেন্টারাস-এর দিকে তাকালো। এখান থেকে আধা মাইলটাক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। দস্যুরা ওটাকে খেয়াল করেনি করলেও এখন লুটতরাজ নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে ওটার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সারাহ আর ইয়াসমিনির সাথে মাত্র দুজন লোককে রেখে এসেছে ও। ওরা যদি এখানে ব্যর্থ হয়, তাহলে মেয়ে দুটোর কপালে শনি আছে। ও জোর করে চিন্তাটা সরিয়ে দিলো।

ডিঙ্গি নৌকাটার গলুই দস্যুদের জাহাজের গায়ে ঘষা খেলো। হালকা খসখস শব্দ হলো শুধু। আবোলি জাহাজে ওঠার সিঁড়িটা আঁকড়ে ধরে উপরের দিকে ইশারা করলো। টম মাথা নেড়ে জানালো যে কেউ নেই। পানির কাছাকাছি জাহজের খোলে একসারি খুপরি দেখা গেল। কামানের খোপ হিসেবে খুব নিচু ওগুলো। টম বুঝলো ওগুলো সম্ভবত বাতাস চলাচলের জন্যে বানানো হয়েছে। জাহজটা যখন দাস আনা নেওয়া করতো তখন কাজে লাগতো।

টম বেল্ট থেকে নিজের ছুরিটা খুলে নিয়ে হাতের কাছের খুপরিটার জোড়া লাগানো জায়গাটায় ঢুকিয়ে চাড় দিলো। যখন দাসেরা এখানে থাকতো তখন এটাকে ভিতর থেকে হুড়কো টেনে বন্ধ করে দেয়া হতো। কিন্তু দস্যুদের এসব ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথা নেই। ওর ছুরির ফলা ভিতরের হুড়কোয় স্পর্শ করলো। ও ছুরিটা উপর দিকে চাড় দিলো।

হুড়কো খুলে পড়ে গেলো। খুপরিটা খুলে ভিতরের আলো আধারিতে উঁকি দিলো টম। কেউ ওর দিকে তেড়ে এলো না। আবোলি নৌকাটা স্থির করে ধরে রাখলো, আর ও দেহটা বাকিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলো। বাকিরাও অস্ত্র হাতে ওর পিছু নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। আবোলির অবশ্য ওর দশাসই শরীরটা নিয়ে ঐ ছোট ফুটো দিয়ে ঢুকতে কষ্ট হলো।

খোলটা একেবারে জিনিসপত্রে ঠাসা আর বদ্ধ। টম প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে আগালো, কিন্তু তবুও মাথা উপরের কাঠে ঠুকে গেলো। দস্যুদের লুট করা মালামালের ভিতর দিয়ে আগাতে লাগলো ও। আলো বলতে উপরের কাঠের ফাঁক গলে যেটুকু আসছে সেটুকুই। সেন্টারাসের বাকি লোকজন আর আবালি আর ডোরিও আছে পিছনেই। বাকিদের মধ্যে আছে আলফ উইলসন, টমের বাবার সাথেও জাহাজ চালিয়েছে সে; আবোলির দুই ছেলে, যামা আর তুলা। অন্ধকারে ওদের চোখ জ্বলজ্বল করছে, জাহাজটার দাস ব্যবসা সংক্রান্ত অতীত বুঝতে পেরে ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড ক্ষেপে আছে। ওরা প্রত্যেকেই জানে যে অন্য কোনো পরিস্থিতিতে এখানে আসলে হয়তো ওরা কাঠের ভিতর থেকে মুখব্যাদান করে থাকা এই লোহার কড়াগুলোর সাথে বাধা থাকতো, তারপর সমুদ্রের ওপারে আমেরিকা আর ক্যারিবিয়ানে পশুর মতো বিক্রি হয়ে যেতো; তবে সেটাও নির্ভর করছে যদি শেষ পর্যন্ত ওরা এই খুপরির ভিতর বেঁচে থাকতে পারে, তবেই। ওদের মনে হতে লাগলো এই তক্তাগুলো থেকে যেনো বাতাসে সেই অভাগা লোকগুলোর দুর্দশা আর কষ্টের কান্না আর ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।

টম মই বেয়ে উঠে সাবধানে মাথা তুললো উপরে। ও যেখানে মাথা তুলেছে সেটা জাহাজের কোয়ার্টারডেক, একেবারে পিছনের মাস্তুলের কাছেই। সামনে গনগনে সূর্যের নিচে শুধু মানুষের লাশ ইতস্তত পড়ে আছে। জ্যান্ত সবাই ডাওজারে গিয়েছে, সেটা লুট করতে। টম পিছনের সবাইকে হাতের ইশারা করলো উপরে উঠে আসতে। ও লম্বা একটা কামানের দিকে ইঙ্গিত করলো। ওটার নল সোজা ডাওজারের খোলের গায়ে গিয়ে ঠেকেছে।

ও দ্রুত আদেশ দিলো, “ওটা টেনে আনো ভিতরে।”

যামা আর তুলা ঝটপট কামানটা যে দড়ি দিয়ে জাহাজের সাথে বাঁধা সেটা টেনে ধরলো। আলফ উইলসন আর অন্য লোকটাও যোগ দিলো ওদের সাথে। সবাই একসাথে টেনে ভিতরে নিয়ে এলো ওটা। ঘড় ঘড় করতে করতে কামানটা নিজের জায়গায় ফিরে আসতেই খোপটা দিয়ে আলো প্রবেশ করতে লাগলো। সেদিকে দিয়ে নিজের মাথা বের করে দিলো টম। দুটো জাহাজই একসাথে চলছে এখন। কিছুক্ষণ পরপর দুটোর খোল বাড়ি খাচ্ছে পরম্পর। আর দুটোর ফাঁকে এক চিলতে পানি ঝিকমিক করছে।

ও নিজের বেল্ট খুলে ফেললো। “আমাকে ধরো, আবোলি।”

আবোলি ওর পা ধরে রাখলো, আর ও কামানের খোপটা দিয়ে শরীর বাকিয়ে মুচড়িয়ে ডাওজারের গা স্পর্শ করলো। কিন্তু ডাওজারের গায়ে কোনো কামানের খোপ নেই। তবে টম জাহাজের লেজের দিকের জানালাগুলো হাতে পেলো, ঠিক ক্যাপ্টেনের কেবিনের জানালা ছিল ওটা। জানালার কাঁচের ওপাশে কয়েকটা অবয়ব নাড়াচাড়া করতে দেখা গেলো, বোঝা যাচ্ছে যে ভিতরে কোনো দামী জিনিস লুকানো আছে কিনা সেটা খুঁজতে পুরো কেবিনটায় তাণ্ডব চালাচ্ছে। টম সাথে সাথে জমে গেল জায়গায়, কিন্তু ওরা নিজেদের কাজে এতো বেশি মগ্ন হয়ে ছিলো যে, দুই জাহাজের মাঝখানের এই গাঢ় অন্ধকারে ওর উপস্থিতি টের পেলো না।

“ধরো দেখি এটা,” একজন ডাক দিলো। “খুব বেশি ভারি!”

ভাঙা জানালা দিয়ে স্পষ্ট লোকটার গলা শোনা যাচ্ছিলো। টম দেখলো আর একজন লোক এসে তার সাথে হাত লাগালো। দুজন মিলে একটা শক্ত বক্স ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলো।

কেবিনে আর কেউ নেই। টম আরো খানিকটা মুচড়ে এগিয়ে গেলো, ভাগ্যিস আবোলি শক্ত হাতে ওকে ধরে রেখেছিলো। জানালার ভাঙা কাঁচের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলো ও, সাবধান থাকছে যাতে কবজি না কাটে। তারপর জানালার হুড়কো খুলে জানালাটা খুলে ফেললো।

“ছেড়ে দাও,” ফিসফিসিয়ে বললো টম। আবোলি ছেড়ে দিতেই ও জানালার গোবরাট ধরে নিজেকে ভিতরে টেনে তুললো। ওর পতনের ধাক্কায় কয়েকটা কুশন ছড়িয়ে পড়লো নিচে। ওগুলো ছিঁড়ে তুলা বের করে ফেলা হয়েছে। ভিতরে যদি দামি কিছু থেকে থাকে তাহলে তা আর নেই।

আবোলি টমের নীল তরবারিটা জানালা দিয়ে পাঠিয়ে দিলো। টম ওটা নিজের কোমরে বেঁধে নিয়ে পিস্তলটা পরীক্ষা করে নিলো। বাকিরাও তততক্ষণে চলে এলো এই জাহাজে। সবাই ভিতরে ঢোকার পর দেখা গেলো নাড়াচাড়ার আর জায়গা নেই।

কেবিনের উপরের ডেক থেকে একটা হাসির হল্লা ভেসে এলো। কি হচ্ছে ভেবে পেলো না টম।

আচমকা খুলে গেলো দরজা। এক দস্যুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো সামনে। সে এতোক্ষণ রান্নাঘরটা লুট করছিলো সম্ভবত, কারণ তার এক হাতে দেখা গেলো এক গাদা রূপার চামচ আর এক হাতে একটা মোমদানি।

“কি করছো তোমরা? এসব আমার।” কিন্তু এরপরেই ওর খেয়াল হলো যে এরা ওর দলের কেউ না। “তোরা আবার কোন শালা?”

কিন্তু কেউ যে তরবারি চালাবে সেই জায়গা ঘরের ভিতরে ছিলো না। আবোলি হাতের ছুরিটাই চালালো শেষ পর্যন্ত। দস্যুর গলা এফোঁড় ওফোড় হয়ে গেলো। গলা চেপে ধরে মেঝেতে পড়ে গেলো সে। গলগল করে হাতের ফাঁক দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। হাতের চামচ আর মোমদানি ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে।

“আমার পিছনে আসো সবাই!” টম মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো ঘরটা থেকে। পুরো জায়গাটা কুরুক্ষেত্র হয়ে আছে : লোকজন কাপড়চোপড়ের গাটরি নিয়ে টানাটানি করছে, আলমারি ভেঙ্গে ভিতরের জিনিস ছড়িয়ে ফেলেছে, দামি দামি সব মশলা পুরো মেঝেতে সয়লাব হয়ে আছে। কয়েকজনকে দেখা গেলো রাম-এর একটা পিপা ভেঙ্গে সেটা থেকে খাওয়া। শুরু করেছে।

কারো হাতেই অস্ত্র নেই। বেশিরভাগই ওদেরকে ঘরটা থেকে বের হতে দেখেনি, বা দেখলেও বোঝেনি যে ওরা আসলে কারা।

সেন্টারাসের দলটা দেরি না করে আক্রমণ করে বসলো। ডোরি আর আবোলি অভিজ্ঞ যোদ্ধা। অসংখ্য যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছে। যামা আর তুলা ওদের বাবার লড়াইয়ের কাহিনি শুনে শুনে বড় হয়েছে। ওরাও আজ জীবনে প্রথম লড়াইয়ের স্বাদ নিলো। আলফ উইলসন আর বাকিরা এর আগে এভোবার কোর্টনীদের সাথে নানান অভিযানে গিয়েছে যে ওরা একেবারে নিখুঁতভাবে জানে যে কি করতে হবে।

দস্যুরা বলা যায় টেরও পেলো না যে ওদের সাথে কি হচ্ছে। বেশিরভাগই কিছু বুঝে ওঠার আগেই অক্কা পেলো। কয়েকজন হাতের কাছে যা পেলো তা দিয়েই আত্মরক্ষার চেষ্টা করলো-নেভিগেশনের বই, থালা বাটি, কাপড়ের গাটরি-কিন্তু তাদেরকেও অনায়াসে পেড়ে ফেলা হলো। চোখের কোনা দিয়ে টম দেখতে পেলো যে ডোরিয়ান মাপা পদক্ষেপে সামনে আগাচ্ছে। ওর সামনের দস্যুর হাতে ছুরি। ডোরিয়ান তরবারি দিয়ে ঝটকা মেরে ছুরিটা ফেলে দিলো, সাথে সাথেই সেটা ঘুরিয়ে দস্যুর হৃৎপিণ্ড বরাবর বসিয়ে দিলো। তারপর কবজির মোচড়ে তরবারিটা বের করে হাতল দিয়ে পিছনে আক্রমণোদ্যত একজনের মুখে আঘাত করলো। লোকটা মুখ চেপে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা, ডোরিয়ান সামনে এগিয়ে তাকেও এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো।

কিন্তু গুটিকয়েক দস্যু ঠিকই সিডি পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। “সবাই ডেক-এ যাও জলদি,” আদেশ দিলো টম। এতোক্ষণে উপরের কেউ না কেউ নিশ্চয়ই নিচে কি হচ্ছে সেটা টের পেয়ে গিয়েছে, ওদের কেউ যদি উপরে ওঠার রাস্তাটা বন্ধ করে দেয় তাহলে টম আর ওর দল নিচেই আটকা পড়ে যাবে।

টম গুলির বেগে সিঁড়ির দিকে ছুটলো। সিঁড়িটা রক্তে পিচ্ছিল হয়ে আছে, তবুও ও তিনটা করে ধাপ একবারে পার হতে লাগলো। সিঁড়ির মাথায় একজন লোককে দেখা গেলো; টম একটা পিস্তল বের করে বাম হাত দিয়ে গুলি করলো তাকে। এতো কাছে থেকে গুলি না লাগার প্রশ্নই আসে না। লোকটা ওর উপর মুখ থুবড়ে পড়লো। টম একদিকে সরে গিয়ে সংঘর্ষ এড়ালো, তারপর এক লাফে বাকি সিঁড়িটা টপকে উপরের ডেক-এ এসে উঠলো।

যুদ্ধের উত্তেজনায় ওর সবগুলো স্নায়ু টানটান হয়ে আছে। এক নজরেই সব চোখে পড়লো ওর পিছন দিকে বন্দীদেরকে জড়ো করে রাখা হয়েছে অস্ত্রধারী দস্যুরা ঘিরে রেখেছে তাদেরকে; জাহাজের ক্যাপ্টেন হাঁটু মুড়ে বসে আছে, সারা শরীর রক্তাক্ত; একটা মহিলাকে মেঝেতে চেপে রাখা হয়েছে, বিবস্ত্র, এক দাড়িওয়ালা দস্যু তার উরুর ফাঁকে একটা তরবারি ধরে আছে।

টম ওর দ্বিতীয় পিস্তলটা বের করে গুলি করলো। কিন্তু একটু বেশি তাড়াহুড়া করায় গুলি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পিছনের আর একটা লোকের গায়ে লাগলো। দস্যুদের ক্যাপ্টেন লাফ মেরে উঠে দাঁড়ালো। অন্ধ আক্রোশে সে হাতের তরবারিটা দিয়ে শোয়ানো মেয়েমানুষটাকে বিদ্ধ করতে গেলো।

আর একটা গুলির শব্দ পাওয়া গেলো। ডোরিয়ান টমের পাশে উঠে এসেছে। ওর হাতের দুটো পিস্তল থেকেই ধোঁয়া উড়ছে; দস্যুদের ক্যাপ্টেন তরবারি ফেলে কবজি চেপে টলতে টলতে পিছনে সরে গেলো। রক্ত পড়ছে সেখান থেকে।

টম ভাইয়ের দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসলো। “গুড় শট, ডোরি।”

“আমিতো ব্যাটার হৃদপিণ্ডের দিকে তাক করেছিলাম,” ডরিয়ান গুলিহীন পিস্তলটা কোমরে গুজতে গুজতে বললো। তারপর আবার তরবারিটা তুলে নিলো ডান হাতে। এক দস্যু বর্শা হাতে ওর দিকে এগিয়ে এলো। ডোরিয়ান একপাশে সরে গিয়ে আঘাতটা এড়ালো, ফলে লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। ডোরিয়ান সেই সুযোগে নিজের তরবারি গেঁথে দিলো। একেবারে বুকের মাঝ বরাবর ঢুকলো তরবারিটা, ফলে শোল্ডার ব্লেডের মাঝখানে প্রায় এক বিঘত পরিমাণ লম্বা একটা ক্ষত সৃষ্টি হলো।

আবোলি ততোক্ষণে আবার নিচে নেমে গিয়েছে। টমও ওর পিছু পিছু নিচে নেমে গেলো। আবারও জাহাজের পিছনে আর একটা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেলো। হুঙ্কার দিয়ে উঠে ডাওজারের লোকজন এবার ওদের বন্দীকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওদের কাছে অস্ত্র ছিলো না কিন্তু দস্যুরা ছিলো একদম অপ্রস্তুত। কয়েকজন লুটতরাজে চলে গিয়েছিলো; আর বাকিরা ছিলো লেগ্রাঞ্জের সাথে মহিলাটার কান্ড কীর্তি দেখায় ব্যস্ত। কয়েকজন নিজেদের অস্ত্র নামিয়ে রেখেছিলো, ফলে এখন ওরা দুই দিক থেকেই আক্রমণের শিকার হলো। নাবিকেরা দস্যুদের অস্ত্র জোর করে কেড়ে নিলো, নাহয় এমনভাবে চেপে রাখলো যাতে ওরা ওগুলো আর ব্যবহার করতে না পারে। টম এর ভিতর দিয়েই এগিয়ে দস্যুদের সর্দারকে খুঁজতে লাগলো।

ওর পা কিছু একটায় আটকে গেলো। চোখ নামিয়ে সেদিকে তাকালো ও। একটু আগে দেখা মহিলাটা, শরীর বাকিয়ে একটা বল-এর মতো হয়ে আছে, ছেঁড়া জামা দিয়েই আব্রু রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাছেই একটা গনগনে ব্রেজিয়ার জ্বলছে। আশেপাশের হট্টগোলে সবাই ভুলে গিয়েছে সেটার কথা।

এই যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝেও, টম সতর্ক হয়ে গেলো। আগুন হচ্ছে সকল নাবিকের নিকৃষ্টতম ভীতি–যা কিনা একটা জাহাজকে মুহূর্তেই কালো ছাইতে রূপান্তরিত করতে পারে।

আবোলিও দেখেছে সেটা। ও একটা পা দিয়ে ব্রেজিয়ারটা তুলে নিয়ে পাশের দস্যুদের জাহাজে ছুঁড়ে দিলো। গরম কয়লা ছড়িয়ে পড়লো ডেক জুড়ে। একটা গিয়ে পড়লো এক গাদা রশির উপর, কিন্তু ডাওজারের এই হট্টগোলের মাঝে কেউ সেটা খেয়াল করলো না।

টম মেয়েটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। কেউ কাছে আসতে চাইলেই ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দিলো দূরে, আর ফাঁকে ফাঁকে শত্ৰুদলের ক্যাপ্টেনকে খুঁজতে লাগলো। সেন্টারাসের লোকজন, ডাওজারের ক্রু আর দস্যুদল ততোক্ষণে মরণপণ লড়াইতে লেগে গিয়েছে। নিচের ডেক থেকে ইঁদুরের মতো আরো অনেকগুলো দস্যু দৌড়ে এলো। এসেই এমন এক আক্রোশে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো যা সচরাচর টমের চোখে পড়েনি আগে। এর কারণ অবশ্য জানা, ওদের আর হারাবার কিছু নেই।

তারপর আচমকাই, ঠিক বাতাসের গতি পরিবর্তনের মতো দস্যুরা রণে ভঙ্গ দিয়ে দিলো। টমের সামনের জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেলো। এটাই সুযোগ ওর ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করার। ও সামনে এগিয়ে পলায়নরত কয়েকজনকে পেড়ে ফেললো। প্রথমে ও বুঝতে পারলো না ওরা এভাবে পালাচ্ছে কেননা। একটু পরেই গন্ধটা পেলো টম। চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়ানো গান পাউডারের ঝাঝালো গন্ধটা না। এটা হচ্ছে কাঠ আর আলকাতরা পোড়ার শক্তিশালী দম আটকানো গন্ধ।

উদ্দত শত্রু আর জ্বলন্ত জাহাজের মাঝে দস্যুরা শেষমেশ জাহাজটাকেই বাঁচাবে বলে ঠিক করেছে, আর সেজন্যেই সেদিকে দৌড়ে যাচ্ছে যদি জাহাজটা কোনোমতে বাঁচাতে পারে। একজনকে দেখা গেলো ডাওজারের কিনারা দিয়ে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। টম তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। লোকটা দুই জাহাজের মাঝখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে খোলে বাড়ি খেয়ে পানিতে আছড়ে পড়লো। টম আশেপাশে তাকালো। কালো ধোঁয়া ফাইটিং কককে পুরোপুরি ঘিরে ফেলেছে; জাহাজের কিনারা ছাড়িয়ে আগুন থাকার জায়গার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এখন।

“এটাকে ঐ জাহাজ থেকে দূরে সরাতে হবে,” চিৎকার করে বললো টম। আগুন যদি কোনোভাবে ডাওজারে লেগে যায় তাহলে ওরা সবাই পুড়ে মরবে। যামা ওর বিশাল কুঠারটা দিয়ে ঝুলতে থাকা সব রশি কেটে দিতে লাগলো। ডাওজারের দুজন ক্রু-ও দুটো তরবারি তুলে নিয়ে ওর সাথে যোগ দিলো।

আগুনের শিখা লকলক করে উপরে উঠতেই লাগলো। কিন্তু তখনো জাহাজ দুটো জোড়া লেগেই আছে। উপরে তাকিয়ে টম দেখলো ডাওজারের মাস্তুলের একটা আড়কাঠ দস্যুদের জাহাজটার রশিতে বেঁধে গিয়েছে। ফলে দুটো জাহাজই খুব শক্তভাবে আটকে আছে।

“কুড়ালটা দাও আমাকে।” বলে ও যামার হাত থেকে সেটা নিয়ে মাস্তুলের সাথে বাধা জালটা বেয়ে উঠতে লাগলো উপরে। ডোরিয়ানও উঠলো পিছু পিছু।

জালের ফাঁকগুলোয় পা বাঁধিয়ে টম মাস্তুলের মাথার কাছে উঠে এলো। নিজের জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়ায় এর আগে কখনোই ওকে এতো উপরে উঠতে হয়নি, কিন্তু তবুও দেখা গেলো কাজটায় ভালোই দক্ষ ও।

মাথায় পৌঁছেই আড়কাঠ আর রশিগুলোর স্তূপে কোপ দিতে লাগলো টম। ওর ঠিক নিচেই দেখা গেলো আগুন জ্বলছে। দেখে মনে হচ্ছে আগুনের শিখা ওর জুতোর তলা চাটছে। ধোয়ায় চোখে পানি চলে এলো। ডোরিয়ানও পৌঁছে একই কাজ করতে লাগলো। ও আড়কাঠের উপর চড়ে বসে যে পাশটায় রশিগুলো আটকে আছে সে পাশটা কোপাতে লাগলো।

কিন্তু এরপরেও দেখা গেলো জাহাজ দুটো কেউ কারো বন্ধন ছাড়ছেই না।

“ছুটছে না কেন?”

ডোরিয়ান একটা পেরেকের দিকে দেখালো। ওটার সাথে রশিগুলো আটকে আছে। ও টমের হাত থেকে কুড়ালটা নিয়ে ওটার দিকে এগিয়ে গেলো।

কিন্তু কিছু একটা এসে আড়কাঠটায় আঘাত করলো। টমও টের পেলো কনটা, তারপরেই মাস্তুলের গায়ে হওয়া ছিদ্রটা দেখতে পেলো। ঠিক ডোরিয়ানের পায়ের কাছে। ধোয়ার ভিতর দিয়েই টম দেখতে পেলো দস্যুদলের সর্দার হাতের মাস্কেটটা নামাচ্ছে। সে-ই করেছে গুলিটা।

ও আমাদের দুজনকেই একসাথে মারতে চাচ্ছে, মনে মনে ভাবলো টম। এক মুহূর্ত ইতস্তত না করে ও আড়কাঠের শেষ মাথায় এগিয়ে গিয়ে লাফ দিয়ে ফাইটিং কক-এর পাল ধরে ঝুলে পড়লো। তারপর একটা পাক খেয়ে কিছু একটা ধরে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুই পেলো না। এতো জোরে নিচে পড়তে লাগলো যে ঘষায় ওর হাত পা ছিলে গেলো, তারপর প্রচণ্ড জোরে শক্ত ডেক-এ আছড়ে পড়লো। ধোঁয়া আর হট্টগোলের মাঝে কেউ ওকে খেয়াল করলো না। সবাই পানি ভরা বালতি হাতে ছোটাছুটি করছে, চেষ্টা করছে আগুনের তেজ কিছুটা কমাতে। বাকিরা চেষ্টা করছে সাথের নৌকাটা নামাতে। ওটা নোঙ্গরে আটকে বেখাপ্লাভাবে ঝুলছে।

লেগ্রাঞ্জ মাস্কেটটায় গুলি ভরছে আবার। টম নিজেকে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলো। দুজনেই ছিটোকে পড়লো মাটিতে। মাস্কেটটা লেগ্রাঞ্জের শরীরের নিচে পড়লো। লেগ্রাঞ্জ শরীরকে ঝাড়া দিয়ে টমকে ফেলে দিতে চাইলো কিন্তু টমের শরীরে ওজনের জন্যে পারলো না। টম নিজের মোজার ভেতর থেকে ছুরিটা বের করে আনলো।

লেগ্রাঞ্জ কিছু করার না পেয়ে অন্ধের মতো ডেক-এর উপর একটা অস্ত্রের জন্যে হাতড়াতে লাগলো। একটা কামানের নিচে একটা কাঠের মুগুর পড়ে ছিলো, সেটায় হাত লাগলো ওর। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে ও সেটা দিয়ে টমের মাথায় বাড়ি দিলো। সময়মতো টমের চোখে পড়লো ব্যাপারটা। ও মাথা সরিয়ে ফেললো, ফলে বাড়িটা লাগলো ওর কাঁধে। কিন্তু টমের বন্ধনুক্ত হতে লেগ্রাঞ্জের ওটুকুই যথেষ্ট ছিলো। ও ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে থাকা মাস্কেটটা তুলে নিয়ে টমের দিকে তাক করে ধরেই ট্রিগার টিপে দিলো।

চকমকি পাথরটায় ইস্পাতের ঘষায় ফুলকি ছুটলো। টম চমকে উঠে পিছু হটার চেষ্টা করলো। কিন্তু মাস্কেটটায় মিসফায়ার হলো। ক্রুদ্ধ গর্জন ছেড়ে লেগ্রাঞ্জ অস্ত্রটা উল্টো করে ব্যারেল চেপে ধরে টমের দিকে এগিয়ে গেলো।

বাতাসে ধোয়া কেটে গিয়েছে ততক্ষণে। লেগ্রাঞ্জের পিছনে তাকিয়ে টম দেখলো যে জাহাজ দুটো সরে যাচ্ছে দূরে। ডোরিয়ান ডাওজারকে মুক্ত করে ফেলেছে। ওকে এখনি সাঁতরে ওটায় গিয়ে উঠতে হবে-কিন্তু সামনেই দাঁড়িয়ে আছে লেগ্রাঞ্জ, গদার মতো করে ধরে আছে নিজের মাস্কেটটা। টম পিছিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে দস্যুর ভয়ানক বাড়িগুলো এড়িয়ে যেতে লাগলো। ততোক্ষণে পূর্ণোদ্যমে জ্বলতে শুরু করেছে আগুন; আর সবাই আগুন নেভানোয় ক্ষান্ত দিয়ে নিজের জান বাঁচানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু লেগ্রাঞ্জ। তবুও টমকে আক্রমণ করতেই থাকলো, এতো দ্রুত ও হাতের অস্ত্রটা ঘোরাতে লাগলো যে টম যে কিছু একটা হাতে তুলে নেবে সে সুযোগই পাচ্ছিলো না।

টম আর এক ধাপ পিছিয়ে গেলো আর একটু পরেই জাহাজের কিনার। বহু কষ্টে মাস্কেটের আরো একটা আঘাত এড়িয়ে ও রেইলের উপর শরীরটা টেনে তুললো।

সরু ধারটার উপর ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ও নিচের পানির দিকে তাকালো একবার। জাহাজটা বাতাসের ধাক্কায় আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। ও যদি লাফ দেয় তাহলে বাতাস ওকে জাহাজের নিচে ঠেলে দেবে। সেক্ষেত্রে জাহাজের খোলে লেগে থাকা শামুকে কেটে মোরব্বা হতে সময় লাগবে না। তবে যদি এর আগেই হাঙ্গর ওকে ধরে ফেলে তাহলে ভিন্ন কথা।

লেগ্রাঞ্জও ব্যাপারটা জানে। ও তাই আক্রমণে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে ব্যাপারটা উপভোগ করলো। ও জানে না যে টম কে, কোথা থেকে এসেছে বা কিভাবে জাহাজে উঠেছে, শুধু জানে যে টম ওর হাত থেকে ওর শিকার কেড়ে নিয়েছে। আর টমের জন্যেই ওর জাহাজটাও এখন হারাতে হচ্ছে। আবারও একটা ক্রুদ্ধ গর্জন ছেড়ে ও টমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। উদ্দেশ্য টমকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেবে।

টম আঘাতটাকে এড়িয়ে পিছন দিকে ঝাঁপ দিলো। অবাক চোখে লেগ্রাঞ্জ দেখলো, টম নিচের পানিতে আছড়ে না পড়ে শূন্যে ভাসছে। তারপর জাহাজের পাশ থেকে এমনভাবে উড়ে গেলো যেনো ওর পাখা গজিয়েছে।

লেগ্রাঞ্জ খেয়াল করেনি যে জাহাজের মাস্তুলের আড়কাঠের সাথে পাল খাটানোর যে দড়িটা বাধা সেটা টম আগেই ধরে ফেলেছিলো। টম ঝুলতে ঝুলিতে যতোদূর সম্ভব দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসতে লাগলো, আসার সময় গতি আরো বেশি বেড়ে গেলো কারণ জাহাজ ঘুরে গিয়ে ওর ভরবেগ আরো বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। ও পা দুটো ভাজ করে বুকের কাছে তুলে আনলো, তারপর লেগ্রাঞ্জের কাছে আসতেই সপাটে পা চালালো। বুটশুদ্ধ পা জোড়া লেগ্রাঞ্জের কপালে আঘাত হানলো। এতো জোরে লেগ্রাঞ্জের শরীরটা বেঁকে গেলো যে টম স্পষ্ট ওর মেরুদণ্ড ভাঙার শব্দ শুনতে পেলো। লেগ্রাঞ্জ পা ভাঁজ হয়ে পিছনে উল্টে পড়ে গেলো। সাথে সাথে আগুন এসে গ্রাস করালো ওকে। এক মুহূর্তের জন্যে টম লেগ্রাঞ্জের ভয়ার্ত মুখটা দেখতে পেলো। ওর দাড়ি, চুল আর কাপড়ে আগুন ধরে গিয়েছে ততোক্ষণে, চেহারায় ফোস্কা পড়ে কাঁপছে।

টম দড়িটাতে ঝুলে উল্টো পাশের পানির উপর পৌঁছে গেলো। তারপর বিপরীত দিকে ফিরতে শুরু করতেই ছেড়ে দিলো দড়িটা। ঝুপ করে পড়লো গিয়ে পানিতে। হাঙ্গরেরা ওর রক্তের গন্ধ পাওয়ার আগেই শক্ত হাতে সাঁতার কেটে সহজেই ডাওজারের কাছে পৌঁছে গেলো ও। ডোরিয়ান মইয়ের শেষ ধাপে অপেক্ষা করছিলো ওকে ধরে টেনে তোলার জন্যে।

“সারাহ আর ইয়াসমিনি কোথায়?” হাফাতে হাফাতে বললো টম। তখনো শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়নি। ও পাগলের মতো ডাওাজারের চারপাশের পানিতে খুঁজতে লাগলো, তারপর ফাইটিং কক-এর জ্বলন্ত শরীরের ফাঁক দিয়ে ওদের দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

টম এরপর নিজের মনোযোগ ফেরালো দস্যুদের জাহাজের প্রতি। অগ্নিকুণ্ড ওটার প্রতিটা মাস্তুল আর কিনার ধরে জ্বলছে, পালগুলোতেও একই অবস্থা। কয়েকজনের গায়েও লেগে গিয়েছে আগুন। লোকজন থাকতে না পেরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যেসব দস্যু ডাওজারে আটকা পড়েছে তারা যে খুব আরামে আছে তা কিন্তু না। জাহাজের ক্রুরা সবাই ভয়ানক হিংস্র হয়ে আছে। কাউকেই ছাড়া হচ্ছে না। ঠিক দস্যুরা যেরকম বলেছিলো।

“একটা নৌকা নামিয়ে দেওয়া উচিত, সমুদ্রে হাবুডুবুর দস্যুদের দেখিয়ে বললো ডোরিয়ান। হাঙরের ডানা দেখা যেতেই চিৎকার শুরু হয়ে গেলো সবার মাঝে।

“এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে লাভ কি বলো, কেপ টাউনে গিয়ে সেই ফাঁসিতেই ঝুলতে হবে,” টম মনে করিয়ে দিলো।

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ধাক্কায় ওদের ফুসফুসের সব বাতাস বেরিয়ে গেলো, হল্কা এসে লাগলো সবার গায়ে। একটা বিশাল ঢেউ এসে জাহাজকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। যারা দাঁড়িয়ে ছিলো সবাই-ই ডেক-এ ছিটকে পড়লো। জ্বলন্ত ছাই আর ধ্বংসাবশেষ ঝরতে লাগলো উপর থেকে। সামনে তাকিয়ে দেখা গেলো ফাইটিং কক বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছে। শুধু কিছু পোড়া কাঠ ভাসতে দেখা যাচ্ছে পানিতে।

টম কষ্টে সৃষ্টে উঠে দাঁড়ালো। এখন আর কাউকে উদ্ধারের চিন্তা করে লাভ নেই। পানিতে থাকা প্রত্যেকটা লোকই নিশ্চিত অজ্ঞান হয়ে বিস্ফোরণের ধাক্কায় তলিয়ে গিয়েছে।

“ওটার পাউডার ম্যাগাজিনে লেগেছিলো মনে হয়।” জাহাজের পাশ থেকে এক পোড়খাওয়া চেহারার লোক বলে উঠলো। গায়ের কোট হারিয়ে ফেলেছে। সে; আর তার বাহু আর গালের একটা কাটা থেকে রক্ত ঝরছে। এরপরেও তার চেহারায় কর্তৃত্বের ছাপটা স্পষ্ট দেখতে পেলো টম।

“আপনিই কি ডাওজারের মাস্টার?”

“জোসিয়াহ ইঞ্চবার্ড।” লোকটা ফাইটিং ককের ধ্বংসাবশেষের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, টুকরো গুলো বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। “জাহাজটা আর ওটার ডাকাতগুলো দুটোর জন্যেই পরিণতিটা ভালোই হয়েছে বলবো।”

টম লড়াই সম্পর্কে লোকটার মন্তব্য শোনার অপেক্ষায় চুপ করে থাকলো, আশা করলো, ওরা যে সাহায্য করেছে সে জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। কিন্তু ইঞ্চবার্ড আর কিছুই বললো না।

“ভাগ্য ভালো যে দস্যুরা যখন আক্রমণ করেছিলো তখন আমরা কাছেই ছিলাম,” টম মনে করিয়ে দিলো। “আমরা আপনার জাহাজটাকে বাঁচিয়েছি।”

ইঞ্চবার্ড ওর কথার অর্থ সাথে সাথেই ধরতে পারলো। “দুঃখিত, আপনারা এজন্যে কিছু পাবেন না। কড়া ভাষায় জানিয়ে দিলো ইঞ্চবার্ড।

“আপনার জাহাজটা দস্যুরা দখল করে নিয়েছিলো। আপনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন,” জানালো ডোরিয়ান।

“আমি আত্মসমর্পণ করিনি।”

“কিন্তু সব দেখে কিন্তু সেটাই মনে হয়েছে।”

“আপনাদের যদি সেরকম মনে হয় তাহলে লন্ডনের নৌ আদালতে অভিযোগ করতে পারেন।”

টম আর কিছু বললো না। পনের বছর আগে একজন ফেরারি হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে এসেছিলো ও। ওর বড় ভাই বিলিকে হত্যার অভিযোগ আছে ওর বিরুদ্ধে। বিলি ছিলো একজন আপাদমস্তক শয়তান লোক। প্রচণ্ড রগচটা। টেমস নদীর ঘাটে, এক মধ্যরাতে ও টমকে আক্রমণ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। অন্ধকারে চিনতে না পেরে টম নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাকে খুন করে বসে। কিন্তু একথা বলে আদালতে পার পাওয়া যাবে না। ও যদি আবার ফিরে যায়, তাহলে নিশ্চিত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হবে।

ইঞ্চবার্ডের সেটা জানার কথা না। তবে ও টমের দুর্বলতাটা ধরতে পারলো। “আপনি যদি মামলা করতে চান তো কোনো সমস্যা নেই। আমি সানন্দে আমার জাহাজে করেই আপনাকে লন্ডনে নিয়ে যাবো।”

“আমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনার জাহাজটা রক্ষা করেছি।” ডেক-এর লোকদের মাঝে উত্তেজিত কোলাহল শোনা গেলো। সেন্টারাস পাশাপাশি চলে এসেছে। আবোলি, সারাহ আর ইয়াসমিনিকে ধরে ডাওজারে চড়তে সাহায্য করলো। আমি আমার লোকজন, এমনকি আমার পরিবারের জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছি,” টম আবার বললো।

ইঞ্চবার্ডের কণ্ঠ নরম হলো কিছুটা। “আমার হাত-পা বাঁধা, স্যার। ব্যাপারটা একটু বুঝতে চেষ্টা করুন। আমি যদি আমার মালিকদের না জানিয়ে কিছু করি তাহলে আর কোনোদিন সমুদ্রের মুখ দেখা হবে না। আপনারা যা করেছেন, সেটার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবে যা চান তা-ই দিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু সেজন্যে আপনাকে আগে কর্তৃপক্ষকে বলতে হবে।”

টম মাথা ঝাঁকালো। মাস্টার এই জাহাজের দায়িত্বে আছে, কিন্তু এতে যা আছে সেসবের মালিক অন্য কেউ। “তাহলে আমি বরং তার সাথেই কথা বলি।”

সারাহ আর ইয়াসমিনি মই বেয়ে উপরে উঠে এলো। সারাহ নিজের পিছনে হাত বেঁধে ডেক জুড়ে ধ্বংসস্তূপ দেখতে লাগলো।

“পরুষ মানুষ মিয়ে আর পারা যায় না,” ইয়াসমিনিকে বললো ও। “কখনো কিছু এলোমেলো ছাড়া গুছিয়ে রাখতে জানে না।” তারপর ইঞ্চবার্ডের দিকে ফিরে বললো। “আমার স্বামী আপনার জাহাজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করে থাকলে দুঃখিত।”

ইঞ্চবাৰ্ড অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালো। “আমরাও ঠিক সেটা নিয়েই আলাপ করছিলাম।”

“আপনার স্বামী আমাদের সবাইকে রক্ষা করেছেন, আর একটা কণ্ঠ বলে উঠলো। লেগ্রাঞ্জের হাত থেকে যে মহিলাটাকে টম বাঁচিয়েছিলো সে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। কণ্ঠ নিচু আর কেমন ফ্যাসফেসে হয়ে আছে। এমন এক টানে কথা কথা বলছে যেটা টম ধরতে পারলো না। ছেঁড়া কাপড়টা পাল্টে সে নতুন একটা পোশাক পরেছে। একটা নীল রঙ্গা সূতি কাপড়, ঠিক তার বুকের উপর এসে শেষ হয়েছে। মনে হচ্ছে গোটা সমুদ্রই বুঝি মেয়েটার গায়ে এসে জুটেছে। চুল একটা ফিতেয় বাঁধা, তবে কয়েকটা ঠিকই ছুটে এসে ওর খোলা গলায় খেলা করছে। বয়স মোটেও বিশের বেশি না, কিন্তু চেহারা দেখে বোঝা যায় সেই তুলনায় সাহস আর শক্তিতে অনেক বেশি পরিপক্ক মেয়েটা। ডেক এর প্রতিটা লোক তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক ঘণ্টা আগেও এরা সবাই মেয়েটার সবচে গোপনীয় অঙ্গটাও দেখেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে কারো মনে মোটেও কামভাব জাগছে না।

“ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ড, আশা করি আপনি ভদ্রতা ভুলে যাননি,” মহিলা বললো। “এই লোকগুলো আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে আর আমি এমনকি এদের নামটা পর্যন্ত জানি না।”

টম সামান্য মাথা ঝাঁকালো। “আমার নাম টম,” বললো ও। “আমার ভাই, ডোরিয়ান; ওর স্ত্রী, ইয়াসমিন; আর আমার স্ত্রী, সারাহ। আপনাদের সাহায্য করতে পেরে আমরা খুব খুশি।”

“আমি অ্যানা দুয়ার্তে। ঐ দস্যুগুলো আমাদের সব লুট করে নিতে চেয়েছিলো।” অ্যানার শরীরে মৃদু কাঁপুনি বয়ে গেলো। “আমি জানি ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ড কেননা তার জাহাজ রক্ষা করার জন্যে বিনিময়ে কিছু দিতে পারছেন না। কিন্তু দয়া করে আমাদেরকে অকৃতজ্ঞ ভাববেন না। দস্যুরা আমাদের মালপত্রের যেটুকু রেখে গিয়েছে তার থেকে যতো ইচ্ছে নিয়ে নিন।”

টম আশা করলো ইঞ্চবার্ড প্রতিবাদ করবে। কিন্তু ক্যাপ্টেন একটা কথা-ও বললো না।

“আপনি আমাদের দিকটা ভাবছেন বলে খুশি হলাম ম্যাম, কিন্তু আমার মনে হয় এভাবে আমাদেরকে ইচ্ছে মতো সব দিয়ে দিলে কর্তৃপক্ষ বেজার হতে পারে। বিশেষ করে উনিও যদি ইঞ্চবার্ডের মতো হন, তাহলেতো কথাই নেই।”

অ্যানা নিজের মাথা নাড়লো।

“এগুলো আমার মালপত্র।”

“আপনার?”

“আমিই কর্তৃপক্ষ।”

“আপনি?” টম ওর আশ্চর্য ভাবটা লুকানোর কোনো চেষ্টাই করলো না।

সারাহ কনুই দিয়ে ওকে গুতো দিলো। “টম কোর্টনী। তুমি একটা আস্ত গবেট। তুমি পুরো আফ্রিকা জুড়ে মহিলা সেনানায়ক, মহিলা ডাকাত, মহিলা মানুষখেকোদের দেখেছো আর জিনিসপত্র বিক্রি করেছো আর এখন কিনা মহিলা ব্যবসায়ী দেখেই তব্দা খেয়ে গেলে?”

অ্যানা আর সারাহ দৃষ্টি বিনিময় করলো-ওদের চোখাচোখির কিছুই বুঝলো না টম। তবে নিজেকে আসলেই বেকুব আর বুদ্ধ মনে হতে লাগলো ওর। এদিকে সারাহের মুখে ওর নাম শুনে ইঞ্চবার্ডের মুখভঙ্গির আশ্চর্য পরিবর্তন ওর চোখে পড়লো না।

সারাহ ওর হাতের ভিতর নিজের বাহু ঢুকিয়ে একদিকে টেনে নিয়ে গেলো। “চলোতো, মিষ্টি করে বললো ও। “মিস দুয়ার্তের উপর যথেষ্ট ধকল গিয়েছে, এখন এভাবে ওনাকে হা করে গিলতে হবে না। চলো কয়টা কাপড়ের গাটরি পছন্দ করি, যা দিয়ে আমাদের বন্দুকের গুলি আর পাউডারের দাম উঠে যাবে। তারপর এদেরকে শান্তিমতো নিজেদের পথে চলে যেতে দেই।”

*

সেদিন পুরোটা, এরপর আরো গোটা একটা দিন লেগে গেলো ওদের আলাদা হতে। সারাহ আর ইয়াসমিনি আহতদের সেবা করলো। টম, ডোরিয়ান আর আবোলি ইঞ্চবার্ডের লোকদেরকে জাহাজ মেরামতে সাহায্য করলো। ওরা মিলে আবার একটা মাস্তুল খাড়া করে দিলো। জাহাজের প্রায় অর্ধেক ক্রু মারা পড়েছে, ফলে সেন্টারাসের লোকেরা রশি পাকিয়ে আর মাস্তুলে চটা মেরে আবার খাড়া না করে দিলে আবার জাহাজটার পক্ষে একা চলা সম্ভব হতো না।

“আবহাওয়া ঠিক থাকলে এটা দিয়েই কেপ টাউনে পৌঁছে যাবো,” ইঞ্চবার্ড বললো। “ওখান থেকে নতুন লোক ভাড়া করে লন্ডনের দিকে যাত্রা করবো।”

কাজটা খুব একটা সহজ না। কিন্তু টম টের পেলো যে ইঞ্চবার্ড চাচ্ছে ওরা জাহাজ থেকে চলে যাক। ব্যপারটা ওর কাছে ভালোই লাগলো। ওরাও তাই দেরি না করে বিদায় নিয়ে ফিরে চললো।

বাতাস পরিষ্কার। রাত নামতেই সারাহ আর টম জাহাজের পিছনের গলইতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত অবলোকন করলো। সূর্যটা পশ্চিম আফ্রিকার অনাবিষ্কৃত দেশগুলোর ওপাশে টুপ করে ডুবে গেলো।

“তুমি ঐ দুয়ার্তে মেয়েটার কথা ভাবছো, তাই না?” সারাহ বললো।

“আরে না, না,” টম বলতে গেলো কিন্তু ওকে থামিয়ে দিলো সারাহ।

“আমাদের যদি একটা ছেলে থাকতো তাহলে ঠিক ওর মতোই একটা বৌ চাইতাম আমি।”

টম সারাহকে আরো কাছে টেনে নিলো। বিয়ের পর থেকেই ওরা বাচ্চা নেওয়ার জন্যে অনেক চেষ্টা করেছে। কয়েক বছর আগে সারাহ গর্ভবতীও হয়েছিলো, তখন ওরা লুঙ্গা নদীতে ব্যবসা করে বেড়াচ্ছিলো; টম ভেবেছিলো ওদের জীবন এবার পূর্ণতা পাবে। কিন্তু সারাহের গর্ভপাত হয়ে যায়, আর তার পর থেকেই ওদের শত চেষ্টার পরেও আর সারাহের গর্ভ সঞ্চার সম্ভব হয়নি।

“তোমার কি কখনো মনে হয়েছে যে তুমি ইংল্যান্ডে থেকে গেলেই ভালো করতে?” সারাহ জানতে চাইলো। “ডেভনের (একটা শহর) কোনো সুন্দরি মেয়েকে বিয়ে করে হাই উইল্ড-এ (টমদের বাড়ির নাম) বাড়ি বানিয়ে থাকলেই ভালো হতো। ডজনখানেক বাচ্চাকাচ্চা হতো।”

টম সারাহের গালে আলতো একটা চাপড় দিলো। “কখনোই না। আর হাই উইল্ড এর মালিক হচ্ছে ব্ল্যাক বিলি।” টমদের বংশের নিয়ম অনুযায়ী সব সম্পত্তির মালিক হয় বড় ছেলে। বিলি ডেভনের সবচেয়ে বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করেছিলো। তবুও সম্পত্তির লোভে বিলি ওদের বাবাকে সময়ের আগেই কবরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলো। কিন্তু সেই সম্পত্তি ভোগ করার জন্যে বেঁচে থাকতে পারে নি সে।

“সম্পত্তির মালিক এখন হবে বিলির ছেলে ফ্রান্সিস।” টম বলে থামলো একটু। মায়ের কোলে শোয়া একটা লালমুখো ছেলের কথা মনে করার চেষ্টা করছে। “এতদিনে তাগড়া জোয়ান হয়ে যাওয়ার কথা ওর। হাই উইল্ডের জমিদার-ও হয়ে গিয়েছে।”

সারাহ বাতাসের তোড়ে উড়তে থাকা কাপড় সোজা করলো আবার। “সময় আমাদের সবার সাথেই বড় নির্দয় আচরণ করে, টম কোর্টনী।”

টম দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলো, সূর্যের শেষ কিরণটা সেখানে সমুদ্রকে লেহন করছে। ঢেউ এসে সেন্টারাসের খোলে বাড়ি খেয়ে গর্জন করছে, জাহাজটা এখন যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমে, আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণে কেপ টাউনে। হাই উইল্ড থেকে পালিয়ে আসার পর এই শহরটাকেই টম বাড়ি হিসেবে পরিচয় দেয় এখন। কেপ টাউনে ওরা জাহাজটার টুকটাক মেরামত করবে, কিনে আনা মালপত্র বিক্রি করবে, নতুন মালামাল কিনবে, তারপর কয়েক মাস পর আবার হয়তো নতুন কোনো অভিযানে বের হবে।

টম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। জীবনে কোনো কিছু নিয়ে ওর দুঃখ নেই, কিন্তু বড় হওয়ার পথে ওকে কতোটা কষ্ট করতে হয়েছে সেসব ও ভুলে যায়নি। সেই বিশাল পুরনো বাড়িটা, সেই গির্জাটা যেটার প্রাঙ্গণে অসংখ্য কোর্টনী কবরে শুয়ে আছে। ওর দাদার সেবা করা চাকরেরা, যাদের সন্তানেরা অনাগত কোর্টনীদের সন্তানদের সেবা করবে, সবই ছিলো একটা বিশাল কিছুর অংশ হিসেবে থাকার অনুভূতি। এখন ও যেখানেই থাকুক না কেননা, ওর শিকড় ওখানেই প্রোথিত, অনেক গভীরে। ও নিজেকে ওখান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, কিন্তু এখনো নতুন কোনো জমিনের সন্ধান পায়নি যেখানে নতুন করে শিকড় গাড়তে পারে।

টম সারাহকে দুই হাতে ধরে কপালে চুমু খেলো।

“আমি ভাবছি ফ্রান্সিস এখন কেমন হয়েছে,” কৌতূহলী কণ্ঠে বললো ও।

*

বিশাল বাড়িটা বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। বাতাস এসে ওটার কিনারে বা গম্বুজে ধাক্কা খেয়ে বিচিত্র শব্দ করছে আর ধুপধাপ করে ঢিলে হয়ে যাওয়া খিড়কিগুলোকে আটকে দিচ্ছে। শুধুমাত্র সবার উপরের তলার শেষ ঘরটা বাদে বাকি সবগুলো জানালা অন্ধকার হয়ে আছে।

ওটা হচ্ছে মাস্টার বেডরুম। একটা মাত্র মোমবাতি মোমদানির উপরে টিমটিম করে জ্বলছে সেখানে। সেই আলোয় ঘরের চারপাশে বিচিত্র সব ছায়া পড়েছে, যেনো ওগুলো সব দৈত্য দানো৷ চিমনি বেয়ে বাতাসের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ফায়ারপ্লেসের নিভে যাওয়া কয়লাগুলো তাতে কেঁপে কেঁপে উঠে ঝাঁঝরির উপর নাড়াচাড়া করছে। কয়লা শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টা আগেই নিভে গিয়েছে আগুন, কিন্তু তবুও ওটার পাশে দুটো অবয়ব বসে পড়ে নকশা তুলছে, আর একজন কমবয়সী। ছেলে এই মৃদু আলোতেও বই পড়ার ভান করে যাচ্ছে। বিগত পনেরো মিনিট যাবত একটা পৃষ্ঠায়ই আটকে আছে সে।

মহিলাটা হঠাৎ মৃদু আর্তনাদ করে উঠলেন। তার ছেলে দৌড়ে এলো কাছে।

“কি হলো আম্মু?”

মহিলা নিজের আঙুল মুখে পুরে খানিকটা রক্ত চুষে নিলেন। “এই আলোয় চোখে দেখা যায় না, ফ্রান্সিস।”

মহিলা হচ্ছে এলিস লেইটন-আগে নাম ছিলো এলিস গ্রেনভিল, এরপর এলিস কোর্টনী। ছেলের দিকে তাকালেন উনি, ছেলের চেহারায় দুশ্চিন্তার ছোঁয়া দেখে আপ্লুত হয়ে গিয়েছেন। ছেলের বয়স পুরো আঠারো হয়নি, কিন্তু এখনই তাগড়া জোয়ান হয়ে গিয়েছে বলা যায়। তবে ছেলেটার মন বড় নরম। মহিলার চিন্তার কারণ সেটাই। বাইরের শয়তানিতে ভরা দুনিয়াতে ছেলেটা কিভাবে কি করবে কে জানে। খাড়া খাড়া কালো চুল, সেই সাথে বাদামী গায়ের রঙ আর মায়াবী কালো চোখে ছেলেটাকে অনিন্দ্য সুন্দর লাগে। চোখের পাতার ঠিক উপরে কপালেও এক গোছা কালো চুল আছে ওর। মহিলা খেয়াল করে দেখেছেন যে গায়ের মেয়েরা ওর দিকে কিভাবে তাকায়। কোনো একসময়, ঠিক একই দৃষ্টিতে উনিও ওর বাবার দিকে তাকাতেন।

জানালার কপাট দড়াম করে বাড়ি খেলো আবার। যেনো শয়তান নিজে এসে দরজায় করাঘাত করছে। ফ্রান্সিস হাতের বইটা বন্ধ করে একটা লোহার শলা দিয়ে ফায়ারপ্লেসের ভিতর খোঁচাখুঁচি করতে লাগলো। কিন্তু ছাই বাদে আর কিছু বের হলো না।

“বাবা কোথায় গিয়েছে জানো?”

ওর বাবা-মানে আসলে সৎ বাবা। তবে এনাকেই ও বাবা হিসেবে জানে। গত এক সপ্তাহ যাবত বলা যায় লাইব্রেরিতেই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন উনি। কি সব কাগজপত্র নিয়ে পড়ে আছেন, যেসব ওদেরকে দেখতে দিচ্ছেন না। একবার ফ্রান্সিস দেখে করতে গিয়েছিলো, স্যার ওয়াল্টার ওকে বকাঝকা করে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এলিস হাতের কাপড়টা নামিয়ে রাখলেন। ওনার কালো চুলে বয়সের আগেই পাক ধরেছে, চোখে কোটরের ভিতরে প্রায়, ধূসর চামড়া গালের কাছটায় কুঁচকে গিয়েছে। ফ্রান্সিসের এখনো ওর মায়ের সুন্দর আর হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা মনে আছে। সেই ছোটবেলায় মা যখন কোনো পার্টি বা নাচের অনুষ্ঠান থেকে ফিরতো, তখন ফিরেই আগে ওর ঘরে এসে ওর কপালে চুমু দিয়ে শুভরাত্রি জানাতে। তার চামড়া থেকে তখন আভা বের হতো, চোখ জোড়া ঝলমল করতো। মা যখন ওর দিকে ঝুঁকে আসতো তখন ও মায়ের গায়ের সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেতো, তার নরম তুলতুলে হাত ওর গালে স্পর্শ করতো। মায়ের গলার হীরার হারটা মোমের আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠতে। সেই হীরাগুলোই সবার আগে হাতছাড়া হয়েছে।

খালি বাড়িটায় আবার একটা প্রচণ্ড শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ছুটে গেলো। মেঝে শুষ্টু কেঁপে উঠলো তাতে। ফায়ারপ্লেসের কয়লা, সব এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লো। ফ্রান্সিস লাফ মেরে উঠে দাঁড়ালো।

“বজ্রপাত নাকি?” অনিশ্চিত স্বরে বললেন এলিস।

ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো। “জানালাও না। নিচ থেকে এসেছে শব্দটা।”

বলে ও লম্বা বারান্দাটা ধরে হেঁটে গিয়ে বিশাল সিঁড়িটা ধরে নেমে এলো। মোমবাতি থেকে মোম গড়িয়ে পড়ে ওর হাতে ছ্যাকা দিতে লাগলো। কিন্তু হাই উইন্ডে আর কোনো রূপার মোমবাতিদান অবশিষ্ট নেই। ফ্রান্সিস সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে বাতাসে গন্ধ শুকলো। শিকারের অভিজ্ঞতা থেকে ও গান পাউডারের ঘ্রাণ ভালোই চেনে। স্থানীয় সেনাবাহিনির মহড়ার সময়েও দেখেছে। কিন্তু এ বাড়িতে কখনো এই জিনিসের ঘ্রাণ পায়নি।

বুকের ভিতর একটা শঙ্কা দলা পাকিয়ে উঠলো ওর, হৃৎপিণ্ড বাড়ি খেতে লাগলো বুকের খাঁচার সাথে। ও দৌড়ে লাইব্রেরির দরজার কাছে পৌঁছালো। “বাবা?” ডাক দিলো ও। “বাবা ঠিক আছেন আপনি?”

উত্তরে শুধু জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা পতনের শব্দ বাদে আর কিছুই পাওয়া গেলো না। ও দরজাটা খোলার চেষ্টা করলো কিন্তু সেটা আটকানো। হাঁটু মুড়ে বসে ও চাবির ফুটো দিয়ে ভিতরে তাকালো। কিন্তু ফুটোয় চাবি ভরা থাকায় ওপাশের কিছুই দেখা গেলো না।

“বাবা?” আরো একবার চেষ্টা করলো ও। এবার আগের চাইতে জোরে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ওর বাবা প্রায় কোনো বিরতি ছাড়াই মদ খেয়ে যাচ্ছে। হয়তো উনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন।

মোমবাতিটা নামিয়ে রেখে ও পকেটা হাত ঢুকিয়ে একটা ছুরি বের করে আনলো। তারপর আস্তে সেটাকে চাবির ফুটোয় ঢুকিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে ওপাশের মেঝেতে চাবিটা ফেলে দিলো। পুরনো দরজাটার নিচে প্রায় এক ইঞ্চি মতো ফাঁকা আছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে ও ঘরের শেষ মাথায় টুপি ঝোলানোর জায়গাটায় একটা খড়ের টুপি দেখতে পেলো। টুপিটা নিয়ে এসে সেটার সাহায্যে দরজার নিচ থেকে চাবিটা টেনে নিয়ে এলো।

দ্রুত হাতে তালা খুলে দরজাটা খুলে ফেললো ফ্রান্সিস। রুমের ভিতর আগাতেই মোমের আলোয় ছায়াগুলো বিচিত্র নকশা করে সরে যেতে লাগলো। ছোট বেলায় ও এখানকার মসৃণ মেঝেয় পিছলা খেতো। কিন্তু এখন মেঝেটা অমসৃণ আর জায়গায় জায়গায় চলটা উঠে গিয়েছে; বহু বছর হয় পালিশ করা হয় না। দেয়াল জুড়ে সারি সারি খালি বইয়ের তাক; বাকি সব কিছুর মতো বইগুলোও বেঁচে দেওয়া হয়েছে। একসময় যেখানে তরবারি আর ঢাল ঝোলানো থাকতো সেখানের প্লাস্টারে দাগ হয়ে আছে। কোর্টনীদের শৌর্য বীর্যের প্রতীক ছিলো সেগুলো। রূপা আর কাঁচের তৈজসপত্রের মতো ওগুলোও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

ঘরের একদম শেষ মাথায় একটা বিশাল ওকে কাঠের টেবিল। একগাদা কাগজ আর খালি ওয়াইনের বোতল দেখা যাচ্ছে ওটার উপর। কোনো গ্লাস বা আর কোনো পাত্র নেই। ওর বাবা আলুথালুভাবে ওটার পেছনে চেয়ারে বসে আছেন। যেনো ক্লান্ত হয়ে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কাগজপত্রের উপরে লাল রঙের একটা তরলে ভরে আছে।

ফ্রান্সিস থমকে দাঁড়ালো। তারপর আচমকা দৌড় মেরে অবয়বটার কাছে। পৌঁছে সেটাকে টেনে সোজা করলো। কিন্তু ছেড়ে দিতেই দেহটা টেবিলের উপর পড়ে টেবিল শুদ্ধ উলটে পড়ে গেলো। ওর বাবা মেঝের উপর আছড়ে পড়ে একদিকে কাত হয়ে গেলেন। একটা হাত থেকে পিস্তল খসে পড়লো।

সারা শরীর কাঁপিয়ে বমি পেলো ফ্রান্সিসের। বহু কষ্টে সামলালো ও সেটা। “বাবা?”

স্যার ওয়াল্টার লেইটন একসময় বেশ সুপুরুষ ছিলেন। কিন্তু মাদকের নেশা তার সব শেষ করে দিয়েছে। এমনকি মারা যাওয়ার পরেও তার চেহারায় এক অদম্য শক্তিমত্তার ভাব ফুটে আছে। ছোট বেলার কথা মনে পড়লো ফ্রান্সিসের। বাবা ওকে বাতাসে ছুঁড়ে মেরে আবার ধরে ফেলতেন, ঘোড়ায় চড়ে বেড়া ডিঙ্গাতে পারলে একটা স্বর্ণমুদ্রা বখশিশ দিতেন, বলা নেই কওয়া নেই লন্ডনে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। এখন তার নিষ্প্রাণ নীল চোখ জোড়া ওর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ওর কাছে ক্ষমা চাইছে। সামনের দিক থেকে তাকালে আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। শুধু ভালো করে খেয়াল করলেই কপালের উপরের দিকের ক্ষতটা চোখে পড়ে, যেখান দিয়ে পিস্তলের গুলি তার ঘিলুকে পিছন দিয়ে বের করে দিয়েছে।

পিছনে একটা খনখনে চিৎকারে সম্বিত ফিরলো ফ্রান্সিসের। ও ঘুরে তাকালো সেদিকে। এলিস দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে। মুখে হাত চাপা দেওয়া। মেঝেতে পড়ে থাকা লাশটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন।

“তোমাকে বলেছিলাম উপরেই থাকতে,” ফ্রান্সিস বললো। ওনাকে এই দৃশ্য দেখতে দিতে চায়নি মোটেও। ও দ্রুত এগিয়ে এলিসকে জড়িয়ে ধরলো। মুখটা নিজের কাঁধে চেপে ধরলো যাতে ভয়াবহ দৃশটা তাকে দেখতে না হয়।

এলিস ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন, “এরকম কেনো করলেন উনি?”

ফ্রান্সিস এলিসকে একটা চামড়ার চেয়ারের দিকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বসিয়ে দিলো। ওখান থেকে লাশটা দেখা যাবে না। তারপর গায়ের শালটা আরো ভালোভাবে তার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে আবার টেবিলটার কাছে। ফিরে গেলো। এলিস আর ওঠার চেষ্টা করলেন না।

ফ্রান্সিস কাগজের গাদা থেকে সবার উপরের কাগজটা তুলে নিয়ে আলোর বিপরীতে ধরলো। লন্ডনের একটা ফার্মের একজন উকিলের চিঠি ওটা। ও জীবনেও নাম শোনেনি আগে। আইনের নানান গালভরা ধারা আর শব্দে ভরা চিঠিটা। ফলে বুঝলো না কিছুই। একটা প্যারার কিছুটা বুঝলো শুধু।

যদি আপনি উনিশে অক্টোবর মাঝরাতের আগে এই ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে দেওয়ান পাঠিয়ে উল্লেখিত সম্পত্তি আর তাতে অবস্থিত যা কিছু আছে সব দখল করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

“এখানে আসলে হাই উইল্ড এর কথা বলা হয়েছে,” ফ্রান্সিস বুঝতে পারলো। “আর দিনটাও আজ রাতেই।” ও ঘড়ির দিকে তাকালো। যতোটা ভেবেছিলো, তার চাইতে বেশি রাত এখন। পাহাড়ের উপরের গির্জায় এগারোটার ঘণ্টা বাজানো হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু ও সেটা খেয়াল করেনি। হঠাৎ প্রচণ্ড আতংক গ্রাস করলো ওকে। “ওদের আসতে আর এক ঘণ্টাও নেই।”

ফ্রান্সিস আবার ওর বাবার লাশটার দিকে তাকালো। ভিতরে ভিতরে রেগে গেলো ও, এতোক্ষণের দুঃখিত ভাবটা কেটে যাচ্ছে সেটার কারণে! ওর ঠিক মনে নেই কতোদিন আগে ও টের পেয়েছিলো যে ওর বাবা আসলে একজন জাত জুয়াড়ি। প্রায়ই দেখা যেতো ওদের বাড়ি থেকে রহস্যজনকভাবে রৌপ্যমুদ্রা উধাও হয়ে যাচ্ছে, আবার কয়েক মাস পর দেখা যেতো সেসব আবার ফিরে আসছে। মাঝে মাঝে বসার ঘরে তাসের আসর বসতো। অনেক রাত পর্যন্ত চলতো সেগুলো, ফ্রান্সিসের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিলো না। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলেও দেখতে সেগুলো চলছে। ওর বাবার মেজাজও একেক সময় একেক রকম থাকতো। কখনো সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যেতো চুপচাপ, বেজার হয়ে আবার কখনো খুশিতে ঝলমল করতেন। ফ্রান্সিস আর এলিসের জন্যে গাদা গাদা উপহার নিয়ে আসতেন তখন। প্রায়ই দেখা যেতো অপরিচিত লোকজন আসছে বাড়িতে। সিঁড়ির রেলিং-এর আড়াল থেকে তাদেরকে দেখতে ফ্রান্সিস। কিন্তু ধরা পড়লেই এলিস ওকে টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে আচ্ছাসে বকতেন।

কিন্তু ও কখনো কল্পনাও করেনি যে অবস্থা এতটা খারাপ। বাইরে থেকে তীব্র একটা শব্দ কাঁপিয়ে দিলো আবার বাড়িটাকে। ফ্রান্সিসের মনে হলো দেওয়ানেরা বোধহয় এসেই পড়েছে। আসলে ওগুলো জানালার কপাট বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। ঘড়ির দিকে আর এক নজর তাকিয়ে বুঝলো আর মাত্র পনেরো মিনিট সময় আছে হাতে।

“আমাদেরকে যেতে হবে,” করুণ সুরে বললো ফ্রান্সিস। ও আবার ওর মাকে টেনে দাঁড় করিয়ে উপরের তলায় নিয়ে গেলো। যাওয়ার পথে সদর দরজা বন্ধ করে দিতে ভুললো না। এলিসের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে, হাত পা ঠাণ্ডা। “তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, যা যা নেওয়া সম্ভব সব নাও।”

অবসন্ন ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে দেরাজ খুলে কয়েকটা পোশাক বের করলেন এলিস। ফ্রান্সিস নিজের ঘরে গিয়ে নিজের যৎসামান্য যা আছে তা একটা ব্যাগে ভরে নিলো। প্রতিটা সেকেন্ড পার হওয়াটা অনুভব করতে পারছে ও।

আবার মায়ের ঘরে ফিরে এসে দেখে বিছানা জুড়ে কাপড় ছড়িয়ে উনি চুপচাপ বসে আছেন।

“কি ব্যাপার?” রেগে গেলো ফ্রান্সিস। “ওরা যে কোনো মুহূর্তে চলে আসবে এখানে।” বলতে বলতে নিজেই মায়ের কাপড় একটা ব্যাগে ভরতে শুরু করলো। “যদি আজ আমার বাবা

“ওনাকে ওই নামে ডাকবে না,” ফিসফিস করে বললেন এলিস। “স্যার ওয়াল্টার তোমার বাবা নন।”

“আমি জানি। কিন্তু তুমিই বলেছো যে আমার তাকে-”

“ভুল করেছি আমি। আমি ওনাকে বিয়ে করেছিলাম কারণ আমি ছিলাম এক বিধাব আর তোমার একজন বাবার দরকার ছিলো। উইলিয়াম মারা যাওয়ার পরে আমার পরিবার আমাকে ত্যাজ্য করে দেয়; ওরা এমনকি ওর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও আসেনি। অভিজাত পরিবারগুলোর বাইরের একজন সাধারণ লোককে বিয়ে করার জন্যে বাবা আমাকে খুবই অপছন্দ করতেন। অথচ কোর্টনীদের আমাদের চাইতেও বেশি টাকা পয়সা ছিলো। এরপর উইলিয়াম মারা গেলো, আর মারা যাওয়া নিয়ে যেসব গুজব শোনা যেতে লাগলো… বাবা আমাকে কখনোই ক্ষমা করেননি।”

“এসব তো আগে বলোনি।”

“তুমিতো ছিলে একটা দুধের বাচ্চা। এমনিতেই কতো কষ্ট পেয়েছো তুমি। স্যার ওয়াল্টার লেইটন ছিলেন দারুণ একজন মানুষ। খুব মজা করতে পারতেন। কিন্তু আমি ওনার আসল রূপটা ধরতে পারিনি। ঠিক যেমন আমি তোমার বাবাকেও চিনতে ভুল করেছিলাম। যখন বুঝেছি ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।”

“কিন্তু তুমি সবসময় বলেছো যে আমার বাবা, মানে আমার আসল বাবা, উইলিয়াম কোর্টনী ছিলেন ভালো মানুষ। একজন দয়ালু মহৎ লোক।”

এলিসের চেহারায় ভাঁজ পড়লো। “ওহ ফ্রান্সিস, সবই ছিলো মিথ্যে। উইলিয়াম কোর্টনী কেমন মানুষ ছিলো সেটা জানলে তুমি কতটা কষ্ট পাবে সেই ভয়েই আমি কিছু বলতে সাহস করিনি। ও ছিলো একটা কুৎসিত মনের নরপশু। নিজের বাবা মারা যাওয়ার পর ও খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলো; আমার উপর অকথ্য অত্যাচার করেছে, বেঁচে থাকলে তোমার উপরেও করতো। ও নিজের আপন ভাই টমাসকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো।”

ফ্রান্সিসের মনে হলো পায়ে কোনো বল পাচ্ছে না। ও ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লো। রাগের চোটে চোখে পানি এসে গেলো ওর। “না। আমিতো জানি টমাস ওনাকে খুন করেছেন। তুমিই বলেছো মা। তুমি নিজে বলেছো।”

“সেটা সত্যি। টম উইলিয়ামকে মেরেছে,” স্বীকার করলো এলিস। “কিন্তু সেটা আত্মরক্ষা করতে গিয়ে।”

“তুমি সেখানে ছিলে?” টম জোর দিয়ে বললো। “নিজের চোখে দেখেছো?”

“উইলিয়াম লন্ডনে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। টম ওকে খুন করেছে এমন খবর চাউর হয়ে যায়। কিন্তু আমি জানি টম যদি ওকে আসলেই খুন করে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই ওকে আগে উসকে দেওয়া হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় নিজের আপন ভাইকে খুন করার লোক টম না।”

ফ্রান্সিসের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো। কিন্তু আসলে উনি সেটাই।”

আচমকা নিচে করাঘাত শোনা গেলো। মাপা কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী। শব্দটা কিসের সেটা ধরতে এবার আর কোনো কষ্ট হলো না। ভারী দরজায় শক্তিশালী একটা হাতের আঘাত। ফ্রান্সিস চাপা আওয়াজ শুনতে পেলো। কেউ একজন দরজার হাতল ঘোরানোর চেষ্টা করতে লাগলো।

এলিস ফ্রান্সিসকে আঁকড়ে ধরলেন। “তুমি এখন বড় হয়েছে। সত্যিটা এখন তোমার জানা দরকার।”

“মিথ্যা বলছো তুমি।” ও ঝাড়ি মেরে এলিসের হাত ছুটিয়ে দিয়ে তার ব্যাগ তুলে নিলো। আবারও দরজায় জোরে জোরে করাঘাতের আওয়াজ পাওয়া গেলো। আমি আজ রাতে একটা বাবাকে হারিয়েছি। আর এখন তুমি বাকিজনেরও স্মৃতি নষ্ট করে দিচ্ছো।”

“দরজা খুলুন,” একটা ভারি গলা শোনা গেলো। এই ঝড়ের মাঝেও স্পষ্ট। “আমরা আইনের লোক।”

ফ্রান্সিস দরজার কাছে এগিয়ে গেলো। “আমাদের যেতে হবে। ওরা আমাদেরকে এখানে পেলে সব কিছু নিয়ে নেবে।”

“আমি যাবো না,” গায়ের শালটা আরো ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললেন এলিস। “ওরা নিশ্চয়ই একজন গরীব বিধবাকে এভাবে বাড়িছাড়া করবে না। আর ওয়াল্টার যেহেতু মারা গিয়েছে, তার মানে এতো সহজে ওড়া ওর ঋণের শোধ পাবে না। যদি ওরা বাড়িটা নিতে চায় তো নিক। এই বাড়িটায় আমার একমাত্র আনন্দ হচ্ছে তোমার জন্ম। এটা বাদে বাড়িটায় শুধু দুঃখই পেয়েছি।”

ফ্রান্সিস এলিসের দিকে তাকিয়ে রইলো। আবেগা দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর; অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না।

“দরজা খুলুন,” নিচ থেকে হাক শোনা গেলো আবার।

ফ্রান্সিস দৌড় দিলো। পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে রান্নাঘর পেরিয়ে উঠোনে চলে এলো ও। আস্তাবলের সব কর্মচারীকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; ও যেসব ঘোড়ার শাবকে চড়ে বড় হয়েছে সেসবকেও বহু আগেই নয়ন মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। শুধু একটা ঘোড়াই বাকি আছে-নাম হাইপেরিয়ন। তেরোতম জন্মদিনে ওর সৎ বাবা ওকে এই উজ্জ্বল বাদামী ঘোড়াটা উপহার দিয়েছিলো। ফ্রান্সিসের পদধ্বনি শুনে ঘোড়াটা মৃদু হ্রেষা ধ্বনি করে উঠলো।

ফ্রান্সিস একটা বাতি জ্বালিয়ে দ্রুত হাতে ঘোড়ার পিঠে কম্বল চাপালো। দেওয়ানের লোকজন কিছুক্ষণ পরেই পিছন দিক দিয়ে বাড়িতে ঢোকা যায় কিনা সেটা খুঁজতে চলে আসবে। ও দেয়ালে ঝোলানো একটা পানিরোধী কাপড় কাঁধে চাপিয়ে হাইপেরিয়নকে উঠোনে নিয়ে এলো।

একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, ওর জন্যেই অপেক্ষা করছে।

“মা?” এলিসকে দেখা মাত্র ফ্রান্সিসের রাগ পানি হয়ে গেলো, আস্তাবলের ছায়ায় ওনাকে ভূতের মতো লাগছে। ওনার শুকিয়ে যাওয়া শরীরে ঝুলতে থাকা কাপড় বেয়ে পানি ঝরছে, যেনো একটা বাচ্চা মেয়ে বৃষ্টিতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ওনার হাতে একটা ছোট ভেলভেটের ব্যাগ।

“বিদায় না বলেই তোমাকে ছাড়ি কিভাবে বলো?”

ফ্রান্সিস–কে জড়িয়ে ধরলো। “গুডবাই মা।”

“কোথায় যাবে তুমি?” ঝড়ের কারণে ফ্রান্সিসের কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচাতে হচ্ছে এলিসের।

ফ্রান্সিসের মাথায় চিন্তাটা আগে আসেনি। কিন্ত আসামত্র ও উত্তরটা পেয়ে গেলো।

“দুনিয়াতে পরিবার বলতে আমার আর আছে গাই চাচা। উনিতো এখন আছে বোম্বেতে। আমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লন্ডন অফিসে যাবো। গিয়ে একটা চাকরি আর ওদের জাহাজে করে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বলবো।” ফ্রান্সিস বিশাল বাড়িটার দিকে তাকালো। কতো শত স্মৃতিতে ভরপুর। “একদিন অনেক টাকা কামিয়ে আবার ফিরে আসবো। আবার হাই উইল্ডকে ফিরিয়ে নেবো।”

এলিস হাতের আঙুলে ঝোলানো ভেলভেটের ব্যাগটাকে আঁকড়ে ধরলেন। প্রাণপণ চেষ্টা করছেন নিজের একমাত্র ছেলেকে বিদায় দেওয়ার ব্যথাকে চাপতে।

“ভালোই বলেছো। গাই চাচার সাথে সাবধানে থাকবে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে ওদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরেরা বাদে তুমি হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবচেয়ে বড় শেয়ার হোল্ডার। মাত্র দুই বছর বয়সেই তুমি এটার মালিক হয়েছিলে। তোমার দাদা হাল বিশ হাজারেরও বেশি শেয়ার কিনেছিলেন। আর উইলিয়াম এতো কম বয়সে মারা যাওয়ার পরে তুমিই ছিলে ওগুলোর মালিক। ওগুলোকে একটা ট্রাস্টের মাধ্যমে রেখে দেওয়া যেতো। কিন্তু গাই বলেছিলো ওগুলো বিক্রি করে দিতে। আমি ওর কথাই শুনি। কিন্তু আমার মনে সন্দেহ যে আসলেই আমাদেরকে আমাদের ন্যায্য পাওনা দেওয়া হয়েছিলো কিনা। আমরা যদি শেয়ারগুলো ট্রাস্টে রাখতাম তাহলে ওয়াল্টার কখনোই ওগুলোর নাগাল পেতো না। ওগুলোকে নগদ টাকায় ভাঙ্গানোর পরেই…”

এলিস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উইলিয়াম যেমন মানুষই হোক না কেনো, ও। মারা যাওয়ার পর এলিস ছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ধনী বিধাব। কিন্তু বিগত পনেরো বছর ধরে সেই সম্পত্তিকে তার সদ্য প্রয়াত স্বামী ঋণ আর কর্জের বোঝা বানিয়ে ফেলেছে। কোন মুখে উনি ফ্রান্সিসকে থেকে যেতে বলবেন? ওর জন্যে এখানে কিছুই নেই। স্যার ওয়াল্টার সব খেয়ে দিয়েছেন।

“এটা নাও।” বলে উনি ভেলভেটের ব্যাগটা বাড়িয়ে দিলেন। বৃষ্টিতে কাপড়টা ভিজে গিয়েছে কিন্তু ফ্রান্সিস হাতে নিয়েই বুঝলো যে ভিতরে শক্ত কিছু একটা আছে। ও ব্যাগটা খুললো।

বিগত কয়েক মাসের দারিদ্রের পরে ভিতরের দৃশ্যটা একেবারে স্বর্গীয় বলা চলে। আস্তাবলের মশালের আলোয় ও দেখতে পেলো জিনিসটা একটা সোনার পদক। ঝকড়া কেশরওয়ালা একটা সিংহ খোদাই করা আছে তাতে। সিংহটা নিজের পায়ের থাবায় পুরো পৃথিবীকে ধরে রেখেছে। আর উপরের মীনা করা নীল আকাশ থেকে হীরার তারা আলো ছড়াচ্ছে।

“কি এটা?”

“দ্য অর্ডার অফ দ্য সেন্ট জর্জ অ্যান্ড হলি গ্রেইল। কোর্টনীরা বংশ পরম্পরায় এটা গলায় পরে। এটার মালিক এখন তুমি।”

“কিন্তু…” ফ্রান্সিস ইতস্তত করতে লাগলো। যেনো একজন ক্ষুধার্ত লোককে একগাদা খাবারের সামনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। “এরতে বিশাল দাম। শুধুমাত্র হীরাগুলোইতো… এটা বেঁচেই তো আমরা হাই উইল্ড রেখে দিতে পারি।”

“না।” ওর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে বললেন এলিস। “এটা কোর্টনীদের ইজ্জতের ব্যাপার। যেখানেই যাও, যা-ই করো, এটা কখনো যেনো হাতছাড়া না হয়।”

কাছেই চিৎকার শোনা গেলো। বাড়ির পাশ থেকেই। এলিস ফ্রান্সিসের হাত ধরে কপালে চুমু খেলেন।

“যাও। লন্ডনে গিয়ে স্যার নিকোলাস চিন্ডস এর সাথে দেখা করবে। উনি তোমার দাদার বন্ধু ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ওনার প্রভাব এখনো অনেক। যদি কেউ তোমাকে সাহায্য করতে পারেন তো উনিই পারবেন।”

*

ছোট থাকতে ফ্রান্সিস অনেকবার লন্ডন এসেছে। কিন্তু সবসময়েই সাথে ওর বাবা মা ছিলেন। ঘোড়ার গাড়িতে করে ঘুরতো ওরা। কোচোয়ান চাবুক দিয়ে বাতাসে সপাং করে বাড়ি দিয়ে সামনের লোকদের সরিয়ে দিতে। সাথে একটা চাকরও থাকতো যে প্রতিটা থামার জায়গায় কিছু লাগলে এনে দিতো। আর এবার লন্ডন যেতে লাগলো প্রায় এক সপ্তাহ। ভাঙাচোরা রাস্তা আর শরতের ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস উঠে গেলো ওর। রাত কাটালো কোনো খানা খন্দের ভিতরে। হাইপেরিয়নকে বেঁধে রাখতো ঝোঁপের আড়ালে যাতে কারো চোখে না পড়ে। কারণ সবসময় দুশ্চিন্তা হতো যে কোনো শয়তানের কবলে পড়ে ও জামার নিচে লুকানো লাল ভেলভেটের ব্যাগটা হারিয়ে ফেলবে। স্যালিসবুরি পৌঁছার পর এক সকালে ওর ঘুম ভাঙলো শেরিফের লোকজনের ডাকে। ওরা ওকে ঘোড়া চোর মনে করে ধাওয়া দিলো। বেশ কয়েকটা মাঠ পেরিয়ে এসে তারপর পালাতে সক্ষম হলো ফ্রান্সিস। রিচমন্ড পৌঁছে, সাথে থাকা শেষ কয়েকটা মুদ্রা দিয়ে ও হাইপেরিয়নের জন্যে এক ব্যাগ ওট আর নিজের জন্যে এক মগ বিয়ার কিনলো। লন্ডন পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘোড়াটা প্রায় পঙ্গু হওয়ার জোগাড় হলো। আর ফ্রান্সিসও দেখা গেলো ময়লা-কাদা মেখে ভূত হয়ে গিয়েছে।

শহরের কোলাহলে ঘোড়াটা ভয় পেয়ে গেলো। লোকজনের হট্টগোল, পাথরের রাস্তায় গাড়ির ক্যাচকোচ শব্দ-নীরবতা নেই এক ফোঁটা। ফ্রান্সিস হাইপেরিয়নের উপর থেকে নেমে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চললো। সাথে কানে কানে ফিসফিস করে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। ব্যস্ত রাস্তায় বেশিরভাগ লোকই ওকে কোনো পাত্তা দিলো না, কিন্তু ওদের চোখের দৃষ্টি ফ্রান্সিসের নজর এড়ালো না। এক ভবঘুরে ছেলের সাথে এরকম সুন্দর একটা ঘোড়া-ব্যাপারটা সবার কাছেই সন্দেহজনক। সেটা বুঝতে পেরে ফ্রান্সিসের চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো; এর আগে কখনো ওর এতোটা একাকী লাগেনি।

অবশেষে একটা আস্তাবল খুঁজে পেলো ফ্রান্সিস। কিন্তু ওখানকার লোকটা ফ্রান্সিসকে এক নজর দেখেই ঘোষণা দিলো যে ওকে আগাম টাকা দিতে হবে। ভাড়া হচ্ছে পাঁচ শিলিং।

ফ্রান্সিস নিজের পকেট চাপড়ে বললো, “আমার কাছে কিছু নেই।”

“তাহলে আমারও কিছুই করার নেই।”

“প্লীজ।” রাত নেমে আসছে। এই ভয়ানক শহরে এভাবে চলার কথা মাথায় আসতেই ভয় লাগছে ফ্রান্সিসের। “আমি কালই আপনার টাকা দিয়ে দেবো।”

ধূর্ত চোখে ফ্রান্সিসকে আপাদমস্তক মাপলো লোকটা। ওর মরিয়া ভাবটা ভালোই টের পেয়েছে। “ঘোড়াটাকে বেচে দাও তাহলে।”

আতংকিত চোখে চেয়ে রইলো ফ্রান্সিস। প্রস্তাবটা বাতিল করতে মুখ খুললো, কিন্তু কথা বের হলো না। কারণ হঠাৎ খেয়াল হলো যে, ও যদি ভারতে নতুন জীবন শুরু করতে যায় তাহলে হাইপেরিয়নকে সাথে নিতে পারবে না।

চোখে পানি জমলো ফ্রান্সিসের কিন্তু সেটা পড়তে দিলো না।

“কতো দেবেন?”

“আমার জন্যে না। আমি দেখি কেনার মতো কাউকে পাই কিনা। ততোক্ষণ ও এখানেই থাক।”

ফ্রান্সিস ঘোড়াটার গলা জড়িয়ে ধরে কেশরে মুখ গুঁজে দিলো। হাইপেরিয়ন গরগর করে উঠলো। আস্তাবলের পরিচিত শব্দ আর গন্ধে আবার ভালো লাগছে ওর।

“রাতে থাকার জন্যে একটু জায়গা পাওয়া যাবে?”

লোকটা আবার ওর আপাদমস্তক তাকালো একবার। “চাইলে আস্তাবলে ঘুমাতে পারো।”

*

রাতে ফ্রান্সিসের ভালো ঘুম হলো না। ভোরেই উঠে পড়লো তাই। একটা পাত্র থেকে পানি নিয়ে যতোটা সম্ভব নিজেকে পরিষ্কার করে নিলো। ঘোড়ার গা পরিষ্কার করার ব্রাশ দিয়ে কাপড়ের কাদা পরিষ্কার করার চেষ্টা করলো কিন্তু কাজ হলো না বেশি একটা। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দোকানের কাছে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শুকনো হাসি ফুটলো ওর মুখে। চুলগুলো কাকের বাসার মতো.হয়ে আছে। চোখের চারপাশে বেগুনি দাগ, যেনো কেউ ঘুষি মেরেছে। গাল জুড়ে সদ্য গজানো দাড়ি। কাপড় ছিঁড়ে আছে এখানে সেখানে। আর কাদা না থাকলেও দাগ ঠিকই লেগে আছে সবখানে। ডান পায়ের জুতোর ছেঁড়া দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আঙুল।

ফ্রান্সিস লন্ডনের অন্যতম সেরা ধনীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। স্যার নিকোলাস চিল্ডস-ই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একটা ছোট সওদাগরী কোম্পানি থেকে অর্ধেক দুনিয়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী এক মহীরুহে রূপান্তরিত করেছেন। ফ্রান্সিস অনেক ছোট থাকতেই ওনার নাম শুনেছিলো। কিন্তু ওর সৎ বাবা যখনই ওনার প্রসঙ্গ তুলতেন ওর মা তখন অন্য ব্যাপারে কথা বলতেন।

ফ্রান্সিসের মনে হলো লন্ডনের প্রায় সবাই-ই লেডেনহল স্ট্রীট-এর বাড়িটাকে চেনে, তাই কোনদিকে যাবে সেটা বের করতে ওর কোনোরকম বেগই পেতে হলো না। প্রথম দর্শনে বাড়িটার খুব আলাদা কিছুই চোখে পড়বে না। কাঠের জানালা আর একজোড়া ভারী দরজা কৌতূহলী পথিকের দৃষ্টি থেকে বাড়িটাকে আড়াল করে রেখেছে; অলঙ্করণ বলতে আছে শুধু দরজার দুপাশে বিশাল দুটো থাম। তার পাশে একজন পোশাক পরা দারোয়ান দাঁড়ানো। কিন্তু যদি চোখ তুলে দেখা হয়, তাহলে অনেক বিস্তারিত ধরা পড়বে। তখন বোঝা যাবে যে আসলে ভবনটা কতোটা বিশাল। দোতলায় একটা কাঠের ব্যালকনি রাস্তা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পিছনে কাঁচ ঘেরা বারান্দা। তার ঠিক উপরে, তিনতলায় একটা রাজকীয় প্রতীক সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। তার উপরে কার্ণিসে যতোদূর চোখ যায় ততোদূর একটা সমুদ্রে ভাসমান পালতোলা জাহাজের মুরাল আঁকা। জাহাজের পাশে ডলফিনেরা সাঁতরে বেড়াচ্ছে। ওটার মাঝে আছে রানি এলিজাবেথের একজন নাবিকের ভাস্কর্য। নাবিকটা লন্ডনের বাড়িগুলোর চুড়া আর চিমনীগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

জানা না থাকলে, প্রথম দর্শনে কারো মনে হতে পারে যে এটা বোধহয় জাহাজের জিনিসপত্রের দোকান। ভুল করে শহরের মাঝখানে দোকানটা দিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আসলে জায়গাটা পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান কয়েকজন লোকের সদরদপ্তর।

ফ্রান্সিস ইতস্তত করতে লাগলো, সাহসে কুলাচ্ছে না। শেষমেশ দারোয়ানের দিকে আগালো ও।

“কষ্ট করে স্যার নিকোলাস চিল্ডসকে গিয়ে একটু বলবেন যে, ফ্রান্সিস কোর্টনী ওনার সাথে জরুরি কাজে দেখা করতে চায়।” উৎকণ্ঠায় স্বাভাবিকের চাইতে বেশি জোরে বলে ফেললো কথাগুলো। মনে মনে এরকম বাচ্চামির জন্যে মরমে মরে গেলো ফ্রান্সিস।

দারোয়ান ওর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। “স্যার নিকোলাস চিল্ডস আজ খুব ব্যস্ত। আর স্যার ফ্রান্সিস কোর্টনী তো সেই রাজা চার্লসের আমলেই মারা গিয়েছেন।”

“আমি ওনার নাতীর নাতী। একটু দয়া করুন, আমার স্যার নিকোলাসের সাথে দেখা করাটা জরুরি।” বলে ও ভারি দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলো। একটা শক্ত হাত ওর পথ আটকে দাঁড়ালো, তারপর ধাক্কা দিয়ে আবার পিছনে ঠেলে দিলো।

“স্যার নিকোলাস কারো সাথে দেখা করছেন না।” জোর দেওয়ার জন্যে দারোয়ান প্রতিটা শব্দ বলার সময় আঙুল দিয়ে ফ্রান্সিসের বুকে খোঁচা দিলো। “আর যদি আপনি এরকম দরজা ধাক্কা দিতে আসেন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনবো।”

ফ্রান্সিস রাস্তার উল্টোপাশে একটা কফির দোকানের ছায়ায় এসে দাঁড়ালো। জানালা দিয়ে দেখতে পেলো লোকজন টেবিল ঘিরে বসে নানা আলাপ আলোচনা করছে, পত্রিকা পড়ছে আর ফাঁকে ফাঁকে ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। ওর আর ওদের মাঝে বাধা শুধু একটা কাঁচ, অথচ মনে হচ্ছে ওটা সম্পূর্ণ অন্য একটা দুনিয়া।

একটা অক্ষম ক্রোধ বয়ে গেলো ফ্রান্সিসের ভিতর দিয়ে। একেবারে ভিতরটা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিলো সেটা। বিগত কয়েক বছরে ওর মাঝে মাঝে মনে হতো যে ওর আসলে কিছুই নেই। আসলে ফ্রান্সিস কখনো বোঝেইনি যে ওর কতোটা ছিলো। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছে টাকা পয়সা না থাকার হতাশায় আসলে ও কতোটা কাবু হয়ে পড়েছে। টাকা ছাড়া কিছুই সম্ভব না। এটার কমতি থাকাতেই ওর সৎ বাবা মারা পড়লো, ওকে ওর মায়ের কাছে থেকে আলাদা হয়ে যেতে হলো, ওর বাড়ি, ওর ঘোড়া সব ছাড়তে হলো। পরনের কাপড় আর গলায় ঝোলানো পদকটা ছাড়া ওর আর এখন কিছুই নেই।

ফ্রান্সিস আবারও কফির দোকানটার ভিতরে তাকিয়ে নিজেকে সেখানে কল্পনা করতে লাগলো। মনে মনে দেখতে পেলো ওর সাথের ব্যবসায়ীদের সাথে বসে ও ভারত থেকে সদ্য সেরে আসা ব্যবসা আর সেটা থেকে পাওয়া বিশাল মুনাফার কথা আলোচনা করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে যোগ দিতে যা করা দরকার ও সেটা করতে প্রস্তুত। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যেতে প্রস্তুত, যে কোনো কষ্ট সইতে রাজি, যে কোনো ঝুঁকি নিতে পিছপা হবে না। সফল হওয়ার জন্যে এমনকি মানুষও খুন করতে পারবে। যদিও চিন্তাটা মাথায় আসতেই ওর কাপুনি ধরে গেলো। ফ্রান্সিস মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো যে ও ওর ভাগ্যকে জয় করবেই নয়তো চেষ্টা করে জান দিতে হলেও দেবে।

অপেক্ষা করবে বলেই ঠিক করলো ফ্রান্সিস। প্রতিবার যখন দোকানটার দরজা খুলছিলো তখন ভিতরের খাবারের সুগন্ধে ওর জিভে জল চলে আসছিলো। সকালটা পড়ে আসতেই দেখা গেলো লোকজন মাংসের পাই বা গরম পেস্ট্রি হাতে গন্তব্যে হেঁটে যাচ্ছে। ওর গলায় ঝুলানো ব্যাগটার ওজন ওর কাছে ক্রমশ আরো ভারি লাগতে লাগলো; জিনিসটা এতো বেশি দামি, অথচ এটা বিক্রির কথা ভাবতেও পারে না। ও একবার ভাবলো আস্তাবলে ফিরে গিয়ে দেখে যে লোকটা হাইপেরিয়নকে বেচতে পেরেছে কিনা, কিন্তু স্যার নিকোলাসের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ যদি হাতছাড়া হয়ে যায় সেজন্যে যেতেও পারছে না।

ফ্রান্সিস জানে না যে কিভাবে স্যার নিকোলাসকে চিনবে। মা বলেছে যে চিল্ডস ওর দাদা হাল এর বন্ধু ছিলেন, তার মানে ওনার বয়স নিশ্চয়ই এখন অনেক বেশি। ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটার ভিতরে লোকজুনের আসা যাওয়া দেখতে লাগলো। পরিপাটি পরচুলা পরা বৃদ্ধ লোকেরা যেমন আসছে, তেমনি বই আর কাগজপত্রের বোঝা নিয়ে যুবকদেরকেও দেখা গেলো ভিতরে যেতে। প্রতিবার যখনই দরজা খোলা হচ্ছিলো দারোয়ানটা ওর দিকে সন্দেহজনকভাবে তাকিয়ে থাকছিলো, কিন্তু ফ্রান্সিস একবারও রাস্তা পার হলো না। একবার ওর মনে হলো যে কেউ একজন দোতলার ব্যালকনির ছায়া থেকে ওর দিকে। খেয়াল রাখছে। কিন্তু ও ভালো করে দেখার আগেই লোকটা ভিতরে চলে গেলো।

অক্টোবরের দিনটা বয়ে চললো। ছায়াগুলো লম্বা হলো আরো; খালি হয়ে গেলো কফির দোকানটা। গির্জার ঘণ্টা বাজিয়ে সন্ধ্যার প্রার্থনার সংকেত দেওয়া শুরু হলো। ফ্রান্সিস ভেবে পেলো না এখন ও কোথায় যাবে বা কি খাবে। দুপুরে দেখা সব দিবাস্বপ্নের কথা ভুলে গিয়েছে ততোক্ষণে। এখন ওর মাথায় ঘুরছে শুধু খাওয়ার কথা। ও ভেলভেটের ব্যাগটা স্পর্শ করে নাড়াচাড়া করলো কিছুক্ষণ। আস্তাবলের কাছেই ও একটা মহাজনের দোকান দেখেছিলো; ওখানে বন্ধক রেখে নিশ্চয়ই ভালো টাকা পাওয়া যাবে। কয়েকদিনই তো, হাইপেরিয়নের টাকাটা পেলাই শোধ করে দেবে। কিন্তু চিন্তাটা মাথায় আসতেই নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে লজ্জা হতে লাগলো ওর।

চিন্তায় ডুবে থাকায় ফ্রান্সিস খেয়াল করলো না যে চাপরাসটা ওর দিকে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতে টের পেলো। লোকটার হাতে একটা কাগজে মোড়ানো গরম কেক।

“সারাদিন এখানে দাঁড়িয়ে আছো দেখলাম। কিছু তো খাও নি।”

ফ্রান্সিস লোকটার হাত থেকে কেকটা প্রায় কেড়ে নিয়ে গপাগপ খেতে আরম্ভ করে দিলো। কেকটার মিষ্টি স্বাদ আর আলমন্ডের সুঘ্রাণ আস্বাদনের অবস্থায় নেই ও আর এখন।

ফ্রান্সিস খাওয়ায় এতোই ব্যস্ত ছিলো যে দারোয়ানের সাথে আরো দুজন লোক এসেছে সেটা ও খেয়াল করার ফুরসত পায়নি। আচমকা এক জোড়া শক্ত হাত ওর হাত জোড়া চেপে ধরলো, আর একটা হাত চেপে ধরলো ওর মুখ। আর দারোয়ানটা হাতের লাঠি চেপে ধরলো ওর গলায়। দম বন্ধ হয়ে এলো ফ্রান্সিসের। অর্ধেক খাওয়া কেকটা মাটিতে পড়ে গেলো, আর একটু পরেই বুটের তলায় চাপা পড়ে মিশে গেলো রাস্তায়।

ফ্রান্সিস নিজেকে ছোটানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুই করতে পারলো না। দারোয়ান আর তার লোকেরা ওকে চ্যাং দোলা করে রাস্তা পেরিয়ে দালানের ভিতরে নিয়ে গেলো। ও এমনকি একটা চিৎকারও দিতে পারলো না। রাস্তার কেউ যদি ঘটনাটা দেখেও থাকে, তারা ভালোই জানে যে এসব ক্ষেত্রে না দেখার ভান করাটাই মঙ্গল।

*

বাইরের থেকে দেখে যা মনে হয়, ভিতরে আসলে বাড়িটা আরো বেশি বড়। লোকগুলো ফ্রান্সিসকে ধরে একটা লম্বা করিডোরে নিয়ে এলো। লবঙ্গ আর মরিচের গন্ধে ভারি হয়ে আছে জায়গাটা। ওখান থেকে অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো ওরা। ফ্রান্সিস হাসি ঠাট্টা আর আলাপের শব্দ শুনতে পেলো, কিন্তু আশেপাশের সব দরজাই বন্ধ, তাই ওদের শব্দ কেউ শুনতে পেলো না।

লোকগুলো ওকে সবার উপরের তলার একটা বিশাল দরজার সামনে নিয়ে এলো। দরজার হাতলটা পিতলের। দেখতে ঠিক শিকার ধরতে উদ্যত একটা সিংহের মতো। দারোয়ান সম্ভ্রমের সাথে টোকা দিলো। এমনকি দরজা খোলার আগেও কিছুটা ইতস্তত করলো, যেনো কোনো ভয়ঙ্কর জানোয়ারের খাঁচায় ঢুকতে যাচ্ছে।

ভিতরটা অন্ধকার। বাতাসও গরম আর ভ্যাপসা। যেনো একটা কাঁচের ঘর। ফায়ারপ্লেসে ছোট একটু আগুন জ্বলছে। পিছনের দেয়ালের সাথে একটা বিশাল ডেস্ক, তার উপরেও একটা মোমবাতি জ্বলছে, কিন্তু দুটোর আলোয় পর্দায় ঘেরা ঘরটা আলোকিত হচ্ছে না মোটেও। দেয়ালগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেনো হেলে পড়ছে। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিশাল বিশাল সব জাহাজ আর যুদ্ধের ছবি ঝুলানো। গিলটি করা ফ্রেমে বাধাই করা ওগুলোর। বাতাসে কটু গন্ধ, যেন এক টুকরো কাঁচা মাংস বহুদিন ধরে এখানে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু কাউকে চোখে পড়লো না। শুধু ডেস্কের পিছনে একটা টিপির মতো দেখা যাচ্ছে, যেনো গাদা করা ময়লা কাপড়ের ভূপ।

ওকে ধরে আনা লোকগুলো ওকে ছেড়ে দিয়ে টুপি খুলে দাঁড়ালো। আচমকা বাধন আলগা হওয়ায় ফ্রান্সিস ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে প্রায় উল্টে পড়ে যেতে যেতে সামলালো। তারপর গলায় হাত ডলতে লাগলো।

ডেস্কের পিছনে ভেজা, খড়খড়ে কাশির শব্দ পাওয়া গেলো। তারপরেই টিপিটা নড়তে শুরু করলো। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই ফ্রান্সিস বুঝলো ওটা একটা মানুষ। ঠিকভাবে বললে, বিশাল ভুড়িওয়ালা একটা মানুষ। পরনে রেশমের ড্রেসিং গাউন, আর হাঁটুর উপর একটা কম্বল রাখা। থলথলে থুতনির পিছনে ঘাড় দেখাই যাচ্ছে না। লোকটার মাথা কামানো, কিন্তু ঠিকভাবে না, তাই ইতস্তত সাদা চুলগুলো তুলা গাছের কাটার মতো বের হয়ে আছে। গাল জুড়ে নীল হয়ে ফুটে আছে শিরা-উপশিরা। শুধু তার কোটরে বসে যাওয়া, মাংসের আড়ালে লুকানো চোখগুলোতেই একটু যা জীবনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

“কে তুই?” মাথা না তুলেই জানতে চাইলো লোকটা। ফ্রান্সিস ধারণা। করলো লোকটার সম্ভবত মাথা তোলার শক্তি-ই নেই। অনেক পরে ও জেনেছিলো যে ওর ধারণা অর্ধেক সত্যি। যদি কোনো বিরল উপলক্ষে উনি এই ঘর ছেড়ে বের হতে চাইতেন, তাহলে ওনার চেয়ারের সাথে লাগানো লোহার আংটাগুলো ধরে চেয়ারসমেত তাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসা হতো। যখন প্রাকৃতিক কর্ম সারার দরকার হতো তখন নাকি তিনজন লোক তাকে বয়ে নিয়ে যেতো, তারপর কাজ শেষ হলে তারাই শৌচকার্য সেরে দিতো।

একজন প্রহরী এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের পেটে ঘুষি বসিয়ে দিলো। “স্যার নিকোলাস যখন কিছু জিজ্ঞে করবে তখন চুপ না থেকে কথা বলবি।”

ফ্রান্সিস কথা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘুষি খেয়ে ওর দম বেরিয়ে গিয়েছে পুরোটা, ফলে কোনো কথাই বেরুলো না।

“কে পাঠিয়েছে তোকে? নরিস আর ওর ডোগেটের লোকজন?”

“কে?” হাফাতে হাফাতে বললো ফ্রান্সিস। এই নামের কাউকে চিনি না। আমি।”

“আমার সাথে চালাকি করার চেষ্টা করিস না ছোঁড়া।” স্যার নিকোলাস মাথাটা সামান্য নাড়তেই আরো একটা ঘুষি পড়লো পেটে। তবে ফ্রান্সিস এবার পেট শক্ত করে রেখেছিলো, তাই আগেরবারের মতো অতোটা জোরে লাগলো না। “সারাদিন আমার বাড়ির উপর নজর রেখেছিস। কার উপর গোয়েন্দাগিরি করছিস?”

“মোটেও না”।

“তোকে কি ঐ ইন্টারলোপারগুলো পাঠিয়েছে নাকি? ওরা কি জানে না আমার ব্যবসা চুরির চেষ্টা করার পরিণাম কি হতে পারে? যদি একবার ধরতে পারি তাহলে সবগুলো জাহাজ পুড়িয়ে দিয়ে ভারতের জেলে পচিয়ে মারবো।”

“প্লীজ,” বলতে গেলে ফ্রান্সিস, কিন্তু কিডনী বরাবর আর একটা ঘুষি পড়ায় থেমে যেতে হলো। “আমি ফ্রান্সিস কোর্টনী। আমার মা আমাকে পাঠিয়েছেন।”

স্যার নিকোলাসের চেহারা রাগে লাল হয়ে গেলো। “ফাজলামি করিস আমার সাথে? স্যার ফ্রান্সিস কোর্টনী কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর আগে মারা গিয়েছেন।”

“উনি আমার পরদাদা।” ফ্রান্সিস হন্তদন্ত হয়ে জামার ভিতর থেকে ভেলভেটের ব্যাগটা বের করার চেষ্টা করলো। প্রহরী দেখে ভাবলো ও বোধহয় কোনো অস্ত্র বের করছে। সে ফ্রান্সিসের পায়ে লাঠি দিয়ে বাড়ি মেরে মাটিতে ফেলে দিলো, সাথে সাথে আবার পা তুললো ওর বুকে লাথি মারার জন্যে।

ফ্রান্সিস ব্যাগটা বের করে আনলো। প্রহরী ওর হাত থেকে সেটা ছিনিয়ে নিয়ে, মুখটা খুলে ঝাঁকি দিতেই ভিতর থেকে সিংহখচিত পদকটা মেঝেতে গিয়ে পড়লো।

প্রহরী মারার জন্যে আবার হাত তুললো।

“থামো,” স্যার নিকোলাস বললেন। “দেখি আমি ওটা।”

লোক দুজন ফ্রান্সিসকে টেনে তুললো, আর একজন খানসামা সোনার সিংহটা তুলে নিয়ে ডেস্কের উপর রাখলো। স্যার নিকোলাস ওটা তুলে ধরলেন, মোমের আলোয় ওটায় খোদাই করা চুনি আর হীরাগুলো ঝিকিয়ে উঠলো।

“কোথায় পেয়েছিস এটা?” ফ্রান্সিসকে ধমক দিয়ে জানতে চাইলেন উনি।

“এটা আমাদের পরিবারের। আমার বাবা আমাকে এটা দিয়ে গিয়েছেন।”

স্যার নিকোলাস পদকটাকে উলটে পালটে দেখলেন কিছুক্ষণ, তারপর লোকদেরকে হাতের ইশারায় ফ্রান্সিসকে ছেড়ে দিতে বললেন।

“কে তুমি?” স্যার নিকোলাস আবার জিজ্ঞেস করলেন কথাটা। তবে এবার আর তাচ্ছিল্যের ভাবটা নেই।

ফ্রান্সিস সোজা হয়ে দাঁড়ালো। নড়তেই সারা শরীরে অবর্ণনীয় ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো। দাঁতে দাঁত চেপে অগ্রাহ্য করলো সেটাকে। এই প্রশ্নটা শুনলে কি বলবে সেই কথাগুলো সারাদিন বার বার আওড়েছে ও। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে কথাগুলো বলতে হতে পারে সেটা কল্পনাও করেনি।

“আমি ফ্রান্সিস কোর্টনী, বাবা উইলিয়াম কোর্টনী। আর দাদা হচ্ছেন হাল কোর্টনী। ডার্টমাউথ এর ব্যারন আর অর্ডার অফ সেন্ট জর্জ অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল এর নৌবাহিনির নাইট। বিশ বছর আগে আমার দাদা আপনার কোম্পানির জাহাজ রক্ষা করতে ফিয়ে জলদস্যুদের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। এখন আমি শুধু একটু সহায়তা চাচ্ছি। আমি কোম্পানির চাকরিতে যোগ দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ চাই।”

চিল্ডস এমনভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন যেনো ও একটা প্রেতাত্মা।

“তোমরা যাও,” নিজের লোকদের আদেশ দিলেন উনি।

ওরা চলে গেলো। চিল্ডস আপাদমস্তক ফ্রান্সিসকে জরিপ করলেন। কয়েক যুগ ধরে উনি নিজের সম্পত্তির মতো করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেখাশোনা করছেন। এই লেডেনহলের অফিস থেকে শুরু করে পৃথিবীর অপর প্রান্ত পর্যন্ত নিজের হাতকে প্রসারিত করেছেন উনি। কতো রাজা, মন্ত্রী আসলো গেলো। কেউ কেউ দাবি করেছিলো কোম্পানি খুব বেশি ক্ষমতাধর হয়ে যাচ্ছে, এর ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু উনি তাদের প্রত্যেককে দেখে নিয়েছেন। একে একে তার প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে হটিয়ে দিয়ে আজও টিকে আছেন, আর তাদের চাইতে বেশিদিন বেঁচেও আছেন।

কোর্টনীরাও অনেকেই এসেছে গিয়েছে। পরিবারটা একসময় খুবই ভালো কাজের লোক হিসেবে তাকে সেবা দিয়েছে এবং এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আর কাজ শেষ হওয়ার পর উনি ওনার শত্রুদের মতোই ওদেরকেও সহজেই সরিয়ে দিয়েছেন। এসব করতে ওনার এক ফোঁটা বিবেকে বাঁধেনি। বোম্বেতে ওনার নিজের বাড়িতে বসে উনি টম কোর্টনীকে ওর ভাই উইলিয়ামের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার ফাঁদ পাতেন। কিন্তু ওনাকে অবাক করে দিয়ে টম সেই ফাঁদ কেটে বেরিয়ে উল্টো উইলিয়ামকেই মেরে বসে। তবে তাতে চিল্ডসের কোনো সমস্যা হয়নি। টম ফেরারি হয়ে পালিয়ে যায় আর উইলিয়ামের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাত শতাংশ ভাগ চলে যায় ওর শিশুপুত্রের উত্তরাধিকারে। আর এক বিধবাকে ফুসলিয়ে সেই ভাগটা তার কাছে বিক্রি করানোর জন্যে মোটেও কোনো কষ্ট হয়নি। ফলে কোম্পানির উপর তার প্রভাব এখন একচেটিয়া করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু উনি এই ফ্রান্সিস কোর্টনীর কথা একদমই ভুলে গিয়েছিলেন।

ছেলেটা এখন তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, প্রায় যুবক হওয়ার দশা। লোকগুলো ওর গলার যেখানে চেপে ধরেছিলো সেখানে একটা নীলচে দাগ হয়ে আছে। চেহারা ফ্যাকাশে কিন্তু তাতেও একটা চাপা আভিজাত্য ঠিকই প্রকাশ পাচ্ছে, যা চিল্ডস বিশ বছর আগে ওর দাদা হাল-এর মাঝে দেখেছিলেন। এই ছেলেটা তার খুব কাজেও লাগতে পারে, আবার তার জন্যে বিপজ্জনকও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

“শোন বাছা,” উনি আগের চাইতে অনেক নরম আর স্নেহময় কণ্ঠে বললেন। “কাছে এসো যাতে তোমাকে আরো ভালো দেখতে পারি।”

উনি ইচ্ছে করে এমনটা করতে বললেন। ওনার শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও নীল চোখজোড়া এখনো ওনার মস্তিষ্কের মতোই ক্ষুরধার আছে।

ফ্রান্সিস টলোমলো পায়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো।

“তোমার সাথে এরকম বাজে আচরণ করার জন্যে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি,” চিল্ডস বললেন। “আমার শত্রুদের গুপ্তচরের অভাব নেই। আরা আমাকে আর আমার কোম্পানির ক্ষতি করতে ওরা কিছুতেই থামবে না। খুব বেশি ব্যথা পাওনি তো, না?”

ফ্রান্সিস ওর হাতের পাশটা একটু ঘষলো। না দেখেও টের পাচ্ছে যে ওসব জায়গায় রক্ত জমাটবেঁধে গিয়েছে।

“আমি খুব ক্ষুধার্ত, মহামান্য।”

“আরে তাইতো।” চিল্ডস ওনার ডেস্কের কোনায় বসানো একটা বেল বাজালেন। তারপর ধমক দিয়ে একজন চাকরকে খাবার আনতে আদেশ দিলেন। “এখন বসো দেখি। আর আমাকে সব খুলে বলো। এখানে এলে কিভাবে? চিঠি লিখে যদি আসতে তাহলেতো তোমাকে এতো ঝামেলা পোহাতে হতো না।”

ফ্রান্সিস ব্যথা সামলে চেয়ারে বসলো। “আমার সৎ বাবা গত সপ্তাহে মারা গিয়েছেন। এই সোনার পদকটা ছাড়া আর কিছুই রেখে যাননি উনি।”

চিল্ডস একটা রুমাল দিয়ে নিজের প্রু মুছলেন। “শুনে খারাপ লাগলো। তোমার মা হয়তো কখনো বলেনি তোমাকে, কিন্তু আমি সবসময়েই তোমার বড় হওয়ার খোঁজখবর রেখেছি। আর তোমার বাবা যেভাবে মারা, গেলেন-আমার নিজেকেও ব্যাপারটার জন্যে দোষী মনে হয়। কারণ তোমার টম চাচা ঐ জঘন্য কাজটা করতে যাওয়ার আগে আমিই ছিলাম শেষ লোক যে তাকে দেখেছিলো। আমার সবসময়েই মনে হয়েছে যে আমি কি কিছু বলে বা করে ওর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারতাম? আমি কি একটু খেয়াল করলে ওর অভিসন্ধি ধরতে পারতাম আর ওকে আটকাতে পারতাম?”

বলতে বলতে কাশির দমকে বাকা হয়ে গেলেন উনি। রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন সাথে সাথে। রুমালটা সরাতেই দেখা গেলো ওটায় টকটকে তাজা রক্ত লেগে আছে।

“আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে আপনার কিছুই করার ছিলো না, স্যার, “ ফ্রান্সিস প্রতিবাদ করলো।

তবে ওর মায়ের বলা কথাগুলো মাথায় আসতেই ওর মনে একটা অসুস্থ চিন্তা আবার নাড়া দিয়ে গেলো।

“আমি কি আপনাকে বিশ্বাস করে একটা কথা বলতে পারি?”

“অবশ্যই। নিজের বাবা মতো ভাবতে পারো আমাকে।”

“বাড়ি ছেড়ে আসার আগে আমার মা খুব আজব একটা কথা বলেছিলেন। উনি বলেছিলেন যে উনি বিশ্বাস করেন টম চাচা নাকি আসলে নির্দোষ। উনি নাকি বাবাকে মেরেছিলেন নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে।”

চিল্ডস এতো জোরে মাথা নাড়লেন যে ওনার থলথলে থুতনী দুলতে লাগলো। “উনি ভুল ভেবেছেন। আসলে অধিক শোকে ওনার বুদ্ধি ঠিকমতো কাজ করছে না। বেচারী! উইলিয়াম কোর্টনী যেদিন মারা যায় আমি সেদিন তাকে হাউস অফ লর্ডসে দেখেছিলাম। নিজের ভাইয়ের ব্যাপারে যে দুশ্চিন্তার কথা সেদিন ও বলেছিলো বা তার জন্যে যে ভালোবাসা আর স্নেহের ভাব আমি দেখেছিলাম সেটা ছিলো সম্পূর্ণ খাঁটি। সেদিনই উইলিয়াম আমাকে বলেছিলো যে ও টমকে দশ হাজার পাউন্ড দেবে, যাতে টম একটা জাহাজ নিয়ে ওদের ভাই ডোরিয়ানকে উদ্ধার করে আনতে পারে। ডোরিয়ানকে দস্যুরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো-পরে জানা যায় যে ছেলেটা মারা গিয়েছে। তবে সেটায় টম কোর্টনীর লোভ মিটলো না। ও টেমসের ধারে উইলিয়ামকে পিছন থেকে আক্রমণ করে ওর বাবার সম্পত্তির আরো বেশি ভাগ দাবি করে। উইলিয়াম রাজি না হতেই ও নির্দয়ের মতো ওর গলা কেটে মেরে ফেলে।”

দৃশ্যটা কল্পনা করে ফ্রান্সিস শিউরে উঠলো। “আপনি নিশ্চিত?”

“এক মাঝি পুরো ঘটনাটা দেখেছিলো। ও আমাকে সব বলেছে। এমনকি এতোদিন পরেও আমার সব মনে আছে।”

একজন চাকর দরজায় আঘাত করে একটা রূপার ট্রে হাতে ভিতরে ঢুকলো। তারপর খাবারের পাত্রগুলো চিল্ডসের ডেস্কে নামিয়ে রাখলো। ঝলসানো মাংস দেখা গেলো ওগুলোয়। দুই গ্লাস ক্লারেট মদ ঢেলে দিয়ে সে বিদায় নিলো। ফ্রান্সিস আর দেরি না করে বলা চলে ঝাঁপিয়ে পড়লো খাবারের উপর।

চিল্ডসও প্রায় ফ্রান্সিসের মতোই বুভুক্ষের মতোই খেতে লাগলেন। ওনার গাল বেয়ে ঝোল পড়ে জামার সামনের দিকটা ভরে গেলো।

“তুমি কি বাবার মৃত্যুর বদলা নিতে চাও?” প্রশ্নটা করতে গিয়ে চিল্ডসের মুখ থেকে খাবারের কণা ছুটে বেরিয়ে এলো। বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলা শুরু করলেন, “অবশ্যই তুমি চাও। তুমি একজন কোর্টনী। আর তোমার শরীরে কেমন রক্ত বইছে সেটা আমার ভালোই জানা আছে।”

ফ্রান্সিস ঢাকাঢক করে খানিকটা ওয়াইন গিললো। “জ্বী স্যার। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না।”

“আজ এখানে তোমার উপস্থিতি আমি ভাগ্যের খেল ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না; যেনো তোমাকে তোমার কপালই এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। এক সপ্তাহ আগে একটা জাহাজ ভারত থেকে ডেপ্টফোর্ডে নোঙ্গর করে। নাম ডাওজার। ক্যাপ্টেনের নাম হচ্ছে ইঞ্চবার্ড। ওর কাছে থেকে সেই একটা ঘটনা শুনলাম আমি। বোম্বে থেকে রওনা দেওয়ার বাইশ দিন পরে, মাদাগাস্কারের কাছাকাছি ওদের জাহাজকে দস্যুরা আক্রমণ করে বসে। ওরা প্রায় দখল করেই ফেলেছিল জাহাজটা। প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ হয় সেদিন। কিন্তু ওরা যখন প্রাণপণ লড়াই করছিলো তখন একটা ছোট জাহাজ ওদের সাথে যোগ দেয়। আর ওটার ক্যাপ্টেন ছিলো আমাদের টম কোর্টনী।”

ফ্রান্সিসের মনে হলো ঘরটা ওর চারপাশে দুলছে। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো যেনো ওর দিকে এগিয়ে আসছে, ওয়াইন ওর মাথায় চড়ে বসছে। “এ কিভাবে সম্ভব? টম কোর্টনীতে অনেক আগেই আফ্রিকায় মারা গিয়েছেন। আমার গাই চাচা বলেছেন সেটা।”

“তোমার চাচা ভুল জেনেছিলেন। টম কোর্টনী বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। আফ্রিকার উপকূলে ব্যবসা করে বেড়াচ্ছে। ইঞ্চবার্ডের ধারণা সমুদ্রে না বের হলে সে কেপ টাউনে থাকে।”

চিল্ডস তার কাটা চামচ আর ছুরি নামিয়ে রাখলেন। “তুমি কোম্পানিতে একটা চাকরি চেয়েছিলে। তোমার দাদার জন্যে যে ভালোবাসা আমার আছে, বা তোমার পরিবারের সাথে আমাদের যে দীর্ঘ সম্পর্ক সেটার জন্যে আমি তোমাকে খুশি মনে তোমার গাই চাচার সাথে একটা কেরানির চাকরি দিয়ে দিতে পারি। আমাদের একটা জাহাজে করে তুমি ফ্রি-তেই যেতে পারবে ভারত। কিন্তু আমি তোমাকে এর চাইতে ভালো কিছু দিতে পারি। জাহাজকে বলবো কেপ টাউন হয়ে বোম্বে যেতে। ছোটখাটো মেরামত আর রসদ সংগ্রহ করতে ওখানে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। যদি তুমি চাও তো জাহাজ থেকে নেমে তোমার চাচাকে খুঁজে বের করতে পারো।”

ফ্রান্সিস আরো এক টুকরো মাংস গিলে নিলো। এতোগুলো খবরের ধাক্কা সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। চিল্ডস সামনে ঝুঁকে এলেন। ওয়াইনের কারণে তার ঠোঁট রক্তের মতো লাল হয়ে আছে।

“টম কোর্টনী যখন ইংল্যান্ড ছেড়ে পালিয়ে যায়, তখন আমরা ওকে ধরার জন্যে পাঁচ হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই পুরস্কারের জিম্মা নিচ্ছি। এখনো সেটা বলবত আছে। পাঁচ হাজার পাউন্ড।” আবার বললেন চিল্ডস। “যে কোনো মানুষের জন্যে বিশাল একটা টাকা, আর তোমার মতো বয়সীর কথা তো ছেড়েই দিলাম। আর টাকাটা যদি তুমি বোম্বেতে ঠিকমতো খাটাতে পারো তাহলে ফিরতে ফিরতে তুমি এটা দ্বিগুণ কি তিনগুণ-ও করে ফেলতে পারবে।”

ফ্রান্সিস টাকার অঙ্কটা একবার কল্পনা করার চেষ্টা করলো। বিশাল একটা গাড়িতে করে হাই উইল্ডে ফিরে আবার বাড়িটা দখল নেওয়ার কথা ভাবলো। ওর মাকে আবার ওখানকার কত্রী হিসেবে দেখার কথা ভাবলো। জায়গাটাকে আবার সেই ছোট বেলার মতো আনন্দ আর খুশিতে ভরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলো।

ওয়াইন খাওয়ার কারণে ওর গরম লাগতে লাগলো। ও জানে যে এরকম অনেকক্ষণ উপোস থাকার পর এভাবে দ্রুত পান করা ঠিক না, কিন্তু ও থামাতে পারছিলো না। ও বুঝতে পারছিলো যে ওর আরো কিছু প্রশ্ন করা দরকার, গাই টম আর ওর উত্তরাধিকারের ব্যাপারে। কিন্তু চিল্ডসের স্বর শুনে বোঝা গেলো এ ব্যাপারে উনি আলাপ করতে আগ্রহী না। উনি যখন আরো ওয়াইন ঢেলে দিলেন ফ্রান্সিস কৃতজ্ঞচিত্তেই সেটা খেয়ে নিলো।

“এই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যেই তুমি সারা জীবন ধরে অপেক্ষা করছো,” চিল্ডস বললেন। “আমাদের দুজনেরই পাওনা কড়ায় গণ্ডায় আদায় হবে এবার।”

সেন্ট জর্জের পদকটা তখনো টেবিলেই পড়ে আছে, অর্ধেকটা এক তাড়া কাগজের নিচে ঢাকা। ফ্রান্সিস ওটা তুলে নিতেই চিল্ডসের চেহারা বেজার হয়ে গেলো, কিন্তু ফ্রান্সিস সেটা খেয়াল করলো না। এতোটা মদ খেয়ে ও এখন ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না।

“আমার বাবার ইজ্জতের কসম, স্যার নিকোলাস। আমি টম কোর্টনীকে খুঁজে বের করে তাকে তার উপযুক্ত শাস্তিই দেবো।”

*

টম আর ডোরিয়ান পানশালার বাইরে বসে আছে। মাঝে মাঝে পানপাত্রে চুমুক দিচ্ছে আর টেবিল উপসাগরে নোঙ্গর করে থাকা জাহাজগুলোর দিকে নজর বুলাচ্ছে। টম খাচ্ছে মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত ওয়াইন, তবে ডোরিয়ান ওর নতুন গ্রহণ করা ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী সব ধরনের মদ জাতীয় পানীয় পরিহার করে চলে। তাই ও খাচ্ছে কমলার রস। ওদের পিছনে টেবিল পর্বত আকাশ জুড়ে আঁকারাকা রেখা টেনে ফুটে আছে। ডেভিলস পিক আর লাতনক পিক এর ছোট চূড়াগুলো উপসাগরকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যে, মনে হচ্ছে কোনো প্রাকৃতিক গ্যালারি। পাহাড়ের ঢালের জঙ্গলের নিচে প্রায় শ-খানেক সাদা রঙ করা পাথুরে বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উত্তর প্রান্তে একটা দুর্গ, নেদারল্যান্ডের তিনরঙ্গা পতাকা উড়ছে সেখানে। দুর্গে পাঁচটা গম্বুজ। দেখেই বোঝা যায় এই উপনিবেশে কারা ক্ষমতাবান।

একটা ইন্ডিয়াম্যান (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ) হেলে দুলে ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। গায়ের রঙ আর দড়াদড়ির অবস্থা দেখে টম বুঝলো ওটা ইংল্যান্ড থেকে এবারই প্রথম সমুদ্র নামানো হয়েছে। জাহাজটার আগমনের ফলে কি কি হতে পারে সে ব্যাপারে দ্রুত হিসাব করে নিলো টম। আইভরির দাম বেড়ে যাবে, কারণ এই ইংরেজ ব্যবসায়ীরা ভারত পর্যন্ত যাওয়ার জন্যে রসদপত্র কিনবে; বিনিময়ে ওরা দেবে ইংল্যান্ড থেকে আনা ছুরি আর ইস্পাতের পাত্র। জাহাজটা দেরি করে এসেছে, বেশিরভাগ আইভরিই বিক্রি হয়ে গিয়েছে। তবে টম গতবারের অভিযান থেকে আনা কয়েকটা হাতীর দাঁত কি মনে করে যেনো রেখে দিয়েছিলো। এখন এদের কাছে কতোটা লাভ করতে পারবে সেই চিন্তা মাথায় আসতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো ওর।

একটু পরেই টম আর ডোরিয়ান, ওরা যে বোর্ডিং হাউসটায় উঠেছে সেটায় ফিরে যাবে। কেপ টাউনে ওরা সবসময় ওখানেই থাকে। আমস্টারডাম ব্যাঙ্কের একটা অফিস আছে এখানে। সেটায় দশ হাজার পাউন্ড জমা আছে টমের, কিন্তু ও সেটা দিয়ে নিজের বাড়ি বানানোর চেষ্টা করেনি কখনো। ডাচ কর্তৃপক্ষ ভিনদেশী কাউকে এই উপনিবেশে বাড়ি বানানোর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে জায়গা মতো কিছু রিক্স-ডলার (সাউথ আফ্রিকার তৎকালীন মুদ্রা) ছাড়লেই নিষেধের বেড়াজাল আলগা হয়ে যায়। টম অবশ্য কখনো চেষ্টা করেনি। বছরের পর বছর ধরে ও মৌসুমের শেষ সময়টা এই বোর্ডিং হাউসেই কাটিয়ে দেয় আর ধৈর্য ধরে পরের মৌসুম শুরুর অপেক্ষা করে।

“বিরক্ত হয়ে গিয়েছে নাকি টম?” ডোরিয়ান জিজ্ঞেস করলো। জবাবে টম ওর হাত সামনে বাড়িয়ে পাহাড়, সমুদ্র, আর তার উপরের তুলোর পেজার মতো মেঘ আর দিগন্তে ডুবতে বসা সুর্যের দিকে দেখালো। “এতো কিছু থাকার পরেও বিরক্ত কিভাবে হই বলো তো?”

“আমি তোমাকে খুব ভালোই চিনি, ভাইয়া,” মৃদু হেসে বললো ডোরিয়ান “ঐ দস্যু লেগ্রাঞ্জের হাত থেকে ডাওজারকে উদ্ধার করে আনার পর থেকে তুমি একটা বারও বন্দুকের গুলি ছোড়োনি। আর সেটাও ঘটেছিলো প্রায় এক বছর আগে।”

এবার আফ্রিকায় হাতীর দাঁত সংগ্রহের অভিযানটা ছিলো একেবারেই সাদামাটা। টম আর ডোরিয়ান জাম্বেসি নদীর প্রায় দুইশো লীগ পর্যন্ত ভিতরে অভিযান চালায়, কিন্তু এর আগে যেসব দাস ব্যবসায়ীদের সাথে ঝামেলা বেধেছিলো তাদের কারো সাথেই এবার আর দেখা হয়নি। এমনকি শিকারও বিগত বছরগুলোর মতো হয়নি। সেন্টারাস এবার মাত্র অর্ধেক খোল ভরে আইভরি নিয়ে ফিরে এসেছে।

“ঝামেলায় জড়ানো ব্যবসার জন্যে ক্ষতিকর,” দৃঢ় বিশ্বাসীর ভঙ্গিতে বললো টম।

তারপর দিগন্তে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলো ও। চোখ পিট পিট করে দেখলো কয়েকবার। যেখানে সূর্যের শেষ কিরণটাও মিলিয়ে যাচ্ছিলো সেখানে এমন সবুজ একটা রঙ দেখা গেলো যা টম এর আগে কখনোই দেখেনি। একেবারে চমকে গেলো ও; যদিও এরকম ঘটনার কথা আগেও শুনেছে, কিন্তু এবারই প্রথম চাক্ষুষ দেখার ভাগ্য হলো।

“ব্যাপারটা দেখেছো?” টম জিজ্ঞেস করলো। দুজনেই উত্তেজিত হয়ে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাকিয়ে আছে দূর দিগন্তে।

“তা আর বলতে!” ডোরিয়ানও সমান উত্তেজিত হয়ে আছে। “এটাকে বলে নেপচুন-এর চোখ টিপ।” এটাও একটা রহস্য-ঠিক সেন্ট এলমোর আগুন-এর মতো। পৃথিবীর দুর্গম সমুদ্রগুলোয় যাত্রা করলে নাকি মাঝে মাঝে দেখা যায় সেটা।

“আমি শুনেছি যারা এটা দেখে তারা নাকি বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়, আবার চেয়ারে বসতে বসতে আগ্রহের সাথে বললো টম।

“তোমার জন্যে তাহলে ভালোই হবে,” ডোরিয়ান ফোড়ন কাটলো। “এখন যা আছে সেটা তো বহু আগেই ব্যবহার করে শেষ করে ফেলেছে।”

প্রত্যুত্তরে টম হেসে ওর গ্লাসের তলানিটুকু ডোরিয়ানের মাথায় ঢেলে দিলো। “বড় ভাইয়ের সাথে বেয়াদবির শাস্তি স্বরূপ এখন আর এক গ্লাস ওয়াইন কিনে নিয়ে আসো।”

ডোরিয়ান বার থেকে টমের জন্যে আর এক গ্লাস পানীয় এনে টেবিলের উপর রাখলো, তারপর আবার চুপচাপ দুজন তারিয়ে তারিয়ে নৈঃশব্দটা উপভোগ করতে লাগলো। একটু পরেই দেখা গেলো ইন্ডিয়াম্যানটা ঘাটে এসে নোঙ্গর ফেললো।

অন্ধকার পানিতে নোঙ্গর ফেলার ঝপাস শব্দ হতেই তীর থেকে ঝাক বেঁধে নৌকা ছুটে গেলো জাহাজটার দিকে। ঠিক মায়ের দুধ খেতে ছাগলের বাচ্চা যেভাবে ছুটে যায়।

“এরা সকালের আগে মালপত্র ডাঙ্গায় আনবে না,” টম বললো। “এদের কাছে কি কি বেঁচা যায় সেটা আগে পরখ করে নিলেই ভালো হবে।”

টম পানীয়ের দাম হিসেবে একটা কয়েন টেবিলের উপর রাখলো, তারপর দুজন মিলে আবার পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চললো। রাস্তাটার নাম হচ্ছে ডাই হেরেংগ্ৰাচ (Die Heerengracht), অর্থ ভদ্রলোকের রাস্তা। কোম্পানির বাগান থেকে প্যারেড গ্রাউন্ড পর্যন্ত লম্বা রাস্তাটা। দুজনে কথায় মশগুল থাকায় উল্টো দিক থেকে আসা মহিলাটাকে খেয়াল করলো না কেউই। একেবারে মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার উপক্রম হতে টের পেলো দুজন।

“টম কোর্টনী?” মেয়েটা বললো। চেহারায় নিখাদ বিস্ময়।

“অ্যানা দুয়ার্তে?” টম জবাব দিলো। ওর চেহারাও খুশিতে ভরে গিয়েছে।

“আমাকে মনে আছে আপনার?”

“আপনাকে কিভাবে ভুলি বলেন? মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি আর আমার ভাই, মাত্রই আপনার সাথে যেদিন দেখা হয়েছিলো সেদিনের কথা আলাপ করছিলাম। কিন্তু আপনি যে কেপ টাউনে সেটা জানা ছিলো না।”

“আমার জাহাজ দুই দিন আগে মাদ্রাজ থেকে এসেছে।”

“এবার নিশ্চয়ই গতবারের মতো কিছু হয়নি?”

মেয়েটা নিজের গলায় ঝুলানো একটা রুপালি ক্রুশ চেপে ধরে বললো, “না, ভাগ্যটা এবার ভালো ছিলো।”

আচমকা টমের ঐ সবুজ দ্যুতিটার কথা মাথায় এলো। যদিও ও কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না, কিন্তু কেনো যেনো মনে হলো ওটা এই অপ্রত্যাশিত মোলাকাতটাকেই ইঙ্গিত করেছিলো বোধহয়।

“আজ রাতে আমাদের সাথে খেতে হবে,” ডোরিয়ান বলে উঠলো। “সারাহ আর ইয়াসমিনি আপনাকে দেখে খুব খুশি হবে।”

“তাহলেতো খুবই ভালো হয়,” অ্যানা হাসলো। “সত্যি কথা হচ্ছে আমি নিজেই চাচ্ছিলাম আপনাদের সাথে বসতে। আমার পক্ষ থেকে একটা প্রস্তাব আছে আপনাদের জন্যে।”

 ২. কোর্টনীদের বোর্ডিং হাউস

কোর্টনীদের বোর্ডিং হাউসটা শহরের একদম শেষ মাথায়, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাগানের দেয়ালের ঠিক নিচে। ওদের মালয় হাউসকীপার মিসেস লাই সবসময় ঝেড়ে পুছে তকতকে করে রাখে জায়গাটা। ওনার রান্না সাধারণ কিন্তু স্বাদ দারুণ। তার বড় একটা কারণ সম্ভবত টমের পরামর্শ মতো উনি ইংলিশ খাবার ভারতীয় মশলা দিয়ে রান্না করেন তাই।

বোতল থেকে এক গ্লাস ওয়াইন ছেলে নিলো টম। ডোরিয়ান আগের মতোই ফলের রস খেলো শুধু।

“আপনি ওয়াইন খান না?” অ্যানা খেয়াল করলো ব্যাপারটা।

“আমি মুসলিম।”

“ইংল্যান্ডে কি অনেক মুসলমান আছে নাকি?”

“উমম… সেটা আসলে এক লম্বা কাহিনি।”

“তবে অনেক ভালো একটা কাহিনি কিন্তু, টম বললো।

“তাহলেতো সেটা শুনতেই হয়,” অ্যানা বললো।

অ্যানার আগ্রহ দেখে ডারিয়ান নিজের জীবন বৃত্তান্ত সংক্ষেপে যতটা সম্ভব বললো ওকে। কিভাবে ও মাত্র এগারো বছর বয়সে আরব দস্যুদের হাতে বন্দী হয়, তারপর কিভাবে ওমানের এক প্রিন্স ওর লাল চুলের জন্যে ওকে পছন্দ করে কিনে নিয়ে যান, কারণ নবী মুহম্মদেরও (স.) নাকি চুল লাল ছিলো। ক্রীতদাস হলেও প্রিন্সের বাড়িতে ও একজন পালিত পুত্রের মতোই বড় হয়। একজন মুসলিম সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে করতে বড় হয়ে শেষমেশ এই বিশ্বাসটাকেই গ্রহণ করে ও।

অ্যানা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ডোরিয়ানের সব কাহিনি শুনলো। ডোরিয়ানের বলা শেষ হলে পরে শান্ত স্বরে বললো, “আপনাদের সবার মাথার জন্যেই দেখি দাম ধরা আছে!”

“তুমি কিভাবে জানো?” টম জানতে চাইলো। সম্বোধন বদলে গিয়েছে ততোক্ষণে।

“মাদ্রাজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ভালোই জানাশোনা আছে আমার। ওদের কাছ থেকে জেনেছি যে বোম্বের গভর্নরের নাম গাই কোর্টনী। আর একটু খোঁজ খবর করতেই জানতে পারি যে আপনারা আত্মীয়।”

টম আর ডোরিয়ান অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করলো।

“গাই আমাদের ভাই,” টম স্বীকার করলো। “তবে ও জানে যে ডোরিয়ান ওমানে মারা গিয়েছে আর আমি আফ্রিকার জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছি।”

“ওনাকে জানাননি যে আপনারা বেঁচে আছেন?”

“খবরটা পেলে গাই মোটেও খুশি হতো না। সত্যি কথা হচ্ছে আমরা মারা যাওয়াতেই বরং ও বেশি খুশি।”

অ্যানা নিজের গ্লাসে চুমুক দিলো। যেনো কথাটা খুবই স্বাভাবিক। “থাক, আপনাদের মাঝে কি হয়েছিলো সেটা জানতে চাই না।” অনুচ্চ স্বরে বললো ও।

“মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপার, ডোরিয়ান সরাসরি বলে দিলো।

“আর মেয়েটা হচ্ছে আমার বোন, প্রথমবারের মতো কথা বললো সারাহ। “ডোরিয়ান যেবার দস্যুদের হাতে ধরা পড়ে, সেই জাহাজে আমরাও ছিলাম। আমি তখনও ছোট কিন্তু আমার বড় বোন ক্যারোলিন ছিলো পূর্ণ যুবতী। বোকা মেয়ে; ও আসলে নিজের সৌন্দর্য দেখিয়ে বেড়াতে পছন্দ করতো। বলা যায় একেবার স্বেচ্ছায় ও টমের সাথে শোয়।”

“পাউডার ম্যাগাজিন রাখার জায়গাটায়, তাই না?” শয়তানি হাসি হেসে বললো ডোরিয়ান। “জাহাজে শুধুমাত্র ওখানেই একটু নিরিবিলি ছিলো।”

“ভুলটা আসলে ছিলো আমার,” টম বললো। অ্যানার সামনে এরকম একটা ঘটনা ফাস হয়ে যাওয়ায় বিব্রত। “আমার আসলে বোঝা উচিত ছিলো যে গাই ওকে ভালোবাসে।”

“গাই মোটেও ক্যারোলিনকে ভালোবাসতো না,” সারাহ বললো। “গাই ওকে শুধু নিজের কর্তৃত্বে রাখতে চাইতো। ঠিক যেভাবে মানুষ নিজের গাড়ি ঘোড়া বা এক ব্যাগ স্বর্ণকে অধিকারে রাখে। বিয়ে করার পর থেকেই গাই আর ক্যারোলিনকে কোন দাম দিতো না। তুমি ভুলে গিয়েছে যে ওদের বিয়ের পর আমি অনেকদিন ওদের বাসায় থেকেছি। গাই ওর সাথে কেমন ব্যবহার করে সেটা আমার নিজের চোখে দেখা।” বলতে বলতে চোখ বন্ধ করে ফেললো সারাহ। “ও মোটেও ক্যারোলিনকে ভালোবাসতো না, খোদা সাক্ষী।”

“আর উনিতো ক্যারোলিনকে বিয়ে করেই ফেলেছেন, তবুও আপনার সাথে ঝামেলা মেটেনি?” অ্যানা টমকে জিজ্ঞেস করলো।

“আসলে আরো কিছু ব্যাপার ছিলো। মানে…” টম আর বলতে পারলো না। কিছু কিছু ব্যাপার আসলে অ্যানার সাথে আলাপ করা সম্ভব না।

কি করেছি আমি? নিজেকে জিজ্ঞেস করলো টম। এক ভাইকে খুন করেছি, আর একজনও আমার মরণ চায়। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দুটো ভুল, আর সেগুলো শোধরানোরও আর কোনো উপায় নেই।

আবার ওর আগের রাতে দেখে সবুজ ঝলকটার কথা মনে হলো। খোদা আমাকে জ্ঞান দাও।

অ্যানা বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। “প্রতিটা পরিবারেই কিছু গোপনীয় ব্যাপার থাকে।”

“তবে তুমি কিন্তু খুবই সাহসী,” অ্যানাকে বললো সারাহ। প্রসঙ্গ পাল্টে পরিবেশ হালকা করতে চাচ্ছে। এই দুজন দাগী আসামীর সাথে বসে খাবার খাচ্ছো!”

“আপনারা আমার জীবন বাঁচিয়েছেন, আপনারা সবাই!” টেবিলের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো অ্যানা। “আপনাদের কিন্তু কোনো দরকার ছিলো না। আপনারা চাইলেই আমাদেরকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পারতেন। একশো জনে নিরানব্বই জন লোকই সেই কাজটাই করতো।”

“কারণ একশো জনের মধ্যে নিরানব্বই জনেরই সারাহ বা ইয়াসমিনির মতো কেউ নেই যারা তাদেরকে বলে দেবে যে কোন কাজটা অবশ্যই করতে হবে,” হেসে বললো ডোরিয়ান। “আমরা কিন্তু যেতে চাইনি!”

আলাপ চলতে থাকলো। রাতের খাবারের পরে সবাই বসার ঘরে গিয়ে বসলো। সারাহ সবাইকে উইলিয়াম বাবেল-এর বুক অফ লেডিজ এন্টারটেইনমেন্ট-এর একটা অংশ হার্প-এ বাজিয়ে শোনালো। টম সেই ইংল্যান্ড থেকে এটা অর্ডার দিয়ে আনিয়েছে।

“আমার আগের হাপটা টম নদীতে ফেলে দিয়েছে, বাজানোর ফাঁকে অ্যানাকে জানালো সারাহ।

“পুরো কথাটা তো বলল না। আমাদের জাহাজ যে একটা চরে আটকা পড়েছিলো সেটা তো বললে না! একদল আরব যে আমাদেরকে খুন করার জন্যে পিছু নিয়েছিলো সেটা মনে নেই? মরতে মরতে বেঁচেছিলাম সেবার, ডোরিয়ান বললো। মেঝেতে একটা কুশন পেতে বসে আছে ও।

“আমি নিশ্চিত মিস দুয়ার্তে ঠিকই বুঝেছেন যে পরিস্থিতি এরকম কিছু একটাই ছিলো,” ইয়াসমিনি বললো।

সারাহ আরো কিছুক্ষণ বাজিয়ে একটা ঝঙ্কার তুলে বাজানো থামালো। হাত তালি দিয়ে উঠলো বাকিরা। সারাহ গিয়ে টমের পাশে বসলো।

“মিস দুয়ার্তে,” টম বলা শুরু করলো। “কাল যখন দেখে হয়েছিলো তখন বলেছিলে যে আমাদের জন্যে নাকি কি একটা প্রস্তাব আছে?”

অ্যানা হাত দিয়ে ডলে নিজের কাপড় সোজা করলো। এই ঘরের বাকিদের চাইতে ও কমপক্ষে বারো বছরের ছোট। কিন্তু ওর শান্ত শিষ্ট ভাব দেখে সেটা মনে হয় না।

“ভারত সম্পর্কে কি জানেন?” টমকে জিজ্ঞেস করলো অ্যানা।

টম হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা নাড়লো কিছুক্ষণ। তলানির দিকে তাকিয়ে আছে। “বেশি কিছু না। নাবিকদের কাছে যা শুনেছি তাই। বুড়ো সম্রাট মারা যাওয়ার পর থেকে নাকি দেশটার অবস্থা বেশি সুবিধার না।”

“বৃদ্ধ আওরঙ্গজেব মারা যাওয়ার পর থেকে দেশটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে আছে,” অ্যানা-ও সায় দিলো কথাটায়। তার তিন পুত্র উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াই করেই যাচ্ছে। আর যখনই ওরা যুদ্ধ শুরু করে, তখন দেখা যায় অন্যান্য জমিদার বা নবাবেরাও প্রতিবেশীকে আক্রমণ করে বসে। পশ্চিম দিকে মারাঠারা নিজেদের পাহাড়ের দুর্গ থেকে প্রায় তিরিশ বছর ধরে মুঘলদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। মালাবার উপকূলে দস্যু আংরিয়া নিজের একটা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। টিরাকোলার দুর্ভেদ্য এক দুর্গ থেকে ও রাজ্য চালনা করে। দক্ষিণের সব নবাবেরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বলা যায় মুঘল সাম্রাজ্য একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।”

“ব্যবসার জন্যে খারাপ,” ডোরিয়ান মন্তব্য করলো।

টম কিছু বললো না তবে অ্যানা ইতস্তত করতে লাগলো। যেনো এরপরে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

“প্রস্তাবটা দেওয়ার আগে মনে হয় আমার আসলে নিজের আর আমার পরিবার সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া উচিত। আমার বাবা ছিলেন এক পর্তুগীজ ব্যবসায়ী। উনি ভারতে গোয়াতেই বসত গাড়েন। আমার মা ছিলেন ভারতীয়। স্থানীয় মানসবদারের মেয়ে। দুই পরিবারের কেউই বিয়েটা মেনে নেননি, তাই তারা মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গে পালিয়ে যান। ওটা ছিলো ব্রিটিশদের অধীনে। কপর্দকহীন অবস্থায় শুরু করলেও কঠোর পরিশ্রমের জোরে ধীরে ধীরে তারা কাপড়ের ব্যবসায় প্রচুর উন্নতি করেন। মাদ্রাজের তাঁতিদের কাছে থেকে সুতি কাপড় কিনতেন তারা, তারপর সেগুলো ইউরোপে রপ্তানি করতেন। প্রথম প্রথম অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে-ই বিক্রি করতেন, কিন্তু কোম্পানি বরাবরই প্রচণ্ড লোভী; ওরা আমাদেরকে দামে কম দিতো। বাবা তাই বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করেন। উনি এক ড্যানিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের মালগুলো বয়ে নেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেন।

“ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেসিডেন্ট গাই কোর্টনীর কানে পৌঁছে যায় ব্যাপারটা। যেসব ব্যবসায়ীরা কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়ায় তাদেরকে ওরা কি বলে জানেন? ইন্টারলোপার।” থুতু ছিটানোর মতো করে কথাটা বললো অ্যানা। “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন মনে করে যে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আসলে ওদের সাজানো বাগানে ঢুকে পড়া সাপ বাদে আর কিছু না। তাই প্রেসিডেন্ট জলদস্যুদের জানিয়ে দেন যে আমাদের জাহাজ কোথা থেকে ছাড়বে। কেপ কর্মোরিনের কাছে ওরা আমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। একটা লোকও বেঁচে ফিরতে পারেনি।

“আমার বাবা তার সব পুঁজি ঐ অভিযানটায় খাঁটিয়েছিলেন। এতো বড় ঝুঁকি জানার পরেও। যদি ব্যাপারটা কোনো দুর্ঘটনা হতো তাহলে বাবা এই ধাক্কা সামলাতে পারতেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কোর্টনী শুধু ঐটুকু করেই ক্ষান্ত দেননি। উনি আমাদেরকে ওনার বাড়িতে ডেকে নিয়ে মুখের সামনে ঘোষণা দিয়ে জানান যে উনি কি কি করেছেন। এটা নাকি আমাদের আর বাকিদের প্রতি একটা সতর্কবার্তা। আমাদের কিছুই করার ছিলো না, ন্যায় বিচার পাবো সেই আশাও ছিলো না। প্রেসিডেন্টই ওখানে আইন।

“বাবা এর কয়েক মাস পরেই মারা যান। প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়েছিলেন উনি।” বলতে বলতে কেঁপে গেলো অ্যানার কণ্ঠ। সারাহ ওর কাধ চেপে ধরলো। “এরপর থেকে আমিই ব্যবসা দেখাশোনা করি। সেজন্যেই ডাওজারে উঠেছিলাম। ক্যাপ্টেন আমার মালগুলো বহনের জন্যে অনেক বেশি ভাড়া হেকেছিলেন। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম যে একটা ইন্ডিয়াম্যান-এ চাপলে যাত্রাটা নিরাপদ হবে।”

“এই দস্যুদেরকেও কি তোমার কথা আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো নাকি?”

“না, ওটা ছিলো দুর্ভাগ্য।”

অ্যানা নিজের হাতের আঙুলগুলো একটা আর একটার ভিতরে ভরলো। “আমার কথা হচ্ছে, আমিও আপনাদের মতোই ব্যবসায়ী। আমি আমার মালগুলো সবচে কম খরচে বাজারে আনতে চাই, যাতে সবচেয়ে ভালো দামে বেচতে পারি। মাদ্রাজ থেকে কেপ টাউনে নিরাপদে মাল আনতে গেলে ব্রিটিশদের চাঁদা দেওয়া লাগে, ডাচদের চাঁদা দেওয়া লাগে, দস্যুদের চাঁদা দেওয়া লাগে, মুঘল সম্রাটদের চাঁদা দেওয়া লাগে। এরপরও জাহাজটা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। কামান দাগার জন্যে আমাকেই লোক রাখতে হয়, আবার সুরক্ষা তহবিলেও চাঁদা দিতে হয়… এতো খরচের পরে আর সেটা আর সম্ভব হয় না।”

“তুমি চাও আমি তোমার মাল বহন করি?”

“এটা শুধু আমার জন্যে না। ভারত মহাসাগর দস্যুতে গিজগিজ করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলো, মানে শুধু ইংলিশ আর ডাচদের জাহাজের ক্ষমতা আছে ওদেরকে আটকানোর। কিন্তু এর জন্যে কোম্পানিগুলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা টাকা নেয়। তবে কথা হচ্ছে, লন্ডনে, আমস্টারডামে বা অস্টেন্ডে বা এরকম আরো ডজনখানেক শহরে আরো অনেক সওদাগর, দালাল আর ব্যবসায়ী আছে যারা আরো সহজ শর্তে এসব ব্যবসায়ে অর্থ লগ্নি করতে রাজি, শুধু যদি তারা এই জাহাজের নিরাপত্তার ব্যপারে নিশ্চয়তা পেতো তাহলেই হয়।

“ইংল্যান্ড থেকে ভারত পর্যন্ত সরাসরি মাল পরিবহনের ব্যবসাটায় আসলে একচেটিয়া রাজত্ব চলছে। ভারতীয় মহাসাগরের বন্দরগুলোয় ব্যবসা পুরোপুরি উন্মুক্ত। যাত্রাটাকে যদি তাই দুই ভাগে ভাগ করা যায়, মানে মালগুলোকে যদি কেপ টাউনে একবার খালাস করা যায়, তাহলে আর এই একচেটিয়া কারবারটা থাকে না। এভাবেই আমি ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ডকে আমার মাল নিতে রাজি করিয়েছিলাম। আপনি যদি ভারত সাগরের এই ঝুঁকিটা নিতে রাজি হন, তাহলে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা আপনাকে ভালো পরিমাণ টাকা দেবে। আবার ভারতের ব্যবসায়ীরাও আপনার কাছে ভালো জিনিস বিক্রি করবে, কারণ আপনি কোম্পানির চাইতে বেশি টাকা দেবেন। কিন্তু এরপরেও লাভ ভালোই থাকবে।”

“VOC, মানে দ্য ডাচ ইস্ট ইন্ডীয়া কোম্পানি কেপ টাউনের সমস্ত ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।”

“আর ওদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজদের ব্যবসাকে দুর্বল করে এরকম যে কোনো উদ্যোগকে ওরা স্বাগতম জানাবে।”

“আমাদেরকে কিন্তু দস্যুদের মোকাবেলা করতে হবে,” টম বললো।

“আপনারা দস্যুদের সাথে কিভাবে লড়েন সেটা আমি দেখেছি। আর শুধু ভারত কেন?” অ্যানা ডোরিয়ানের দিকে ফিরলো। “আপনার পালক বাবা না ওমানের খলিফা বললেন? লামু, মাস্কাট, মোকা বা গন এর মতো আরব বন্দরেও নিশ্চয়ই এরকম অনেক লোক আছে যারা আপনাকে বিশ্বাস করে। আপনি ওদের ভাষাতেই কথা বলেন, ওদের ঈশ্বরের কাছেই প্রার্থনা করেন।”

“আগের খলিফা ছিলেন আমার পালব বাবা। বর্তমান খলিফা আমার পালক ভাই। তবে সে আমাকে ঠিক ততোটা ঘৃণা করে, যতোটা ঘৃণা গাই টমকে করে। নিজের লাল দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো ডোরিয়ান। “তবে… পরিচিত অনেকেই আছে এখনো।”

“যদি শুধু ঠিকঠাক একবার কাজটা করা যায়, তাহলে পুরো সাগর বাণিজ্যের মালিক হয়ে যাবেন আপনারা।”

প্রস্তাবটা নিয়ে সবাই ভাবনা চিন্তা করত লাগলো।

“আমরা ভেবে দেখবো,” টম বললো। “আমি কাল তোমাকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানবো।”

*

ডোরিয়ান অ্যানাকে ওর থাকার বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলো। বোর্ডিং হাউজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদেরকে চলে যেতে দেখলো টম। খাওয়া শেষে ও একেবারে গলা পর্যন্ত পান করেছে, তবে মাথা এখনো পরিষ্কার। ভালোভাবে চিন্তা করার জন্যে শুধু এখন একটু খোলা হাওয়া দরকার।

“আমি একটু বাগানে হাঁটতে যাচ্ছি,” সারাহকে বললো টম।

“তরবারি নিয়ে যাও। নইলে সিংহ ধরে খাবে?”

“লাগবে না,” জবাব দিলো টম। “আমি দাঁত দিয়েই সিংহ মারতে পারি, জানো না?”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো টম। ভাবনায় মগ্ন থাকায় রাস্তার উল্টো দিকের কটেজটার ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অবয়বটাকে খেয়াল করলো না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে শুরু করলো ও। আপনমনে স্প্যানিশ লেডি’ গানটার শিষ বাজাচ্ছে। অল্প পরেই voC-র কাছের গেটটায় পৌঁছে গেলো। গেটটা নানান কারুকার্যে সজ্জিত। বাগানের বাকি তিনদিকে কোনো দেয়াল নেই। তবে বন্য প্রাণীর আনাগোনা থেকে বাঁচতে পরিখা কাটা। ওদিক দিয়েই ডেভিল’স পিক-এর একটা ঢাল এসে মিলেছে। সারাহের সিংহের ব্যাপারে সতর্কবার্তাটা আসলে পুরোপুরি কৌতুক না।

VOC বাগানটা বানিয়েছে কেপ টাউনের স্থানীয়দের বিনোদনের জন্যে। প্রথম যখন ওরা এখানে ঘাটি গাড়ে তখন বাগানটার পিছনে প্রচুর খরচ করেছে, কিন্তু এখন আর এটার বিশেষ যত্ন নেয় না। টম যত ভিতরে যেতে লাগলো ততোই দেখলো বাগানের বেহাল দশা বেড়েই চলেছে। বিশাল বিশাল মাচাগুলো আগাছা দিয়ে ভরা। ওগুলোর জন্যে চাঁদের আলোও বাগানে প্রবেশ করতে পারে না। কয়েকটা মাচা ভেঙে রাস্তায় পড়ে আছে। পুকুরগুলো ময়লা জমে জমে ডোবায় পরিণত হয়েছে। এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় কয়েকটা মাত্র ফুলের গাছ টিকে আছে।

টম অবশ্য এসব কিছু খেয়াল করলো না। অ্যানার প্রস্তাবটা নিয়ে ওর মনের মধ্যে ঝড় চলছে। বিশ বছর আগে হলে ও এতো ভাবতো না, ঘরে বসেই রাজি হয়ে যেতো। কিন্তু এখন বয়স বেড়েছে, এখন ও জানে যে কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে কিছুক্ষণ থেমে নিলে ভালো হয়।

আবার মনে হচ্ছে কেননা প্রস্তাবটা নেবে না? কোর্টনীরা সবসময়েই এরকম অস্থির একটা পরিবার; ওদের স্বভাব-ই হচ্ছে নতুন নতুন দেশ, নতুন নতুন অভিযানে নেমে পড়া। আমরা বহুদিন ধরে একই জায়গায় লাঙ্গল ঠেলে চলেছি। মনে মনে ভাবলো টম। এই সুযোগটাই তো আমি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। এখন কেনো নেবো না?

সামনেই রাতের আধারে ও হায়েনার হাসি শুনতে পেলো। কলোনির ভাগাড়ে মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি করছে বোধহয়।

গাই এর জন্যে, ওর মনের সতর্ক অংশটা উত্তরটা দিলো। কারণ যদি তুমি এটা করো, তুমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লেজে পাড়া দেবে, আর একসময় না একসময় গাই এর কানে ব্যাপারটা পৌঁছাবেই। শেষ যে দুবার তোমাদের দেখা হয়েছিলো, দুবারই ও তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিলো। তার মানে আর একবার যদি দেখা হয়, তাহলে দুজনের একজন অবশ্যই মারা পড়বে।

পিছনের রাস্তায় নুড়ি মাড়ানোর শব্দ হলো। টম ঘুরে গেলো সেদিকে। ওর পিছনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। মাচার ছায়ার কারণে চেহারা বোঝা যাচ্ছে না, তবে তার ফাঁক দিয়ে যে আলো আসছে তা দিয়ে হাতের খোলা তরবারিটা দেখতে কোনো কষ্ট হলো না। টম নিরস্ত্র।

“আপনি কি টম কোর্টনী,” ইংরেজ টানে জিজ্ঞেস করলো একজন।

“হ্যাঁ, আমিই সে।” লোকটা কথা বলতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি পেলো টম। তারপর এক পা সামনে বাড়লো কিন্তু লোকটা তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর।

*

কেপ টাউন বন্দরে দ্য প্রফেট যেদিন এসে ভিড়লো, তার পরের দিনই ফ্রান্সিস কোর্টনী একটা ডিঙ্গি নৌকায় করে ডাঙ্গায় চলে এলো। এর আগেই ও জাহাজের কিনারে দাঁড়িয়ে উপসাগরকে বেষ্টন করে রাখা পর্বত চূড়া, সমুদ্রের ঢেউ, আর এই বিশাল মহাদেশটার একদম পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরগুলো ভালো মতো দেখে নিয়েছে। ছোট বেলায় ওর অভ্যাস ছিলো লাইব্রেরিতে থাকা বিভিন্ন ম্যাপ বের করে বিভিন্ন এলাকার অদ্ভুত সব নাম খুঁজে খুঁজে বের করা। স্কুলের খাতায় ও প্রায়ই নিজের কল্পনা থেকে সব মানচিত্র আঁকতো আর সেসব জায়গা আবিষ্কারের অভিযানে বেরিয়ে পড়তো। আর এতোদিন পর অবশেষে বাস্তবেই ও সেই কাজে বের হয়ে পড়েছে।

প্রথমে বন্দরের মাস্টারের অফিসে গিয়ে ওর আগমন রেজিস্টার করে নিলো।

“নাম? “ কলম থেকে কালি ঝরাতে ঝরাতে জিজ্ঞেস করলো কেরানি।

ফ্রান্সিস কোটের পকেট থেকে একগাদা ভুয়া কাগজপত্র বের করলো। চিল্ডস ওকে এগুলো দিয়েছেন। “আমার নাম ফ্রাংক লেইটন।”

ওখান থেকে বেরিয়ে ও সৈকত ধরে হেঁটে দুর্গে গিয়ে পৌঁছালো। শহর থেকে মাস্কেটের গুলি ছুড়লে যতোদূর যাবে, দুৰ্গটা ততোদূর অবস্থিত। এই বন্দর আর এর আশেপাশের এলাকাটা নিয়ন্ত্রিত হয় এখান থেকে। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ এটার দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছে যে ওর দাদার দাদা এই গরমে এখানে কাজ করছে। হাই উইন্ডে বড় হওয়ায় ফ্রান্সিসের চারপাশেই ওর পূর্বপুরুষদের নানান স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। ওদের গির্জার সমাধিকক্ষে অনেকের আবক্ষ মূর্তি আছে। তাদের পাওয়া নানা পদক বা ভূষণগুলোও কাঁচের বক্সে রাখা ছিলো, দেয়াল জুড়ে ছিলো পোর্ট্রেট। একে একে সেসব পোর্ট্রেট গায়েব হয়ে যায়। ওর মনে আছে প্রথমবার যখন ও ওদের লম্বা গ্যালারিতে একটা জায়গায় ফাঁকা দেখেছিলো তখন কেমন লেগেছিলো। স্যার ওয়াল্টারের দেনা শোধ করতে প্রতিবার যখন একটা করে ছবি বিক্রি হয়ে যেতো তখনকার কষ্ট ফ্রান্সিস বলে বোঝাতে পারবে না।

কিন্তু আজ ও এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় ওর দাদার দাদার একটা ছবি ফ্রান্সিস দেখেছিলো। ওনার চেহারা ছিলো কঠোর, ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা কেশরের মতো কালো চুল। ওর মায়ের কাছে। শুনেছে ওর দাদা হাল-এরও নাকি ওরকম চুল ছিলো। ও মনে মনে কল্পনা করলো ওনারা বেঁচে থাকলে আজ কেমন হতেন। ক্যানভাসের রঙ তুলির না, রক্ত মাংসের জ্যান্ত মানুষ হিসেবে তারা কেমন হতেন।

ওর কেমন অদ্ভুত লাগতে লাগলো। যেনো চারপাশে নিজের পুরুষদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। গ্যালারির সবগুলো ছবি যেনো জ্যান্ত হয়ে, ছবির ফ্রেম থেকে বেরিয়ে ওর পাশে এসে জড়ো হয়েছে। আর কোর্টনী নামটার সব ওজন আর তাদের প্রত্যাশার পুরো চাপটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে।

ও যদি টম চাচাকে খুন করে, তাহলে কি ও ঐ খুনীটার চাইতে আলাদা কিছু হতে পারবে?

“আমার বাবার খুনের বদলা এটা,” নিজেকে প্রবোধ দিলো ফ্রান্সিস। স্যার নিকোলাসের প্রতিশ্রুতিমতো পাঁচ হাজার পাউন্ডের পুরস্কারের কথাটা মাথা থেকে জোর করে সরিয়ে দিলো। সামান্য টাকা পয়সার জন্যে এরকম একটা ঘৃণ্য কাজ করতে বাধছে ওর।

ফ্রান্সিস টের পেলো দুর্গের দরজায় দাঁড়ানো প্রহরী ওর দিকে আগ্রহ নিয়ে খেয়াল করছে। ও ঘুরে দ্রুত পানির কাছে চলে এলো আবার। তারপর একটা সরাইতে ঢুকে পানীয়ের অর্ডার দিলো। এই সাত সকালে পুরো সরাই খালি, কিন্তু ওর কিছু পান করা দরকার।

বিয়ারটার রঙ টকটকে লাল। পানি ছাড়া, একদম কড়া। ফ্রান্সিস এক চুমুক দিতেই মনে পড়লো প্রায় দিনই সকালে ও ঘুম ভেঙ্গে নিচে এসেই দেখতো ওর সৎ বাবা অর্ধেক বোতল শেষ করে ফেলেছেন।

একজন মহিলা এসে ওর পাশের টুলে বসলো। মহিলার ঠোঁট লাল, মুখে পুরু পাউডার দিয়ে চেহারার বলিরেখাগুলো ঢেকে রেখেছে।

“ফুর্তি টুর্তি কিছু করার চিন্তা করছো নাকি?” নিজের ব্লাউজের ফিতে নিয়ে খেলতে খেলতে বললো মেয়েটা। “যা চাও তা-ই পাবে আমার কাছে।”

মেয়েটা কি প্রস্তাব করছে সেটা বুঝতে পেরে ফ্রান্সিস লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত কথা-ই বলতে পারলো না। ওর পুরো জীবনটাই কেটেছে হাই উইন্ডে। বাইরে গিয়েছে খুব কম, ফলে এরকম কোনো মহিলার সাথে কখনোই দেখা হয়নি আগে। এমনি অন্যান্য ছেলেদের কাছে এদের ব্যাপারে ফিসফিসানি শুনেছে, এর বেশি কিছু না।

“আমি টমাস কোর্টনীকে খুঁজছি,” কোনোমতে বললো ও। মেয়েটার দৃষ্টিতেই ফুটে উঠলো যে ও টমকে চেনে। তা দেখে ফ্রান্সিস আবার বললো, “আপনি চেনেন ওনাকে?”

ফ্রান্সিস টেবিলে একটা রূপার মুদ্রা রাখলো। মেয়েটা সাথে সাথে তুলে নিলো সেটা। তারপর নিজের কাপড়ে একবার মুছে কাচুলির ভিতর থেকে ছোট একটা ব্যাগ বের করে তার ভিতর রেখে দিলো।

ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললো, “তারপর?”

“একটা ড্রিঙ্ক কিনে দেবে না?” ছলনাময়ী কণ্ঠে বললো মেয়েটা। “একজন ভদ্রলোক সবসময়েই একজন ভদ্রমহিলাকে ড্রিঙ্ক কিনে দেয়।”

ফ্রান্সিস আবার লজ্জায় লাল হয়ে বারমেইডকে ডাকলো। লোকটা চুপচাপই আর এক গ্লাস বিয়ার নিয়ে এলো কিন্তু গ্লাসটা রাখার সময় ফ্রান্সিসের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালো।

“প্রথমবার নাকি?” নিজের বিয়ারে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো বেশ্যাটা। “তোমার মতো একজন তাগড়া জোয়ান? বিশ্বাস হয় না।”

“আমি টমাস কোর্টনীকে খুঁজছি,” ফ্রান্সিস আবার বললো।

“আমি তোমার জন্যে যা করতে পারবো, সে কিন্তু সেসব পারবে না।” বলে মহিলাটা টেবিলের নিচে পা দিয়ে ফ্রান্সিসের পা ঘষতে শুরু করলো। ফ্রান্সিস ত্রস্ত ভঙ্গিতে সেটা সরিয়ে নিলো।

ফ্রান্সিসের অস্বস্তি দেখে খুব আমোদ পেলো মহিলা। “ব্যাগে এরকম আর রুপার মুদ্রা আছে নাকি? ওরকম আর একটা দিলে শুধু বলবো না, তোমাকে একেবারে দেখিয়ে দেবো টম কে?”।

ফ্রান্সিস বুঝলো যে একে আগেভাগেই টাকা দেওয়াটা বোকামি হয়েছে। ও আর একটা মুদ্রা বের করলো কিন্তু সেটাকে এগিয়ে না দিয়ে নিজের আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রাখলো।

“এটা আপনি পাবেন, কিন্তু আগে আমাকে নিয়ে যেতে হবে।”

মহিলাকে হতাশ দেখালো। “বেশ দ্রুত সব শিখে নাও দেখছি। সাথে আর একটা মুদ্রা দিলে আমি এমন জিনিস শিখিয়ে দিতে পারি যা জীবনেও ভুলবে না।”

“আমাকে ওনার কাছে নিয়ে যান,” ফ্রান্সিস প্রসঙ্গ পাল্টালো।

“যেতে হবে না, আমি এখান থেকেই ওনাকে দেখতে পাচ্ছি।”

বলে মহিলা সরাইয়ের জানালা দিয়ে ইশারা করলো। জানালাটা বাতির কালি আর সমুদ্রের লবণে ভরে আছে। পেছনে বন্দরের সম্মুখভাগটা আর ওটার কাঠের জেটিটা দেখা যাচ্ছে। প্রফেটের নৌকাগুলো ওটার পাশেই বাধা, একদল কৃষ্ণাঙ্গ কুলি ওগুলো থেকে মাল নামাচ্ছে। এই হট্টগোলের মাঝে তিনজন লোককে দেখা গেলো দাঁড়িয়ে আলাপ করছে আর একগাদা মাল পরীক্ষা করে দেখছে। ফ্রান্সিস দুজনকে চিনতে পারলো, একজন প্রফেটের ক্যাপ্টেন আর একজন জাহাজঘাটার কেরানী। তৃতীয় লোকটা সবচেয়ে লম্বা, কমপক্ষে ছয় ফুটের উপরে লম্বা, কাঁধ ওনার পাশের কুলিগুলোর মতোই চওড়া। ঘন কালো চুল নাবিকদের মতো বেণী করে রেখেছেন। হাসিমুখেই কথা বলছিলো লোকটা, কিন্তু ভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো যে এই লোক কারো কাছে মাথা নোয়ায় না।

“লম্বা লোকটাই হচ্ছে টম কোর্টনী,” মেয়েটা বললো। কণ্ঠে প্রশংসার ছোঁয়া।

ফ্রান্সিসের মনে হতে লাগলো যেনো ওর রক্ত জমে গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টম কোর্টনী ওর জন্যে ছিলো রূপকথার এক দৈত্যের মতো, যে কিনা বার বার ওর দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দিতো। আর এখন সে ওর থেকে মাত্র কয়েক গজ সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অন্য লোকদের সাথে হাসাহাসি করছে। ওর জন্য কি করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে সে ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই।

বেশ্যা মহিলাটা ফ্রান্সিসের চেহারার অভিব্যক্তি পড়তে পারলো।

“তুমি ওনাকে ঘৃণা করো,” মজা পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বললো মহিলা।

“তুমি ওনাকে খুন করতে চাও, তাই না?” আবার বললো সে। ফ্রান্সিস প্রতিবাদের চেষ্টা করতেই বললো, “তর্ক করে লাভ নেই। তোমার চোখে যে দৃষ্টি দেখলাম সেটা আমি আগেও অনেকবার দেখেছি। অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই লোকগুলো ছিলো পাড় মাতাল।”

ফ্রান্সিস টমের উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলো না। “যদি চাই তো কি সমস্যা?”

“টম কোর্টনী কিন্তু কোনো ফালতু মাতাল নাবিক না। এখানকার সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক সে। তার সম্পর্কে নানান গল্প শোনা যায়,..” বলতে বলতে মাথা নাড়লো মহিলা।

ফ্রান্সিসের সৎ বাবা ওর জন্যে খুব বেশি কিছু করেননি কিন্তু ফ্রান্সিস যেনো তরবারি দিয়ে আর খালি হাতে লড়াইটা ভালোমতো শেখে, সে ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। একাধিকবার স্যার ওয়াল্টারের দেনার কারণে ফ্রান্সিসকে ভোর বেলায় ওনার পক্ষে ডুয়েলে নামতে হয়েছে। তাই ফ্রান্সিস ভালোভাবেই জানে নিজেকে কিভাবে রক্ষা করতে হয়। স্যার ওয়াল্টার ছিলেন একেবারে জাঁদরেল প্রশিক্ষক। ফ্রান্সিসের মুঠি দিয়ে রক্ত বের হওয়ার আগ পর্যন্ত উনি ওকে এক বিন্দু ছাড় দিতেন না। অনেক সময় এমন হতো যে ব্যথায় ও তরবারিটাও মুঠি করে ধরতে পারতো না।

একদিন এটাই তোমার জীবন বাঁচাবে, উনি প্রায়ই বলতেন কথাটা।

“আমি নিজেকে রক্ষা করতে জানি,” ফ্রান্সিস মহিলাটাকে আশ্বস্ত করলো।

“সেতো তুমি পারবেই সোনা,” কটাক্ষ হেনে বললো মহিলা। “কিন্তু এই ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি? তোমার তো তরবারিও নেই। কেপ টাউনে তুমিই টম কোর্টনীর একমাত্র শত্রু না। আমি এরকম অনেককেই চিনি যারা তোমাকে খুশি মনেই সাহায্য করবে।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফ্রান্সিস জানালা থেকে রিয়ে মেয়েটার দিকে আবার তাকালো। “কি বলতে চাচ্ছেন?”

“আর একটা ড্রিঙ্ক কিনে দাও, তাহলে বলছি।”

*

অন্ধকার নেমে আসতেই ফ্রান্সিস পাহাড় বেয়ে উঠে এলো। কোমরে গোজা তরবারিটা উরুতে বাড়ি খাচ্ছে। হাতটা ধরে ওটাকে সোজা রাখতে হচ্ছে। তরবারিটার অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরে স্বস্তি পাচ্ছে ফ্রান্সিস। টম কোর্টনীকে কিভাবে খুন করবে সেটাও ঠিক করে রেখেছে; মাস্কেট বা পিস্তলের গুলিতে অজ্ঞাত ভাবে ও খুন করবে না। একেবারে হৃৎপিণ্ডে তরবারি গেঁথে কাজটা সারবে ও। ঠিক যেভাবে টম উইলিয়ামকে মেরেছে।

ফ্রান্সিস নার্ভাস ভঙ্গিতে ওর চারপাশের লোকজনের দিকে তাকালো একবার। অন্ধকারের পটভূমিতে অশরীরী কালো একেকটা অবয়বের মতো লাগছে সবাইকে। অবশ্য চাঁদের আলোয় চামড়া চকচক করে উঠছে। সবার হাতে লম্বা, সোজা ফলার ছুরি। হাতলে আঙুল ভরে ঘোরাচ্ছে।

ফ্রান্সিসের পিছনে আসছে জ্যাকব দ্য ড্রিস। লম্বা পা ফেলে ও পাহাড় বেয়ে উঠছে আর রাস্তার দুধারের ঝোঁপ জঙ্গল তরবারির আঘাতে কেটে দিচ্ছে। ছুরিগুলোর ফলা খুবই ভারি, অনেকটা তরবারির মতো। এগুলো বানানো হয়েছিলো বার্বাডোজের আখের ক্ষেতে ব্যবহারের জন্যে। কোনো এক ব্যবসায়ী হয়তো সেগুলো কেপ টাউনে নিয়ে এসেছে। জ্যাকব এখন সেটার নতুন একটা ব্যবহার খুঁজে পেয়েছে।

পিছন থেকে জ্যাকব-ও ফ্রান্সিসকে জরিপ করলো। একদম নবীশ এই ইংরেজ ছেলেটাকে নিয়ে বেশ কৌতূহল অনুভব করছে ও। যখন বেশ্যা মহিলাটা ওদের পরিচয় করিয়ে দেয় তখন ও ভেবেছিলো যে এটা হয়তো একটা ফাঁদ। ছেলেটা একেবারে তালপাতার সেপাই, সদ্য গজানো দাড়ি এখনো পুরো গাল জুড়ে ছড়ায়নি। দেখা মনে হয় কড়া কোনো পানীয় পেটে পড়লেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। তবে জ্যাকব ছেলেটাকে তরবারির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আগে পরখ করে দেখেছে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, ছেলেটা খুবই ভালো একজন অসিযোদ্ধা। দ্রুত নাড়াচাড়া করতে পারে, সবসময় সতর্ক, আর মাত্র কয়েকটা প্যাঁচ কষেই জ্যাকবের মতো দক্ষ লোককেও অবাক করে দিয়েছে। আর টম কোর্টনীর কথা উঠলেই ছেলেটার চোখে যে আগুন দেখা যায়, সেটা ভুয়া হতে পারে না।

জ্যাকব নিজেও এই অনুভূতিটার সাথে পরিচিত। দুই বছর আগে ও। মোজাম্বিক থেকে জাহাজে করে একদল দাস নিয়ে আসছিলো। আসার পথে ওর জাহাজ চরে আটকে পড়ে। টম কোর্টনী ওদেরকে উদ্ধার করে, কিন্তু বিনিময়ে ও জোর করে সব বন্দীকে মুক্ত করে দেয়। জ্যাকবের সব টাকা জলে যায়। বিশেষ করে একটা সুন্দরি দাসীকে ওর খুব মনে ধরেছিলো। নিজের জন্যেই রাখতে চেয়েছিলো মেয়েটাকে। কিন্তু ওই কুত্তী সারাহ কোর্টনী মেয়েটাকে নিজের কাছে নিয়ে পড়াশোনা আর আচার ব্যবহার শিখিয়ে ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দেয়, যাতে সে স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে।

মেয়েটার কথা মনে হতেই জ্যাকবের শরীরে উত্তেজনার ঢেউ খেলে গেলো। মেয়েটাকে যখন ধরে আনা হয়ে তখন সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ ছিলো। উদ্ধত স্তন, মাথার চুল ওদের গোষ্ঠীর ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশেষভাবে কাটা–জ্যাকবের কল্পনার সবটা ছিলো যেনো সে। ও মেয়েটাকে পেলে কি করতো সেকথা বহুবার ভেবেছে। আর টম কোর্টনী সরে গেলে সারাহ কোর্টনীর কি করবে সেটাও ভেবে রেখেছে অসংখ্যবার।

ওরা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলো। ওখানে মাত্র কয়েকটা ঘর, কিন্তু একটা পুরো খালি। মালিক গিয়েছে আমস্টারডামে। কয়েক মাসের ভিতরে আর ফিরবে না। জ্যাকব আর ওর লোকেরা বাগানের দেয়ালের ছায়ায় লুকিয়ে রইলো, উল্টো পাশের বোর্ডিং হাউজের দিকে লক্ষ্য রাখছে। একটু পরেই হার্পের সুরের মূর্ঘনায় ভরে গেলো চারপাশ। বাড়ির ভিতর উজ্জ্বল আলোর বাতি জ্বলছে। জানালা দিয়ে জ্যাকব দেখলো টম, ওর ভাই আর ওদের স্ত্রীরা বসার ঘরে বসে আছে। ভাইয়ের মাথায় একটা পাগড়ি, কাফিরদের (আফ্রিকান উপজাতি) মতো। জ্যাকব ভাবতে লাগলো ও যখন মুন্ডুটা আলাদা করে ফেলবে তখন কি পাগড়িটা জায়গা মতো থাকবে?

ও ফ্রান্সিসের কাঁধে টোকা দিলো। ছেলেটা এতো জোরে লাফ দিয়ে উঠলো যে মনে হলো ভয়ের চোটে কাপড় ভিজিয়ে ফেলবে। ব্যাপারটা মোটেও ভালো না, ভাবলো জ্যাকব।

“এখন আক্রমণ করবো?”

ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো। জ্যাকব ভেবে পেলো না ছেলেটা এখন আবার মত বদলাচ্ছে নাকি। সেরকম কিছু হলে ছুরির এক কোপে ছেলেটাকে শুইয়ে দেবে। জ্যাকব এরকম অনেক জায়গা চেনে যেখানে লাশ ফেলে দিলে কেউ দেখার আগেই শিয়াল কুকুর শকুন এসে খেয়ে সাবাড় করে ফেলবে।

তবে অপেক্ষা করায় কোনো সমস্যা নেই। কিছুক্ষণ পরেই দরজা খুলে গেলো আর ডোরিয়ান কোর্টনী বেরিয়ে এলো। সাথে এক মহিলা, যাকে জ্যাকব চেনে না। চেহারা দেখে মনে হয় মেয়েটা সংকর জাতের। এখন আপাতত সারাহের সাথে সব কিছু মেটানো যাক, পরে একেও খুঁজে নেওয়া যাবে।

জ্যাকবের নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস হচ্ছে না। যদিও ও স্বীকার করবে না, কিন্তু এতোগুলো লোক নিয়েও একসাথে দুই কোর্টনী ভাইয়ের সাথে লড়াই করতে ওর দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। কিন্তু এখন একজন একজন করেই লড়া যাবে।

ডোরিয়ান আর মেয়েটা দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো ও। তারপর ফ্রান্সিসের হাত টেনে ধরলো।

“এখন,” হিসিয়ে উঠলো ও।

কিন্তু নড়ার আগেই পুরো রাস্তাটা আলোয় ভরে গেলো। টম বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। জ্যাকব দ্রুত মাথা নিচু করে ফেললো, কিন্তু টম নিজের চিন্তায় এতোটাই ব্যস্ত ছিলো যে খেয়াল করলো না ব্যাপারটা। জ্যাকব আর একবার ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে দেখলো যে টম কোম্পানির বাগানের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সাথে কোনো অস্ত্র নেই।

জ্যাকব খুশিতে শব্দ করে উঠে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। তুই কে জানি না ভাই, মনে মনে ভাবলো ও। কিন্তু একেবারে শয়তানের ভাগ্য নিয়ে এসেছিস।

“এটাই উনি না?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, চোখের মণি বড় বড় হয়ে গিয়েছে। জ্যাকব ভেবে পেলো না এর কি আসলেই টমের সাথে লড়ার সাহস আছে কিনা। যাক ব্যাপার না। তরবারি যার হাতেই থাক, টম কোর্টনী আজ রাতে মারা পড়বেই।

ওরা নিরাপদ দূরত্ব রেখে টমকে অনুসরণ করে চললো। ভাগ্য আবারও ওদের সহায়তা করলো। দেখা গেলো টম বাগানের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে ওদের মারামারির শব্দও কেউ শুনবে না এখন। টম হাঁটছিলো খুব দ্রুত কিন্তু একবারও পিছনে ফিরে তাকালো না।

কাছেই কোথাও হায়েনারা হেসে উঠলো। ফ্রান্সিস তরবারিটা বের করে হাতে নিলো। মরার আগ মুহূর্তে টমের চেহারাটা কেমন হবে সেটা কল্পনা করার চেষ্টা করছে। ফ্রান্সিস আজ বহুদিন ধরে দৃশ্যটা চিন্তা করে যাচ্ছে, কিন্তু এখন যখন সময় উপস্থিত, তখন ও রাগের চাইতে বরং ভয় বেশি পাচ্ছে। এর আগে কখনো ও কোনো মানুষ খুন করেনি। তরবারিটার ওজন খুব বেশি মনে হতে লাগলো ওর, পা গুলো মনে হলো নরম মোমের তৈরি।

পারতেই হবে ফ্রান্সিস, নিজেকে বললো ও। বাবার জন্যে হলেও পারতে হবে।

সাথে পাঁচ হাজার পাউন্ড পুরস্কার, স্যার নিকোলাসের কণ্ঠ শুনতে পেলো যেনো মাথার ভিতর।

জ্যাকব ওর ইতস্তত ভাবটা বুঝতে পেরে সামনে এগিয়ে গেলো, আখ কাটা ছুরিটা প্রস্তুত। ফ্রান্সিস ওকে ইশারায় পিছনে যেতে বললো। “ওকে আমি মারবো,” ফিসফিসিয়ে বললো ও।

জ্যাকব কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিছিয়ে গেলো। ছেলেটা ওকে টাকা দিচ্ছে যেহেতু, ওকেই সুযোগটা নিতে দেওয়া যাক। শেষমেশ না পারলে জ্যাকব তো আছেই।

ফ্রান্সিস ওর হাতটা সরিয়ে নিলো। ইংল্যান্ড থেকে আসার পথে সমুদ্রে বসে বসে, ও হাজারবার এই দৃশ্যটা কল্পনা করেছে। তবে ঠিক যেরকম ভেবেছিলো ব্যাপারটা সেরকম হচ্ছে না। ভেবেছিলো ও টমের নাম ধরে ডাকতেই টম অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাবে। তারপর ফ্রান্সিস নিজের পরিচয় আর টমকে কেনো মারতে চায় সেটা জানাতেই সেই অবাক দৃষ্টি আতংকে রূপ নেবে। টম শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারবে যে পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এরপর হাঁটু ভেঙ্গে বসে নিজের জীবন ভিক্ষা চাবে, কিন্তু ফ্রান্সিস কোনো ক্ষমা করবে না।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যতো তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা শেষ হবে ততোই ভালো। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে; আর নিতে পারছে না।

কোনো ব্যাপার না, নিজেকে বললো ফ্রান্সিস। কাজটা করাটাই আসল, কিভাবে সেটা মুখ্য না। ও টমের কাঁধ বরাবর তরবারিটা তাক করলো। ঠিক ওর সৎ বাবা যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে। এভাবে ধরলে তরবারিটা বুকের হাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে ঢুকবে। ও এক পা সামনে আগালো।

কিন্তু এতো জোরে পা পড়লো যে নিচের পাথরগুলো কড়মড় করে উঠলো। টম ঘুরে গেলো সাথে সাথে। যে লোকটা ওর বাবাকে খুন করেছিলো, জীবনে প্রথমবারের মতো তার মুখোমুখি হলো ফ্রান্সিস।

“আপনি কি টম কোর্টনী?” জিজ্ঞেস করলো ফ্রান্সিস। কণ্ঠ যাতে না কাপে আপ্রাণ সে চেষ্টা করছে।

টমকে দেখে মনে হলো অবাক হয়েছে। “হ্যাঁ, আমিই সে।”

ফ্রান্সিস ঝাঁপিয়ে পড়লো সামনে। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূতে সরে গেলো টম। তরবারির ডগায় লেগে ওর জামার সামনের দিকটা ছিঁড়ে গেলো। চামড়ায় ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ পেলো, কিন্তু সামান্য আচড়ের বেশি লাগলো না। এদিকে আঘাত জায়গামতো না লাগায় ফ্রান্সিস তাল সামলাতে না পেরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। টম চাইলেই ওর হাত থেকে থাবা দিয়ে তরবারিটা ফেলে দিতে পারতো, কিন্তু আর একটা অবয়বকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো ওর দিকে। লোকটা হাতের ভারি ছুরিটা ঠিক টমের মাথা বরাবর ধরে রেখেছে। টম পিছনে সরে গেলো। মাচার ফাঁক দিয়ে ওখানে চাঁদের আলো এসে পড়ছে।

সেই আলোয় দেখা গেলো, ওখানে মোট পাঁচজন আছে। এর মধ্যে জ্যাকব দ্য ভিসকে চেনে টম। বাকি তিনজনেরও চেহারা পরিচিত, এর আগেও জ্যাকবের সাথে দেখেছে। পঞ্চম যে ছোঁড়াটাকে ওকে তরবারি হাতে আক্রমণ করেছিলো তাকে ও জীবনেও আগে দেখেনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ওর সবকিছু কেমন যেনো চেনা চেনা লাগছে।

কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই মোটেও। ছেলেটা আবার ওর দিকে এগিয়ে এলো। দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষিত মাপা আঘাত করলো সে, টমের হাত প্রায় কেটেই গিয়েছিলো। বাকি মাস্তানগুলো ওকে ঘিরে ফেলেছে ততোক্ষণে। পালানোর পথ বন্ধ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো সামনে।

বোঝা যাচ্ছে ছেলেটাই এদের সর্দার আজ। আক্রমণে ওর দক্ষতা আর ক্ষিপ্রতা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আসলে মারাত্মক বিপজ্জনক সে।

“তুই কে রে?” জানতে চাইলো টম। “তোকে তো চিনি বলে মনে হচ্ছে না।”

কিন্তু উত্তরে ছেলেটা তরবারি বাগিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো। টম লাফিয়ে পিছিয়ে গেলো। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছে, হামলাকারীর চোখে বিজোয়ল্লাস দেখতে পেলো ও। সেই মুহূতে আক্ষরিক অর্থেই টমের পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো। একটা ময়লায় বুজে যাওয়া পুকুরে হুড়মুড়য়ে পড়ে গেল ও। ছেলেটা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে ওর নিরস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে তাকিয়ে রইলো।

জ্যাকব ওর একটা লোকের দিকে তাকালো। “ছেলেটার সাথে থাক এখানে। ও যেনো কাজটা শেষ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখবি?” টমের মরণ দেখতে ওর খুবই ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু ডোরিয়ান আসার আগেই ওকে টমের বাসায় যেতে হবে। ওর বৌয়ের গলায় একটা ছুরি ধরে থাকলে ডোরিয়ান কিছুই করতে পারবে না। ও ওর বৌকে কি করে সেটা দেখতে বাধ্য : করবে, তারপর সারাহের দিকে নজর দেবে।

জ্যাকব টমের দিকে ঝুঁকে বিশ্রী ভঙ্গিতে বললো, “তোর সুন্দরি বৌকে একটা দেখা দিয়ে আসি। ছেলেটা তোর সাথে হিসাব মেলাক।”

টম কোর্টনীর দিকে আবার একটা উল্লসিত দৃষ্টি দিয়ে ও বোর্ডিং হাউজের দিকে চললো। সাথের দুজন গেলো ওর সাথে। আর একজন থেকে গেলো ফ্রান্সিসকে সাহায্য করার জন্যে।

মাজা পুকুরটার ভিতর ভয়ানক আঠালো কাদা। টম নিজের পা মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। জীবনে ও এতো বেশি লোকের জীবন সংহার করেছে যে এটা জানাই ছিলো একদিন সৌভাগ্যের দেবতা ওকে ছেড়ে যাবে। ওর বাবাও অনেক কম বয়সে মারা গিয়েছেন, ওর দাদা-ও। কিন্তু ও এখনো বুঝতে পারছে না যে ওর এই নিষ্ঠুর শত্রুটা কে।

আর জীবন থাকতে টম জ্যাকব দ্য ভিসকে সারাহের দিকে একটা আঙুলও তুলতে দেবে না। ও কাদার ভিতর হাত ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে নিজেকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো। ঠিক তখনি ওর হাতে শক্ত ধারালো কিছু একটা বাঁধলো। টম আঙুল দিয়ে টেনে জিনিসটা কাদা থেকে বের করে আনলো-একটা তিন ইঞ্চি পুরু পাইপ। এটায় করে পুকুরে পানি দেওয়া হতো একসময়।

এদিকে ফ্রান্সিস পুকুরের কাদায় ভরা পাড় বেয়ে একজন নাচিয়ের মতো ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে নেমে এলো। তরবারি টমের তালু বরাবর তাক করে রেখেছে। টম হাঁটুতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে হাতের পাইপটা দিয়ে আঘাতটা আটকালো। ধাতুতে ধাতুতে আঘাত করে ঝংকার উঠলো তাতে। মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্যে রক্ষা পেলো টমের চেহারা।

ধাক্কা দিয়ে টম ফ্রান্সিসের ভারসাম্য নাড়িয়ে দিলো। ফ্রান্সিসও পা পিছলে পড়ে গেলো কাদার ভিতর। টম নিজেকে কাদা থেকে মুক্ত করে পাইপটা উঁচিয়ে ওর আক্রমণ করতে গেলো। কিন্তু তার আগেই রয়ে যাওয়া লোকটা আখ কাটার ছুরি নিয়ে তেড়ে এলো ওর দিকে। টম সেদিকে ঘুরে মাথা নামিয়ে আঘাতটা এড়ালো। তারপর লোকটার ছুরি ধরা হাতের কবজি ধরে ফেলে লোকটার জড়তাকে ব্যবহার করে ভারসাম্য নাড়িয়ে দিলো। একই সাথে হাতটা টেনে পিঠের পিছনে নিয়ে এলো। প্রায় সাথেসাথেই লোকটার কাঁধের জোড়াটা মট করে আলাদা হয়ে গেলো। লোকটা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো। টম ওর ডান হাতে ধরে থাকা লোহার পাইপটা লোকটার মাথা বরাবর সজোরে নামিয়ে আনতেই সে মুখ থুবড়ে কাদায় পড়ে গেলো।

টম আখ কাটার ছুরিটা কাদা থেকে তুলে নিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে ফিরলো। কিন্তু ফ্রান্সিস ততোক্ষণে কাদায় গড়াগড়ি করে ভূত হয়ে গিয়েছে, আর পড়ার সময় হাত থেকে তরবারিটাও গিয়েছে ছুটে। নিরস্ত্র অবস্থায় টমের মুখোমুখি হওয়ার চাইতে পালানোই ভালো মনে করলো ও। তাই ঘুরে টলতে টলতে পুকুরের পাড় বেয়ে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ভয় আর লজ্জায় ফোপাচ্ছে ও। টম লোহার পাইপটা ওর দিকে ছুঁড়ে মারলো। ওটা থ্যাপ করে ফ্রান্সিসের পিঠের মাঝ বরাবর গিয়ে লাগলো। ফ্রান্সিস ব্যথায় কাতরে উঠলো কিন্তু থামলো না। সামান্য পরেই অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলো, টম আর ওকে ধরতে গেলো না। আগে সারাহকে বাঁচাতে হবে।

জ্যাকব দ্য ভ্রিসের হুমকিটা কানে বাজতেই ও দৌড়াতে শুরু করলো। তোমার সুন্দরি বৌকে একটা দেখা দিয়ে আসি।

*

টম বাগানের দরজা দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে মিসেস লাই এর বোর্ডিং হাউজের দিকে ছুটলো। বাড়িটার খোলা দরজার সামনে জ্যাকবের দুই সাঙাত পাহারা দিচ্ছে। ওরা টমকে আসতে দেখলেও অন্ধকারে চিনতে পারলো না। আর ওর হাতে আখ কাটা ছুরিটা থাকায় ওরা ভেবেছে টম বুঝি বাগানে থেকে যাওয়া ওদের দলের লোকটা।

“ধীরে সুস্থে, হেনড্রিক,” একজন স্বাগত জানালো ওকে। “জ্যাকব, কোর্টনী মাগী দুটোর সাথে কেবল মজা শুরু করেছে।”

বাড়ির ভিতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ মেয়ে কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেলো। প্রহরী দুজন হেসে সেদিকে ঘুরলো ঘটনা দেখার জন্যে। একজন মরার আগে জানলোও না কি তাকে আঘাত করলো। দ্বিতীয় জন আঘাত আর লাশটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ঘুরতে গেলো, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। টমের আখ কাটার ছুরিটা ওর ঘাড়ের পাশ দিয়ে নেমে গেলো। ওর মেরুদণ্ড দুই ভাগ হয়ে গেলো তাতে। মাথাটা তখনও ঘাড়ের সাথে লেগে ছিলো। সেটা সামনের দিকে ভাঁজ হয়ে বুকের উপর ঝুলে পড়লো।

টম লাফিয়ে লাশ দুটো পেরিয়ে দরজা ধরে ছুটলো। বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডটা ঘোড়ার বেগে লাফাচ্ছে। আচমকা পিস্তলের গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো। টম না থেমেই হুড়মুড় করে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকলো। রুমের উল্টো দিকে টমের দিকে মুখ করে সারাহ দাঁড়িয়ে আছে। বন্দুকের ধোয়ার পাতলা একটা আবরণে ঢেকে রেখেছে ওকে। তার পিছনে মিসেস লাই সারাহের জামা ধরে ভয়ে ফোপাচ্ছেন।

ডান হাতে সারাহ ওর ছোট ফ্লিন্ট-লক ডেরিঞ্জারটা ধরে আছে, হাত সামনে বাড়ানো। সামনে মেঝেতে উপুড় হয়ে চার হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে জ্যাকব দ্য ভিস। খুলির পিছনে যেদিক দিয়ে বুলেট বেরিয়েছে সেই স্থানটা হা হয়ে আছে। মিসেস লাই-এর দামি কার্পেট ভরে গিয়েছে হলদেটে ঘিলুতে।

সারাহ আর টম সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ সময় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর সারাহ হাতের খালি পিস্তলটা ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়লো টমের বুকে।

“টম কোর্টনী!” কেঁদে উঠলো সারাহ। ওর কণ্ঠে অর্ধেক ছিলো ফোপানি, বাকি অর্ধেক বাধ ভাঙা আনন্দ। “তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে আমাকে ভালবাসবে, সম্মান করবে আর রক্ষা করবে। কিন্তু দরকারের সময়েই কোথায় ছিলে তুমি?”

“ও, আমার সোনা, আমার লক্ষী সোনা।” ও হাতের ছুরিটা ফেলে সারাহকে জড়িয়ে ধরলো। “আর কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে যাবো না। কক্ষনো না! কক্ষনো না!” দেখা গেলো দুজনেই একসাথে কথা বলছে।

সামনে দরজায় আবার হল্লা শোনা গেলো। একটু পরেই ডোরিয়ান ঢুকলো ভিতরে। সাথে একটা কাদা মাখা ভুতকে ধরে এনেছে।

“সারাহ! টম!” ডোরিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। “আল্লাহর শুকরিয়া যে তোমরা ঠিক আছে। আমি ফেরার পথে পিস্তলের আওয়াজ শুনলাম, তারপরেই এই জানোয়ারটাকে দেখি পাহাড় ধরে নেমে যাচ্ছে।” বলে ও ওর বন্দীর পায়ের পেছনে একটা লাথি মারলো। ছেলেটা হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো মেঝেতে। “দেখেই বুঝেছি যে এর কোনো কুমতলব আছে, তাই ধরে এনেছি।”

টম দেখলো এ হচ্ছে ওকে আক্রমণকারী সেই কম বয়সী ছেলেটা।

“হ্যাঁ, এ ওদের দলেরই। সম্ভবত দলের সর্দার।” গম্ভীর কণ্ঠে বললো টম। সারাহের কাঁধে এক হাত জড়িয়ে রেখে ও মেঝেতে বসে থাকা ছেলেটা সামনে এসে দাঁড়ালো।

“কে তুই?” ঠাণ্ডা স্বরে জানতে চাইলো টম। “তোর সাঙ্গপাঙ্গগুলোকে যেভাবে মেরেছি তোকেও কেন সেভাবে মারবো না, বল দেখি?”

ছেলেটা ওর দিকে তাকালো। তারপর প্রাণপণ চেষ্টায় নিজের আতংক সামলে উল্টো চোখ রাঙ্গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, “হ্যাঁ, টমাস কোর্টনী। দুই হচ্ছিস এক জন্ম খুনী। তুই আমার বাবাকে মেরেছিস-তার ছেলের সাথেও তো একই কাজই করবি।”

টম ওর প্রতি আনা অভিযোগ আর বলার হিংস্রতায় চমকে গেলো। ফলে ওর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিটাও আর থাকলো না। কয়েক সেকেন্ড কেমন যেনো ওর মাথা কাজ করলো না ঠিকমতো।

“ঠিক আছে, তা কাকে খুন করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আমাকে?” জানতে চাইলো ও।

“আমার বাবা উইলিয়াম কোর্টনী। তোর সৎ ভাই।”

“উইলিয়াম…” টমের মুখের কথা আটকে গেলো। “তার মানে বিলি? ব্ল্যাক বিলি তোমার বাবা?”

“জ্বী হ্যাঁ, উইলিয়ামই আমার বাবা।”

“তার মানে তুমি হচ্ছে ফ্রান্সিস; ফ্রান্সিস কোর্টনী।”

আবারও টমের সেদিন মারমেইডস উইঙ্ক-এ দেখা সবুজ দ্যুতির কথা মনে পড়লো। একটা আত্মা আবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসবে।

ও সামনে ঝুঁকে ফ্রান্সিসের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো। “বোঝাই যাচ্ছে যে তোমার আর আমার অনেক কথা বলা বাকি।” ওর স্বর শান্ত কিন্তু অনুতাপে ভরা। “তোমাকে অন্তত সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলা উচিত।”

*

ফ্রান্সিস ঘুম ভেঙে দেখলো একটা পালকের বিছানায় শুয়ে আছে। প্রায় একমাস যাবত জাহাজের একটা সরু খাটে শোয়ার পর শয্যাটা ছিলো একেবারে স্বর্গশয্যার মতো। এক মুহূর্তের জন্যে মনে হলো ও বোধহয় হাই উইন্ডে ফিরে গিয়েছে আবার। চাকরেরা একটু পরেই ওর জন্যে সকালের নাস্তা নিয়ে আসবে।

পাশ ফিরে শুতে গেলো ফ্রান্সিস। তীব্র একটা ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তেই সব মনে পড়ে গেলো ওর। ও হাই উইন্ডে নেই। আছে কেপ টাউনে। ওর সারা শরীরে আঘাত।

চোখ খুলে তাকালো ও। কফির মতো গায়ের রঙের এক মহিলা ওর পাশে এসে বসলো। মাথার উপর একটা শাল জড়ানো। তার পেছনে মুখে দাগওয়ালা এক বিশাল কৃষ্ণাঙ্গ লোক দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

“আমি কোথায়?”

“টম আর ডোরিয়ান কোর্টনীর বাসায়, কালো লোকটা বললো।

ফ্রান্সিস লাফ দিয়ে উঠে বসলো। একটু বেশিই জোরে হয়ে যাওয়ায় সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো আবার। ও বিছানা ছেড়ে নামার চেষ্টা করলো। কিন্তু ব্যথার চোটে পারলো না।

“আমাকে এখানে পেলে টম কোর্টনী মেরেই ফেলবে,” কোনোমতে বললো ও।

“টম কোর্টনী তোমাকে মাফ করে দিয়েছেন। তোমার ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে একজন ভদ্রলোক হিসেবে তোমার সেবা করতে কে বলে দিয়েছে বলে তোমার মনে হয়?”

“এটা খাও,” মহিলাটা বললো! বিশ্রী গন্ধযুক্ত একপাত্র তরল ওর ঠোঁটের সামনে ধরলো সে। ফ্রান্সিস একটু চেখে ওয়াক করে পাত্রটা একদিকে ঠেকে দিলো। চেহারায় দাগওয়ালা কালো লোকটা এগিয়ে আসলো বিছানার দিকে। তারপর ফ্রান্সিসের নাক টিপে ধরলো যাতে ও মুখ খুলতে বাধ্য হয়।

“মিস ইয়াসমিনি তোমাকে খেতে বলেছে, চুপচাপ খেয়ে নাও!” মহিলাটা আবার ওর ঠোঁটের ফাঁকে পাত্রটা ধরলো। ফ্রান্সিস আর ঝামেলা না করে চুপচাপ খেয়ে নিলো। সাথে সাথে কাজ হলো ওষুধে। অবিশ্বাস্যভাবে ওর ব্যথা গায়েব হয়ে গেলো। তবে মাথাটাও ঝিম ঝিম করে উঠলো। বিছানাটাও এতে নরম। না চাইতেও চোখ বন্ধ হয়ে এলো ওর।

ইয়াসমিনি ওর ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে দিলো; ওগুলো অবশ্য খুব বেশি গভীর না। বন্য গুল্ম কেটে তৈরি করা একটা মলম ওখানে লাগিয়ে দিলো। এসব গুলা ও নিজেই সংগ্রহ করেছে। আল্লাহর রহমতে ক্ষত নিখুঁত ভাবেই সেরে যায়।

“আমি ভাবছি ও কি আসলেই টম আর ডোরিয়ানের ভাতিজা?” ইয়াসমিনি বললো।

“যদি না হয়, তা হলে একটা মাত্র মিথ্যা বলার জন্যে ও অনেক দূর চলে এসেছে,” মাথা নেড়ে বললো আবোলি। “জন্মের পর থেকে আমি উইলিয়াম কোর্টনীকে চিনি। এই ছেলেটা একেবারে ওর মতোই। আর এই ব্যাপারটাও আছে।”

ও তাকের উপর রাখা একটা পদক দেখালো। চুনির চোখওয়ালা একটা সোনালি সিংহ। ওটার পায়ের নিচে পৃথিবী, আর উপরে হীরার তারা খচিত আকাশ। “এটা ছিলো ক্লিবি-র বাবার। ছেলেটার জামার নিচে পেয়েছি। এতেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় যে ও আসলে কে।

“কিন্তু সবাই জানে যে টম উইলিয়ামকে খুন করেছে। আর এজন্যেই ও আর কখনো ইংল্যান্ড ফিরতে পারবে না। উইলিয়ামের সাথে যা হয়েছে সেজন্যে টম এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি। ছেলের সাথে নিশ্চয়ই ও একই ভুল করবে না,” আবোলি বললো।

দরজায় টোকা শোনা গেলো। টম উঁকি দিলো সেখান দিয়ে। “রোগীর অবস্থা কি?”

“ওকে মারতে ব্যর্থ হয়েছেন আপনি,” খোঁচা মেরে বললো ইয়াসমিনি। “আবার যদি মারধোর না করেন তাহলে এ যাত্রা বেঁচে যাবে।”

টম বিছানার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে থাকলো। বাবার মতোই ঘন কালো চুল হয়েছে ফ্রান্সিসের, কিন্তু বাকি সব বৈশিষ্ট্য নরম সরম। অনেকটা মেয়েদের মতোই সুন্দর। মোটেও ওর বাবার মতো না। টম আশা করলো ওর স্বভাবও যেনো এরকম উল্টো হয়।

টম হিসেব করতে বসলো শেষ কবে ও হাই উইল্ডের সিঁড়িতে ছোট্ট ফ্রান্সিসকে খেলতে দেখেছিলো। ছেলেটার বয়স এখন কমপক্ষে সতেরো। টম ও বাড়ি ছেড়েছিলো ঠিক এই বয়সে। বা বলা যায় ওকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো। আর কখনোই ও হাই উইল্ড বা ইংল্যান্ড ফিরতে পারেনি। একজন ফেরারি আসামী-যার হাতে লেগে আছে তার ভাইয়ের রক্ত। সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটাকে এখনো ভুলতে পারে না টম। টেমস নদীর ঘাটের অন্ধকার গলিতে ও লোকটাকে মেরেছিলো শুধু নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে। অথচ টুপি সরিয়ে দেখা গেলো লোকটা ওর নিজের ভাই।

অর্ডার অফ দ্য সেন্ট জর্জের পদকটা তুলে নিলো টম। ও নিজেও নৌবাহিনির খেতাব প্রাপ্ত নাইট, তবে কখনোই পদকটা পরে না। উইলিয়াম অবশ্য সবসময়েই পরে থাকতো।

“ও উঠলে আমাকে ডাক দিও,” আবোলিকে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো টম।

আমি ওর বাবাকে বাঁচাতে পারিনি। ছেলেকে দিয়ে সেই ঋণ আমি শোধ করতে পারি।

*

ফ্রান্সিস আবার জেগে উঠে দেখতে পেলো মহিলাটা ঘরে নেই। তবে কালো লোকটা তখনও দরজা পাহারা দিচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে এক চুলও নড়েনি জায়গা থেকে; ফ্রান্সিস একবার ভাবলো যে লোকটা কাঠের তৈরি নাতো?

ও সাবধানে উঠে বসলো। নাড়াচাড়া আস্তে করলে ব্যথা কম লাগে। বিছানা থেকে পা নামিয়ে উঠে দাঁড়ালো তারপর। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে দেয়াল ধরে রাখা লাগলো। তবে আবোলি ওকে কিছু করলো না।

“ইয়াসমিনির ওষুধে কাজ করছে তাহলে,” মন্তব্য করলো ও।

ফ্রান্সিস আবোলির দিকে তাকিয়ে থাকলে কিছুক্ষণ। তারপর দেয়ালের জানালাটার দিকে তাকালো। এদিক দিয়ে কি বের হওয়া যাবে? ওর পরনে শুধু একটা নাইট শার্ট। এই পোশাক কেপ টাউনের রাস্তায় ওকে দেখতে একটা উন্মাদের মতো লাগবে। ওকে কি তখন গ্রেপ্তার করা হবে?

আবোলি ঘরের অন্যদিকে ইঙ্গিত করলো। সেখানে চেয়ারের উপর একটা জামা আর একটা পায়জামা ভাজ করে রাখা আছে।

“পালাতে চাইলে কাপড় পরে নেওয়াই ভালো।”

“আমাকে থামাবেন না?”

আবোলি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। “তুমি এখানে নিরাপদ। কিন্তু যদি তুমি পালাতেই চাও…”

ওকে কথা শেষ করতে দিলো না ফ্রান্সিস, “নিরাপদ?” ব্যঙ্গ ঝরলো ওর কণ্ঠ থেকে। “টম কোর্টনী আমার বাবাকে খুন করেছে।” ও চেয়েছিলো কথাটা বলে আবোলিকে চমকে দেবে, কিন্তু আবোলি শুধু মাথা ঝাঁকালো একটু। “আপনি সেটা বিশ্বাস করেন না?”

“তোমার বাবাকে আমি জন্মের দিন থেকে চিনি,” মাপা স্বরে বললো আবোলি। “আমি মন থেকে বলতে পারি সে কতটা খারাপ লোক ছিলো। উইলিয়াম মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে টম হাই উইন্ডে গিয়েছিলো ওদের ভাইয়ের ব্যাপারে সাহায্য চাইতে, আর উইলিয়াম সাহায্যের বদলে টমের উপর চড়াও হয়। ও টমকে মেরেই ফেলতো সেদিন, কিন্তু টম তরবারি চালোনায় ওর চাইতে দক্ষ ছিলো। তাই শেষে দেখা গেলো টম-ই উইলিয়ামের গলায় তরবারি ধরে আছে। কিন্তু টম শেষ আঘাতটা করতে পারেনি। ওর হাত ওর কথা শোনেনি। এর এক সপ্তাহ পরে লন্ডনে উইলিয়াম টেমস নদীর ঘাটে কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই টমকে আক্রমণ করে বসে; সাথে লোকবল ছিলো। কিন্তু সাথের লোকগুলো যখন পারলো না, তখন ও পিস্তল বের করে টমকে গুলি করতে যায়। আমি সেখানে ছিলাম। টম সেসময় তোমার বাবার বুকে তরবারি না বসালে নিশ্চিত তখনই মারা পড়তো।”

আবোলি বলে চললো, ছেলেটার উপর ওর, কথার কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা সেদিকে খেয়াল নেই। এমনকি যদি এই ঘটনার আগে তোমার বাবা তার চেহারা দেখাতো-যদি টম জানতো যে লোকটা আসলে কে-তাহলে টম আঘাতটা করতে পারতো না।”

“আপনি এসব কেনো বলছেন আমাকে?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো। “আমাকে আমার বাবার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে?”

“কথাগুলো সত্যি তাই,” আবোলি বললো। “তুমি এটা মেনে নিতে পারো, নাও নিতে পারো; সেটা তোমার ব্যাপার। তবে যদি তুমি একটা মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকো তাহলে সেটা একসময় তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।” তারপর সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, “কাপড় পরে নাও।”

আবোলি বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্সিস দীর্ঘ সময় খাটের পাশে বসে রইলো। ওর ভিতরে যে উন্মত্ততা ছিলো সেটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে; ও যে আসলে এখন কে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। চেয়ারের উপরের কাপড়গুলোর দিকে তাকালো ফ্রান্সিস, ওগুলো পরতে পারবে কিনা সে ব্যাপারেও নিশ্চিত না। আবোলির কথাগুলো ওর মাথার ভিতর বন বন করে ঘুরছে। একসময় ওর মনে হলো যে মাথাটা দুই ভাগ হয়ে যাবে।

গত রাতের সব কথা ওর মনে নেই, তবে একটা জিনিস স্পষ্ট মনে আছে। টম চাইলেই ওকে মেরে ফেলতে পারতো, কিন্তু সেরকম কিছুই করেনি।

আর এই একটা কারণেই ফ্রান্সিসের সকল বিশ্বাস ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। ওর মনে পড়লো যে ওর মা কি বলেছিলেন। টম ঠাণ্ডা মাথায় নিজের ভাইকে খুন করার লোক না। কথাটা বিশ্বাস হয়নি ওর। আর এখন যখন ও টম কোর্টনীর কবলে পড়েও বেঁচে গিয়েছে, তখন মনে হচ্ছে যে মায়ের কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে।

ওখানে বসে বসে ও নিজেকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। বেশ্যা আর মাস্তানদের সাথে আঁতাত করছে, নিজের পরিবারের একজন সদস্যুকে খুন করার চেষ্টা করছে-এ কেমন মানুষে পরিণত হয়েছে ও? আর বিনিময়ে টম কোর্টনী ওকে দিয়েছে দয়া আর করুনা।

যদি তুমি একটা মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকো তাহলে সেটা একসময় তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।

কিন্তু ওর কি মিথ্যটাকে ত্যাগ করার মতো সৎ সাহস আছে?

*

ফ্রান্সিস নিচে নেমে এসে দেখে টম বসার ঘরের চেয়ারে বসে অর্ডার অফ দ্য সেন্ট জর্জের পদকটা হাতে নিয়ে দেখছে। ফ্রান্সিসের পরনে ডোরিয়ানের পায়জামা আর গায়ে টমের জামা। দেখে মনে হচ্ছে মাস্তুল থেকে পাল ঝুলছে বুঝি। ও সিঁড়ির মাঝপথে থেমে গেলো; টম ভেবেছিলো ওকে দেখেই হয়তো ফ্রান্সিস দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিস জানে যে এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। ও ভয়টাকে গিলে নামতে শুরু করলো আবার।

সিঁড়ির গোড়ায় নেমে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো ওরা। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

টম-ই নীরবতা ভাঙলল। “মাঝে মাঝে তরবারি হাতে কারো সাথে দেখা হলেই ভালো হয়, দুঃখিত কণ্ঠে বললো ও। “তাহলে কি বলতে হবে সেটা ভাবতে হয় না।”

ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালো। তারপর আচমকা ওর ভিতর থেকে কথা ফুটে বেরুতে লাগলো। “আমার যত্ন নেওয়ার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আমি… আপনি চাইলেই আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারতেন। বা চাইলে আরো খারাপ কিছু করতে পারতেন।”

“আমরা এভাবে শান্তভাবে কথা বলতে পারছি তাতেই আমি খুশি,” টম বললো। ও এমনভাবে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে যেনো যে কোনো মুহূর্তে ও গায়েব হয়ে যাবে। “তুমি কি আসলেই বিলির ছেলে?”

ফ্রান্সিস কাটা কাটা ভাবে বললো, “হ্যাঁ, আমি।”

“তাহলে তুমি ঐ ভ্রিস এর মতো গুণ্ডাদের সাথে মিশলে কিভাবে?”

“একটা সরাইতে দেখা হয়েছিলো। একটা… মেয়েমানুষ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো।” ফ্রান্সিসকে দেখে বোঝা গেলো যে লজ্জায় মরে যাচ্ছে। “আপনাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললেই ভালো হবে।”

টম ডোরিয়ান আর আবোলিকেও গল্প শোনার জন্যে ডেকে আনলো। টম অবাক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আবোলির চেহারার কাটা দাগ, আর ডোরিয়ানের মাথার পাগড়ি আর আরব পোশাক-দুটোই অবাক করেছে ওকে। আর ডোরিয়ান আসলে কে সেটা জানার পর ওর মুখ আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে গেলো।

“আমাকে যা যা বলা হয়েছে সব দেখি মিথ্যে। আমি জানতাম যে আপনি আর বেঁচে নেই।”

“সে এক লম্বা কাহিনি,” ডোরিয়ান বললো। “বলবো পরে একসময়। কিন্তু তার আগে তুমি এখানে কিভাবে এলে আর আমাদেরকে খুঁজে পেলে সেই কাহিনি শোনাও দেখি।”

ছিন্নভিন্ন কুশনগুলোতে বসেই ফ্রান্সিস ওদেরকে সব খুলে বললো। শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে গেলো টম। স্যার ওয়াল্টারের কর্মকাণ্ড শুনে ও জোরে জোরেই গালাগাল করে উঠলো।

“বেচারা এলিস। যেদিন আমি বিলিকে খুন করলাম, সেদিন থেকেই আসলে দুর্দশার শুরু।”

“ও উইলিয়ামের সাথেও সুখী হতে পারতো না,” আবোলি বললো। “ও ওর সাথে কেমন ব্যবহার করতো তা তো দেখেছিলেই। যেভাবে ওকে মারধোর করতো, তাতে মনে হয় উইলিয়াম এলিস আর ফ্রান্সিস দুজনকেই মেরে ফেলতে।” টম ওকে ইশারায় থামতে বললো। কিন্তু আবোলি প্রতিবাদ করে বললো, “না, ছেলেটার নিজের বাবা সম্পর্কে সব সত্যি জানার অধিকার আছে।”

“আমি জানি, ফ্রান্সিস বললো। আমি আসার আগে মা আমাকে বাবা। সম্পর্কে সব সত্যিটা বলেছিলেন। বাবা কেমন মানুষ ছিলেন সেটাও বলেছেন। উনি বলেছেন আপনি যা করেছেন নিজেকে রক্ষা করতে করেছেন।” তারপর বিব্রত ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, “আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি।”

“আচ্ছা,” সেদিনের ভয়াবহ রাতটার কথা মনে পড়লো টমের। “তবে ওটা পুরোটাই বিলির দোষ ছিলো না। লর্ড চিল্ডস বলে না দিলে ওর জানার কথা ছিলো না যে আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে।”

ফ্রান্সিসের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। “স্যার নিকোলাস চিল্ডস? তার মানে আমার সাথে দুই নম্বরি করা হয়েছে? আমাকেতো উনিই পাঠিয়েছেন। আপনাকে কোথায় পাওয়া যাবে সেই খবর উনিই দিয়েছেন আমাকে। আপনাকে মারতে পারলে পাঁচ হাজার পাউন্ডও দেবেন বলে কথা দিয়েছেন।”

“পাঁচ হাজার পাউন্ড এর লোভ দেখালে তো আমিও কাজটা করতাম, মজা করে বললো ডোরিয়ান। কিন্তু টম মজার মেজাজে নেই।

“টাকা তুমি জীবনেও পেতে না। চিল্ডস একটা মাকড়সা। পৃথিবীর সমস্ত কোনায় কোনায় জাল বুনে রেখেছে সে। লেডেনহল স্ট্রিটে নিজের ডেরায় বসে বসে ও কুমতলব আটে আর এক পয়সার লাভেরও কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তাকে জালে আটকে শেষ করে দেয়। আমি তাকে প্রায় বিশ হাজার পাউন্ড লাভ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু সামান্য একটা এক মাস্তুলের জাহাজের বখরা দিতে অস্বীকার করায় উনি আমাকে খুন করার চক্রান্ত করেন। আস্ত একটা শয়তান লোকটা।”

“এখন আমি বুঝতে পারছি।”

“তোমার চাইতে অনেক বুদ্ধিমান লোক ওনার শয়তানির ফাঁদে পড়ে সব হারিয়েছেন। আমার ধারণা এমনকি তোমার বাবা বিলিও তার শিকার। ও বুঝতে পারেনি যে আসলে ও চিল্ডসের কুমন্ত্রণার এক সামান্য ঘুটি মাত্র! বিলি আমাকে খুন করতে চাইতো সেটা ঠিক, কিন্তু চিল্ডসই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। কোনো সন্দেহ নেই যদি সেদিন বিলি সফল হতো তাহলে ওর এই অপরাধটা চিল্ডস ওর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতো।”

ফ্রান্সিসের ভ্রু কুঁচকে গেলো। “তাহলে এখন আমি কি করবো? লর্ড চিল্ডস গাই চাচা আর বোম্বেতে কোম্পানির অফিসে দেওয়ার জন্যে একটা চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু-” টমের মুখভঙ্গি বদলে যেতে দেখে ও থেমে গেলো। “কি হয়েছে?”

“গাই তো আর এক চীজ।”

“কিন্তু ফ্রান্সিস একজন কোর্টনী। আর আমাদের পরিবারের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানার অধিকার ওর আছে,” নরম স্বরে বললো ডোরিয়ান। “এসব গোপন কথা আর অর্ধ সত্যগুলোই আমাদেরকে আলাদা করে রেখেছে। এসব কারণেই লর্ড চিল্ডসের মতো শয়তানগুলো আমাদেরকেই আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ফায়দা উঠাচ্ছে।”

টম জবাব দেওয়ার আগেই দরজায় করাঘাতের আওয়াজ পাওয়া গেলো। অ্যানা দুয়ার্তে ঢুকলো ভিতরে।

“বিরক্ত করলাম নাকি? আজ সকালে আমার প্রস্তাবটার ব্যাপারে আর একবার আলোচনা করার কথা ছিলো না?” তারপর ফ্রান্সিসের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ইনি কে?”

ওর চেহারায় কৌতূহলের ভাব স্পষ্ট। এমনভাবে ফ্রান্সিসের দিকে চেয়ে রইলো যেনো এই ঘরে ও-ই একমাত্র পুরুষ মানুষ। আনমনেই নিজের জামার গলার কাছটা টেনেটুনে ঠিকঠাক করে নিলো অ্যানা।

টম ওদের পরিচয় করিয়ে দিলো। “এ হচ্ছে আমার ভাতিজা, ফ্রান্সিস। ইংল্যান্ড থেকে এসেছে। গতরাতেই। আমরা অবশ্য জানতাম না। ফ্রান্সিস, এ হচ্ছে অ্যানা দুয়ার্তে। উনি আমাদের ব্যবসায়িক পার্টনার। অবশ্য এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি।”

ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকালো। যেনো একটা ঘোরের মাঝে আছে-যেন ওর দেখা সবচে স্পষ্ট স্বপ্নটা দেখছে এখন। অ্যানার সবকিছুই যেন একেবার সূক্ষ্মভাবে ওর চোখে ধরা পড়ছে। ওর কানের পেছন দিয়ে এক গোছা চুল বেরিয়ে আছে; ওর ঠোঁটের বাক; ওর চোখে আটকে থাকা অ্যানার বাদামী চোখের গভীরতা-সব।

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বললো না। সবাই আশা করছিলো যে ফ্রান্সিস কিছু বলবে, কিন্তু ও কিছু বলার সাহস পেলো না।

“ফ্রান্সিস কাল রাতে মাথায় আঘাত পেয়েছে। সম্ভবত এখনো পুরোপুরি ব্যথা যায়নি,” টম বললো।

অ্যানার চোখ দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেলো। “ইশ! বেশি ব্যথা পেয়েছে? কি হয়েছিলো?”

“ও আমাদেরকে খুন করে ফেলার চেষ্টা করছিলো, তাই টম মাথায় বাড়ি মেরে ঠাণ্ডা করেছে, ডোরিয়ান বললো।

অ্যানা দুই ভাইয়ের দিকে খেয়াল করলো আবার। এবার ওদের চেহারা আর হাতের কাটাছেঁড়াগুলো নজরে এলো ওর। আসার সময় বাতাসে পোড়া গানপাউডারের গন্ধ পেয়েছিলো। আর কার্পেটে ছিটিয়ে থাকা রক্তের দাগও দেখেছে। মিসেস লাই পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারেননি দাগটা।

“এখন নিশ্চয়ই ওনার সে ইচ্ছা চলে গিয়েছে?”

ডোরিয়ান ফ্রান্সিসকে আড়চোখে একবার দেখলো। “সেরকম-ই আশা করি। কারণ ও এতোদিন যা জানতো, ভুল জানতো।”

ফ্রান্সিস সাবধানে উঠে দাঁড়ালো। এখনো পায়ে পুরোপুরি বল আসেনি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। “আমাকে আসলে ভুল পথে চালানো হয়েছিলো।”

হঠাৎ ও বুঝলো কথাটা আসলে ঠিক হলো না। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, বিশেষ করে অ্যানা। নিজের দোষ নিজের কাঁধে নিতে শিখতে হবে ওকে।

“আমি অন্য লোকের মিথ্যে কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু যাদের কথা শোনা উচিত ছিলো তাদেরকে পাত্তা দেইনি। আমি আপনাদের যে বিপদে ফেলেছিলাম সেজন্যে ক্ষমা চাচ্ছি, এসবের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমাকে যা করতে বলবেন তা আমি খুশি মনেই করবো। আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।”

টম ওর কাঁধে হাত রাখলো। “ঠিক আছে। এখন শোনো, কাল রাতে মিস দুয়ার্তে আমাদেরকে তার ব্যবসার অংশিদার হওয়ার একটা প্রস্তাব এনেছিলেন। তুমিও ইংল্যান্ড ছেড়েছো ভাগ্য গড়তে; আমরা তোমাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবো বলে মনে হয়।”

ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে সবার সাথে খাবার ঘরের দিকে আগালো। ব্যথা শরীরেও দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে সাহায্য করলো অ্যানাকে।

অ্যানা আসার কারণে যে কথোপকথনটা থেমে গিয়েছিলো সেটার কথা ও বেমালুম ভুলে গিয়েছে। অনেক পরে ওর খেয়াল হলো, আচ্ছা গাই চাচার কথা বলায় টম চাচা ওরকম আচরণ করলো কেনো?

*

প্রখর রোদের কারণে সমুদ্রের উপরিভাগ এতোটা মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। যে মনে হচ্ছে পাথর কুঁদে পুরো জিনিসটা বানানো। এমনকি ছোট ছোট ঢেউগুলো যখন তীর এসে পড়ছিলো তারাও কোনো আলোড়ন না তুলে একেবার নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে পড়ছিলো। সৈকতেই দুটো ইন্ডিয়াম্যান অলস ভাবে নোঙ্গর ফেলে ভেসে আছে।

মোহনায় কয়েকটা ছোট ছোট চর মাথা তুলে আছে। প্রতিটা পাহাড়ের চুড়ায় একটা করে পাথরের তৈরি দুর্গ। একগাদা বট গাছের ভিতর থেকে বিশাল একটা প্যাগোডার সুউচ্চ মিনার আর গম্বুজ মাথা তুলে আছে। ওখান থেকে একটা মাস্কটের গুলির দূরত্বের চাইতেও কম চওড়া একটা খাড়ি পার হলেই বিশিষ্ট ভারতীয় উপমহাদেশ।

দুর্গ থেকে দুপুরের সংকেতদায়ী কামানের বুম শব্দ কানে এলো ক্রিস্টোফার কোর্টনীর। মুখ থেকে ঘাম মুছলো ও। নিজের সেরা জামা আর প্যান্টটা পরে আছে আজ। বোম্বের যত সওদাগর আছে তারা সবাই-ই আজ সকাল সকাল ব্যবসাপাতি গুটিয়ে, ঘরের ভিতরের তুলনামূলক ঠাণ্ডা পরিবেশ ফিরে গিয়েছে। এই মুহূর্তে ও বাদে জাহাজে আর কেউ নেই।

Two monsoons are the age of a man,’ বোম্বের পুরনো প্রবাদ এটা। মাত্র দুই বছরেই ক্রিস্টোফার সেই কোটা পূরণ করে ফেলেছে। সৈকতের পাশের লবণের ঘেরগুলো থেকে ভেসে আসা কটু গন্ধের সাথে শুকাতে দেওয়া পচা মাছের দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। ফলে কেউ না দেখাও বলে দিতে পারবে যে ওরা তীরের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। পচা মাছগুলো স্থানীয় লোকেরা নারিকেল গাছের গোড়ায় সার হিসেবে দেয়। তীরেও কাউকেই দেখা গেলো না। সবাই ঘরের ভিতর বসে বসে মুনাফা গুনছে আর দিন গুনছে কবে ইংল্যান্ড ফিরে গিয়ে জান বাঁচাবে।

ক্রিস্টোফার প্রায় পনেরোটা বর্ষা পার করে ফেলেছে এখানে-মানে ওর প্রায় পুরো জীবনটাই, মাঝে শুধু তিন বছর ছিলো জাঞ্জিবারে। ভারতের গরম পরিবেশে এসে দেখা যায় অনেকেই নিস্তেজ হয়ে এমনকি মারাও পড়ে, সেখানে ক্রিস্টোফারের চেহারা আরো খোলতাই হয়েছে। লম্বা একহারা গড়ন, শক্ত চোয়াল, গাঢ় বাদামী চোখ। ওর বাবার কোনো বৈশিষ্ট্যই পায়নি বলা চলে। সবাই কথাটা বলে তবে অবশ্যই ওর বাবার আবডালে।

এই গরমের মাঝেও ও কাঁপছে। এক কাহিল হয়ে যাওয়া প্রহরী ওকে ফটক দিয়ে ঢুকতে দিলো। উঠোন পেরিয়ে ও গভর্নরের বাসভবনে চলে এলো। দ্বীপটা যখন পর্তুগিজদের অধীনে ছিলো সেই সময়কার একটা ধ্বংসাবশেষ এই কুঠিটা। একটা মনোরম তিন-তলা বাড়ি, এখনো সদর দরজায় পর্তুগিজ প্রতীক খোদাই করা আছে। দুর্গের দেয়াল ছাড়িয়ে ওটার মাথা দেখা যায়। মূলত ইংরেজরা দখল নেওয়ার পর ওরা বাড়িটাকে ঘিরে দুৰ্গটা নির্মাণ করে।

যদিও এটা নিজের বাড়ি, তবুও ভিতরে ঢুকতে যেতেই দুশ্চিন্তায় ক্রিস্টোফারের শ্বাস ভারি হয়ে এলো। সিঁড়ির বেয়ে উঠে গভর্নরের অফিসের ভারি কাঠের দরজায় আস্তে টোকা দিলো ও।

“এসো,” পরিচিত কণ্ঠটা গর্জে উঠলো।

গাই কোর্টনী নিজের ডেস্কের পিছনে বসে আছে। উল্টোদিকে তিনটা বিশাল বিশাল জানালা। এগুলো দিয়ে সে সহজেই ঘাটের প্রতিটা জাহাজের উপর নজর রাখতে পারে। ডেস্কের উপর কাগজপত্র পরিপাটি করে সাজানো-চিঠিপত্র, আইনের বই, বিভিন্ন ঘোষণাপত্র, টাকার রসিদ। এসব দিয়েই চালিত হয় কোম্পানির ব্যবসা। লোকে বলে কোম্পানির ব্যবসা নাকি জাহাজের গায়ে লাগা বাতাসের চাইতেও দ্রুত চলে। দেয়ালের বাম দিকে গাই-এর বাবা হাল এর একটা তৈলচিত্র ঝোলানো। ওনার হাতে একটা দুর্দান্ত সুন্দর তরবারি। সোনালি হাতলে একটা বিশাল নীলকান্ত মণি খোদাই করা তাতে। ছবিটা আঁকা-ও হয়েছে এতো দারুণভাবে যে ছবির ভিতর থেকেই পাথরটা দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

একজন কৃষ্ণাঙ্গ চাকর গাই-এর পাশে দাঁড়িয়ে ময়ূরের পেখম দিয়ে বানানো পাখা দিয়ে বাতাস করছে। গাই ক্রিস্টোফারের দিকে ফিরেও তাকালো না।

“কি হয়েছে?” সপাং করে জানতে চাইলো গাই।

ক্রিস্টোফার ওর হ্যাঁটের কোনাটা একটু তুলে লম্বা একটা দম নিলো। “আমি বিয়ে করতে চাই, বাবা।”

গাই হতভম্ব হয়ে গেলো। “বিয়ে?” ও এমনভাবে শব্দটা আবার বললো যেনো ওটা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। “এই ভূত মাথায় চাপলো কি করে?”

“আমার বয়স হয়েছে।”

“সেটা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। তা তোমার মোটা বুদ্ধিতে কোন মেয়েটাকে মনে ধরেছে শুনি?”

“রুথ রেড্ডি।”

“কে?”

“কর্পোরাল রেড্ডির মেয়ে। দুর্গের সৈন্যদলে আছেন উনি।”

“ঐ ফালতু মেয়েটা? ও তো একটা মাগী ছাড়া কিছু না!” গাই-এর অভিব্যক্তি বদলে গেলো। মাথাটা পিছনে হেলিয়ে হাসতে লাগলো সে। “আমিতো ভেবেছিলাম তুমি আসলেই বিয়ে করতে চাও। তোমাদেরকে প্রায়ই একসাথে দেখা যায় সেই খবর আমি পেয়েছি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম হয়তো তোমার বয়সী বাকি ছেলেপুলেরা যেমন করে সেরকম তুমিও বোধহয় সুযোগ পেলে আস্তাবলের পিছনে নিয়ে ওর সাথে একটু ঢলাঢলি করো। আমি বোধহয় তোমার সম্পর্কে একটু বেশিই ভেবে বসেছিলাম।

“আমি ওকে ভালোবাসি।”

গাই অর্ধনিমীলিত চোখে তার ছেলেকে জরিপ করলো। ছেলেটা সবসময়েই ওর বাবার মতোই গোঁয়ার। কিছু না ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, কিন্তু একবার নিলে আর ফেরানো যায় না। একজন ডাকসাইটে ব্যবসায়ী হওয়ার সমস্ত লক্ষণ ওর মাঝে আছে। দুর্দান্ত মেধাবী, গাই অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ওকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলতেও পিছপা হয়নি, উদ্দেশ্য ছিলো শুধু ওর ভিতরে যতো অপছন্দনীয় গুণাবলি আছে সেগুলো যাতে দূরীভূত হয়। যাতে ভবিষ্যতের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ও শতভাগ প্রস্তুত থাকতে পারে। কিন্তু এখনো ছেলেটা কিছুই শিখলো না।

সম্ভবত জবরদস্তি করার চাইতে বুঝিয়ে শুনিয়ে কাজ আদায় করা সহজ। গাই তাই স্বর নরম করে বললো।

“তোমার বয়সে কেমন লাগে সেটা আমি জানি। আমি যখন তোমার মতো কমবয়সী এক বেকুব ছিলাম তখন এক মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। এতোটাই বেশি যে আমি প্রায় মরতে বসেছিলাম তার জন্যে। কিন্তু পরে আবিস্কার করলাম যে মেয়েটা আসলে একটা বাজারের মাগী। সামান্য কয়েক রুপি পেলেও সে যে কারো সাথে শুয়ে পড়ে।”

এতো বছর পরেও স্মৃতিটা মনে আসতেই গাই রাগে গরম হয়ে গেলো। জোর করে নিজেকে শান্ত করলো ও। তবে একবার তার বৌ হওয়ার পর ও বহুবার এর বদলা সুদে আসলে আদায় করেছে।

“আপনার ভুল আমার ভাবার বিষয় না বাবা।”

“কিন্তু তোমারগুলো আমার চিন্তার বিষয়। তুমি এই মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারবে না। শুধু তোমার বাবা হিসেবে না। বোম্বে প্রদেশের গভর্নর হিসেবে আমি এই বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা দিলাম। জানো নিশ্চয়ই আমার অনুমোদন ছাড়া এখানে কোনো বিয়েই বৈধ হয় না।”

“নিজের ছেলের সাথে এমন করবেন আপনি?”

“যখন সে উল্টা পাল্টা কাজ করে? অবশ্যই, গাই চেয়ারে হেলান দিলো। “তোমার বিয়ে করার শখ? আমি ব্যবস্থা করবো। তোমার বয়স হয়েছে, তোমার বিয়ে করার ইচ্ছা হতেই পারে। আমার আগেই এ ব্যাপারটা দেখা উচিত ছিলো। তাহলে আজকের এই বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না। আমি তোমার জন্যে উপযুক্ত পাত্রী খুঁজে বের করবো। স্যার নিকোলাস চিল্ডসের একজন ভাতিজি আছে। অথবা আর্ল অফ গোডলফিনের নাতনীকেও দেখা যায়। এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যার সাথে বিয়ে হলে তোমার ভবিষ্যতের পথটাও মসৃণ হয়।”

সাথে আমারও, মনে মনে ভাবলো গাই। অবশ্য না বললেও বোঝা কষ্ট না। ছেলে যদি বাবার কাজে না লাগে তো সেই ছেলের দরকার কি? এর মধ্যেই গাই মনে মনে হিসেব করা শুরু করেছে যে জায়গা মতো বিয়ে হলে ও কোম্পানির আরো কতোগুলো শেয়ার বাগাতে পারবে। হয়তো কোর্ট অফ ডিরেক্টরসেও একটা জায়গা পাওয়া যাবে, এমনকি রাজদূত হয়ে যাওয়াটাও অসম্ভব কিছু হবে না।’

ক্রিস্টোফার কিছু না বলে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। এতো সাধ্য সাধনার পরেও ছেলেটা সারাজীবন রামগড়রের ছানা-ই থেকে গেলো, মনে মনে ভাবলো গাই। অকৃতজ্ঞ, গাই ওর জন্যে কতোটা স্বার্থ ত্যাগ করেছে সেটা কোনোদিন বুঝলো না।

“আমি লন্ডন থেকে খবর পেয়েছি যে স্যার নিকোলাস চিল্ডস এর শারীরিক অবস্থা ভালো না,” গাই বলতে লাগলো। “একদিন হয়তো লেডেনহাল স্ট্রিটের ঐ অফিসটায় তুমিই বসবে।”

এতো ভালো একটা খবরেও ছেলেটার চেহারায় কোনো আনন্দের ছাপ পড়লো না। গাই-এর মনে হলো ক্রিস্টোফার সম্ভবত এখনো কর্পোরালের মেয়েটার সাথে শোয়নি। ও সম্ভবত আদর্শ বিয়ে নামের কোনো উদ্ভট চিন্তা থেকে নিজেকে এসব থেকে বিরত রাখছে। গাই-ও যখন এই বয়সী ছিলো, ও ও একটা বিশুদ্ধ আর পবিত্র ভালোবাসায় বিশ্বাস করতো। কিন্তু ওর ভাই টমের কল্যানে সেই বিভ্রম কেটে যায়।

“আমি জানি যে তোমার চাহিদা আছে, সেসবকে অবহেলা করে আমি অপরাধ করেছি,” বলতে বলতে ও ডেস্কের একটা ড্রয়ার থেকে একটা প্যাগোডা খচিত স্বর্ণমুদ্রা বের করে ক্রিস্টোফারের দিকে ছুঁড়ে দিলো। “তোমার ভবিষ্যৎ বৌয়ের কাছে থেকে যৌতুক হিসেবে এর চাইতে অনেক বেশি আদায় করা হবে। আপাতত এটা নিয়ে কাস্টম হাউজের ওখানে যে বেশ্যাপাড়াটা আছে ওখানে যাও। ওটাই সবচেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অফিসারেরা ওখানেই যায়। ওখান থেকেই একটা মেয়েকে নিয়ে একটু ফুর্তি করে এসো।” মিটিমিটি হাসলো গাই। “খোদার দোহাই ওখানেও কারো প্রেমে পড়ে যেও না।”

ক্রিস্টোফার এমনভাবে মুদ্রাটার দিকে তাকিয়ে রইলো যেনো আগে কখনো দেখেনি। ও মুদ্রাটা তুলে ধরলো যাতে ওটার স্বর্ণালি আভা ওর মুখের উপর পড়ে।

“আপনি এতো কিছু করবেন? আমার জন্যে?”

পিতা হিসেবে গাই-এর খানিকটা গর্ব বোধ হলো। “আজীবনই আমি তোমার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে কাজ করেছি।”

মুদ্রাটা ক্রিস্টোফারের আঙুলের ফাঁক গলে ডেস্কের উপর পড়ে বনবন করে ঘুরতে লাগলো।

“আপনি একটা শয়তান। একটা নিষ্ঠুর, স্বার্থপর দানব। আপনার বুকের হৃৎপিণ্ডের জায়গায় ফাঁকা একটা বক্স বাদে কিছুই নেই। আপনি নিজের স্বার্থ চরিতার্থের জন্যে আপন সন্তানের সুখকেও বিসর্জন দিতে পিছপা হন না। আমি আপনার খেলার ঘুটি হবো না।”

গাই প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ালো। এতোটাই রেগে গিয়েছে যে ধাক্কা দিয়ে ডেস্কটাকে সামনে ঠেলে দিলো।

“এতো বড় সাহস তুই আমার কথার উপর কথা বলিস?”

ক্রিস্টোফার তাতে ঘাবড়ালো না। আমি এখন আর ছোট ছেলে নেই যে আপনি যখন ইচ্ছে ধরে পেটাবেন। আমার যেমন ইচ্ছা আমি সেভাবে নিজের জীবন সাজাবো। আপনার পছন্দ মতো না। আমার যেখানে ইচ্ছা আমি যাবো, যাকে ইচ্ছা বিয়ে করবো।”

গাই-এর গলার শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যেতে লাগলো। “খবরদার, ক্রিস্টোফার! এই সমুদ্রের দুই কূলে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে গিয়ে তুই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবি।”

“আপনাকে আমি ভয় পাই না।”

“পাওয়া উচিত,” ভয়ানক স্বরে বললো গাই। “তোকে আমি শেষ করে দিতে পারি।”

ক্রিস্টোফার তার দিকে তাকিয়ে রইলো। “কি বলছেন বুঝে বলছেন তো? কোন পদের মানুষ নিজের ছেলেকে এই কথা বলতে পারে? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে আপনি আমার বাবা না।”

কথাটা গাই-এর এমন এক জায়গায় আঘাত করলো যেটা সম্পর্কে ক্রিস্টোফারের কোনো ধারণাই নেই। প্রচণ্ড রাগে মাথা খারাপ করে গাই একটা রূপার কাগজ কাটা ছুরি হাতে নিয়ে ছুঁড়ে মারলো ক্রিস্টোফারের দিকে। ছুরিটা ক্রিস্টোফারের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দরজায় বিধে কাঁপতে লাগলো।

ক্রিস্টোফার এক চুল নড়লো না। এক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়েই রইলো। ওরও রাগে সারা শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সামলে রেখেছে। গাই এর আগে খেয়াল করেনি যে তার ছেলে কতোটা লম্বা হয়ে গিয়েছে।

“বিদায়, বাবা। আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো হবে।”

“দাঁড়াও,” গাই ডাক দিলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার আর ওর ডাক শোনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে নেই।

*

সুর্য কিরণ একেবারে বজ্রপাতের মতো ক্রিস্টোফারের চোখে আঘাত করলো। মাত্র যা করে এসেছে তার ভয়াবহতা মনে হতেই ওর মাথা ঘুরে যাচ্ছে। একরকম টলতে টলতেই রাস্তাটা পার হয়ে এলো। সমুদ্রতীরের সাথে দেখা করলো রুথ। জায়গাটা মরচে পড়া নোঙ্গর আর ছিঁড়ে যাওয়া দড়াদড়িতে ভরা। শেষ দেখা হওয়ার পর এক ঘণ্টাও পার হয়নি, তবুও রুথ দুই হাত বাড়িয়ে এমনভাবে ক্রিস্টোফারকে জড়িয়ে ধরলো যেনো কতোকাল ওদের দেখা হয় না।

নয়মাস আগে রুথ ওর বাবার সাথে এখানে এসেছে। ওরা যে ইন্ডিয়াম্যানে করে এসেছিলো সেটা ক্রিস্টোফারের চোখের সামনেই বন্দরে এসে নোঙ্গর করে। দুর্গের দেয়ালের পাশে বসে ও জাহাজের যাত্রীবাহী ডিঙ্গিটায় রুথকে এক ঝলক দেখতে পায়। মাত্র ষোল বছর বয়স, শঙ্খের মতো গায়ের রঙ, লাল টকটকে চুল, কোনো মেয়েতে এই দুই রঙের সম্মিলন এর আগে দেখেনি ও। নৌকাটা দুর্গের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রুথ চোখ তুলে তাকায়, চোখে ওর নতুন ঠিকানা সম্পর্কে সন্দিহান কৌতূহল। তখনই ক্রিস্টোফারের নজরে পড়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ও নিজের উরুতে এমন, এক কাঁপুনি টের পায় যা আগে কখনোই পায়নি। কামনার আবেশে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো ওর।

বোম্বেতে এক ইংরেজ মেয়ের আগমন অনেকটা মরুভূমিতে গোলাপ ফোঁটার মতো। আর সেই ফুলের সুবাস নিতে পুরুষ মানুষের অভাব নেই এখানে। কিন্তু গাই কোর্টনীর ছেলে রুথের ব্যাপারে আগ্রহী জেনে সবাই হাত গুটিয়ে নেয়।

তারপরেও সবকিছু হতে সময় লাগে অনেক। ক্রিস্টোফার মেয়েদের সাথে কথাই বলতে পারতো না। কারণ দাসী বাদে আর কোনো মেয়ের সাথে কখনো কথা হয়নি ওর। কতো রাত ও জেগে কাটিয়েছে রুথ এর ঠোঁটের স্বাদ কেমন হবে সেটা চিন্তা করে করে। নিজের কাপুরুষতায় নিজেকে হাজারবার গালাগাল করে কাটিয়েছে আরো কতো রাত।

রুথ নিজেও ছিলো অনেক ধৈর্যশীলা। ও বুঝতে ক্রিস্টোফারের আসলে কেমন লাগে, কিন্তু ওর বাবা মা সেটা বুঝতে না। ও ক্রিস্টোফারের ভিতরের ভালোবাসাটা ধরতে পেরেছিলো, সেটাকেই ও মমতা আর যত্নের দিয়ে বের করে এনেছে। গভর্নরের বাড়িতে একটা সমাবেশ হয়েছিলও একবার। সেখানে সৈন্যদের পরিবারকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়, কারণ এখানে মহিলার সংখ্যা ছিলো একদমই কম। সেখানে রুথ ক্রিস্টোফারকে নাচের আমন্ত্রণ জানায়। প্রথম যখন ক্রিস্টোফার রুথকে স্পর্শ করে, ওর সারা শরীর কেপে ওঠে। সারা রাত নেচেছিলো ওরা সেদিন। কিন্তু তাতে ওর প্যান্টের সামনের দিকটা ফুলে আটসাট হয়ে গিয়েছিলো, মনে মনে ভাবছিলো যে সবাই নিশ্চয়ই ওকে দেখে। হাসছে। কিন্তু রুথ হাসলো না। ও ক্রিস্টোফারকে নাচে সাহায্য করতে লাগলো, আর নাচের ফাঁকে যখনই ওরা মুখোমুখি নাচতো তখন ও একটু সামনে এগিয়ে যেতো যাতে ক্রিস্টোফার পরনের পাতলা কাপড়টার উপর দিয়েই ওর শরীরের প্রতিটা বাক টের পায়।

এরপর ওরা দুজন প্রায় প্রতিদিন দেখা করতো। গোলঘরের পিছনে, বা ব্যাক বে-র সৈকতে, নারকেল বাগানের আড়ালে ওরা সময় কাটাতে। হাতে হাত রেখে বালির উপর দিয়ে হাঁটতে ওরা। রুথ ক্রিস্টোফারকে ইংল্যান্ডের গল্প বলতো। ওখানে ক্রিস্টোফারের বাড়ি হলেও কখনো সেটা দেখার ভাগ্য হয়নি। রুথ এমন অনেক কিছু দেখেছে যা ক্রিস্টোফার শুধু বইয়ের পাতাতেইও পড়েছে বা ওর বাবার অধীনস্তদের আলাপচারিতায় শুনেছে। রুথ ক্রিস্টোফারের প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখে কথা বলতো। দেখা যেতো রুথ বকবক করেই চলেছে আর ক্রিস্টোফার ওর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়েই আছে।

প্রথমবার চুমু খাওয়ার পর ক্রিস্টোফারের মনে হয়েছিলও যে জীবন এর চাইতে মধুর হতে পারেনা। পরে রুথ ক্রিস্টফারকে ওর কাচুলি খুলে বুকে হাত দিতে দিয়েছে। ও নিজেও ক্রিস্টোফারের পায়জামায় হাত ঢুকিয়ে ওর পুরুষাঙ্গ নাড়াচাড়া করেছে। কিন্তু এর বেশি কিছু ক্রিস্টোফারকে করতে দেয়নি। “বিয়ের আগে এসব পারবো না,” জোর দিয়ে বলেছে রুথ। আর ক্রিস্টোফার ওর দুই স্তনের মাঝে মুখ ডুবিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে, “তোমাকেই আমি বিয়ে করব।”

এখন রুথ ক্রিস্টোফারের উভ্রান্ত চেহারা দেখে দুই হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলো। “কি বললেন বাবা? বলো সোনা? খারাপ লাগছে? বাবা অনুমতি দিয়েছেন?”

“না।” ক্রিস্টোফার ধপাস করে ডাঙ্গায় তুলে রাখা একটা ভাঙাচোরা নৌকার খোলের উপর বসে পড়লো। ধাক্কায় একগাদা মাছি ভনভনিয়ে উড়ে গেলো।

রুথের নিষ্পাপ নীল চোখে অশ্রু জমলো। “কি করবো আমরা এখন? আমিতো তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। এরচে মরে যাওয়াই ভালো হবে।”

ক্রিস্টোফার চোখ বন্ধ করে ফেললো। এই চোখ ধাঁধানো আলোয় ঠিকমতো চিন্তা ভাবনা করা যাচ্ছে না। ও কপাল ডলতে ডলতে বাবার সাথে হওয়া কথোপকথনটা আরো একবার ভাবতে বসলো। রুথের জন্যে ওর ভালোবাসাটা এতো খাঁটি, এতো পবিত্র! ওর বাবা কিভাবে সেটাকে অস্বীকার করেন? কতো বড় সাহস তার? ওর এতো বেশি হতাশ লাগতে লাগলো যে একবার চিন্তা করলো একটা নোঙ্গর পায়ে বেঁধে সাগরে ঝাঁপ দেবে কিনা। সব শেষ করে দেবে। দমবন্ধ লাগছে ওর। বাবাকে বোঝানো কখনোই সম্ভব না।

কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না।

“বোষে ছেড়ে চলে যাবো,” আচমকা বললো ও।

“আমিও যাবো তোমার সাথে!”।

ক্রিস্টোফার মাথা নাড়লো। “আমার বাবা আমাকে এটা কানাকড়িও দেবে না। আমাকে নিজের পরিশ্রমে নিজের ভাগ্য গড়তে হবে। আর সেখানে মহিলাদেরকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখানেই থাকো, তোমার পরিবারের সাথে, আর আমার ফিরে আসার অপেক্ষা করো।”

“পারবো না।”

“পারতেই হবে। আমি জানি কতোটা কষ্ট হবে তোমার, কিন্তু আমাদের জন্যে তোমাকে পারতেই হবে।” ক্রিস্টোফার উঠে দাঁড়িয়ে রুথকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ ডুবিয়ে দিলো। কামনার আগুনে জ্বলে যাচ্ছে ও, কিন্তু তারচে বড় কথা ওর বাবাকে ভুল প্রমাণ করতে হবে। “তুমি এখানেই থাকো, তাহলে বাবা ভাববেন যে উনি-ই জিতেছেন। কিন্তু যখন আমি ফিরে আসবো, তখন আমার জয় সম্পূর্ণ হবে-সেই সাথে আমাদের দুঃখেরও শেষ হয়ে যাবে।”

রুথ ক্রিস্টোফারের ঠোঁটে চুমু খেলো। “কথা দাও ক্রিস্টোফার, কথা দাও যে তুমি আমাকে সুখী করবে।”

“প্রতিজ্ঞা করলাম সোনা। যদি তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করো, আমি এতো বেশি টাকা কামাবো যে আমার বাবাও আমাদেরকে ছুতে পারবে না।”

“আমি অপেক্ষা করবো। ঈশ্বরের কসম। তুমি বিশ বছর পরেও যদি ফিরে আসো, তবুও আমি অপেক্ষা করবো। প্রতিদিন এখানে বসে তোমার ফেরার অপেক্ষা করবো।”

“ওডিসাস আর পেনেলোপির মতো,” হাত নেড়ে বললো ক্রিস্টোফার।

রুথের ভ্রু কুঁচকে গেলো। “কাদের মতো?”

“কাদের মতো সেটা ব্যাপার না।” বলতে বলতে ও গায়ের কোটটা খুলে ফেললো। ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে গিয়েছে সেটা। আর এখন যখন একবার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে, রওনা দিতে আর তর সইছে না ক্রিস্টোফারের। চোখের উপর হাত দিয়ে ও বন্দরের দিকে তাকালো। ইস্ট ইন্ডিয়াম্যানটা তখনও বাধা অবস্থায় দুলছে। তবে একটা ছোট সওদাগরী জাহাজের ডেক এ নড়াচড়া দেখা গেলো। জাহাজটা সমুদ্রে নামানোর জন্যে প্রস্তুত করছে ওটার ক্রু-রা।

“জোয়ার আসলেই জাহাজটা ছেড়ে যাবে। ওটায় চড়ে কোথায় যাওয়া যায় দেখি।” আবার রুথকে চুমু খেলো ক্রিস্টোফার। ওর শক্ত বাহুর স্পর্শে রুথের শরীরেও শিহরণ বয়ে গেলো।

“আমার জন্যে অপেক্ষা কোরো কিন্তু।”

“কথা দিচ্ছি করবো।”

*

সাথে নেওয়ার মতো ক্রিস্টোফারের কিছুই নেই। ওর সব সম্পত্তি রয়ে গিয়েছে গভর্নরের বাড়িতে, ওর ঘরে। আর ওখানে ফিরে যাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব না। ক্রিস্টোফার ঘাটে গিয়ে একটা ডিঙ্গি নৌকাকে ডেকে বললো ওকে সওদাগরি জাহাজটায় নিয়ে যেতে। জাহাজটার নাম জোসেফ। আলাদা একটা আড়কাঠে খোদাই করে লেখা। ও জাহাজে উঠে পড়লো। বেশিরভাগ ক্রু ই ভারতীয়, সবার গায়ের রঙ গাঢ়, গায়ে কাপড় নেই বললেই চলে। মালপত্র বোঝাই চলেছে। ডেক-এর একমাত্র শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে দেখে মনে হলো সে-ই মাস্টার। লম্বা একটা লোক, চুল একেবারে খুলির সাথে ছেটে রাখা। পেশল বাহুতে একটা মৎস্যকুমারীর ট্যাটু। মালপত্র ওঠানামা তদারকিতে বিরতি দিয়ে ক্রিস্টোফারের দিকে এগিয়ে এলো।

“কি চাই?” গর্জে উঠলো লোকটা।

“আপনার জাহাজে কাজ করতে চাই।”

মাস্টার ওর আপাদমস্তক পরখ করলো। দেখে মুখ বিকৃত করে বললো, “আমি চিনি তোমাকে। তুমি গভর্নরের ছেলে, ক্রিস্টোফার কোর্টনী

ক্রিস্টোফার মাথা ঝাঁকালো।

“শালা একটা খবিশ?”

লোকটা এটো কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো যে ওর মুখের থুতু এসে ক্রিস্টোফারের মুখে লাগলো। ক্রিস্টোফার নড়লো না।

“তো?” মাস্টার বললো। “আমি তোমার বাবাকে গালাগাল করে যাবো আর তুমি কিছুই বলবে না? কেমন ছেলে তুমি?”

“আমার বাবাকে পরোয়া করলে তো আর আমি এখানে আসতাম না।”

মাস্টার চটাশ করে ওর গালে একটা চড় কষালো। “যথেষ্ট বেয়াদবি হয়েছে। জাহাজে থাকতে হলে বড়দের সম্মান করতে হবে, নইলে ভাগো।”

সাথে সাথে অবশ্য ক্রিস্টোফার প্রত্যুত্তরে মারতে পারে ভেবে নিজের মুখের সামনে হাত তুলে আড়াল করলো। ক্রিস্টোফার বহু কষ্টে আঘাত করা থেকে বিরত থেকে নিজেকে শান্ত রাখলো। ওর বাবার কাছে থেকে যদি একটা জিনিস শিখে থাকে সেটা হচ্ছে মার খেয়ে কিভাবে হজম করতে হয়।

মাস্টার ডেক-এ থুতু ফেললো। ক্রিস্টোফারের পায়ের বুড়ো আঙুলের ঠিক পাশে পড়লো সেটা।

“এর আগে জাহাজে কাজ করেছিস?” সম্বোধন বদলে গেলো মাস্টারের।

“না, স্যার।”

“কখনো সমুদ্রে গিয়েছিস?”

“না, স্যার।”

“তাহলে কোন দুঃখে আমি তোমাকে আমার. জাহাজে নেবো? এটা তো। তোমার বাবার সোনায় মোড়া ইন্ডিয়াম্যান না যে কয়েকশো কামলা থাকবে জাহাজ চালানোর জন্যে। এখানে থাকতে হলে খেটে খেতে হবে, নইলে ঈশ্বরের কসম আমি এতো জোরে তাকে পানিতে ছুঁড়ে মারবো যে পড়ার শব্দটা পর্যন্ত কেউ টের পাবে না।”

“আমি কঠোর পরিশ্রম করতে পারি স্যার।”

“কঠোর পরিশ্রমের ক সম্পর্কেও তোর ধারণা নেই।” বলে মাস্টার ক্রিস্টোফারের হাতটা টান দিয়ে নিয়ে তালু উল্টে ধরলো। “এই দুধ-সাদা চামড়ার দিকে তাকা। জীবনে এই হাত দিয়ে এক গাছি রশিও পাকাস নাই।” তারপর ঘুরে বললো। “জাহাজ থেকে নেমে যা, নইলে ছুঁড়ে ফেলে দেবো।”

“দাঁড়ান,” ক্রিস্টোফার ডাকলো। তারপর ও ডেক-এর এক কোণে পড়ে থাকা কাপড়ের একটা গাট্টি তুলে নিলো। “কি এটা? কালবেলে? রেশমের সাথে কার্মানিয়া উল দিয়ে বোনা, তাই না? আর এটা হচ্ছে জুরিস, সবচে বেশি দিন টেকে এই সুতি কাপড়। এটা হচ্ছে

“আমার জাহাজ ছেড়ে ভাগ,” মাস্টার ক্রিস্টোফারের জামার গলার কাছে মুঠো করে ধরে শূন্যে তুলে ডেক-এর অন্য পাশে নিয়ে গেলো। তারপর জাহাজের কিনার দিয়ে ঠেলে দিলো নিচে।

‘আট রুপি, হাফাতে হাফাতে বললো ক্রিস্টোফার। “প্রতি গজ আট রুপি। কালবেলের জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আট রুপি দেবে আর জুরিস এর জন্যে ছয় রুপি।”

ও জাহাজের পাশ ধরে ঝুলে রইলো। মাস্টার ওর কাছে মুখ নামিয়ে আনলো। পিছনে নীল আকাশের প্রচ্ছদে তার পোড় খাওয়া মুখটা দেখতে অদ্ভুত লাগছে।

“তুই এসব কিভাবে জানিস?”

“বাবার হয়ে অনেক কাজ করেছি আমি। লেজার বইতে জিনিসপত্রের দাম লিখতাম। কোম্পানি কোন বন্দরে কোন মালের জন্যে কতো দাম দেয়, তার সবই আমার জানা।” বিশাল হাতটা ওর গলা চেপে ধরে টেনে আবার তুললো। দম বন্ধ হয়ে এলো ক্রিস্টোফারের। “এসব তথ্য কিন্তু আপনি কাজে লাগাতে পারবেন।”

মাস্টার ক্রিস্টোফারকে ছেড়ে দিলো। ডেক-এ আছাড় খেয়ে পড়লো ও। পড়েই পিঠ চেপে ধরলো।

ভারি বুটের লাথি পড়লো বুক বরাবর।

“উঠে দাঁড়া।”

পিঠের ব্যথা আর বমি বমি ভাব দুটোকেই অগ্রাহ্য করে ক্রিস্টোফার উঠে দাঁড়ালো। মাস্টার ওকে ক্ষুধার্ত হাঙরের দৃষ্টিতে জরিপ করলো কিছুক্ষণ।

“আমি তোকে আমার নবীশ হিসেবে নেবো। মাসে চার রুপি করে পাবি। থাকা খাওয়া এর বাইরে।” ক্রিস্টোফারের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে হেসে দিলো লোকটা। “তোর কি মনে হয়? তোর দাম আরো বেশি? শালা নরম চামড়ার দামড়া ছোঁড়া? তাহলে আর একটা জাহাজ খুঁজে নে, যা।”

ক্রিস্টোফার হাত মুঠি করে ফেললো। কাজটা যে সহজ হবে না তা তো। আগেই জানা ছিলো, নিজেকে বললো ও। নিজের ভাগ্য গড়ার আগে ব্যবসাটা সম্পর্কে জানতে হবে।

“আমি রাজি।”

মাস্টারকে দেখে মনে হলো হতাশ হয়েছে। ক্রিস্টোফার বুঝলো লোকটা ওকে আবার আঘাত করার মওকা খুঁজছিলো। তবে ও খুব বেশি ভয় পেলো না। গাই-এর কাছে বড় হওয়ায় এসব ওর কাছে এখন পানি ভাত হয়ে গিয়েছে।

মাস্টার রেজিস্টার খাতা আনলে ক্রিস্টোফার সেখানে সই করলো। বাকি সব ভারতীয় ক্রুদের কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং-এর মতো লেখার মাঝে ওর ঝকঝকে হাতের লেখা দেখে মনে হচ্ছিলো ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝে শান্ত দ্বীপমালা।

গরমের কারণে লেখা শেষ না হতেই কালি শুকিয়ে গেলো। মাস্টার ঠাস করে বইটা বন্ধ করে বললো, “এখন থেকে তোর মালিক আমি। যদি কখনো দেখেছি কাজে ফাঁকিবাজি করছিস, তাহলে যে কি করবো সেটা খোদা মালুম। আমার জাহাজে যতোক্ষণ আছিস ততোক্ষণ তোর বাবার নামের-ও কোনো মূল্য নেই। তোর চামড়া সাদা আর হাতের লেখা ভালো বলে ভাবিস না যে পার পেয়ে যাবি। উল্টাপাল্টা কিছু করলে ওই কালাগুলোর মতোই ঠেঙানি খাবি। বোঝা গিয়েছে?”

“জ্বী স্যার।”

মাস্টার ওর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ক্রিস্টোফার বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে নিলো। কাধও আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে নেমে গেলো নিচে। ভঙ্গিটা ও ওর বাবার হাতে মার খাওয়ার সময় আয়ত্ত্ব করেছে। মাস্টার ঘোত ঘোত করলো কিন্তু আর কিছু বললো না।

“এখন কাজে যা।”

মাত্র দশ মিনিটের মাঝে ক্রিস্টোফার বুঝে ফেললো কোন পাকে এসে পড়েছে ও। গায়ের দামি উলের পোশাকটা খুলে কোমরে বেঁধে বাকি খালাসিদের সাথে হাত লাগিয়ে কপিকল দিয়ে নোঙ্গর তোলা শুরু করলো। ওর নগ্ন পিঠে আগুন ছড়াতে লাগলো সূর্য। কপিকলের দড়ির টানে হাতে কড়া পড়ে গেলো। তবুও ও মাথা তুলে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে নিজের ব্যথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলো। ডাঙ্গায় তাকাতেই দেখলো পানির ধারে একটা জটলা, কোম্পানির ইউনিফর্ম পরা একদল লোক জোসেফ-এর দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। ওটা কি ওর বাবা? হয়তো উনি নিজের মন বদলে ফেলেছেন।

আচমকা পিঠে প্রচণ্ড একটা গুতো খেয়ে সম্বিত ফিরলো ওর। ঝাঁকি দিয়ে উঠে ফিরে দেখে কপিকলের দণ্ডটা ঝুলতে ঝুলতে ওর পিঠে এসে বাড়ি খেয়েছে। ও আবার ওটা ধরে নিজের কাজ করা শুরু করলো। আড়চোখে দেখলো মাস্টার জাহাজের পাশ থেকে ওর দিকে নজর রাখছে আর হাতে ছোট এক টুকরো মোটা দড়ি দোলাচ্ছে। উদ্দেশ্য ওটা দিয়ে ওকে মারবে।

“মন কোথায় যায় রে মুরগির বাচ্চা? আর একবার ভুল করবি তো কি করি দেখিস।”

“ওর কথায় ক্ষেপে যেওনা যেনো,” পিছন থেকে ফিসফিস করে বললো কেউ। লোকটা বলছে পর্তুগিজ ভাষায়। মালাবার উপকূলে এটাই হচ্ছে লিংগুয়া ফ্রাংকা (সবাই ব্যবহার করে এমন সাধারণ ভাষা)। ক্রিস্টোফার গলা লম্বা করে পিছনে হেললো। তখনও কপিকল টেনে চলেছে। একটা একহারা ছেলে নজরে এলো। গায়ের রঙ কালো কিন্তু চোখ জোড়া বেশ উজ্জ্বল। ওর পরের দণ্ডটাই ঠেলছে সে। ক্রিস্টোফারের চাইতে ওর বয়স কম, কিন্তু হাতে কড়া পড়ে শক্ত হয়ে আছে, এই বয়সেই গায়ে কিলবিল করছে পেশি।

“ক্যাপ্টেন ক্রফোর্ড একটা আস্ত শয়তান, আবার ফিসফিসিয়ে বললো ও। কপিকলের ক্যাচকোচের কারণে শোনাই যায়না বলা যায়। কিন্তু ওনাকে এড়ানোর উপায়ও আছে। তুমি যতোই ওনার সাথে শক্তি দেখাবে, উনি ততোই তোমাকে ভাঙার চেষ্টা করবে।”

অবশেষে উঠে এলো নোঙ্গরটা। দ্রুত ওটাকে শক্ত করে জায়গামতো বেঁধে ফেলা হলো। পালগুলো তুলে দিতেই কিছুক্ষণের মাঝে সাগর ছুঁয়ে আসা বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাসে ফুলে উঠলো ওগুলো। আদেশমতো ক্রিস্টোফার পালের দড়িগুলো টেনে ধরে রাখলো। সেটা করতে গিয়ে কয়েকবার ক্রফোর্ডের দড়ির বাড়িও পড়লো পিঠে। কিন্তু একটা বারও পিছু ফিরে দেখলো না।

সেই রাতে ও জাহাজের পিছন দিকে ডেক-এর উপর বিছানা পাতলো। পিঠের নিচে শক্ত কাঠের তক্তা। তার উপর ব্যথায় সারা শরীর কাতরাচ্ছে। দাতে চেপে সেগুলো সহ্য করে তারার দিকে চেয়ে রইলো। আজ সকালেও ও গভর্নরের বাড়ির পালকের বিছানায় ঘুম থেকে উঠেছে। চাকরেরা বলার আগে ওর প্রয়োজন মেটাতে সচেষ্ট হয়েছে। আর এখন শোয়ার জন্যে ওর এমনকি একটা কম্বল পর্যন্ত নেই।

একটা কালো অবয়ব এসে ওর পাশে বসলো। অন্ধকার সাদা দাঁত ঝিকিয়ে উঠলো লোকটার। কপিকল টানার সময় যার সাথে কথা হয়েছিলো সেই ছেলেটা।

“আমার নাম দানেশ,” নিজের পরিচয় দিলো ছেলেটা।

“ক্রিস্টোফার।”

“তোমার বাবা আসলেই বোম্বের গভর্নর?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি ওনাকে খুন ঘেন্না করো, তাই না?”

ক্রিস্টোফারের গাই-এর চোখের দৃষ্টিটা মনে পড়লো।

“হ্যাঁ, করি।”

দানেশ ওকে একটা কম্বল ধরিয়ে দিলো। “আর এই অভিযান শেষ হতে হতে তুমি ক্রফোর্ডোকে আরো বেশি ঘৃণা করবে।”

*

পরের তিন সপ্তাহ ছিলো ক্রিস্টোফারের জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর সময়। দ্বিতীয় দিন ক্রফোর্ড ওকে মাস্তুলের মাথায় উঠে পাল খাটাতে আদেশ দেয়। মাস্তুলে অর্ধেক ওঠার পর ক্রিস্টোফার নিচে তাকিয়ে দেখে যে আর কেউ ওর সাথে উঠছে না। সবাই ডেক-এ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে আর নিজেদের মধ্যে বাজি ধরছে।

সেই মুহূর্তে দমকা বাতাসে একদিকে হেলে পড়লো জাহাজটা। খুবই সামান্য, কিন্তু ক্রিস্টোফারের মনে হলো যেনো হারিকেন বয়ে গেলো। ও উল্টোদিকে হেলে পড়ে একদিকে কাত হয়ে গেলো। ঢেউগুলো দেখে মনে হলো ওর দিকে ছুটে আসছে। ডেক-এর লোকগুলো কেউ শিষ দিয়ে উঠলো, কেউবা হেসে উঠলো হো হো করে। ক্রফোর্ড চিৎকার করে কিছু একটা বললো, কিন্তু ক্রিস্টোফারের হৃৎপিণ্ড এতো জোরে ধুকপুক করছিলো যে সেসব ও কিছুই শুনতে পেলো না। ওর হাত ফসকে যেতে শুরু করলো।

জাহাজটা আবার সোজা হলো। ক্রিস্টোফারের ভয়টাও কাটলো কিছুটা। বুঝতে পারলো যে, ও যদি সাগরের দিকে তাকায় তাহলে আর এখানে থাকতে পারবে না, পড়ে যাবে। জোর করে ও উপরের দিকে দৃষ্টি ফেরালো-মাস্তুলের একদম মাথায়। তারপর ইঞ্চি ইঞ্চি করে উপরে উঠতে লাগলো। এক হাত প্রথমে তোলে তারপর অন্য হাতটা দিয়ে নিজেকে টেনে তোলে। প্রতিটা ধাপ পার হতে গিয়ে অবর্ণনীয় আতংক বয়ে গেলো ওর ভিতর দিয়ে। শেষে একটা রশির নাগাল পেতেই এমনভাবে আঁকড়ে ধরলো-যেভাবে বাচ্চা তার মায়ের আঙুল আঁকড়ে ধরে।

কিভাবে মাস্তুলের মাথায় পৌঁছালো তা জানে না ও। তবে এটাই সবার উঁচু না, প্রধান মাস্তুল আরো উঁচু। ক্রিস্টোফারের মনে হচ্ছিলো ও বুঝি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করে ফেলেছে।

কিন্তু নিচ থেকে কেউ উল্লাস প্রকাশ করলো না। অবাক হয়ে ক্রিস্টোফার। বুঝতে পারলো ও এতো কষ্ট করে যা করলো তাতে কেউই তেমন খুশি হয়নি। বরং সবাই চেয়েছিলো যাতে ও পড়ে যায়। এটাই ওর জীবনের পরিণতি এখন-অন্যের বিনোদনের খোরাক হওয়া।

তবে ওদের আশা শেষ হয়নি এখনো, কারণ ক্রিস্টোফারের অগ্নিপরীক্ষা আরও বাকি। উপরে ওঠা হয়েছে, এখন ওকে আড়কাঠের কিনারায় যেতে হবে। ওর পায়ের নিচে তখন সরু একগাছি দড়ি বাদে আর কিছুই থাকবে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরো কয়েকজন নাবিক ওর সাথে যোগ দিলো। ওরা সবাই আড়কাঠ ধরে বানরের দক্ষতায় চলাফেরা করতে লাগলো। জাহাজের দুলুনিতে সামান্য কিছুও হলো না। কয়েকজন ইচ্ছা করে ক্রিস্টোফারকে ঠেলা দিলো, ওর হাতের উপর পাড়া দিলো বা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধে ধাক্কা দিলো।

ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়।

পাল বাধার দড়িটার গিটু খুলতে গিয়ে আঙুল বারবার পিছলে যেতে লাগলো ক্রিস্টোফারের। পায়ের নিচে দড়িটাও নড়েচড়ে গেলো বারবার। ওটা এতো চিকন যে ক্রিস্টোফারের মনে হতে লাগলো বাতাসের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। এরপর শুরু হলো নতুন এক আতংক, নিচে নামা। এক পা, এক পা করে নামিয়ে স্পর্শ করে করে পা বাধানোর জায়গাটা খুঁজে খুঁজে নামলো ও। কারণ নিচে তাকানোর সাহস হচ্ছিলো না।

নেমে এসে মাস্তুলটা জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ক্রিস্টোফার। কারণ পায়ে মনে হচ্ছিলো একটুও বল নেই। বহু কষ্টে বমি আটকালো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব খুশি লাগছিলো নিজের উপর। ও কাজটা পেরেছে। ডেক এর উল্টো পাশ থেকে দানেশ ঠোঁট নেড়ে বলললো, “সাবাস।”

পিঠের উপর কাটা দড়ির ঘা পড়তে সম্বিত ফিরলো ওর। ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ঘুরে দেখে ক্রফোর্ড ওর দিকে ঝুঁকে আছে।

“আমিতো তোকে নামতে বলিনি।”

ক্রিস্টোফার জবাব দিয়েই ফেলেছিলো প্রায় সামলে নিলো শেষ মুহূর্তে। আপনাআপনি মাথা নিচু করে ক্রফোর্ডের রাগ কমার অপেক্ষা করতে লাগলো।

“তুই উপর থেকে লক্ষ্য রাখবি। এসব এলাকায় জলদস্যু আছে। ওদের কেউ যদি আমাদের জাহাজের এক মাইলের ভিতর আসতে পারে তো জ্যান্ত তোর চামড়া ছাড়িয়ে নেবো।”

ক্রিস্টোফার এমনভাবে বাঁকা হয়ে গেলো যেনো ওর গায়ে আবার আঘাত করা হয়েছে। প্রধান মাস্তুলের মাথায় তাকালো ও, অসম্ভব উঁচু। আবার কি ওখানে উঠতে পারবে?

ক্রিস্টোফারের দৃষ্টি খেয়াল করে শয়তানি হাসি খেলে গেলো ক্রফোর্ডের ঠোঁটে।

“এখানে দাঁড়িয়ে কিছুই দেখা যাবে না। তুই উঠে ক্রসট্রেসে দাঁড়িয়ে থাকবি।”

ক্রসট্রেস হচ্ছে প্রধান মাস্তুলেরও উপরে একসাথে জোড়া লাগানো দুটো সরু আড়াআড়ি কাঠ। খুবই ছোট। ক্রিস্টোফার নিচ থেকে ওটাকে দেখতেই পাচ্ছে না। এমনকি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই মাথাটা ঘুরে উঠলো।

ও নড়লো না। ক্রফোর্ড জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চেটে হাতের দড়িটা প্যাচাতে লাগলো। তারপর আবার সোজা করে ওটার জোর পরীক্ষা করলো।

“কথা কানে যাচ্ছে না?”

ক্রিস্টোফার বহু কষ্টে চোখে উপচে ওঠা অশ্রু সামলালো। ক্রফোর্ডোকে ও জিততে দেবে না কিছুতেই।

“যাচ্ছি স্যার।”

“তাহলে আবার বলার আগেই তোর ফর্সা পাছাটা মাস্তুলের উপরে তুলে ফেল। আর আমি বলার আগ পর্যন্ত ওখানেই থাকবি।”

ক্রিস্টোফার আর কিছু না বলে উঠতে শুরু করলো।

*

জীবনে ক্রিস্টোফার অনেককেই ঘৃণা করে, কিন্তু বর্তমান জীবনটাকে ও অন্য সব কিছুর চাইতে বেশি ঘৃণা করে। এমনকি ওর বাবার চাইতেও। তবে গাই এর কথা ওর আর মনে পড়ে না বললেই চলে। জাহাজ সামলানোর অবিরত কাজ-এটা সেটা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলা–সবসময় সবার শেষে নিজের দায়িত্ব শেষ করতে পারাওর এখন অলস চিন্তা করার বিন্দুমাত্র ফুরসত নেই। যখন কাজের ফাঁকে একটু সময় পায়, তখনি ও থাকার জায়গায় গিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে আর ব্যথার জায়গাগুলোতে তেল মালিশ করে। ওর শরীরে এখন সেই প্যাগোডা খচিত মুদ্রার সমান একেকটা ফোস্কা।

জাহাজের বাকি লোকজন ওকে এড়িয়ে চলে। গায়ের রঙ সাদা হওয়ায় ও যেনো ভিন গ্রহের কোনো প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয় সবার কাছে। আর নাবিক হিসেবে সবাই ওকে করুণার চোখে দেখে। শুধু দানেশ ওর প্রতি সদয়। তবে ও-ও সবসময় সতর্ক থাকে যাতে ক্রিস্টোফারের সাথে ওর মেশাটা কেউ দেখে না ফেলে। জীবনে এতোটা একা কখনো লাগেনি আগে। এ কারণেই কয়েকদিন পরেই দেখা গেলো ও মাস্তুলের মাথায় ওঠার আদেশ পাওয়ার জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় করা শুরু করেছে। তবে এখনো ওখান থেকে নিচে তাকানোর সাহস অর্জন করতে পারেনি। উপরে পালের মাঝে বসে থাকার সময়, ওর নিজেকে মেঘের মাঝে বসে থাকা কোনো দেবতার মতো মনে হয়। মরণশীল মানুষ আর তাদের ঘৃণ্য আচরণ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। ওখানে বসে বসে ও রুথের সাথে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। কোথায় ওরা থাকবে, রুথকে কি কি উপহার কিনে দেবে-এইসব। কিন্তু যখনই ওর বাবা বা। ক্রফোর্ডে অথবা ওর সাথে শত্রুতা করেছে এমন সবার উপর প্রতিশোধের কথাটা মাথায় আসে তখন দেখা যায় সেসব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

এক বিকেলে নজর রাখা শেষে ও নিচে গেলো পানি আনতে। নিচে খোলের ভিতর যেতে ভালো লাগে ওর। কাপড়ের গাটরি আর নতুন প্যাকেট করা কাপড় থেকে যে ঘ্রাণটা ভেসে আসে তা ওকে কোম্পানির গুদামগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় ওটাই ছিলো ওর খেলার জায়গা।

“ক্রিস,” অন্ধকার থেকে হিসিয়ে ডাকলো দানেশ। “এটা দেখো।”

ওর হাতের তালুতে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। একটা পিতলের চাবি।

“কিসের চাবি?”

“সিন্দুকের,” দানেশ ফিসফিস করে বললো। “ক্রফোর্ড যখন দড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখছিলো তখন ওর কেবিন থেকে চুরি করেছি।”

গুদাম ঘরের সিন্দুকের ভিতর স্পিরিট রাখা। ওগুলো আসলে ক্রুদের ব্যবহারের জন্যে। কিন্তু গুজব শোনা যাচ্ছে যে ক্রফোর্ড সেটা নাকি বিক্রি করে দেওয়ার পায়তারা করছে।

ক্রিস্টোফার কাঁধের উপর দিয়ে উদ্বিগ্ন মুখে ইতিউতি তাকালো। “ধরা পড়ে গেলে?”

“কয়েক বোতল গায়েব হলে ও টের পাবে না। আমরা পরের বন্দরে ওগুলো বেঁচে দেবো। তাড়াতাড়ি।”

দানেশ চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। খোলা দরজা দিয়ে পিরিটের তীব্র ঝাঝালো গন্ধ নাকে এলো ওর।

“তুমি এখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দাও। ধরা খেলে ক্রফোর্ড কিন্তু জ্যান্ত ছাল তুলে ফেলবে।”

দানেশ ওকে চাবিটা ধরিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লো। ক্রিস্টোফার ওখানে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ওর মন বলছে দানেশকে এভাবেই ফেলে পালিয়ে যেতে। যদি ধরা পড়ে তাহলে সব অস্বীকার করলেই হবে যে ও এসবের মধ্যে নেই। কিন্তু দানেশই হচ্ছে একমাত্র লোক যাকে ও বন্ধুর কাছাকাছি একজন হিসেবে ধরতে পারে। ও যদি না থাকে তাহলে জাহাজে ক্রিস্টোফারের আর কেউই থাকবে না।

উপরের ডেক-এ পদশব্দ শোনা গেলো। জাহাজের দুলুনির কারণে উপরের হ্যাচওয়ে দিয়ে যে আলোটা আসে তাতে ছায়াগুলো একেক সময় একের রকম আকার ধারণ করছে, তাই বোঝা গেলো না যে লোকটা কে।

“তাড়াতাড়ি,” ক্রিস্টোফার বললো। “কেউ আসছে।”

দানেশ বেরিয়ে এলো। বগলে চার বোতল ব্রান্ডি ধরে রেখেছে। সেগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখলো ও।

“এখানকার সব তো হাতীও খেয়ে শেষ করতে পারবে না,” ফিসফিসিয়ে বললো ও। “আর কয়েকটা আনতে পারলেই আমাদের দুজনের হয়ে যাবে।”

“না,” হিসিয়ে উঠলো ক্রিস্টোফার। “এখন চলো। আমরা

ভারী কিছুর চাপে ঝাঁকিয়ে উঠলো কাঠের সিঁড়িটা। এক জোড়া জুতা দেখা গেলো সেখানে, তার উপরে দেখা গেলো সাদা মোজা পরা এক জোড়া গোদা পা। এরপর এক জোড়া চোঙ্গা প্যান্ট। তারপর একটা থলথলে দেহ নেমে এলো, গায়ের জামার বোতামগুলো টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

দানেশ দ্রুত নোঙ্গরের দড়ির পিছনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওটার বিশাল কুণ্ডলীর ভিতর একজন মানুষ অনায়াসে লুকিয়ে পড়তে পারবে। ক্রিস্টোফার

এক চুলও নড়লো না। যেনো পাথর হয়ে গিয়েছে। ক্রফোর্ড মাথা নিচু করে হ্যাচওয়েটা পার হয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে এলো। সব দেখে শুনে শান্তভাবে সিন্দুকের খোলা দরজাটা লাগালো, তারপর ক্রিস্টোফারের পায়ের কাছে নামিয়ে রাখা বোতল দুটো আর চাবিটা তুলে নিলো।

“যখন খেয়াল করলাম যে চাবিটা পাওয়া যাচ্ছে না তখনই ভেবেছিলাম যে এখানে কাউকে পাওয়া যাবে।”

ক্রিস্টোফার কিছুই বললো না।

“তুই এটা পেলি কিভাবে? আর কে আছে তোর সাথে?”

ক্রিস্টোফার সোজা ক্রফোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলো। দৃষ্টি কোনোদিকে সরাচ্ছে না; যাতে করে ক্রফোর্ড ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দানেশের অবস্থান টের না পেয়ে যায়। কিন্তু ক্রফোর্ড এটাকে ঔদ্ধত্য হিসেবে নিলো।

“তোর বাপ বোম্বের গভর্নর বলে কি ভাবিস যে তুই এখানকার সবার চাইতে সেরা? তুই কি ভাবিস সেই ক্ষমতাবলে তুই আমার জিনিস চুরি করতে পারবি?”

ক্রফোর্ডের চেহারা ক্রোধে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। যেনো ঘন কালো মেঘ জমেছে আকাশে। ক্রিস্টোফার এই দৃষ্টি চেনে। ও ইষ্টনাম জপ করা শুরু করলো।

“সারেং,” চিৎকার করে ডাকলো ক্রফোর্ড। “মি. কোর্টনীকে ডেক-এ নিয়ে আয়। আর সবাইকে খবর দে। সবার সামনে শাস্তি দেবো আমি ওকে।”

কয়েকটা কঠোর হাত ওকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে গেলো। উঠেই দেখে বাকি সবাই প্রধান মাস্তুলের পিছনে বসানো একটা কামানের চারপাশে জড়ো হয়ে গিয়েছে। ক্রফোর্ড নিজের ঘরে গিয়ে খানিকটা রশি নিয়ে এলো। ও হাতে করে যে রশি নিয়ে ঘোরে এটা তার চাইতে সরু আর নমনীয়। কিছুক্ষণ আঙুলের ফাঁকে রশিটা নাড়াচাড়া করে সামনের দিকে দুটো গিট দিয়ে নিলা।

“বন্দীকে প্রস্তুত কর,” আদেশ দিলো ক্রফোর্ড।

ওরা ক্রিস্টোফারকে ব্যারেলের উপর শুইয়ে দিলো। সারাদিন রোদের তাপে গনগনে হয়ে থাকা লোহার কড়াগুলো সাথে সাথে ওর নগ্ন বুকে ছ্যাকা দিলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার জানে যন্ত্রণা সবে শুরু। সারেং ওর হাত চেপে ধরে আছে, আর অন্য একজন নাবিক ধরে আছে ওর পা। ঠিক একটা ময়লা কাপড়ের মতো ও ব্যারেলটার উপর লম্বা হয়ে আছে।

পিছনেই জামার হাতা গুটিয়ে নিজেও প্রস্তুত হলো ক্রফোর্ড। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রশিটার প্যাঁচ খুলে ফেলে, প্রথমে ডেক এর উপর কয়েকবার বাড়ি দিয়ে দড়িটাকে আরো নমনীয় করে নিলো। তারপর পা শক্ত করে হাত পিছনে নিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে ক্রিস্টোফারের পিঠের উপর নামিয়ে আনলো সেটা। শব্দ শুনে মনে হলো মাস্কেটের গুলি লেগেছে পিঠে। ব্যথার পরিমাণ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। ক্রিস্টোফার দাঁতের ফাঁকে একটা পাটের দড়ি কামড়ে ধরে রইলো। কাঁদবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। প্রথম আঘাতের পর নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও না দিয়ে আবার ক্রফোর্ড ওর দড়ির চাবুক হাকালো। এবার শোল্ডার ব্লেডের মাঝ বরাবর। এরপর তৃতীয়টা। তারপর

ক্রফোর্ড খেই হারিয়ে ফেললো। ঢেউয়ের মতো ব্যথা আসতে লাগলো। একের পর এক-এতো দ্রুত যে সবগুলো মিলে কিছুক্ষণ পর ক্রিস্টোফার অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়লো। অত্যাচারের চূড়ান্ত করলো ক্রফোর্ড। বর্বরতম আচরণ বলে যাকে, যেনো ওর ইচ্ছা ক্রিস্টোফারের শরীরের সকল হাড় গুড়ো করে ফেলবে।

তবে ক্রিস্টোফার এতো যন্ত্রণার মাঝেও প্রতিটা বাড়ি গুণে রাখলো। এভাবেই ও ওর বাবার মার খাওয়ার সময় মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখতো। এই মারটাও হজম করে ফেলতে পারলো তাই। যতোগুলো মার খায় সেই সংখ্যা থেকে যেনো ওর শরীরে শক্তি উতসরিত হয়। একটা কল্পিত লেজারে ও মারগুলো টুকে রাখে। একদিন সুদ সমেত আদায় করবে। যতদিন এভাবে মারের সংখ্যা গুণতে পারবে ততোদিন ও সব অত্যাচারই সহ্য করতে পারবে।

আস্তে আস্তে মারের জোর কমে এলো। ক্রফোর্ড আগের আক্রোশেই হাত চালিয়ে গেলো, কিন্তু ক্লান্ত হয়ে গেলো একটু পরেই। ও দড়িটা ফেলে দিলো। ওটার পাক খুলে গিয়েছে, এখন সেখানে ক্রিস্টোফারের রক্ত আর চামড়া লেগে আছে। লোকজন সবাই নিজেদের কাজে ফিরে যেতেই যারা ক্রিস্টোফারকে ধরে রেখেছিলো তারাও ছেড়ে দিলো। ওদের শরীরও রক্তে ভরে আছে। ক্রিস্টোফার ব্যারেল থেকে গড়িয়ে নেমে ডেক এর উপর স্তূপ হয়ে পড়ে রইলো। এতো ব্যথা সারা শরীরে যে চোখের পাতা বন্ধ করতেও কষ্ট হলো ওর।

কেউ একজন ওর ঠোঁটে এক মগ রাম এনে ধরলো। তৃষ্ণার্তের মতো তা খেয়ে নিলো ও। লোকটা দানেশ। রাম খেয়ে ব্যথা না গেলেও কমলো কিছুটা।

দানেশ ক্রিস্টোফারের পিঠ ধুয়ে দিলো। ক্রফোর্ড ক্রিস্টোফারকে পরিষ্কার পানি দিতে নিষেধ করেছে, দানেশ তাই জাহাজের পাশ দিয়ে বালতি ডুবিয়ে পানি নিয়ে এসেছে। নোনা পানির ছোঁয়ায় চাবুকের বাড়ির চাইতেও বেশি ব্যথা করে উঠলো। সহসাই একটা কালো পর্দা নেমে আসতে লাগলো ওর চোখের সামনে। ও নাড়াচাড়া করতে চাইলো কিন্তু ওর হাত পা কথা শুনলো না।

“উনপঞ্চাশ,” যেনো এক ঘোরের মাঝে বললো ক্রিস্টোফার।

“মানে?”

“ঊনপঞ্চাশটা বাড়ি।” হেসে বললো ক্রিস্টোফার। ঠোঁট নাড়তে গিয়েও অপরিমেয় ব্যথা হচ্ছে ওর। “পঞ্চাশটাও মারতে পারলো না। কাপুরুষ।” বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে গেলো ও।

৩. জোসেফ ত্রিভান্ড্রাম বন্দর

এক সপ্তাহ পর জোসেফ ত্রিভান্ড্রাম বন্দরে নোঙ্গর করলো। কু-রা সবাই তো মহা খুশি। বোম্বে ছাড়ার পর আর ওদের ডাঙ্গায় পা দেওয়া হয়নি। পুরো সময়টা ফুর্তিতে কাটাবে বলে ঠিক করলো সবাই। ক্রফোর্ড একটা টুল আর টেবিল নিয়ে ডেক-এ গিয়ে বসলো। নাবিকরা ওর চারপাশে জড় হলো যার যার পাওনা নিতে।

খাতায় নিজের নাম সই করে, হাতে কয়েকটা পয়সা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতে লাগলো সবাই। ক্রিস্টোফার ছিলো সবার শেষে। ক্রফোর্ডের সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। ক্রফোর্ড সরু চোখে তাকালো ওর দিকে।

“কি চাই?”

“আমার বেতন।”

“অবশ্যই,” বলে ক্রফোর্ড মহা আয়োজন করে টাকা গুণতে বসলো। শেষে কয়েকটা মুদ্রা বের করে সেগুলো টেবিলের উপর দিয়ে ঠেলে দিলো সামনে। কিন্তু ক্রিস্টোফার ওগুলো তুলে নিতেই ক্রফোর্ড ওর কবজি ধরে ধরে ফেললো। তারপর মোচড় দিয়ে মুদ্রাগুলো ওর হাত থেকে আবার ফেলে দিলো টেবিলের উপর।

“আবার এসব কি করছিস?”

ব্যথায় ক্রিস্টোফারের চোখ ফেটে পানি চলে এলো। মনে হলো কবজিটা বোধহয় ভেঙেই গিয়েছে।

“আমার বেতন নিচ্ছি।”

“আবার আমার কাছ থেকে চুরি করছিস?”

“প্রতি সপ্তাহে চার রুপি দেওয়ার কথা ছিলো আপনার।”

“তুই আমার নবীশ হিসেবে জাহাজে উঠেছিস। তার মানে তোর সব বেতন আমার কাছে আসবে।” বলে ক্রফোর্ড ক্রিস্টোফারের হাত ছেড়ে দিলো। আচমকা বন্ধন মুক্ত হওয়ায় ক্রিস্টোফার পিছনে উল্টে ডেক-এর উপর পড়ে গেলো। এতোগুলো লোক চেয়ে চেয়ে দেখলো, কেউ ধরতে পর্যন্ত আগালো না। ক্রফোর্ড পয়সাগুলো নিয়ে আবার ওর বক্সে ভরে রাখলো। তারপর ঠাস করে মুখটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে বাঁধা ছুরিটা নাড়তে লাগলো।

“সব পরিষ্কার?”

ক্রিস্টোফার ওখানেই পড়ে রইলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ। প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসেছে ওকে। শুধু ইচ্ছা করছে ছুরিটা ক্রফোর্ডের পেটে গেঁথে দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ওর মৃত্যুটা দেখতে। ও টের পেলো সবগুলো ক্রু ওকে দেখছে, ওর দুরবস্থা উপভোগ করছে। এদেরকেও ও চরম ঘৃণা করে।

ক্রিস্টোফার নিজেকে টেনে তুলে সোজা ক্রফোর্ডের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলো। কবজির ব্যথাটাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ওকে দাঁড়াতে দেখে অবাক হয়ে গেলো ক্রফোর্ড।

“সব পরিষ্কার,” কাটা কাটা ভাবে বললো ক্রিস্টোফার। আর কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না ওর।

ক্রফোর্ড আরো একবার ওকে ক্ষেপিয়ে তুলতে গিয়েও কি মনে করে থেমে গেলো। মাত্র কয়েক সপ্তাহেই ক্রিস্টোফার এখন আর বোম্বেতে দেখা সেই নাদুসনুদুস বাচ্চাটা নেই। কাঁধ চওড়া হয়ে গিয়েছে, শরীরও পেশিবহুল হয়েছে আরো বেশি। এখন আর আগের মতো বিনীতও নেই। তবে এতো কিছুর মধ্যে ওর চেহারার পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। কঠোর আর শক্ত হয়ে গিয়েছে চেহারা। কালো চোখের মণিতে কেমন অস্থিরতা, অথচ দৃষ্টি অনেক গভীর। ক্রফোর্ড মুখে স্বীকার করবে না, কিন্তু চোখ জোড়া দেখে ও নিজেও ভয় পায়।

ক্রফোর্ড ঘুরে আদেশ দিলো, “নৌকা নামাও। আমরা ডাঙ্গায় যাবো। তুই বাদে।” ক্রিস্টোফারের দিকে ঘেউ ঘেউ করে বললো ও। “তুই জাহাজে বসে নোঙ্গরের দিকে খেয়াল রাখবি। যদি আমার জাহাজের কিছু হয়, তাহলে তোকে মাস্তুলে পেরেক দিয়ে গেঁথে কাক দিয়ে খাওয়াবো। বুঝেছিস?”

ক্রিস্টোফার দেখলো শুধু দানেশে ওর দিকে সহানুভুতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। বাকিরা ফিরেও তাকালো না। ক্রিস্টোফার বসে বসে দেখলো সবাই নৌকা বেয়ে ডাঙ্গার দিকে চলে গেলো। দানেশ-ও গেলো। একদল মহিলা তীরে দাঁড়িয়ে আছে ওদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে। নামতে না নামতেই সবাইকে প্রায় টেনে হেঁচড়ে কাছের বেশ্যালয়ে নিয়ে গেলো মেয়েগুলো। রাত পোহানোর আগেই এদের সব ইনকাম হাওয়া হয়ে যাবে। তবে তাতে ক্রিস্টোফারের কোনো সান্ত্বনা নেই।

ও জাহাজের ছাউনির ছায়ায় বসে ছুরি দিয়ে একটা কাঠে আঁকিবুকি আকলো কিছুক্ষণ। পুরো জাহাজে ও একা, এই একাকীত্বটাই ওর কাছে ভালো লাগতে লাগলো। সারাজীবন বলতে গেলে ও একা-ই বড় হয়েছে। কুঠির অন্য ছেলেদের সাথে মেশা ওর বারণ ছিলো। কারণ ওর বাবার চোখে বাকিরা ছিলো ওদের চাইতে নিম্ন শ্রেণির। যে গুটি কয়েকের সাথে ওর বন্ধুত্ব হয়েছিলো তারা সব মারা পড়েছে নাহয় ইংল্যান্ড ফিরে গিয়েছে। ওর মা, বাবার ভয়ে কখনো নিজের ঘর ছেড়ে বের হন না। তাই ও সবসময় একা-ই বড় হয়েছে।

ও বুঝতে পারছে যে ওর পক্ষে এভাবে ভাগ্য গড়া সম্ভব হবে না। যদি ও ক্রফোর্ডের অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে-ও যায়, তবুও ওকে একটা সস্তা কাপড়ের জামা বানানোর টাকা জমাতেও কয়েক বছর লেগে যাবে। রুথকে তো আর এতো দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখা সম্ভব না।

ওর বাবার কাছ থেকে ক্রিস্টোফার আর একটা জিনিস শিখেছে। গভর্নরের অফিসে চুপচাপ সবার অলক্ষ্যে বসে থেকে থেকে ও অনেক মানুষকে অফিসে আসা যাওয়া করতে দেখেছে। নীরব ঘরটায় দূর থেকেও কথোপকথন শোনা যেতো। মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হলে লোজন ওর বাবাকে এমন কুৎসিত। ভাষায় গালি দিতে যা ও কল্পনাও করতে পারে না। এরপরেও ওর বাবা তাদেরকে মাথা উঁচু করেই ওদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দিতো। ওরা মনে মনে ভাবতো যে খুব জেতা জিতেছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর ও তাদেরকেই দেখেছে হতদরিদ্র অবস্থায় ইংল্যান্ডের জাহাজে চড়ে বসতে। সব হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গিয়েছে তারা। একজনকে তো গ্রেপ্তার করে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, কারণ তাকে একজন সেপাহী ছোঁকড়ার সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় ধরা পড়েছিলো সে।

কখনো ভুলবে না, কখনো ক্ষমা করবে না। আর এমন সময় বদলা নেবে যখন সেটা তোমার শত্রুকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। ক্রিস্টোফারের মনে হলো ও যেনো নতুন কোনো সত্য আবিস্কার করে ফেলেছে।

ও ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো। সূর্যমামা ডুবে গিয়ে অন্ধকার ভরে গেলো চারপাশ। ক্রিস্টোফার হ্যাচ গলে নিচের ডেক-এ নেমে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে বাবুর্চির রেখে যাওয়া একটা পাত্র থেকে খানিকটা স্ট্য নিয়ে উদরপূর্তি করলো। তারপর খোঁজাখুঁজি করে লুকানো জায়গা থেকে বের করে আনলো এক বোতল আরক। জিনিসটা আসলে ধেনো মদ। ছিপি খুলেই bক ঢক করে কয়েক ঢোক পেটে চালানরে দিলো। জ্বলন্ত তরলটা পেটে পড়তেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেলো ওর। এক অদ্ভুত সাহস অনুভব করতে লাগলো নিজের ভিতর।

“আর এক শয়তানের দাস হয়ে থাকবো বলে আমি আমার বাবাকে ছেড়ে আসিনি,” নিজেকেই শোনালো ও। আর একটা হ্যাচ গলে একেবারে নিচের ডেক-এ চলে এলো ক্রিস্টোফার। জোসেফ-এর বেশিরভাগ মালপত্রই একেকটা বিশাল গাট্টি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। কাপড়ের গাট্টি বা চাউলের বস্তাগুলো বেশি বড়, ওগুলো দিয়ে ওর উদ্দেশ্য সাধন হবে না। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে রেশমি কাপড়ের একটা ছোট বোঁচকা খুঁজে পেলো। এতেই চলবে।

পানির কাছাকাছি থাকায় ক্রিস্টোফার জাহাজের গায়ে ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলো। জাহাজের প্রতিটা ক্যাচকোচ শব্দ মাস্তুল বেয়ে নিচে নেমে আসছে। খোলের গায়ে শব্দ করে কিছু একটা বাড়ি খেলো, সম্ভবত ঢেউ। বা পানিতে ভেসে আসা কোনো কাঠের টুকরো। কিন্তু তাতেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলো ও। হাতের তালু ঘেমে পিছলে গেলো বোঁচকা। মদটা গলার কাছে উঠে এসে তেতো অনুভুতির সৃষ্টি করলো।

একটা বস্তা থেকে সুপারি নিয়ে পকেটে ভরলো ক্রিস্টোফার, তারপর সিল্কের বোঁচকাটা কাঁধে ফেলে আবার উঠে এলো উপরে। ডিঙ্গি নৌকাগুলো এখনো তীরে, কিন্তু ঠিকই একটা ছোট নৌকা রয়ে গিয়েছে যা ও নিজেই বাইতে পারবে। ও নিজের ছুরিটা বের করে নৌকা বাধা দড়িগুলো কাটতে লাগলো।

“যাচ্ছিস কোথায়?” গর্জে উঠলো ক্রফোর্ড। জাহাজের পিছনে জ্বালানো মশালের আবছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ডেক-এ বিশাল লম্বা ছায়া পড়েছে ওর। “আবার তুই চুরি করছিস। একবার মার খেয়ে শিক্ষা হয়নি?”

ক্রফোর্ড কখন জাহাজে এসেছে সেটা ক্রিস্টোফার টের পায়নি। হয় ও ক্রিস্টোফারকে বিশ্বাস করে না, নয়তো কোনো সাক্ষী ছাড়া ওকে শেষ করে দিতে এসেছে। কিন্তু ক্রিস্টোফার কারণটা কখনো জানতে পারেনি। ক্রফোর্ড সামনে এগিয়ে এসে এতো জোরে ক্রিস্টোফারের চেহারায় ঘুষি দিলো যে ও উড়ে পিছনের দড়াদড়ির উপর গিয়ে পড়লো।

“আমাকে মেরে ফেলতে হলে এর চাইতে জোরে মারতে হবে, ক্রিস্টোফার বললো। ওর কণ্ঠে এক ভয়ানক হিংস্রতা খেলা করছে। একটা বুড়ি মহিলার মতো আঘাত করেন আপনি।”

একটা হুংকার ছেড়ে ক্রফোর্ড পেয়ে গেলো সামনের দিকে। ক্রিস্টোফার উঠে দাঁড়িয়েছে। আত্মরক্ষার্থে নিজের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে ধরলো ও, এক হাতে যে ছুরি ধরা সেটা খেয়াল নেই। অন্ধকারে ষাড়ের মতো ধেয়ে আসা ক্রফোর্ড-ও খেয়াল করলো না ব্যাপারটা।

সহজাত প্রবৃত্তির বশেই ক্রিস্টোফার ক্রফোর্ডের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। বিশাল লোকটা ওকে আঁকড়ে ধরতে যেতেই ও-ও সজোরে ধাক্কা দিলো সামনের দিকে।

ক্রিস্টোফার কিছু বোঝার আগেই হাতের ছুরিটা ক্রফোর্ডের ভূড়ি ফাঁসিয়ে দিলো। গরম রক্ত বেরিয়ে এলো সেদিক দিয়ে। ক্রফোর্ড চিৎকার দিয়ে উঠে মোচড়া মুচড়ি করে ছুরিটা শরীর থেকে বের করার চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু টানাটানিতে ওর জখম আরো বড় হওয়া ছাড়া আর কিছু হলো না। ওর নাড়িভুড়ি বেরিয়ে ক্রিস্টোফারের হাতের উপর এসে পড়লো।

ক্রিস্টোফার লাফিয়ে সরে গেলো দূরে। ছুরিটা টান দিয়ে বের করে ফেলেছে। ক্রফোর্ড নিজের পেট চেপে ধরে চেষ্টা করলো সবকিছু আবার ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার। ব্যথায় একটা আহত ষাড়ের মতো গোঁ গোঁ করছে ও।

ক্রফোর্ডের চিৎকার নিশ্চয়ই পানি পেরিয়ে ডাঙ্গায়ও পৌঁছাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা যাবে ডাঙ্গা থেকে কেউ না কেউ শব্দটা শুনে কি হয়েছে সেটা খতিয়ে দেখতে চলে আসবে। আর ক্রিস্টোফারকে এভাবে উদ্দত ছুরি হাতে দেখলেই যা বোঝার বুঝে নেবে সবাই। ওকে এর শেষ করতে হবে।

এছাড়া ওর আর কোনো উপায় নেই। ক্রিস্টোফার শক্ত হাতে ছুরিটা ধরলো আবার, তারপর ওপরে তুলে সোজা ক্রফোর্ডের হৃৎপিণ্ড বরাবর বসিয়ে দিলো।

ক্রফোর্ডের চিৎকার চেঁচামেচি সর থেমে গেলো সাথে সাথেই। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে পায়ের কাছে পড়ে থাকা লাশটার দিকে চেয়ে রইলো ক্রিস্টোফার। হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেলো ওর। সারা শরীর কাঁপছে।

‘তুমি একটা খুনী-গাই এর মতো ঠাণ্ডা স্বরের কেউ এসে ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেলো কথাটা।

লাশটা থেকে নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলো না ও। একটু আগেও যে একজন জলজ্যান্ত মানুষ ছিলো, সে এখন কাটা মাংসের স্তূপ ছাড়া কিছু না।

‘তুমিই করেছো সব’-কণ্ঠটা আবার বললো।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর অপরাধবোধ কমে এলো খানিকটা। আস্তে আস্তে শরীরে উষ্ণতাও ফিরে এলো। কাঁপাকাপি গেলো থেমে। যে লোকটা ওকে পিটিয়েছিলো, ঠেঙিয়েছিল, অত্যাচার করেছিলো, ধোঁকা দিয়েছিলো-সে এখন মৃত। ও আর কখনো ক্রিস্টোফারের গায়ে হাত তুলতে পারবে না।

“আমিই কাজটা করেছি, নিজেকে নিজে বললল ও। ভাবনাটা মাথায় খেলতেই পুরো শরীর শিউরে উঠলো ওর। ঠাণ্ডার দিনে গোসল করতে গেলে যেরকম হয় সেরকম। “এতোদিন ধরে কাপুরুষের মতো কেননা বেঁচে আছি। আমি? নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তো কিছুই জানতাম না।”

নিজের রক্তাক্ত হাত দুটো ক্রফোর্ডের পায়জামায় মুছে নিলো ক্রিস্টোফার, তারপর লাশটা হাতড়ে ক্রফোর্ডের টাকার থলেটা খুঁজে বের করলো। ভিতরে পয়সার ঝনঝনানি শোনা গেলো-ওর টাকা এগুলো সব। ও থলেটা নিয়ে নিজের পায়জামার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো।

আর একটা জিনিস খেয়াল হলো ওর। একটা চাবি-ক্রফোর্ডের গলায় একটা রশি দিয়ে ঝোলানো। পিরিট রাখার সিন্দুকটার চাবির চাইতে অনেক ছোটো। তবে এই চাবিটাও ও সকালে দেখেছিলো। এটা হচ্ছে টাকার সিন্দুকের চাবি। ক্রফোর্ডের বুকের ছিদ্র থেকে রক্ত বেরিয়ে লাল হয়ে আছে। ক্রিস্টোফার টান মেরে চাবিটা ছুটিয়ে নিয়ে দ্রুত ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে ছুটে গেলো। ক্রফোর্ডের খাটের নিচে টাকার সিন্দুকটা লুকানো থাকে। সবাই বেতন তুলে নেওয়ার পরেও ওর সিন্দুকটা বের করে আনতে ঘাম ছুটে গেলো। ভালো লক্ষণ।

নিচে ভাড়ার ঘরে গিয়ে এক বোতল কপির তেল খুঁজে পেলো ক্রিস্টোফার। জাহাজের খোলের ভিতর থাকা কাপড়ের গাড়িগুলোর উপর ঢেলে দিলো তেলটা, তারপর একটা ছোট পিপা থেকে গান পাউডার বের করে খোলের উপর ছড়িয়ে দিলো। এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা আর শক্তির অনুভূতি কাজ করছে ওর ভিতরে। দ্রুত হাতে কাজ করতে লাগলো ও। ওর কাছে এই কাজটা একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। এতে করে ক্রফোর্ডের লাশও পুড়ে যাবে আর জাহাজের কোনো ত্রু-ও ওকে খোঁজার কথা চিন্তা করবে না। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে ও কাজটা শুরু করেছিলো ভিতরে থাকা প্রচণ্ড আক্রোশ থেকে, এতো কথা ভেবে না।

সিঁড়ির অর্ধেক উঠে এসে, ও ঘুরে হাতের কুপিটা অন্ধকারে ছুঁড়ে দিলো। কাঁচ ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে, আর তেলে ভেজা কাপড়ে আগুন ধরে গেলো মুহূর্তেই। লকলকে শিখায় ভরে গেলো খোল।

ক্রিস্টোফার তাকিয়ে থাকলো সেদিকে, নিজের কাজে নিজেই সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে যেনো। আমিই করেছি সব, আবার ভাবলো ও। সামনের ধ্বংসলীলা ওর রক্তে আফিমের নেশার মতোই প্রবাহিত হতে লাগলো।

নিচ থেকে আসা গরম বাতাস এসে লাগলো ওর মুখে। বুঝলো যে আর থাকা যাবে না। সিঁড়ি বেয়ে উঠে ক্রফোর্ডের লাশের কাছে গিয়ে রেগে আবারও একটা লাথি দিলো ক্রিস্টোফার। ডিঙ্গিটা নামানোর সময় আর নেই, তবে গাছের গুঁড়ির যে ডোঙ্গাটায় করে ক্রফোর্ড এসেছে সেটা জাহাজের সাথে বাধা ই আছে। একটা রশিতে বেঁধে প্রথমে সিন্দুকটা নামিয়ে দিলো ডোঙায়, তারপর নিজেও নেমে এসে দাঁড়টা তুলে নিলো। দেরি না করে সমস্ত শক্তি দিয়ে বাওয়া শুরু করলো ও, পিছনের জাহাজটা ততোক্ষণে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

একটু পরেই বালিতে এসে ঠেকলো ওর নৌকাটা। সিন্দুকটা কাঁধে তুলে নিয়ে ঝপাশ করে পানিতে নেমে পড়লো ক্রিস্টোফার। তারপর সোজা দিলো দৌড়। একটানে তীরের গাছগুলোর আড়ালে পৌঁছে তারপর পিছনে ফিরে তাকালো। জোসেফ দেখতে তখন বন ফায়ারের গানপাউডার ট্রিজন ডে-র মতো লাগছে। শহরের লোকজন অন্যপাশের পানির ধারে ছুটে আসছে কি হয়েছে দেখতে। প্রায় সবাই-ই অর্ধ উলঙ্গ। হাঁ করে তাকিয়ে আছে আগুনের দিকে। জাহাজের কয়েকজনকেও দেখা গেলো, সাথের মেয়েগুলো তখনও সেটে আছে সাথে। ও ভেবে পেলো না ওরা কিভাবে বাড়ি যাবে? আর একটা জাহাজ খুঁজে পেতে কতো দিন লাগবে আর?

গাছের ফাঁকে মুক্ত বাতাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত ও ভিতর হাঁটতেই থাকলো। বন্দরে যাওয়ার সাহস ওর নেই। অন্তত যতোক্ষণ জোসেফ-এর লোজন ওখানে থাকবে ততোক্ষণতো না-ই। তবে ও আসার পথে তীর দিয়ে অনেকগুলো শহর আর গ্রাম দেখেছে যেখানে আশ্রয় নিতে পারবে। সে উদ্দেশ্যেই দিক বদলে উত্তরে ঘুরতে যাবে কিন্তু দেখতে পেলো বনের ফাঁক দিয়ে আলো ছুটে আসছে। ও সিন্দুকটা টেনে সরিয়ে দিয়ে এক ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।

অবয়বটা আরো কাছে এগিয়ে এলো, লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো একটা বাতি ধরে আছে সাথে। ক্রিস্টোফারের লুকানো জায়গাটার একদম সামনে এসে দাঁড়ালো লোকটা। ধুলোমাখা পথে ওর পায়ের ছাপ আর সিন্দুক টেনে নেওয়ার দাগ দেখেই বুঝেছে কোথায় লুকিয়েছে।

“ক্রিস?” ডাকলো অবয়বটা।

ওটা হচ্ছে দানেশ। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ক্রিস্টোফার লুকানো জায়গাটা থেকে মাথা তুলোলো। দানেশ আতংকে পিছিয়ে গেলো, চিনতে পারেনি ওকে। দানেশের কাছে মনে হচ্ছিলো ওর সামনে রক্ত আর ধুলোয় ভরা একটা অর্ধ উলঙ্গ দানব দাঁড়িয়ে আছে।

“ক্রিস?” ও তাকিয়েই রইলো। “আমি তোমাকে ডাঙ্গায় উঠতে দেখেছি।” তারপর রক্ত আর ওর চোখের উভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে বললো, “করেছছা কি তুমি?”

“আমি ওকে খুন করেছি,” বহু কষ্টে বললো ক্রিস্টোফার। মনে মনে বলার চেয়ে মুখে বলা অনেক কষ্ট। কিন্তু দানেশের চোখে তাকাতেই ওর প্রতি ‘দানেশের আলাদা একটা সম্ভম দেখতে পেলো।

“আর জাহাজ?”

“নেই। জ্বালিয়ে দিয়েছি আমি ওটাকে।”

দানেশের মুখ কালো হয়ে গেলো। “জাহাজটা দিয়েই পেট চালাতাম আমরা।”

“পেট চালানো? ক্রফোর্ড আমাকে কিছুই দেয়নি, মনে নেই?” ও ঝোঁপের পিছনে ফিরে গিয়ে আবার সিন্দুকটা তুলে নিয়ে এলো। “এটা দেখেছো? আমরা এখন নিজেরাই মালপত্র কিনতে পারবো। একটা জাহাজ ভাড়া করবো। আর দড়ি ধরেও ঝুলতে হবে না, বা ওর দড়ির বাড়িও খেতে হবে না। আমরাই এখন হবো সর্দার। আর কয়েকটা অভিযান ভালোয় ভালোয় করতে পারলেই আরো বড় একটা জাহাজ কিনে ফেলতে পারবো। তারপর আর একটা।” ও এর মধ্যেই কল্পনায় একটা বিশাল সওদাগরি জাহাজে করে বোম্বে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে শুরু করেছে। ওর জাহাজের কামানের খোপগুলো সোনার পাতে মোড়ানো থাকবে। তীরে রুথ দাঁড়িয়ে থাকবে ওর অপেক্ষায়, ডাঙায় নামতেই দুই হাত বাড়িয়ে দৌড়ে আসবে ওর দিকে। আর ওর বাবা যখন জানবেন খবরটা, তখন পরাজয়ের রাগে দুঃখে ক্ষোভে লাল হয়ে যাবেন।

দানেশের অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো। “চাবি? ওটা এনেছো তো?”

ক্রিস্টোফার কবজিতে বাঁধা চাবিটা বের করে তালায় ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। ঝট করে খুলে গেলো তালা, ঢাকনা সরতেই দেখা গেলো ভিতএ সোনা আর রূপা চকচক করছে।

“এ দিয়ে তো…” দানেশ এক মুঠো মুদ্রা বের করে হাতে নাড়তে লাগলো। “পুরো রাজার হালে থাকা সম্ভব।”

“সাবধান,” ক্রিস্টোফার হাসলো। “আমাদের কিন্তু সব টাকা একবারে খরচ করা যাবে না। যদি ঠিকমতো খাটাতে পারি তাহলে এর চাইতে দশ গুণ বেশি কামাতে পারবো।”

ঘুষিটা কোন দিক থেকে এলো সেটা টেরও পেলো না ক্রিস্টোফার। এতে জোরে ওর চোয়ালে লাগলো যে ও পিছন দিকে উলটে পড়ে গেলো। দানেশের গায়ে মাংস কম, কিন্তু ও সেই দশ বছর বয়স থেকে জাহাজে কাজ করছে। রশির মতো পাকানো ওর শরীর-আর ক্রিস্টোফার এতোক্ষণের ধকলে অবসন্ন। হয়ে আছে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার একটা শিকড়ে বেঁধে পড়ে গেলো ও। আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে যেতেই আর একটা ঘুষিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।

দানেশ ক্রিস্টোফারের কোমরের দড়ি দিয়ে বানানো বেল্টটা খুলে নিয়ে সিন্দুকের হাতলে ভরে একটা কাজ চালানোর মতো ফাস বানিয়ে ফেললো। আর বেল্টটা খুলে নেওয়ায় ও ক্রিস্টোফারের ছুরি আর ক্রফোর্ডের টাকার থলে দুটোই পেয়ে গেলো। ওগুলোও ও নিয়ে নিলো সাথে।

ক্রিস্টোফারের ততোক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। থুথু দিয়ে মুখ থেকে খানিকটা রক্ত ফেলে, এক হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলো ও। কিন্তু দানেশের মারমুখি ভঙ্গি দেখে আর বেশি ওঠার সাহস করলো না।

“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার বন্ধ,” করুণ কণ্ঠে বললো ক্রিস্টোফার।

দানেশ এমনভাবে তাকালো যেনো ক্রিস্টোফার বাচ্চাদের মতো কোনো কথা বলেছে, “এতো বেকুব তুমি। স্বর্ণের কাছে কোনো বন্ধু নেই।”

দানেশ সিন্দুকটা কাঁধে তুলে নিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলো। ক্রিস্টোফার পিছু নেওয়ার চেষ্টা করলো না। ওখানেই শুয়ে শুয়ে দানেশের হাতের আলোটা ফিকে হয়ে যেতে দেখলো। তারপরেও না উঠে অন্ধকারেই শুয়ে রইলো ও।

*

“আপনি কি আমাকে মারতে চান?”

ক্রিস্টোফার চোখ খুললো। রাস্তার অপর পাশে একটা অপরিচিত লোককে দেখতে পেলো ও। লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে আছে ওর দিকে। লোকটার শরীর একহারা কিন্তু শক্তপোক্ত, মুখের দাড়ির রঙ ধূসর হয়ে এসেছে।

“আপনি কি আমাকে মারতে চান?” আবার বললো লোকটা। পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলছে সে, যদিও চেহারা আর পোশাকআশাক দুটোই ভারতীয়।

ক্রিস্টোফার হাত দিয়ে ওর কপাল ডললো। চোয়াল ফুলে আছে, সামান্য নাড়াচাড়াতেই সারা শরীরে ব্যথা করে উঠলো একযোগে।

“আমাকে দেখে সেরকম মনে হচ্ছে?” গরগর করে বললো ও।

“এই এলাকায় ডাকাতের অভাব নেই। কেউ কেউ এভাবে ভান করে শুয়ে থাকে, যেনো কেউ তাকে ছিনতাই করেছে। যখন নিরীহ কেউ তাকে সাহায্য করার জন্যে থামে তখন তাকে আক্রমণ করে।”

“আমি উঠেও বসতে পারছি না।”

লোকটা তবুও নড়লো না। “কোত্থেকে এসেছেন আপনি?”

“আমার জাহাজে আগুন লেগেছিলো। আমি সাঁতরে ডাঙায় উঠেছি।”

লোকটা চিন্তিত মুখে মাথা ঝাঁকালো। তারপর ক্রিস্টোফারের গায়ের শুকিয়ে আসা রক্ত আর চেহারার নীলচে দাগগুলো দেখলো কিছুক্ষণ।

“আমি আপনাকে ত্রিভান্ড্রামে আপনার জাহাজের বাকি লোকগুলোর কাছে নিয়ে যেতে পারি। ওরা নিশ্চয়ই আপনার জন্যে দুশ্চিন্তা করছে।”

ক্রিস্টোফার মাথা নেড়ে, ওর বাম দিকে, মানে ত্ৰিভাল্লামের উল্টোদিকে ইঙ্গিত করলো। “আমি যাচ্ছি ওইদিকে।”

“আহ, লোকটার ঠোঁটে একটা শুকনো হাসি দেখা গেলো। আমিও।”

“আমাকে আপনার সাথে নেবেন?”

লোকটা উত্তর না দিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। সেকেন্ড তিনেক ভেবেই, এতো দ্রুত ক্রিস্টোফারের দিকে ধেয়ে এলো যে, ও ঠাহরও করতে পেলো না কখন লোকটা এসে ওর মাথায় তার লাঠিটা তাক করে ধরেছে। এতোদর আসতে বড়জোর মাত্র দুইবার পা ফেলতে হয়েছে তাকে। ক্রিস্টোফার প্রতিরক্ষার্থে হাত তুলে ধরলো, যদিও তাতে খুব বেশি লাভ হতো না। লাঠিটার ডগা ওর চোখ থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে এসে থামলো। বৃদ্ধ লোকটা ঠিক ওর উপরেই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নাগালের বাইরে। এতে দ্রুত এতো কিছু করার পরেও তার শ্বাসের গতি সামান্যও বাড়েনি।

“যদি আপনার কথা মিথ্যে হয়-যদি আমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেন-তাহলে আপনাকে খুন করবো আমি,” সাবধান করলো লোকটা।

ক্রিস্টোফার তার দিকে তাকিয়ে রইলো, “কে আপনি?”

“এমন একজন যে নিজেকে রক্ষা করতে জানে।” বলে লোকটা লাঠির ডগা দিয়ে ক্রিস্টোফারের মুখের কালশিটে দাগটা স্পর্শ করলো। “কিন্তু আপনাকে দেখে সেরকম কেউ মনে হচ্ছে না।”

ক্রিস্টোফার কোমরে হাত দিলো, “আমার সাথে এমনকি একটা ছুরি-ও নেই।”

“মানুষকে মেরে ফেলার অনেক রাস্তা আছে, সেগুলো খুব শক্ত-ও না। এদেশে এমন ডাকাতও আছে যারা পরনের ধুতি পেচিয়েও মানুষ মারতে পারে।”

লোকটার কণ্ঠের নিশ্চয়তা শুনে ক্রিস্টোফারের আচমকা মনে হলো যে সে একেবারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো বলছে।

“আপনি কি ডাকাত?”

“এখন কি আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছেন?” সহাস্যে বললো লোকটা। তারপর লাঠির মাথাটা এমন ভাবে ধরলো যাতে ক্রিস্টোফার ওটা ধরে নিজেকে টেনে তুলতে পারে।

“নাম কি আপনার?” জিজ্ঞেস করলো লোকটা।

ক্রিস্টোফার নিজের আসল নাম বলতে গিয়েও থেমে গেলো। কারণ ক্রিস্টোফার কোর্টনী একটা জাহাজ ডাকাতি করেছে, একজন লোককে খুন করেছে। ক্রিস্টোফার কোর্টনী একজন ফেরারি। আর সবচে বাজে ব্যাপার হচ্ছে ক্রিস্টোফার কোর্টনী, গাই কোর্টনীর ছেলে।

বোম্বেতে থাকাতে রবিবার সকালে গির্জায় যাওয়ার কথা মনে পড়লো ওর। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে, মাছির অত্যাচার সয়ে ওকে বসে বসে পাদ্রির বকবক শুনতে হতো। সেখানে শোনা বাইবেলের গল্পগুলোর মধ্যে একটা মনে পড়লো ওর। রাজা ডেভিডের ছেলের গল্প-যে কিনা তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেয়।

“আমার নাম আবসালম,” ক্রিস্টোফার বললো।

বৃদ্ধ লোকটা সরু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো, যেনো ওর ভিতরের মিথ্যে আর অপরাধগুলো সব দেখে নিতে পারছে।

গাধা, ক্রিস্টোফার নিজেকে বুঝালো। এগুলো শুধু আমার চোখ; দেহের একটা অংশ, ঠিক আমার পা বা কনুই এর মতোই।

“আমি রঞ্জন।” সামনের দিকে তাকিয়ে বললো লোকটা। “আমি আপনাকে পাশের গ্রামে নিয়ে যাবো।” কথাটা শুনে ক্রিস্টোফারের মনে হলো কাঁধ থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেলো যেনো।

দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। সূর্য উঠে গিয়েছে ততোক্ষণে। রাস্তায় লোকের চলাচলও বেড়েছে। রাস্তার দুই ধারে পাম গাছগুলোয় রসের হাঁড়ি ঝুলানো, দেখে মনে হচ্ছে বিশাল কোনো মাকড়সা যেন শুড় দিয়ে রস চুষে খাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটা একটা শব্দও বললো না। কিন্তু ক্রিস্টোফার বকবক করেই চললো। বারবার ও ক্রফোর্ডের অত্যাচারের বর্ণনা দিতে লাগলো। কিভাবে ও ক্রফোর্ডের পেট ফেড়ে দিয়েছে সেটা বলতে গিয়ে কণ্ঠে গর্ব ফুটে উঠলে ওর। ইচ্ছা করছিলো আবার জাহাজে ফিরে গিয়ে আবার যদি কাজটা করতে পারতো তাহলে আরো ভালো লাগতো।

গ্রামটা একদমই নিরিবিলি। পাম গাছের পাতায় ছাওয়া মাটির ঘর দেখা গেলো কয়েকটা। তার ফাঁক দিয়ে চিমসানো কয়েকটা গবাদি পশু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তীরে জেলেরা নিজেদের জাল গোটাচ্ছে, ওটা দিয়ে ধরা মাছগুলো পড়ে আছে বালির উপর।

“তা কি করবেন এখানে?” রঞ্জন জানতে চাইলেন।

ক্রিস্টোফার মাথা নাড়লো। এসব ভেবে দেখেনি। চাইলে জেলে হতে পারে, তবে এখানকার সবচে বড় নৌকাটাও সম্ভবত জোসেফ-এর ডিঙ্গি নৌকার সমান হবে। কিন্তু আবারও সমুদ্রে যাওয়ার চিন্তাটা ওকে আতংকিত করে তুললো।

“আপনার কাছে খাবার আছে? টাকা? পরিচিত কেউ আছে?” রঞ্জন-ই জিজ্ঞেস করলেন আবার।

“নাহ,” জবাব দিলো ক্রিস্টোফার।

“তাহলে বরং আমার সাথে চলেন।”

ওরা চলতেই থাকলো, মাইলের পর মাইল। আরো অনেকগুলো জেলে গ্রাম, প্যাগোডা আর লম্বা, বালুকাময় সৈকত পেরিয়ে সুর্যাস্তের আগে আগে ওদের গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালো। মোটামুটি বড় একটা শহর এটা। সাগরের তীর থেকে একটু ভিতরে যদিও, তবে আসার পথের গ্রামগুলোর তুলনায় অনেক বড়। বড় বড় বাজার, মন্দির সবই আছে এখানে।

রঞ্জন ক্রিস্টোফারকে শহরের শেষ মাথার একটা বিশাল বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দেখে ক্রিস্টোফার ভেবেছিলো এটা একটা মন্দির। রঞ্জন লোকটার হাবভাব এতে সাধু সাধু যে ওনার পক্ষে একজন সন্নাসী হওয়া অবাক হওয়ার মতো কিছু না।

শুধু ধুতি পরা এক বাচ্চা ছেলে দরজা খুলে দিলো। ক্রিস্টোফার ভিতরে ঢুকতেই ছেলেটা ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। ভিতরে দেখা গেলো একদল অর্ধনগ্ন ছেলে মারামারি করছে। কয়েকজন এক কোনায় কাঠ দিয়ে বানানো লম্বা একটা লাঠি দিয়ে নানান কসরত করছে, অনেকটা বৃদ্ধের হাতের লাঠির মতোই। আর এক জায়গায় চাঁদের মতো বাকা তরবারি দিয়ে যুদ্ধ চলছে। একটু পর পর ঝনঝন আওয়াজ আসছে সেদিক থেকে। কয়েকজনকে দেখা গেলো খালি হাতে মারামারি করতে। এমন মোহনীয় ভঙ্গিতে ওরা নাড়াচাড়া করছে যে বোঝাই যাচ্ছে ওদের লাথি বা ঘুষি সবই সহজাত ভাবেই হচ্ছে, জোর করে কিছু করা লাগছে না।

“এ কোন জায়গা?” অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো ক্রিস্টোফার।

“এটা হচ্ছে কালারি-যোদ্ধাদের স্কুল বলতে পারেন। আমরা এখানে কালারিপায়াত্ত শেখাই। এটা হচ্ছে যুযুৎসু-র অতি প্রাচীন একটা রূপ। কারো কারো মতে সবচেয়ে প্রাচীন।”

“আপনি এসব পারেন?”

“আমি হচ্ছি আসান, মানে এদের গুরু।”

ভাবনার চেয়েও দ্রুত এদের নাড়াচাড়া, হাতাহতি, ঘাম আর রক্তের গন্ধ সব ক্রিস্টোফারকে অবাক করে দিলো। ও সারাজীবনে যতো মার খেয়েছে সেসব মনে পড়লো ওর। ওর বাবার হাতে, ক্রফোর্ডের হাতে, এমনকি দানেশের হাতে। ও মুখ বুজে সব সহ্য করেছে কারণ ওর নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য ছিলো না।

এখানকার সব লোকই নিজেকে রক্ষা করতে জানে।

“আমাকে শেখাবেন?”

“এখানকার সবাই সেই বাচ্চাকাল থেকে এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে,” রঞ্জন সাবধান করলেন ওকে।

“আমি শিখতে পারবো।”

রঞ্জন ওর চোখের দিকে তাকালেন। আবারও ক্রিস্টোফারের মনে হলো। ঊনি এমন সব জিনিস দেখে নিচ্ছেন যা কিনা ক্রিস্টোফার নিজেও জানে না।

“হ্যাঁ,” উনি বুঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। “আমার মনে হয় আপনি পারবেন।”

*

জাহাজের জীবনটা কষ্টের ছিলো সন্দেহ নেই, তবে কালারি-র জীবন আরো কঠিন। জাহাজে মার খাওয়ার ঘটনা ঘটতো হঠাৎ-সটাৎ, আর এখানে মারামারিটাই দিনের একমাত্র কাজ। ক্রিস্টোফার গায়ের কালশিটে দাগগুলো গোনা বন্ধ করে দিলো একসময়। কতোবার বুকের পাঁজরের হাড় ভাঙলো বা মার খেয়ে চোখ ফুলে ঢোল হলো সেই হিসাবও থাকলো না। ভাঙা পাঁজরের কারণে নিঃশ্বাস নিতে পারতো না মাঝে মাঝে। কিন্তু সেসব নিয়ে কখনো ঘ্যান ঘ্যান তো দূরে থাক একদিনের জন্যেও প্রশিক্ষণও বাদ দেয়নি ও।

দ্রুতই ওর শরীরে আমূল পরিবর্তন চলে এলো। জাহাজে থাকতেই যেসব পেশি গঠন শুরু হয়েছিলও সেগুলো আরো বেশি শক্তপোক্ত হলো, একেবারে পাথরের মতো। আরো বেশি সরু হলো কোমর। একেবারে সোজা হয়ে হাঁটতে শিখলো, আগের চাইতে লম্বা লাগতে লাগলো তাই। মোটকথা বোম্বে থেকে পালিয়ে আসা সেই নাদুসনুদুস ছেলেটা বা কথায় কথায় মার খাওয়া ভীতু নাবিকটা আর রইলো না ও। ওর সতীর্থ সবাই স্থানীয় ভারতীয়। তাই বাকি সবার চাইতেই ও লম্বা। অনেকেই এজন্যে আসানের কাছে অভিযোগ করলো যে ক্রিস্টোফার এতে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রঞ্জন ওদেরকে এই বলে বিদায় করলো যে, “ভগবানই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিক করে দেন।”

ক্রিস্টোফার খুব দ্রুত শিখে নিতে লাগলো সব। অষ্ট ধাপ আর অষ্ট ভঙ্গি শিখলো। একশো আটটা মামরা শিখলো; মামরা মানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে আছে বৈকালকারা অংশ, যেগুলো মানুষকে অসাড় করে দিতে পারে, আছে বিন্দু অংশ, যেখানে একটা মাত্র আঘাতই মেরে ফেলতে পারে যে কাউকে। চিৎকার করে মন্ত্র পড়ে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বের করে আনা শিখলো। কারো চেহারা আর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেই তার পরবর্তী আক্রমণটা কোনদিক থেকে আসবে সেটা শিখলো। লাঠি আর তরবারি দুটো দিয়েই যুদ্ধ করা শিখে ফেললো। বাকা চাঁদের মতো দেখতে থোট্টি চালনাও শিখে নিলো একসময়।

এছাড়াও, প্রতিটা দিন শেষে কিভাবে নিজেকে সুস্থ্য করে তুলতে হয় সেটাও শিখলো। কিভাবে সারা শরীরে তেল মর্দন করতে হয়, কোন কোন জায়গায় কিভাবে মালিশ করলে সবচেয়ে দ্রুত ব্যথা সেরে যায়, সেগুলোও জেনে নিলো। ফলে পরের দিন আবার যুদ্ধে নামতে আর সমস্যা হতো না ওর।

বাড়িটার উঠোনের মাঝখানে দড়ি দিয়ে ঘেরা একটা মঞ্চ বানানো আছে। সপ্তাহে একদিন সব ছাত্ররা ওটার চারপাশে জড়ো হয় আর সেরা ছাত্ররা মঞ্চের উপর উঠে লড়াই করে। ওদের নাড়াচাড়া এতে মসৃণ আর দ্রুত যে শুরুতে ক্রিস্টোফার মাঝে মাঝে বুঝতো-ও না যে কোনদিক কোনদিক দিয়ে আঘাতটা হচ্ছে। তবে পরে যখন ও নিজেও ওগুলো শিখলো তখন একটু একটু ধরতে পারতো। এরপর থেকে যখন ও লড়াইগুলো দেখতো তখন ওর নিজের শরীরও আপনাআপনি সেগুলোর তালে বেকে যেতো, মনে মনে ও নিজেকে মঞ্চের উপরে কল্পনা করতো, আর লড়াই শেষে আরো মরিয়া হয়ে সেই কসরতগুলো অনুশীলন করতো।

অন্য ছাত্ররা ক্রিস্টোফারকে পাত্তা দিতে না বেশি। কিন্তু রঞ্জন ওকে সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। একদিন উনি ক্রিস্টোফারকে একজন কাঠ মিস্ত্রীর কাছে নিয়ে গেলেন। জায়গাটা তেল আর বার্নিশের গন্ধে ভরা। অনেকগুলো অর্ধেক বানানো গণেশের মূর্তি রাখা তাকের উপর।

ক্রিস্টোফার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলো। মনে মনে অপেক্ষা করছে কখন আসান ওকে এখানে নিয়ে আসার কারণটা বলবেন। মিস্ত্রী তার হাতের বাটালি দিয়ে কাঠের গায়ে আঘাত করছে, প্রতি আঘাতে একটু একটু করে কাঠের চলটা উঠে আসছে।

ওর দিকে না তাকিয়েই মিস্ত্রীটা কিছু একটা বললো। কিন্তু ভাষাটা এখানকার স্থানীয় হওয়ায় ক্রিস্টোফার বিন্দু বিসর্গ-ও বুঝলো না।

“কি বললেন উনি?”

“বললো যে এই মূর্তিটা আগে থেকেই কাঠের ভিতরে আছে। ওর কাজ হচ্ছে শুধু বাইরের অতিরিক্ত অংশটা বাদ দিয়ে ভিতরে যা আছে বের করে আনা। বাটালির প্রতিটা আঘাতে আসলে জিনিসটা আরো বেশি নিজেতে পরিণত হচ্ছে।” বলে রঞ্জন ক্রিস্টোফারের দিকে তাকালেন। “তোমার কি মনে হয় কাঠের অনুভূতি আছে?”

“না।“

“হিন্দু পুরানি অনুযায়ী প্রতিটা জীবিত জিনিসের চেতনা আছে। এমনকি গাছেরাও অনেক কিছু অনুভব করতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে কি তোমার মনে হয় যে কাঠ এই নিজের শরীরে খোদাই করাটা উপভোগ করে?”

মিস্ত্রী আবার হাতুড়ি চালালো, বাটালির ধারালো মাথা কামড় বসালো কাঠের গায়ে।

“প্রচণ্ড ব্যথা পাওয়ার কথা।”

“প্রতিটা আঘাত কিন্তু ও যে জিনিস সেটাতেই পরিণত করছে ওকে। রাস্ত টিা অনেক কঠিন, আবসালম-কিন্তু গন্তব্য…” বলে উনি একটা গণেশের মূর্তির গায়ে চাপড় মারলেন। মূর্তির মাথাটা হাতীর। এতোটাই নিখুঁত যে ক্রিস্টোফারের মনে হলো যে কোনো মুহূর্তে ওটা শুড় নেড়ে উঠে দাঁড়াবে।

“গন্তব্যই আমাদের আসল পরিচয়টা বের করে আনে।”

*

যখন অনুশীলন করে না, তখন ক্রিস্টোফার কাজ করে নিজের থাকা খাওয়ার ব্যয় মেটায়। শুরুর দিকে গাছ কেটে লাকড়ি সংগ্রহ করতে বা সবজির বাগানে কাজ করতো। যখন এক জিনিস খেতে খেতে সবাই বিরক্ত হয়ে যেতো তখন রঞ্জন ওকে বাজারে পণ্য বিনিময় করতে পাঠাতেন। লড়াই করার সময়টা বাদে এই সময়টা ক্রিস্টোফারের খুব ভালো লাগতো। বহু কষ্টে ও স্থানীয় ভাষা আয়ত্ত করেছে। তবে বেশ তাড়াতাড়িই পেরেছে শিখতে। বার বার আসা যাওয়া করতে করতে সওদাগরেরো চিনে ফেললো ওকে। তবে ক্রিস্টোফার দোকানে আসলে মোটেও খুশি হতো না তারা। কারণ ও দামাদামিতে খুবই পটু, একেবারে একটা পয়সা পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি হয় না।

একদিন বাজারের ভিতর এক ভারতীয় ওর সাথে কথা বলতে এগিয়ে এলো। হাত ভরা সোনার আংটি তার সাথের চাকরেরা বাতাস করে পাশের মাছি তাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্রিস্টোফার লোকটাকে এড়িয়ে সরে যেতে চাইলো, কিন্তু লোকটার চেহারায় চোখ পড়তেই থমকে গেলো ও। একজন চাকর এগিয়ে এলো ওর দিকে। লোকটার পরনে চটকদার পোশাক, মাথার পাগড়িতে একটা পান্না বসানো পিন লাগানো। গায়ের কাপড়ে সোনার সুতোর কাজ করা-এক ধনী লোকের দেওয়ানের যেমনটা হওয়া উচিত, ঠিক তেমন। লোকটার পুরু ঠোঁট, পানের লাল রসে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে আছে।

“ইনি হচ্ছেন আমার মালিক পরশুরাম,” ঘোষণা দিলো দেওয়ান লোকটা। ক্রিস্টোফারের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছে সে, উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা এমনটাই করে। পরদেশীদের স্পর্শে নাকি ওদের জাত যায়। “উনি এই শহরের সবচেয়ে ধনী সওদাগর।”

পরশুরাম ক্রিস্টোফারের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “তোমার কথা শুনেছি আমি। তুমি নাকি কালারির এক ভীষণ যোদ্ধা!”

ক্রিস্টোফার মাথা নোয়ালো।

“সবাই বলে তুমি নাকি দামাদামিতে সওদাগরদের একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়ো?”

“আমার বাবা শিখিয়েছেন যে, দামাদামিতে শেষ বলে কিছু নেই।”

“সেটাই-তবে সবাই কিন্তু সেটা পারেনা। তোমার মতো একজন হলে আমার খুব সুবিধা হয়।”

“আমাদের মালিকের কিছু জিনিস নিয়ুর শহরে নিতে হবে,” দেওয়ান। বললো আবার। “রাস্তাঘাট ভালো না আর ওটা যখন এসে পৌঁছাবে তখন সবচেয়ে সেরা দামেই বিক্রি করতে ইচ্ছুক উনি। সেজন্যে তুমিই সবচে উপযুক্ত লোক।”

“জিনিসটা কি?”

“লবণ।”

“বিনিময়ে, পরাম বললেন। “লাভের পাঁচ ভাগ দেবো আমি তোমাকে।”

“বিশ ভাগ, ক্রিস্টোফার বললো।

ক্রিস্টোফারের দাবি শুনে দেওয়ান হতভম্ব হয়ে গেলো, তবে পরশুরাম হেসে দিলেন। “আসলেই তোমার গুণ আছে। ঠিক আছে দশ ভাগে রাজি হয়ে যাও।” কিন্তু ক্রিস্টোফারের চেহারায় না বোধক অভিব্যক্তি দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি যোগ করলেন, “যদি এবার সব ভালোয় ভালোয় করতে পারো, তাহলে সামনে আরো কাজ দেবো তোমাকে। আমি অনেক জিনিসের ব্যবসা করি। লবণের চাইতেও আরো অনেক বেশি দামি জিনিসের ব্যবসা আমার আছে।”

“আমাকে আমার মালিকের অনুমতি নিতে হবে,” বলে ক্রিস্টোফার বিদায় নিলো।

রঞ্জনকে বলতেই উনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

“আমি তোমার মালিক নই, বা তুমিও আমার গোলাম নও। তুমি যতোক্ষণ আমার সাথে থাকবে আমি ততোক্ষণ তোমাকে শিক্ষা দেবো। তুমি যদি অন্য কিছু পছন্দ করো তো যেতে পারো।”

“আমি কি প্রস্তুত?”

রঞ্জন নিজের হাতের তালুর দিকে তাকালেন, “লড়াইয়ের প্রথম নীতিটা কি?”

“কখনো ইচ্ছা করে লড়াই করবে না, তখনই যুদ্ধ করবে যখন সেটা এড়ানো সম্ভব না হয়।”

“এটা মনে রাখলে তোমার খুব বেশি ঝামেলা হবে না।”

যাত্রায় কোনো ঝামেলা হলো না। সেজন্যে নিয়ুরের যে বাড়িতে যাওয়ার কথা সেখানে পৌঁছে ক্রিস্টোফার হতাশ-ই হলো বলা চলে। ও চরম মাত্রায় দর কষাকষি শুরু করলো, এক পর্যায়ে ও চাকরদের আদেশ দিলো খচ্চরগুলোয় মালপত্র তুলে ফিরে যাওয়ার জন্যে। সদর দরজা দিয়ে অর্ধেকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর ওকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো।

পরের দিন বাড়ি ফিরে ও পরশুরামের বাড়িতে উপস্থিত হলো। সব কামাই বুঝিয়ে দিলো তাকে।

“কতো পেয়েছো লবণ থেকে?”

“বিশ রুপি” ক্রিস্টোফার জবাব দিলো।

দেওয়ান সন্দেহজনক ভঙ্গিতে মুদ্রাগুলো গুনলো। প্রতিটা পয়সা কামড়ে দেখে নিলো যে ঠিক আছে কিনা। তারপর ছোট্ট একটা নিক্তিতে মেপে দেখলো।

“ঠিক আছে,” কেমন বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো লোকটা।

পরশুরাম ক্রিস্টোফারের দিকে চেয়ে হাসলো। “আমার দেওয়ান, জয়ন্তন তোমাকে বিশ্বাস করে না। সেজন্যে লবণের প্রথম বস্তাটার ভিতর নিয়ুরের সওদাগরের কাছে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম আমি। তাতে লিখে দিয়েছিলাম যে, লবণ কতো দামে বিক্রি হলো সেটা জানিয়ে যেনো তার সবচেয়ে দ্রুতগামী লোকটাকে পাঠিয়ে দেয়।”

ক্রিস্টোফারের চেহারা লাল হয়ে গেলো। “আপনি আমাকে টাকা পয়সার ব্যাপারে বিশ্বাস করেন না?”

“এখন করি।” বলে উনি দুটো পয়সা নিয়ে ক্রিস্টোফারকে দিলেন। “আপাতত এটা তোমার ভাগ। তবে শিগগিরিই আবার খবর পাঠাবো। আমি যাদেরকে বিশ্বাস করি তাদের জন্যে কাজের অভাব হয় না।”

পরের কয়েক মাস ক্রিস্টোফার দারুণ কাজ দেখালো। ভিন্ন ভিন্ন শহর, ভিন্ন ভিন্ন মালামাল। কখনো ক্রিস্টোফার একা গেলো, কখনো সাথে থাকলো কেউ। কয়েকবার অবশ্য মাস্তানের খপ্পরে পড়েছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফারের তরবারি দেখেই ভেগেছে সব। প্রতিবারই ক্রিস্টোফার তাই হতাশ-ই হয়েছে। ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় ফুটছে ও, একেবার ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে আছে বলা যায়। উত্তেজনা কমাতে মঞ্চের লড়াইতে এতো ভয়ংকরভাবে লড়াই করতে যে একদিন একজনকে প্রায় অন্ধ-ই করে ফেলেছিলো।

“তোমাকে দুই নম্বরে কোন নীতিটা শিখিয়েছি?” রঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন।

“ছানিগা,” গোমড়া মুখে বললো ক্রিস্টোফার।

“আর ছানিগা কি জিনিস?”

“ধৈর্য।”

*

একদিন পরশুরামের দেওয়ান জয়ন্তন কালারি-তে এসে উপস্থিত। “মালিক তোমাকে খবর দিয়েছেন।”

পরশুরামের বাড়িতে পৌঁছালে উনি ক্রিস্টোফারকে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। ওটার কাঠের জালির ঢাকনার ভিতর দিয়ে নরম আলোয় অনেকগুলো চুনি ঝিকমিকিয়ে উঠলো।

“মাদুরা-তে এক তামিল সওদাগরের কাছে নিয়ে যেতে হবে এগুলো। শহরটা পাহাড়ের ওপাশে। যেতেও সময় লাগবে অনেক। আর পাহাড়ের রাস্তাটা ডাকাত দিয়ে ভরা।”

ক্রিস্টোফারের কানে কথাগুলো গেলো বলে মনে হলো না। ও একদৃষ্টিতে চুনিগুলো দেখছে। বেশ্যাখানার দরজায় দাঁড়ানো এক বেশ্যার মতোই ওগুলো যেনো ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে। একটা শয়তানি চিন্তার উদয় হলো ওর মনেঃ চাইলে এই দুজনকে খুন করে এগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। তাহলেই ওর রুথকে বিয়ে করার মতো যথেষ্ট রুপি হয়ে যাবে। ক্রিস্টোফারের সারা শরীরে শিহরণ বইতে লাগলো। নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে ওর।

তিন নম্বর নীতিটা কি? রঞ্জনের কণ্ঠ ভেসে এলো ওর কানে।

আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, নিজের ভিতরের সত্ত্বা জবাব দিলো।

ও জোর করে নিজের চিন্তা আড়াল করলো।

“জয়ন্তন তোমার সাথে যাবে,” পরশুরাম বললেন। মৃত্যুর কতো কাছে থেকে মাত্র ফিরে এসেছেন সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। শুধু তোমরা দুজন। আমি এক গাড়ি ভর্তি লোক পাঠাতে পারতাম-কিন্তু তাতে করে সবাই ই ব্যাপারটা খেয়াল করবে। আর সেই গন্ধে এখান থেক দিল্লি পর্যন্ত সব শয়তানের দলে এসে হাজির হবে। তাই বিশ জনের পক্ষে সম্ভব না হলেও দুই জনে আশা করা যায় যে ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে।”

ক্রিস্টোফার মাথা ঝোঁকালো, “আমি আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো।”

পরের দিনই বের হয়ে গেলো ওরা। সমুদ্র পিছনে রেখে আরো ভিতরের দিকে গন্তব্য ওদের। রাস্তাটা একটা উপবনের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে। বৃষ্টির কারণে কাদা জমে আছে এখানে সেখানে। গাড়ি-ঘোড়া নেই বললেই চলে। রাস্তার দু’ধারে তেঁতুল গাছের সারি। সেখান থেকে ভেসে আসছে নানা পাখির ডাক। তবে সেটা চাপা পড়ে যাচ্ছে তাঁত যন্ত্রের খটখট শব্দে। রাস্তার ধারে বসে তাঁতিরা কাপড় বুনছে।

ক্রিস্টোফার ওর জীবনের প্রায় পুরোটাই ভারতে কাটিয়েছে, কিন্তু এই প্রথম ও সমুদ্র থেকে এতো ভিতরে আসলো। এমনকি পরশুরামের হয়ে কাজ করতে যেসব জায়গায় গিয়েছে সেগুলোও ছিলো সব সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা। বেলা বাড়তেই জনমানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে এলো। একটু পরেই তাঁতের খট খট শব্দ মিলিয়ে গিয়ে, অজানা সব পাখির ডাক ভেসে আসতে লাগলো কানে।

প্রথম রাত ওরা রাস্তার ধারের একটা মন্দিরে কাটালো। পরের দিনে দেখা গেলো রাস্তা সোজা ঘাট বরাবর উঠে গিয়েছে। ঘাট হচ্ছে বিশাল এক পর্বতের সারি। ভারতের পশ্চিম উপকূলে ওগুলো ঠিক এক সারি দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আশেপাশের জঙ্গলও ঘন হচ্ছে ধীরে ধীরে। ওরা বিশাল বিশাল কাঠের গাছ আর বাঁশ দিয়ে ভরা এক বনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললো। আগে কখনো এখানে মানুষের পা পড়েছে কিনা কেউ জানে না। প্রকাণ্ড সব লতা গুলা আর অর্কিড-ও দেখা গেলো। প্রচুর আগাছা মাটিতে, তুলা গাছের লাল রঙের ফুল পড়ে আছে সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে, দেখে মনে হচ্ছে রক্তের ফোঁটা।

ওরা অবশ্য রাস্তায় একা ছিলো না। কয়েকজন কুলিও ছিলো সাথে। বিশাল ভারি বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে মাথায়। ওগুলোতে আছে নারিকেলের ছোবড়ার পার্টি, ফলের ঝুড়ি। প্রতিবারই ওরা কাছাকাছি আসতেই জয়ন্তন ক্রিস্টোফারের হাত চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, “খুব সাবধান।”

তবে ওরা জয়ন্তনের উচ্চ জাত চিনতে পারার সাথে সাথে সাথে মাটিতে উপুড় হয়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখলো। যতোক্ষণ না ক্রিস্টোফার আর জয়ন্তন চোখের আড়ালে গেলো ততোক্ষণ ওরা ওভাবেই রইলো।

“অন্তত এই মেয়েটা নিশ্চয়ই ডাকাত না,” ক্রিস্টোফার তরুণী বয়সী এক মেয়েকে দেখিয়ে বললো। মেয়েটার সাথে একটা গাধা। আম ভর্তি বস্তা গাধাটার পিঠে। মেয়েটার পরনে একটা সুন্দর শাড়ি। হাতে আর বাহুতে তামার বালা।

যেনো ক্রিস্টোফারের কথা শুনতে পেয়েই মেয়েটা ওর দিকে ফিরে তাকালো। অন্যদের মতো ও মাথা ঝোকালো না বা ওদের উচ্চ জাত টের পেয়ে সরেও গেলো না। বরং ও-ও বড় বড় চোখ করে ক্রিস্টোফারের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, অনেকটা লাজুক একটা হাসি। সেই হাসিতে যেনো ক্রিস্টোফারের সমস্ত কল্পনা লুকিয়ে আছে। ওর সারা শরীরে কামনা ছড়িয়ে পড়লো।

“বেহায়া মাগী, গাল দিয়ে উঠলো জয়ন্তন। “শালীকে বেয়াদবির জন্যে ধরে চাবকানো উচিত।”

কোনো তাড়াহুড়া ছাড়াই মেয়েটা তার গাধাকে রাস্তার মাথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো আর ওদেরকে চলে যেতে দিলো। ক্রিস্টোফার আর একবার তার চোখে চোখে তাকাতে চেষ্টা করলো কিন্তু মেয়েটা গাধার পিঠের বোঝার বাঁধন টেনেটুনে দেখছিলো, তাই আর চোখ তুলে তাকালো না।

জয়ন্তন আর ক্রিস্টোফার রাস্তার পাশের একটা ছোট মঠ পেরিয়ে এলো। একটা গণেশের মূর্তি দেখে গেলো সেখানে। গলেয় ফুলের মালার স্তূপ।

জয়ন্তন ক্রিস্টোফারের কোমরের তরবারিটার দিকে তাকালো। “জিনিসটা সময়মতো ব্যবহার করতে পারবে তো? এই মঠের এখানেই কিন্তু ডাকাতেরা একজনকে খুন করেছিলো।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা খনখনে চিৎকার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিলো। এক মুহূর্ত পড়েই ত্রাহি রব ছাড়তে ছাড়তে এক পাল খচ্চর রাস্তার উল্টোপাশ দিয়ে তীর বেগে ছুটে এলো। ক্রিস্টোফার তরবারি বের করে মাত্র যেদিক দিয়ে এসেছে সেদিকে দৌড় দিলো।

“আরে থামো থামো,” চিৎকার করে ডাকলো জয়ন্তন। “তোমার কাজ আমাকে বাঁচানো।”

ক্রিস্টোফার ওর কথায় কান না দিয়ে দৌড়াতেই থাকলো। পায়ের ধাক্কায় ধুলো উড়ছে চারপাশে। রাস্তার বাঁকে পৌঁছাতেই ও সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলো। মাটিতে চিত হয়ে শোয়া। কাপড় কোমর পর্যন্ত তোলা, কাচুলি ছিঁড়ে সদ্য প্রস্ফুটিত স্তন বেরিয়ে আছে। একটা দশাশই কালো চামড়ার লোক মেয়েটার দুই পায়ের ফাঁকে বসে তাকে মাটির সাথে চেপে ধরে রেখেছে।

কালারিতে শেখা রণহুংকার ছেড়ে ক্রিস্টোফার লোকটাকে আক্রমণ করলো। কিন্তু শয়তানটা কামনায় একবারে দিশা হারিয়ে ফেলেনি। সে ক্রিস্টোফারকে আসতে দেখেই লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর ক্রিস্টোফারের হাতের তরবারির দিকে এক নজর যেতেই জান হাতে নিয়ে দিলো দৌড়।

ক্রিস্টোফার যথেষ্ট জোরে দৌড়াতে পারে, কিন্তু লোকটা আরো বেশি দ্রুত। খানিকটা দৌড়ানোর পরে ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো সোজাসুজি দৌড়ে ও কখনো লোকটাকে ধরতে পারবে না। ও থেমে দাঁড়িয়ে তরবারিটা মাটিতে ফেলে দিলো। দুই হাত মুক্ত হওয়ার পর ক্রিস্টোফার ওর ধুতি গুটিয়ে নিলো।

কোমরে একটা উরুমি পেচিয়ে পরেছে ক্রিস্টোফার। সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না সেটা। উরুমি হচ্ছে দুই প্রান্তেই ধারালো, ফুট দশেক লম্বা একটা পাতলা ইস্পাতের পাত। চাবুকের কশ এর মতোই নমনীয়।

কালারিতে এটার ব্যবহারই সর্বশেষ শিখেছিলে ও। আর এটায় দক্ষতা অর্জন করাই ছিলো সবচেয়ে কঠিন। ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলে ব্যবহারকারীরই গলা কাটা পড়ার সম্ভাবনা আছে।

উরুমি-র হাতীর দাঁতের হাতলটা ওর হাতের মুঠোয় ঠিকঠাক বসে গেলো। কবজির মোচড়ে ও ফলাটা ছুড়ে দিলো সামনে। দেখে মনে হতে লাগলো জিনিসটা জ্যান্ত বুঝি। বাতাসে একেবেকে সোজা হল ওটা। ধর্ষক লোকটা ছিলো

উরুমি-র একেবারে ডগায়। ওটার বাকা ডগাটা লোকটার গোড়ালিতে সাপের মতো ছোবল দিয়ে ফাসের মতো আটকে ফেললো। তারপর পর্যায়ক্রমে ওটা গোড়ালির চামড়া, মাংস, রগ ভেদ করে শেষমেশ হাড়ও ভেঙ্গে দিলো। ব্যথায় প্রচণ্ড জোরে একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগলো লোকটা।

ক্রিস্টোফার লোকটার কাছে এগিয়ে গেলো। কোন তাড়াহুড়া নেই! আস্তে টান দিয়ে উরুমির ফলাটা গুটিয়ে নিলো ও। পথের ধুলোয় একটা গোখরার চলার পথের মতো দাগ করে ওর হাতের মুঠোয় কুণ্ডলী পাকিয়ে গেলো ওটা।

ক্রিস্টোফার লোকটার গায়ের উপর দাঁড়িয়ে তার দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো। “বন্ধু, তোমার সময় যে শেষ সেটা আশা করি বুঝতে পারছো? দুনিয়াকে বিদায় বলে দাও।” ও কথা বলছিলো ইংরেজিতে। ফলে লোকটা কিছুই বুঝলো না। তবে বলার ভঙ্গি আর ধরনেই যা বোঝার বুঝে নিলো। লোকটা গোঙাতে গোঙাতে প্রাণ ভিক্ষা চাইলো কিন্তু ক্রিস্টোফার হাসতে হাসতেই আবার ওর কবজি মোচড় দিলো। উরুমি-টা কুণ্ডলী খুলে ছুটে গিয়ে লোকটার গলায় স্পর্শ করলো এবার। দেখে মনে ওখানে আর একটা মুখের সৃষ্টি হয়েছে। ফুসফুসের সব বাতাস বেরিয়ে যেতে লাগলো সেদিক দিয়ে। এক মুহূর্ত পরেই ক্যারোটিড ধমনী দিয়ে সবেগে ছুটে বের হলো রক্ত, হৃৎপিণ্ডের ছন্দের তালে সেখানে রক্তের পরিমাণ কমতে বাড়তে লাগলো। ক্রিস্টোফারের পায়েও লাগলো রক্ত, তবে ও সরে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করলো না। আস্তে আস্তে রক্তের বেগ কমতে কমতে একসময় পুরোপুরি থেমে গেলো। তারপর ও উবু হয়ে লাশটার পরনের কাপড়ের ভিতর হাত চালালো। ধুতির নিচে চামড়ার একটা থলে বাধলো হাতে। বেল্টে বাঁধা। ও থলেটার বাঁধন খুলে ভিতরের সবকিছু অন্য হাতে ঢেলে দিলো। বেশিরভাগ মুদ্রাই ছিলো তামার, তবে যথেষ্ট রুপা-ও আছে দেখে মুখে হাসি ফুটলো ওর।

যে মেয়েটাকে ধর্ষকটা আক্রমণ করেছিলো সে ক্রিস্টোফারের দিকে এগিয়ে এসে ওর হাতের দিকে ঝুঁকে দেখলো যে ও কি পেয়েছে। তখনও মেয়েটা নিজের কাপড় চোপড় ঠিকঠাক করছে। ক্রিস্টোফার মেয়েটার দিকে তাকালো। এতো কাছ থেকে ওকে দুর্দান্ত সুন্দর লাগছে। চুল খুবই ঘন, বেণী করে বাধা। নিয়মিত তেল দিয়ে আচড়ানোর কারণে চকচক করছে। ওর ছেঁড়া ব্লাউজের ভিতর তখনও একটা স্তন বেরিয়ে আছে। মেয়েটাও ক্রিস্টোফারের দৃষ্টি খেয়াল করে ইচ্ছে করেই সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে সেটাকে ভিতরে ঠেলে দিলো।

“ধন্যবাদ সাহেব। ভগবান আপনার ভালো করুক। এই পশুটার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আপনার উপর।” মেয়েটার কণ্ঠ খুবই নরম আর মিষ্টি। বলতে বলতে সে ক্রিস্টোফারের কাঁধে হাত রেখে মৃদু চাপ দিলো। ক্রিস্টোফারের মনে হলো নিজেকে আর সামলাতে পারবে না।

কিন্তু মেয়েটাকে দেখে মনে হলো সে এসবের কিছুই টের পাচ্ছে না।

“আপনার সাথের লোকটা কই?” জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা।

“ও সুইট খ্রাইস্ট!” ক্রিস্টোফারের সম্বিত ফিরলো। জয়ন্তনের কথা ভুলেই গিয়েছিলো ও। বিদ্যুতবেগে দৌড়ে আবার রাস্তার বাকে ফিরে এলো। জয়ন্তন-ও এদিকেই আসছিলো। সামান্যের জন্যে দুজন মুখোমুখি বাড়ি খেলো না।

“কত বড় সাহস তুমি আমাকে রেখে চলে যাও?” প্রচণ্ড রেগে আছে ও। “মালিক খবটা জানতে পারলে-”

“ওই মেয়েটা একটা ডাকাতের হাতে পড়েছিলো,” ঠাণ্ডা গলায় বললো ক্রিস্টোফার। “আমার কি করা উচিত ছিলো?”

“যদি এটা একটা ফাঁদ হতো? যদি ডাকাতের সাঙাতের ওঁত পেতে থাকতো, আর তুমি ওদিকে ধাওয়া করা মাত্র আমাকে আক্রমণ করতে? একটা ছোট জাতের বেহায়া মাগীর জন্যে নিজের দায়িত্ব ভুলে যেও না।”

ক্রিস্টোফার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে সামলালো। মৃত লোকটার গরম রক্ত তখনও ওর পায়ে লেগে আছে, আর খুন করার নেশা তখনও ওর ভেতর জ্বলছে। ওর সাথে এভাবে কথা বলার জন্যে উরুমি দিয়ে চাইলেই ও জয়ন্তনের জিহ্বাটা কেটে দিতে পারতো।

তা না করে ও আবার আগের জায়গায় ফিরে গেলো। মেয়েটা পড়ে যাওয়া আমগুলো কুড়িয়ে আবার গাধার পিঠের বস্তায় তুলে রাখছে। ক্রিস্টোফারকে একটা সাধলো ও।

“নিন না,” বললো মেয়েটা। “এর বেশি কিছু দেওয়ার মতো নেই আমার।”

ক্রিস্টোফার মেয়েটাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিয়ে ছুরি দিয়ে আমটা কেটে খেতে শুরু করলো। দারুণ সুস্বাদু আম।

“খুব মিষ্টি,” ক্রিস্টোফার বললো। “ঠিক তোমার মতোই।”

মেয়েটা লজ্জা পেয়ে হেসে চোখ নামিয়ে নিলো। “আমার নাম তামান্না, মেয়েটা বললো।

“ক্রিস…” বলতে গিয়ে থেমে গেলো ক্রিস্টোফার। “আবসালম।” মেয়েটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একটু হলে আসল নামটাই বলে ফেলেছিলো। ও জয়ন্তনের দিকে তাকালো। কিন্তু দেওয়ানজী খেয়াল করেছে বলে মনে হলো না।

মেয়েটা সামনের ফাঁকা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলো। “আমার সাথে একটু যাবেন, আবসালম? আমার ভয় করছে।”

“না,” বললো জয়ন্তন।

“হ্যাঁ,” বললো ক্রিস্টোফার।

“না,” আবার বললো জয়ন্তন। ওর কণ্ঠে অধৈর্য। “তোমাকে টাকা দেওয়া হচ্ছে আমাকে পাহারা দেওয়ার জন্যে আর আমার কথা শোনার জন্যে।”

ক্রিস্টোফার দুই পা ফাঁক করে, বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ালো। “আপনি নিজে যেতে চান তো যেতে পারেন। তবে আমি এই ভদ্রমহিলার সাথেই যাবো।”

“যখন মালিকের কানে খবরটা যাবে…” রাগের চোটে জয়ন্তনের কথা জড়িয়ে গেলো। বুকের যেখানে চুনি ভরা থলেটা রাখা সেখানে ধরে দেখলো।

তামান্না ওদের মাঝে এসে দাঁড়ালো। আমার জন্যে আপনাদের মধ্য ঝামেলা করবেন না।”

“উনি আমার বন্ধু-ও না, আমার মালিকও না, ক্রিস্টোফার গাধার লাগামটা ধরে হাঁটা শুরু করে দিলো। “তাছাড়া যেখানে বলা হয়েছে সেখানেই যাচ্ছি আমি।”

“ওনার কি হবে?” রক্তে ভরা লাশটার দিকে ইঙ্গিত করে বললো মেয়েটা। এর মধ্যেই মাছি ভনভন করতে শুরু করেছে সেখানে।

ক্রিস্টোফার কাঁধ ঝাঁকালো “ওখানেই থাক। অন্যদের জন্যে হুশিয়ারি হয়ে থাকবে।”

*

বাকি দিনটা ওরা হেঁটেই কাটালো। জয়ন্তন চুপচাপ সামনে, ক্রিস্টোফার আর তামান্না পিছনে। জয়ন্তন তামান্নার দিকে তাকালোই না বলা চলে। কারণ ও হচ্ছে নীচু জাত, তাই ওর কাছে বস্তুতঃ মেয়েটার অস্তিত্ব নেই। এদিকে ক্রিস্টোফার তামান্নার উপর থেকে চোখ ফেরাতেই পারছে না। কারণ, যা দেখেছে সেটা কিছুতেই মন থেকে সরছে না। ছিন্ন ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা প্রস্ফুটিত স্তন আর ধর্ষক লোকটা যখন কোমর পর্যন্ত ওর শাড়ি তুলে ফেলেছিলো তখন ও দুইপায়ের সংযোগস্থলটাও দেখতে পেয়েছিলো।

রুথ এর কথা ভাবো, নিজেকে বললো ক্রিস্টোফার। যখন স্বামী স্ত্রী হিসেবে একসাথে থাকবে তখন ব্যাপারটা কতোটা মিষ্টি হবে সেটা চিন্তা করো।

কিন্তু তামান্নাকে পাশে রেখে রুথ এর কথা ভাবাটা বেশ শক্তই বটে। রুখের কথা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ওর। কিন্তু তামান্নার হাসি আর কথায় সেসব উড়ে গেলো সহসাই। মেয়েটা বয়সে ওর চাইতে খুব বেশি বড় না, কিন্তু একেবারে চপল আর ইচড়ে পাকা। সেই সাথে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আর উদার মনের অধিকারি। সম্ভবত এই শ্যামল প্রকৃতির কোলে বড় হয়েছে বলেই এমন স্বভাব। তামান্নার বাবা একজন কৃষক। সমুদ্রতীরের কাছে এক গ্রামে বাড়ি ওদের। ওর বাবা নাকি এক পথচারীর কাছে শুনেছেন যে হায়দ্রাবাদের নিজামের সাথে যুদ্ধ চলার কারণে পাহাড়ের ওপাশে খাবার ঘাটতি চলছে। তাই তামান্না ওখানে আম নিয়ে চলছে, ভালো দাম পাওয়ার আশায়।

“তুমি একাই বেরিয়ে পড়েছো?” ক্রিস্টোফার অবাক হলো।

“আমার ভাইদেরকে মাঠে কাজ করতে হবে।”

“তোমার স্বামী?”

বলতে বলতে আবার ক্রিস্টোফার মেয়েটার দিকে তাকালো। সেটা দেখে তামান্নার চেহারা লাল হয়ে গেলো। লাজুক একটা হাসি হাসলো ও।

“আমার বিয়ে হয়নি। আমার বাবার যৌতুক দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আর সত্যি কথা হচ্ছে মাঠের কাজে আমাকেও লাগে।”

ক্রিস্টোফার ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। “তোমার মতো সুন্দরিকে কেউ এখনো বিয়ে করেনি সেটা আমার বিশ্বাস হয় না।”

তামান্না দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। “আমাকেত বাবার আদেশ মানতেই হবে।”

সন্ধ্যা নাগাদ ওরা এক মন্দিরে এসে উপস্থিত হলো। আশেপাশে আর কিছুই নেই। পাহাড়ের চূড়া ওখান থেকে কাছেই। ছোট ঘরটার চারপাশে এক চিলতে দেয়াল। উঠোন জুড়ে আগাছা আর কাটা ঝোঁপ। পোড়া ছাই দেখে বোঝা গেলো এর আগেও অনেকেই এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

জয়ন্তন প্যাগোড়ার ভিতরে কম্বল পেতে নিলো। ক্রিস্টোফার দরজার কাছের ঝোঁপ জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানেই নিজের বিছানা পাতলো।

“আমি বাইরেই ঘুমাবো,” তামান্নাকে বললো ক্রিস্টোফার। “ভিতরে পোকামাকড়ের বাসা। গায়ের উপর হাঁটবে।”

কারো দৃষ্টি আকর্ষণের ভয়ে ওরা কোনো আগুন জ্বাললো না। ভাত আর ডাল দিয়ে রাতের খাবার সারলো সবাই। তারপর খেলো তামান্নার আম। ক্রিস্টোফার জোর করে দাম দিয়ে দিলো। “নইলে পাহাড় পার হতে হতে তোমার আর আম একটাও থাকবে না। শেষে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে।”

ঘুমাতে অনেক সময় লেগে গেলো ক্রিস্টোফারের। ঘাসের উপর শুয়ে ও রাতের নিস্তব্ধতা শুনতে লাগলো। দেয়ালের ওপাশে জঙ্গলে পশু পাখিরা উচ্চস্বরে চিৎকার করে চলেছে। এই পর্বতে বাঘ আছে নিশ্চিত, আর কি আছে তা ঈশ্বরই জানেন। জঙ্গলে হাজার হাজার জায়গা আছে যেখান থেকে ওদের দিকে নজর রাখা সম্ভব। কে জানে, কেউ হয়তো সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে।

কিছু একটা শব্দ করে উঠলো। জঙ্গলে না, দেয়ালের ভিতরেই। ও তরবারির দিকে হাত বাড়ালো। হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে, তবে সেটা ভয়ের জন্যে না। আবার লড়াইয়ের সম্ভাবনায় ওর শরীর জেগে উঠেছে।

“আবসালম?”

কোমর সমান উঁচু ঘাসের ভিতর দিয়ে এগিয়ে এলো তামান্না। কাটাঝোঁপ এড়াতে শাড়ি দুই হাতে উঁচিয়ে রেখেছে। এসে ক্রিস্টোফারের পাশে বসলো ও। এতো কাছে যে ওদের কাধ স্পর্শ করলো।

“আমার ঘুম আসছে না। চোখ বুজলেই…” শিউরে উঠলো তামান্না। “আপনি ভাবতেও পারবেন না।”

“এখন আর কোনো চিন্তা নেই, ক্রিস্টোফার আশ্বাস দিলো ওকে।

তামান্না ওর গায়ে হেলান দিয়ে কাঁধে মাথা গুঁজে দিলো। ক্রিস্টোফার বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রাখলো। মেয়েটাকে চুমু খাওয়ার জন্যে ওর সারা শরীর একযোগে চিৎকার শুরু করেছে যেনো।

ও দাঁতে দাঁত চাপলো। রুথ, নিজেকে বললো ও। রুথের জন্যে নিজেকে শক্ত করো।

“আপনি যেভাবে ঐ শয়তানটাকে সামলালেন! আমি জীবনেও কাউকে এরকম করতে দেখিনি। আপনার ওই অস্ত্রটা মারাত্মক কিন্তু এতো ভালো করে কোত্থেকে শিখলেন?”

“কালারিতে শিখেছি।”

তামান্না নিজের ভর বদল করতে সামান্য বাকা হলো, ভারসাম্য রাখতে ও ক্রিস্টোফারের হাঁটুতে ভর দিলো।

“ওখানে অনেকদিন আছেন, তাই না?”

“বেশি দিন না। আমার বাড়ি এখানে না। বোম্বেতে।”

তামান্নাকে বেশ কৌতূহলী দেখালো। “আপনি কি তাহলে এদেশী না?”

“না,” প্রশ্নটা ক্রিস্টোফারকে অবাক করেনি মোটেও। ওর কালো চুল আর কালো চোখের কারণে ওকে স্থানীয় বলেই মনে হয়। আর কালারিতে ঘণ্টার পর ঘন্টা রোদে অনুশীলন করার পর ওর চামড়া-ও পুড়ে গাঢ় বাদামী হয়ে গিয়েছে। ফলে এখন আর চেনার উপায় নেই। শুধু আকৃতির দিক থেকে অন্যদের চাইতে আলাদা ও।

“আমার বাবা ইংরেজ, তবে আমি সারা জীবনই এদেশেই থেকেছি।”

তামান্নার হাত ক্রিস্টোফারের হাঁটু থেকে উরুতে নেমে এলো। তারপর দুই পায়ের মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গা সেখানে ঝুলে রইলো।

“ইংল্যান্ডে কি খুব গরম?”

“না। বাবাতো বলেন খুব ঠাণ্ডা আর সারাদিন নাকি বৃষ্টি হয়।”

“বর্ষাকালে এখানে যেমন হয়?”

“সম্ভবত।”

তামান্নার হাত আবার নড়ে উঠলো। এবার সেটা দুই পায়ের সংযোগস্থলে আলতোভাবে গিয়ে স্থির হলো। ওর হাত পাতলা কাপড়টা ভেদ করে বিদ্যুতের মতো উত্তেজনা ছড়াতে লাগলো। ওকে থামাও, ক্রিস্টোফারের মন আদেশ দিলো। কিন্তু ওর শরীর শুনলো না-তামান্নার স্পর্শ পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব।

“কাজটা ঠিক হচ্ছে না, কোনোমতে বললো ক্রিস্টোফার। “মানে… আমার আর একজন আছে।”

“বুঝেছি,” তামান্না বললো কিন্তু হাত সরালো না। “আপনি বিবাহিত।”

“না”

“তাহলে সমস্যা কি?” তামান্নার হাতের নাড়াচাড়া আরো দ্রুত হলো। এতো দ্রুত মালিশ করতে লাগলো যে ক্রিস্টোফারের মনে হলো কামনার আবেশে ও উড়ে যাবে।

“কখনো কোন মেয়ের সাথে রাত কাটিয়েছেন?”

“না,” স্বীকার করলো ক্রিস্টোফার।

তামান্না নিজের কাচুলি খুলে বক্ষ উন্মুক্ত করে ফেললো। তারপর ক্রিস্টোফারের একটা হাত নিয়ে আঙুলগুলো ফাঁক করে একটা স্তনের উপর রাখলো। রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে স্তনের বোটা শক্ত আর উদ্ধত হয়ে আছে। ক্রিস্টোফার বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ওখানে চাপ দিতেই ও অস্ফুট শব্দ করে উঠলো।

“আস্তে,” ফিসফিস করে বললো তামান্না। ওর লম্বা ঘন চুল ক্রিস্টোফারের বুকে লাগতে লাগলো; চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো একজন আর একজনকে। তামান্না ক্রিস্টোফারকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে পিষতে লাগলো ওর সাথে।

রুথ, ক্রিস্টোফারের মনের গহীন একটা কোণ থেক আর্তনাদ ভেসে এলো। কিন্তু ও পাত্তা দিলো না। কামনা ওকে বশ করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে শরীরের ভিতর একটা আগুন বইছে। এই আগুন চাপিয়ে রাখা আর ওর পক্ষে সম্ভব না।

*

ক্রিস্টোফারের ঘুম ভাঙলো দেরিতে। কালারিতে যখন থাকে তখন সবসময়ই ও সূর্য ওঠার আগেই উঠে নিজের যা কাজকর্ম সব সেরে নেয়। কারণ সূর্য উঠতে না উঠতেই অনুশীলন শুরু হয়ে যায়। শেষ কবে সূর্যোদয়ের পর ঘুম ভেঙ্গেছে মনে নেই ওর।

আরামটা ও উপভোগ করলো কিছুক্ষণ। কাল রাতের সবকিছু মনে আসছে, এতে স্পষ্টভাবে যে আবারও ওর কামনা জাগ্রত হতে শুরু করলো। আসলেই কি কাল রাতের সব সত্যি ছিলো? নাকি সব স্বপ্ন? না। তামান্নার শরীরের ঘ্রাণ এখনো নিজের শরীরে লাগে আছে ওর। নারিকেল, সুগন্ধি আর ঘামের গন্ধ।

চেহারায় চওড়া একটা হাসি খেলে গেলো ওর। শরীর এখনো ম্যাজ ম্যাজ করছে, তাই চামড়ার উপর সূর্যের নরম উত্তাপটা আরো বেশি ভালো লাগছে। ও একটা হাত বাড়িয়ে দিলো, কিন্তু তামান্না পাশে নেই। সম্ভবত ও চায়নি জয়ন্তন যেনো ওদেরকে একসাথে দেখে ফেলে। ক্রিস্টোফার উঠে বসে চারপাশে তাকালো।

তামান্নার কম্বলটা দেখা যাচ্ছে। মাড়ানো ঘাসের উপর পড়ে আছে। গাধাটাও একই জায়গায় বাঁধা। আগাছা চিবুচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা কোথাও নেই।

একটা কাক এসে মন্দিরের গম্বুজের উপর বসলো। বেলা হয়ে গেলেও, জয়ন্তন কেন এখনো ওকে জাগিয়ে দেয়নি ভেবে অবাক হলো ক্রিস্টোফার। সাধারণত, ওর কোনো ত্রুটি ধরতে পারলে বিমলানন্দ লাভ করে জয়ন্তন।

নিতান্ত অনিচ্ছায় ও জয়ন্তনকে খুঁজতে গেলো। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দেখলো কাকটা দরজার ভিতরে, মাটিতে পড়ে থাকা কিছু একটায় ঠোকরাচ্ছে। কিন্তু ক্রিস্টোফারের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে না যে জিনিসটা কি। কাকের পাশে একদল মাছি ভনভন করছে। সিঁড়ির মাথায় উঠে আসতেই ওকে দেখে কয়েকটা ইঁদুর দৌড়ে পালালো। জয়ন্তনকে দেওয়া ওর সাবধানবাণী মনে পড়লো। এসব পুরনো দালান হচ্ছে পোকা মাকড়ের আখড়া।

বাইরের উজ্জ্বল সূর্যালোকের কারণে অন্ধকারে চোখ সয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলো ক্রিস্টোফারের। তারপর আরো কিছুটা সময় লাগলো মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসটা কি সেটা বুঝতে।

জয়ন্তন চিত হয়ে শুয়ে আছে, তবে সে ঘুমাচ্ছে না। গলা থেকে বুকের মাঝ বরাবর নিখুঁতভাবে কাটা। এতো বড় হা হয়ে আছে জায়গাটা যে নিচের মেরুদণ্ড পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চুনি ভরা ব্যাগটা নেই। চারপাশ ঘিরে শুকিয়ে আসা রক্তের ছোটখাটো একটা পুকুর দেখা যাচ্ছে। মাছিতে ভরে আছে সেটা। রক্তের কিনারায় পাথরের উপর ছোট একটা পায়ের ছাপ। গত রাতে এই পা টাই ওকে সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো।

রাগে উন্মাদ হয়ে বাইরে দৌড়ে এলো ক্রিস্টোফার। দুত হাতে তরবারিটা তুলে নিলো ও। তারপর উরুমি-টা বেঁধে ছুটে গেলো রাস্তায়।

ভোরের কুয়াশায় রাস্তার ধুলো মরে গিয়েছে। আর এতো সকালে এখানে আর কারোই আসার সম্ভাবনা নেই। তাই তামান্নার খালি পায়ের ছাপগুলো স্পষ্টভাবেই দেখতে পেলো ও। সেগুলো অনুসরণ করে পাহাড়ে উঠে এলো ক্রিস্টোফার। প্রতিটা পদক্ষেপে রাগ আরো বাড়ছে ওর। কোমরে ঝুলানো উরুমি-টা হিস হিস করছে। আর ও মনে অনে ভাবছে তামান্নাকে ধরার পর এটা দিয়ে ওকে কি করবে।

রাস্তা ধরে কিছুদুর যাওয়ার পরেই পায়ের ছাপ দিক পরিবর্তন করে একটা ছাগল চরার রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়েছে। একটা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে মিশেছে সেটা। রাস্তাটা পাথরের। তামান্নার হালকা পা তাই এখানে কোনো ছাপ ফেলেনি। ও কি এদিক দিয়েই গিয়েছে? নাকি ওর পিছু নেওয়া থামানোর জন্যে ধোঁকাবাজি করেছে।

তামান্না শুরু থেকেই ক্রিস্টোফারকে ধোঁকা দিয়ে এসেছে। আমের বাগান, গরীব বাবা যে কিনা ওর যৌতুক দিতে পারে না-সব মিথ্যা। ধর্ষণটাও নাটক। জয়ন্তনের কথা-ই ঠিক 1. কিন্তু অতিরিক্ত রাগের কারণে ক্রিস্টোফার অনুতাপ বোধ করলো না। ওই ধর্ষক লোকটাও নিশ্চয়ই তামান্নারই সাথের কেউ। ক্রিস্টোফার কাছে আসামাত্র পালিয়ে যাবে, পরে রাত নামলে তামান্নার কাছে ফিরে আসবে-এই ছিলো ওদের পরিকল্পনা। তবে ওদের পরিকল্পনার এই অংশটুকু মাঠে মারা গিয়েছে।

কিন্তু সুযোগ থাকার পরেও তামান্না কেন ওকে খুন করেনি সেটা ভেবে অবাক হচ্ছে ও। আবেগ? ওর সাথে থাকার সময় তামান্নার কেমন লাগতো সেটা মনে পড়লো ওর। ওর স্পর্শের অনুভূতি মনে আসতেই রাগে হাত মুঠো করে ফেললো ও। একবার ধরতে পারলে জীবনের শিক্ষা দিয়ে দেবে।

ক্রিস্টোফার রাস্তা ধরে আরো কিছুটা গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো, কিন্তু আর কোনো পায়ের ছাপ পাওয়া গেলো না। তার মানে ছাগল চলার রাস্তা ধরেই গিয়েছে মেয়েটা। ও-ও সেদিকেই এগিয়ে পর্বতের খাড়া গা বেয়ে উঠতে শুরু করলো। ও মাটিতে ছাপ বের করায় খুব বেশি দক্ষ না, তবে এক জায়গায় সামান্য নরম মাটিতে ও আবার একটা পায়ের ছাপ খুঁজে পেলো। এখনো তাজা। উরুমির প্যাঁচ খুলতে খুলতে আরো জোরে ছুটলো ও।

পথটা পর্বতের চারপাশ ঘুরে তারপর উপরে উঠেছে। খানিকটা উঠতেই আচমকা একটা গিরিখাত দেখা গেলো সামনে। আর ওখানেই তামান্না  দাঁড়িয়ে। একাকী। একটা পাথরের চাই-এর উপর নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। ও নিশ্চয়ই ক্রিস্টোফারের আসার শব্দ শুনেছে কিন্তু পালানোর কোনো চেষ্টাই করেনি দেখা যাচ্ছে। এখন আর শাড়ি পরা নেই। শুধু কাচুলি আর হরিণের চামড়ার পায়জামা পরনে। ওটা ক্রিস্টোফার আগে দেখেনি।

“আমাকে খুঁজে বের করে ফেলেছো?” তামান্না অবাক হয়েছে বোঝা গেলো।

রাগের চোটে ক্রিস্টোফারের ইচ্ছে করছিলো তখনি দৌড়ে গিয়ে ওর টুটি চেপে ধরে। কিন্তু তামান্নার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিলো, যে জন্য ও সামনে আগালোে না। যেনো ওর ভিতর লুকানো একটা শক্তি আছে-আর সেজন্যেই ওর চেহারায় এক অদ্ভুত আত্মতুষ্টি ফুটে আছে। এই ব্যাপারটাই ক্রিস্টোফারের রাগকে কমিয়ে সচেতন করে তুললো।

“চুনিগুলো কোথায়?” জানতে চাইলো ক্রিস্টোফার।

“নিরাপদ কোনো জায়গায়। তোমার বন্ধু জয়ন্তন কিন্তু খুবই বিশ্বস্ত। আমাকে আসতে দেখে ও চেষ্টা করেছিলো পাথরগুলো গিলে ফেলতে, যাতে ওর মালিকের সম্পদ রক্ষা পায়। শেষে তাই ওর বুক কেটে সেগুলো বের করতে হয়েছে।”

“এজন্যে তোকে পস্তাতে হবে।”

“তুমিও একই কাজ করতে। ওর দিকে তুমি কিভাবে তাকাও সেটা আমি কালই দেখেছি। তোমার মনের ভিতর কি আছে জানি আমি।”

ক্রিস্টোফার ওর কথার প্রতিবাদ করলো না। কিন্তু এখনতো আমি তোকে বাগে পেয়েছি।”

“তাই নাকি?” জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করলো তামান্না। পাথরের আড়াল থেকে পাঁচজন লোক বেরিয়ে এলো। চেহারা রুক্ষ, মুখে না কামানো দাড়ি, পরনে ছেঁড়া পোশাক। সবার হাতে ধরলো ছোরা।

“আমার তো মনে হচ্ছে তোমাকে বাগে পেয়ে গিয়েছি।”

“আমাকে আটকাতে হলে এই কয়জন দিয়ে হবে না।” বলতে বলতে ক্রিস্টোফার তামান্নার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর চেহারা দেখে নিলো। কে সবচে দ্রুত বা কে সবার আগে আক্রমণ করতে পারে সেই চিন্তা করছে। কাকে খুন করতে সবচেয়ে কষ্ট হবে? কিন্তু সেরকম কিছুই ঠাহর করতে পারলো না।

“যে কাছে আসবে, তারই কল্লা ফেলে দেবো,” সাবধান করলো ক্রিস্টোফার। তামান্না দশ গজ মতো দূরে দাঁড়িয়ে। উরুমির আওতার সামান্য বাইরে। ও সামনে এগিয়ে আক্রমণের লক্ষ্যে শরীরকে প্রস্তুত করে ফেললো।

তামান্না শরীরের পিছনে হাত দিয়ে কোমর থেকে একটা লম্বা পিতলের নলের পিস্তল বের করে আনলো। তারপর আলতো করে সেটা ক্রিস্টোফারের দিকে তাক করে হ্যাঁমার টেনে ধরলো।

ক্রিস্টোফার জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। ওর মুখের অক্ষম ক্রোধ দেখতে পেয়ে হেসে দিলো তামান্না। “কালারির সেরা যোদ্ধার পক্ষেও বুলেটের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব না।”

“তাহলে আমাকে এখানে টেনে আনার মানে কি? জয়ন্তনের মতো আমাকে ঘুমের মধ্যে মেরে রেখে আসলেই তো হতো।”

“কারণ আমি তোমাকে খুন করতে চাইনি।” ক্রিস্টোফার আরো এক চুল আগালো। কিন্তু আর একটুও সামনে বাড়ার চেষ্টা করলে সেটা করতে বাধ্য হবো।”

“কেনো?”

“বাকি জীবন কি এই আনা নেওয়ার কাজই করে যেতে চাও? ওই ভোটকা ব্যাটার সেবা করে যেতে চাও যাকে তুমি এক ঘুষিতে পরপারে পাঠিয়ে দিতে পারবে? শুধু টাকা আছে বলে ওরা তোমার উপর ছড়ি ঘুরিয়া যাবে? তুমি কিভাবে ঊরুমি চালাতে পারো সেটা আমি দেখেছি। তোমার মতো একজন যোদ্ধা মালাবার উপকূলের ত্রাস হতে পারবে।”

“তাতে কি হবো আমি? দস্যু?”

“মুক্ত হবে।”

তামান্না বন্দুকের নলটা নামালো। ওর বাহু অনেক সরু, কিন্তু একবারের জন্যেও সেটা কাপলো না।

“কোন পক্ষে যোগ দিতে চাও ভেবে দেখো?”

*

“আমরা ঠিক কাজটাই করছি, তাই না?” টম জোরে জোরে চিন্তা করছে।

ও আর ডোরিয়ান পানসি নৌকাটার পিছন দিকে বসে আছে। এক হাতে হালটা ধরে আছে টম। টেবিল উপসাগরের বন্দরে ভীড়ে থাকা সওদাগরি জাহাজগুলোর ফাঁক দিয়ে পানসিটা এগিয়ে যাচ্ছে। সারাহ, ইয়াসমিনি আর অ্যানা বসেছে মুখোমুখি। ওদের পিছনে আলফ উইলসন আর তার সহযোগীরা নিখুঁত ঐকতানে দাঁড় বাইছে। আলফের বাবার বাড়ি ছিলো ব্রিস্টলে। তবে ওর গায়ের গাঢ় রঙটা পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন উচ্চ বংশের মঙ্গোলিয়ান মহিলা। আলফ নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে পেরে কতোটা আনন্দিত সেটা টম বুঝতে পারছে।

“যদি আমরা সব ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারতাম যে কি হতে যাচ্ছে তাহলে বলতাম যে অবশ্যই ভুল পথে যাচ্ছি আমরা,” হেসে বললো ডোরিয়ান। “অনিশ্চয়তাই তো রোমাঞ্চের কারণ।”

সারাহ টমের দিকে ভ্রুকুটি করলো। “তোমাকেতো এরকম অস্থির দেখিনা কখনো।”

“আমি আসলে জোরে জোরে চিন্তা করছিলাম।” সত্যি কথা হচ্ছে ফ্রান্সিস ওকে খুন করার অভিপ্রায়ে উদয় হওয়ার সেই রুদ্ধশ্বাস রাতটার পর থেকে ও অনিশ্চয়তায় থাকার আর কোনো সুযোগ পায়নি। কারণ এরপর থেকেই শুরু হয় অনবরত কাজ : একটা জাহাজ কিনে সেটাকে সুসজ্জিত করা, ওটায় এমন সব মাল ভর্তি করা যেগুলো ভারতে বিক্রি করলে প্রাচুর দাম পাওয়া যাবে, তারপর জাহাজকে চালানোর জন্য লোকবল জোগাড় করা। টম এসবের প্রতিটা খুঁটিনাটি নিজে নজরদারি করেছে। প্রতিদিন সূর্যের আগে ঘুম ভাঙতে ওর, বাসায় ফিরতে গভীর রাতে। ফিরেই লণ্ঠনের আলোয় সারাদিনের ব্যয়ের হিসেব কষতে বসে যেতো।

“অনেকের স্বামী-ই সমুদ্রে গিয়ে আর ফিরে আসে না। এরকম কিন্তু অনেক নজির আছে,” সারাহ বললো। “জাহাজে থাকার সময় তাই ওকে সবসময় চোখে চোখে রাখি।”

টম ওর হাত ধরলো। “যখন আমরা সমুদ্রে থাকবো, তখন আমার চোখ থাকবে শুধু তোমার দিকে।”

“তোমার চোখ থাকবে দিগন্তে, আবহাওয়ায়, পাল খাটানোয় আর তোমার লোকেদের দেখাশোনায়,” মুখ বাঁকিয়ে বললো সারাহ। “তবে আমার কাছ থেকে বেশি দূরে তো আর যেতে পারবে না।”

“ভারত যেতে অনেক সময় লাগবে রে পাগল,” জ্বলজ্বলে চোখে বললো টম।

একটা অতিরিক্ত বোঝাই ইন্ডিয়াম্যানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো পানসিটা। দুপুরের কড়া রোদে ওটা সোনার পাত বসানো কামানের খোপগুলো ঝকমক করছে। তা দেখে টমের শেরপা জাহাজটার কথা মনে পড়লো। ওটায় করেই ও প্রথম আফ্রিকায় এসেছিলো। ওর বাবা হাল-এর সাথে এসেছিলো ও। সোনা দিয়ে এরকম গিলটি করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কতো টাকা খরচ হতে পারে ভাবলো টম। তবে ওদের মোট লাভের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ এই বিলাসিতা দ্বারা প্রকাশ পায়।

“ওরে আল্লাহ্! এতে তো অনেক টাকা লাগার কথা!” ইয়াসমিনি বললো।

টম জানে ও ইন্ডিয়াম্যানটা সম্পর্কে কথা বলছে না। ও বলছে গত কয়েক সপ্তাহে ওদের খরচ করা টাকা সম্পর্কে। জাহাজটার দামই অনেক, কেপ টাউনে এরকম জাহাজ মাত্র কয়েকটাই আছে। শুরুতে ওটার মালিক দাম কমাতেই চাইছিলো না। কেনার আশা তাই এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলো টম। ব্যাংক অফ হীরেনগ্রাচট-এ রাখা সব টাকা খরচের পরেও দেখা গেলো আরো টাকা দরকার ওদের। গত দশ বছর ধরে ইউরোপ জুড়ে স্প্যানিশ আগ্রাসন চলছে। সেই যুদ্ধের কারণে বন্দুক, পাউডার, গুলি, কার্তুজসহ আরো প্রায় শখানেক দরকারি জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছে।

“তবে টাকা দিয়ে কি পেয়েছি দেখো।” বলে টম পানসির মুখ সোজা করলো। ইন্ডিয়াম্যানের লেজের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো পানসিটা। সামনেই ওদের নতুন জাহাজটা দাঁড়িয়ে। ডাচ নকশায় বানানো একটা তিন মাস্তুলের জাহাজ। এগুলোকে বলা হয় স্কুনিয়ার্স, অর্থ ‘অত্যন্ত সুন্দর। ইংরেজিতে শব্দটা হচ্ছে ‘স্কুনার্স। এই নামটা যথাযথ। জাহাজটা বিশাল ইন্ডিয়াম্যানগুলোর চাইতে লম্বা কিন্তু সরু, সারা গায়ে মার্জত নকশা কাটা। ওটার সামনে লাগানো সমুদ্র পরীর ভাস্কর্য থেকে শুরু করে পিছন দিকের থাকার জায়গা পর্যন্ত সবই মনোহর। জাহাজটা কেপ টাউনে আসামাত্র টমের মনে ধরে যায়। ও জাহাজটার নাম দিয়েছে কেস্ট্রেল-একটা পাখির নাম। ডেভনে থাকার সময় টম প্রায়ই এই পাখি শিকারে যেভো। নামের সার্থকতা রাখতেই যেনো জাহজাটা সামান্য বাতাসেও প্রায় উড়ে চলতে পারে।

বন্দরের জাহাজের সারির পিছনে ওটাকে নোঙ্গর করে রাখা। পাশেই ভাসছে কোর্টনীদের আদি আর অকৃত্রিম সেবক সেন্টারাস। জায়গাটা দুর্গের কামানের গোলার আওতার বাইরে। এই আগাম সতর্কতাটা টম শিখেছে ওর বাবার কাছ থেকে।

টম পানসিটা কেট্রেল-এর পাশে এনে দাঁড় করালো। তারপর একজন একজন করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে। আবোলি আগেই এসে উঠেছে, শেষ সময়ের প্রস্তুতি তদারকি করছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে পাশে। সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর হাতের খাতায় লিখে রাখছে।

সিঁড়ির মাথায় টমের মাথাটা দেখা যেতেই ও দৌড়ে গেলো সেদিকে।

“আসেন চাচা। সবকিছু রেডি। বাতাসও আছে প্রচুর। আবোলি বললো আপনার আদেশ পেলেই নোঙ্গর তুলে ফেলা যাবে।”

ছেলেটার আগ্রহ দেখে হাসলো টম। কেস্ট্রেল কেনা শেষ হওয়া মাত্র টম ফ্রান্সিসকে জাহাজে থাকতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। যাতে লোকজন জ্যাকব দ্য সি আর অন্যান্য লোকগুলোর নিখোঁজ হওয়ার সাথে ফ্রান্সিসের আগমনকে মেলাতে না পারে। আবোলি ওকে সব ভালো খবরই দিলো। ফ্রান্সিস খুবই আগ্রহী ছাত্র। খুব দ্রুত সব শিখে নেয়, আর কাজকর্মেও পটু। যদিও আফ্রিকা আসার আগে কোনোদিনও কোনো জাহাজে পা দেয়নি ও। তবে সব দেখেশুনে টম ওর মধ্যে এক দুর্দান্ত নাবিকের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলো।

“ব্যবসার ক্ষেত্রে ওর মাথা ব্ল্যাক বিলির মতোই,” একরাতে আবোলি বলেছিলো টমকে। “কিন্তু মনটা একদম ওর মায়ের মতো।”

টম হঠাৎ খেয়াল করলো ফ্রান্সিস আর ওর দিকে তাকিয়ে নেই, ওর কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে। জাহাজ বা এটার কোনোকিছুই যেনো আর ওর মাথায় নেই। চেহারা বিমলানন্দে উদ্ভাসিত হয়ে আছে। অ্যানা উঠে এসেছে জাহাজে।

এই দুজনের দিকে নজর রাখতে হবে, মনে মনে বললো টম। আবোলি শুধু ফ্রান্সিসের শেখার দক্ষতা সম্পর্কেই টমকে বলেনি। ও আরো জানিয়েছে, “ছেলেটা প্রেমে পড়েছে, ক্লিবি। যখনই অ্যানা জাহাজে আসে ও সব কাজ ভুলে ওকে নিয়েই পড়ে থাকে।”

“আরে বাচ্চা একটা ছেলে।” টম অবাক হয়ে বলেছে। “আর অ্যানা বড় একটা মেয়ে।” তবে ভালো করে ভেবে বুঝলো দুজনের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি না। “অ্যানারও কি একইরকম অবস্থা নাকি?”

“অ্যানা এখনো ফ্রান্সিসকে ঐ নজরে দেখে না,” আবোলি বলেছে। “কিন্তু আমাদের যাত্রাটা অনেক লম্বা হবে। আর সে জন্যেই সম্ভবত ফ্রান্সিস বেশি বেশি আশা করছে।”

টম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফ্রান্সিস বা অ্যানা দুজনের কেউই আর ছোট নেই। দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে ওরা। কিন্তু ও ফ্রান্সিসের জন্যে একটা দায়িতুবোধ অনুভব করে, নিজের আপন সন্তান থাকলেও এমনটাই অনুভব করতো। আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ও খুব ভাল মতোই জানে যে জাহাজের মতো এইরকম বদ্ধ পরিবেশে যে ভালোবাসার সম্পর্কগুলো হয়, সেগুলোর পরিণতি সাধারণত শেষমেশ ভালো হয় না।

সারাহ ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। “ফ্রান্সিস, মিষ্টি করে ডাকলো ও। “তুমি কি কষ্ট করে মিস দুয়ার্তের ব্যাগপত্র তার বার্থে দিয়ে আসতে পারবে?”

“তুমি ওকে এসবের মাঝে ঠেলে দিচ্ছো কেনো?” ওরা নিচে নেমে যেতেই নালিশের সুরে বললো টম।

“আমি ঠেলে দেই বা না দেই তাতে কিছুই যায় আসে না,” সারাহ জবাব দিলো। “যা হওয়ার তা হবেই। আর কেউ না হোক, অন্তত তোমার সেটা জানা থাকার কথা।”

ডোরিয়ান এগিয়ে এলো ওদের দিকে। “দারুণ কিন্তু জাহাজটা,” প্রশংসা করলো ও। “ঠিক আছে, আপাতত বিদায় তাহলে দেখা হবে শীঘ্রই।”

“আচ্ছা।”

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে করা পরিকল্পনা মোতাবেক, টম আর সারাহ, ফ্রান্সিস আর অ্যানাকে নিয়ে কেস্ট্রেল-এ করে মাদ্রাজ যাবে। ডোরিয়ান, ইয়াসমিনি আর আবোলি সেন্টারাস-কে নিয়ে আফ্রিকার উপকূল ধরে আরবের গুম্বন আর মোকা বন্দরে যাবে। সেখান থেকে ভারতের দক্ষিণ উপকূল থেকে একশো মাইল দূরে লাকুইডিভা নামের এক দ্বীপপুঞ্জে আবার একসাথে মিলবে ওরা। তারপর একসাথে বাড়ি ফিরবে।

টম ওর ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করলো। “সাবধানে থেকো!”

“তুমিও নিরাপদে ফিরে এসো।”

“তাতে আসতেই হবে,” টম বললো। “সব টাকা ঢেলেছি এটার পিছনে।”

ছোট ভাইয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা বেদনা অনুভব করলো টম। প্রায় দশটা বছর টম জানতো যে ও মারা গিয়েছে। তাই এখন সামান্য সময়ের জন্যেও যদি আলাদা হতে হয় তো ওর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। এটাই যদি আমাদের শেষ দেখা হয়?

“ডোরিয়ান চাচা চলে গিয়েছেন?”

ফ্রান্সিস উঠে এসেছে উপরে। ও আর অ্যানা কতক্ষণ নিচে ছিলো ভেবে অবাক হলো টম।

“বিদায় দেওয়ার জন্যে একেবারে ঠিক সময়ে চলে এসেছো তুমি।”

আবোলি, ইয়াসমিনি আর ডোরিয়ানকে নিয়ে নৌকাটা আবার দূরে সরে গেলো। ওরা হাত নাড়লো নৌকা থেকে। নৌকাটা দৃষ্টির আড়াল হতেই নোঙ্গর তোলার আদেশ দিলো টম। কু-রা কপিকল ঘোরানো শুরু করলো। নোঙ্গর উঠে আসা শুরু হতেই পায়ের নিচে সেই সুপরিচিত দুলুনিটা অনুভব করতে পারলো টম।

সাগরের অবাধ স্বাধীনতা টমের খুব পছন্দ। তবে এবার কাঁধে ঋণের বোঝার কারণে কিছুটা চিন্তিত ও। সারা জীবনে কখনো কারো কাছে থেকে ঋণ নেয়নি ও। তাই সারাক্ষণ ব্যাপারটা খচখচ করছে মনের ভিতর। এবারের যাত্রাটা তাই দ্রুত শেষ করার জন্যে মুখিয়ে আছে টম। দ্রুত সব শেষ করে লাভের টাকা দিয়ে দেনা শোধ করতে পারলে তবেই শান্তি। তারপরেই মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পারবে ও।

*

সমুদ্র ওদের অনুকূলেই থাকলো। যদিও এখন মৌসুমের শেষ সময়, তবুও টম মনে করতে পারলো না কবে এতো ঝামেলাহীন যাত্রা করেছে ওরা। ক্রমাগত বাজে আবহাওয়া থাকার কারণে কেপ অফ গুড হোপ-এর নাম বদলে এখন সবাই কেপ অফ স্টর্মস ডাকা শুরু করেছে। কিন্তু ওখানেও ঝড়ের কোনো চিহ্ন দেখা গেলো না। কেস্ট্রেল-ও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করলো। বাতাসের আগে আগে ছুটলো ওটা, যেনো খোলের তলে পানি না, পাতলা বাতাস। প্রতিদিনই টম এমন নতুন কিছু না কিছু আবিস্কার করতে লাগলো যা ওকে ওর নতুন জাহাজটা সম্পর্কে অবাক করেই চললো।

টম, ফ্রান্সিসের সাথেই বেশিরভাগ সময় কাটাতে লাগলো। ও যা যা পারে সবই ছেলেটাকে শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক ওর বাবাও যেভাবে প্রথম যাত্রায় ওকে সব শিখিয়েছিলো। ও ফ্রান্সিসকে জাহাজ চালনা শেখালোঃ কিভাবে সূর্যের অবস্থান দেখে অক্ষাংশ বের করতে হয়, কিভাবে লগ লাইন দিয়ে জাহাজের গতি মাপতে হয়। কপাস দিয়ে কিভাবে দিক ঠিক রাখতে হয়, কিভাবে হাল-এর পাশে বসানো ট্রাভার্স বোর্ডের সাহায্যে জাহাজ কতদূর অগ্রসর হলো সেটা বের করতে হয়-সবই শেখালো।

“অনেক চেষ্টার পরেও দ্রাঘিমাংশ বের করার কোনো পদ্ধতি এখনো কেউ বের করতে পারেনি,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। “জাহাজের অবস্থান কতোটা পূর্ব বা পশ্চিমে তা সূর্য দেখে জানা যায়, কিন্তু উত্তর বা দক্ষিণে কতদূর আসলাম সেটা জানা সম্ভব না। সেটার জন্যে আমাদেরকে জাহাজের গতি আর স্রোত দেখে অনুমান করতে হবে।”

বিকেলে, অবসরে ওরা তরবারি দিয়ে অনুশীলন করতো। ফ্রান্সিস ওর সৎ বাবার কাছে থেকে ভালোই শিখেছে, সেই সাথে ওর নিজের বাবার কাছ থেকে পাওয়া স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা তো আছেই। আর এখন টমের তত্ত্বাবধানে ও সত্যিকার অর্থেই এক ভয়ানক যোদ্ধায় রূপান্তরিত হলো।

মাঝে মাঝে ভারি অস্ত্র-শস্ত্র নিয়েও অনুশীলন চলতো। কেস্ট্রেল-এ দশটা নয় পাউন্ডের কামান আছে। প্রতিদিন টম ওর সব লোকদেরকে সেগুলোর ব্যবহার প্রশিক্ষণ দিতে। কারণ, কোনো ঝামেলা ছাড়া ভারত পৌঁছাবে এটা ওরা কল্পনাতেও ভাবে না। আর সেজন্যে টম কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন নাবিক একেবারে ইংরেজ সৈন্যদলের সদস্যের মতো দ্রুত গোলা ছুঁড়তে পারে ততোক্ষণ টম অনুশীলন করিয়েই যেতো। সময়টা হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই মিনিট। ফ্রান্সিসও বাকি সবার সাথে অনুশীলন করে। গেলো। অচিরেই ও বাকিদের মতো কামানের নল মুছে, তাতে গোলা ভরে, তাক করে ছোঁড়া শিখে গেলো।

“যদি সেরকম জরুরি পরিস্থিতি হয়-ই, তাহলে সেসময় যেনো প্রতি জোড়া হাতই আমাদের কাজে লাগে,” এক সন্ধ্যায় কথাটা বললো টম। “আমি আমার শেষ পয়সাটা পর্যন্ত এই যাত্রার পিছনে খরচ করেছি। কোনো ফালতু দস্যু এসে আরামে সেটা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তা আমি হতে দেবো না।”

“আপনি নিশ্চিত যে দস্যুরা আমাদেরকে আক্রমণ করবে?” ফ্রান্সিসের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে টম হাসি গোপন করলো। ছেলেটা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণের জন্যে আগ্রহে ফেটে পড়ছে।

ব্যাপারটা ভালোই, টম নিজেকে বললো। তুমি নিজেও এরকম ছিলে। ওর মনে আছে, ওকে জাহাজে নেওয়ার জন্যে ও ওর বাবার প্রধান নিয়োগ কর্মকর্তা বিগ ড্যানিয়েল ফিশারের শুধু পা ধরা বাদ রেখেছিলো। এরপর ওর বাবা যখন অনুমতি দিলো, সেদিনটা ছিলো ওর জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন।

“শুধু তো দস্যুদের কথা বললাম,” সাবধান করলো টম। “গাই যদি একবার আমাদের এই ইন্টারলোপিং অভিযানের কথা জানতে পারে, তাহলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমগ্র বহর আমাদের পিছনে লেলিয়ে দেবে।”

রোদের চোটে ফ্রান্সিসের চোখ ছোট ছোট হয়ে আছে। “গাই চাচা আপনাকে এতো বেশি অপছন্দ করে কেননা? কেপ টাউনে আমাকে কথাটা বলেননি।”

“সে এক লম্বা কাহিনি।” এড়িয়ে যেতে চাইলো টম। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। নিজের খুব কম কৃতকর্মের জন্যেই ও লজ্জা বোধ করে, আর ওর ভাই সম্পর্কে বলাটা সেগুলোর মধ্যে একটা। “তখন আমারদের বয়স এই তোমার মতোই…”।

একটা পালে বাতাস লেগে ফুলে উঠতেই হ্যাচকা টানে ওটায় বাঁধা একটা রশি গেলো খুলে। তারপর ওটার মাথা ডেক-এ ছোটাছুটি করতে লাগলো। জাহাজের গতিও পরিবর্তিত হয়ে গেলে সাথে সাথে।

“আগে এটা সামলিয়ে আসি,” ফ্রান্সিসের কাঁধ চাপড় দিয়ে বললো টম। “আর একদিন বলবো। প্রমিস, বলবো।”

ফ্রান্সিস অবশ্য আর জিজ্ঞেস করেনি। একটা কারণ হচ্ছে, টম যে এ ব্যাপারে আলাপে অনাগ্রহী সেটা টের পেয়েছে ও। আর আসল কারণটা হচ্ছে ওর মাথায় সারাক্ষণ শুধু অ্যানার চিন্তা ঘোরে। মেয়েদের সাথে মেলামেশার খুব বেশি সুযোগ ওর হয়নি। যতোদিনে বয়স বেড়ে উপযুক্ত হয়েছে বলা যায়, তততদিনে দারিদ্র ঝাঁকিয়ে বসেছে ওদের পরিবারে। হাই উইল্ডের বিশালতু দেখে কয়েকটা মেয়ে অবশ্য কিছু আগ্রহ দেখিয়েছিলো, কিন্তু সেটাও একদিনের বেশি টেকেনি। কারণ বাড়ির ভিতরের খালি দেয়াল আর ফাঁকা ঘর দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলো তারা।

কিন্তু অ্যানার সাথে ওর ওরকম কিছুই হচ্ছে না। অ্যানা ওকে ওর চরম দুরবস্থায় পাওয়ার পরেও দূরে ঠেলে দেয়নি। ওর সাথে একদম সহজভাবে, নরম সুরে কথা বলে অ্যানা। তবে এটায় একটা সমস্যাও আছে। ফ্রান্সিস ধরতে পারে না কথার আড়ালে ওর জন্যে অ্যানার আসল মনোভাবটা কি। ওর সারাক্ষণ অ্যানার সাথে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে হয়। ফলে যদি কখনো অ্যানা ওকে একটু এড়িয়ে যায় বা একটু বেখেয়াল হয়, তাহলে ওর সারাটা দিন খারাপ কাটে। যতোবার অ্যানা ডেক-এ উঠে আসে, ফ্রান্সিস কোনো কাজেই মন বসাতে পারে না। ট্রাভার্স বোর্ড নিয়ে খাবি খায় তখন, বা সূর্যের কৌণিক অবস্থান বের করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে।

“তুমি দেখি আমাদেরকে গ্রিনল্যান্ডের অক্ষাংশে অবস্থান দেখিয়েছো,” টম একদিন ওকে ডেকে বকুনি দিলো। সেদিনের হিসাবে বিশাল একটা গড়মিল করে ফেলেছিলো ফ্রান্সিস।

“ভুল হয়ে গিয়েছে, চাচা।”

“অ্যাডমিরাল স্যার ক্লাউডেসলি শোভেল-এর কথা শুনেছো? দুই বছর আগে, উনি নিজের অবস্থান বের করতে ভুল করে ফেলেন আর ওনার পুরো বহর নিয়ে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের দিকে চলে যান। ওখানকার পানির নিচের পাহাড়ে বেধে ওনার চারটা জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যায় দুই হাজার মানুষ। উনি নিজেও ছিলেন তার ভেতর। তাতে করে অবশ্য আত্মহত্যা করার ঝামেলা থেকে বেঁচে যান উনি।”

ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “আচ্ছা, বুঝেছি।”

টম ওর স্বর নরম করলো। “তোমাকে বুঝতে হবে, ফ্রান্সিস। জাহাজে মাত্র তিনজন লোক আছে যারা সূর্যের অবস্থান নিখুঁতভাবে বের করতে পারে। এখন যদি আমার বা আলফ উইলসনের কিছু একটা হয়-ধরো কোনো ঝড়, বা দস্যুর আক্রমণ, বা জাহাজ কিছুর সাথে ধাক্কা খায়-তাহলে একমাত্র তুমিই আছো যে কিনা জাহজটাকে নিরাপদে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।”

“আমি আসলে সেভাবে ভেবে দেখিনি।”

“আমি এই জাহাজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারি না। কেপ টাউনের জাহাজঘাটার কেরানি vOC-র হয়ে কাজ করে। আমার কাছে থেকে সে ইচ্ছে করে বেশি টাকা নিয়েছে। আমার নিজের সব টাকা তো বটেই, তার সাথেও বাড়তি অনেক টাকা এই অভিযানের সাথে জড়ানো। যদি জাহজটা ডোবে তাহলে আমিও ডুবে যাবো।”

*

“ওর উপর ওর সৎ বাবার প্রভাব নিয়ে ভয় হয় আমার,” নিজেদের কেবিনে শুয়ে এক রাতে সারাহকে বললো টম। জাহাজে প্রতি কেবিনে একজনের শোয়ার মতো করে খাট ছিলো, কিন্তু টম কাঠ মিস্ত্রিকে বলে ওর ঘরের খাটটা দুজন শোয়ার মতো করে বানিয়েছে। পাশাপাশি শুয়ে আছে ওরা। ভ্যাপসা আবহাওয়ার কারণে দুজনেরই পরনে কোনো কাপড় নেই। ওনার মতো একজন জুয়াড়ির নিশ্চয়ই নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। যদি ফ্রান্সিসও সেসব শিখে নেয়?”

“তাহলে সেসব অভ্যাস ছাড়িয়ে দেওয়া হবে,” সারাহ পাশ ফিরে শুলো। টম এর বুকে মাথা রেখে ওর হৃৎস্পন্দন শুনছে।

“আর তার উপর ওর শরীরে বিলির রক্ত বইছে,” টম আবার বললো।

“আমার বাবা আজীবন শুধু লাত্রে ধান্দা করেছেন, আর আমার মায়ের ধ্যান জ্ঞান ছিলো শুধু খাওয়া। আর আমি কি তাদের মতো অতপ্ত দানব হয়েছি?”।

টম মাথার উপরের নিচু ছাদটার দিকে চেয়ে রইলো। উপর থেকে পাহারাদারের মাপা পদধ্বনি ভেসে আসছে।

“একজন মানুষের মানুষ হওয়ার পিছনে কি থাকে?” জোরে জোরে চিন্তা করতে লাগলো টম। “এটা কি বংশগত? নাকি পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয় সবাই?”

সারাহ কনুইতে ভর দিয়ে হাতের উপর মাথা রাখলো। ওর বয়স সবে তিরিশ পেরিয়েছে। কিন্তু এখনো কিশোরী মেয়েদের মতোই চপল। ওর সোনালি আভার চামড়া একেবারে মসৃণ, স্তন নিখুঁত আর উন্নত আর চোখ ঠিক ডেভনের আকাশের মতোই পরিষ্কার আর নীল।

‘ফ্রান্সিস বংশগতভাবে যে গুণাবলিই পাক বা কারো কাছ থেকে যা কিছুই শিখুক-ও কিন্তু সেই সবার চাইতে আলাদা একটা মানুষ হবে। তুমি শুধু ওকে সঠিক পথটা চিনিয়ে দিতে পারো। ও সঠিক পথে না হাঁটলে সেটা তোমার দায় না।”

সারাহের লম্বা কেশরাজি টমের বুকের উপর ছড়িয়ে আছে, ওর কেমন সুড়সুড়ি লাগছে তাতে। সারাহ আঙুল দিয়ে টমের পেশির বাইরের দিকটায় বুলাতে লাগলো। ধীরে ধীরে নিজের কাজ করছে ও। টম টের পেলো ওর ভাবনা অন্যদিকে সরে যাচ্ছে।

সারাহ টমের ঠোঁটে চুমু খেলো। ওর চোখ চকচক করছে। তবে আমি কিন্তু মায়ের প্রভাব থেকে পুরো মুক্ত নই। কিছু কিছু ব্যাপারে আমার লোভ খুব বেশি! যেমন তোমার আদর।”

*

কেপ কোমোরিন পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ওদের ভাগ্য সুপ্রসন্নই থাকলো। এটা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ব দক্ষিণ প্রান্ত। জায়গাটা একবার পার হতে পারলেই ওদের আর মৌসুমি বায়ুর ভয় থাকবে না। ইদানীং ঝড়ের জন্যে পশ্চিম উপকূলে জাহাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“একবার অন্তরীপটা পার হতে পারলেই আর চিন্তা নেই। সিলন ঘুরে মাদ্রাজ পর্যন্ত একেবারে মাখনের মতো রাস্তা,” টম বললো। সামনের টেবিলে একটা চার্ট বিছানো। সেটার দিকে তাকিয়ে যেনো জোর করেই নিজেকে আশ্বস্ত করলো টম। ওরা ঠিক ঋতু বদলের সময়টাতে এখানে এসে পৌঁছেছে, তার উপর আজ সারা বিকেল বাতাস স্থির হয়ে আছে। এখনো নিরাপদ না ওরা।

“সিলনে নীলার খনি আছে,” অ্যানা বললো। “ওগুলো হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে দামী পাথর। রানি সেবার মন জয় করার জন্যে রাজা সলোমন নাকি তাকে এই পাথরা উপহার দিয়েছিলেন।”

টেবিলের উল্টো পাশে বসা ফ্রান্সিসের মুখভঙ্গি দেখছে টম। ও কি ভাবছে সেটা পড়ার চেষ্টা করছে। সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ও অ্যানার দিকে তাকালো, কথাটা কি অ্যানা ইচ্ছেকৃতভাবে ফ্রান্সিসের মাথায় ঢোকানোর জন্যে বললো কিনা সেটা ভাবছে।

“আমরা কি সিলনে একবার নামতে পারি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।

“ফেরার পথে দেখা যাবে,” টম বললো। “এই মুহূর্তে আমাদের এক দলা পনির কেনারও সামর্থ্য নেই।” পরের কথাটা ও ঠাট্টার ছলে বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু কেনো যেনো সেটা বেশ রুঢ় শোনালো।

“দামী পাথরের ব্যবসা কিন্তু অনেক লাভের,” অ্যানা বললো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে টম কোনো ছলনা দেখতে পেলো না। শুধু এক ব্যবসায়ীর বেশি লাভ করার অভিপ্রায়। “কয়েক বছর আগে মাদ্রাজের গভর্নর স্যার থমাস পিট বিশাল বড় একটা হীরা কিনেছিলেন। ওটার ওজন ছিলো প্রায় সোয়া এক পাউন্ড, চারশো দশ ক্যারেট ছিলো পাথরটা।”

শুনে এবার টমও আগ্রহী হয়ে উঠলো। মৃদু স্বরে শিষ দিয়ে উঠলো ও।

“এক ভারতীয় শ্রমিক গোলকান্দার খনিগুলোর একটা থেকে চুরি করে এনেছিলো হীরাটা। লোকটার পায়ে বিশাল একটা দগদগে ঘা ছিলো। তার ভিতরে লুকিয়ে খনি থেকে বের করে এনেছিলো হীরাটা। খনির পাহারাদারেরা কিছুই টের পায়নি। পিট ওটার জন্যে বিশ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন। পাথরটা কেটে পালিশ করার পর ওটার দাম লক্ষ পাউন্ড ছাড়াবে।”

“গোলকান্দা কি মাদ্রাজের কাছে?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।

“দুইশো মাইল ভিতরে। তবে সব ভালো ভালো পাথরই মাদ্রাজে আসে।”

“তাহলে দোয়া করো যেনো আমরা এতো বেশি লাভ করতে পারি যা দিয়ে কয়েকটা পাথর কেপ টাউনে কিনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়,” টম বললো। “আমি বাজি-”

টম কথা থামিয়ে চুপ করে গেলো হঠাৎ। কিছু একটা অস্বাভাবিক ঠেকছে ওর কাছে। যেনো জাহাজের কাঠের ভিতর দিয়ে ওর কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছে। ও উঠে দাঁড়ালো, সাথে সাথেই শব্দ হলো দরজায়।

“দুঃখিত স্যার,” মেট বললো। “বাতাস পড়ে গিয়েছে। আবহাওয়ার মতি গতিও ভালো ঠেকছে না। মাস্টার বললেন একটা ঝড় নাকি আসছে।”

টম প্রায় দৌড়ে ডেক-এ উঠে এলো। ওরা নিচে গিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। এইটুকুতেই সমুদ্র ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। বিশাল বিশাল ঢেউ ফুলে উঠছে চারপাশে; দড়িগুলোতে বাধা পেয়ে বাতাস যেনো আর্তচিৎকার করে বেড়াচ্ছে। এক অশুভ, নীলচে-লাল আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রের উপরিভাগ। দিগন্তে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে মাথা গলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু পারছে না।

“সব পাল নামাও এখনি, শুধু মাঝেরটা রাখো,” টম আদেশ দিলো। “ওটাকেও অর্ধেক তুলে রাখো। উপর থেকে গজ খানেক থাকবে শুধু। সমুদ্রের নোঙ্গরগুলো প্রস্তুত করে রাখো তাড়াতাড়ি।”

লোকজন ঝটপট কাজে লেগে গেলো। দড়ি ধরে টেনে পাল গুটিয়ে ফেলছে। টম ফ্রান্সিসকে ডাকলো।

“কুয়োর গভীরতা কতোটুকু মেপে আসো।” কুয়োটা আসলে জাহাজের ঠিক মাঝের একটা গর্ত। জাহাজের পেটে যতো পানি ঢোকে তা ওখানে জমা হয়। সাগর যতোই ঠাণ্ডা হোক, বা জাহাজটা যতোই ভালো করে বানানো হোক কেন, খোলে পানি ঢুকবেই। আর ঝড়ের কারণে জাহাজের তক্তাগুলোর উপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। ঢেউ এসে খোলে বাড়ি দিয়ে তক্তাগুলো নাড়িয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই ফুটো হবে অনেকগুলো। যদি পানি ঠিকমতো সেচ দিয়ে বের করা না যায় তাহলে পানির কারণে জাহাজের ওজন আরো বেড়ে যাবে, তখন ওটা ঠিকমতো চালানোও যাবে না, ফলে জাহাজ ঢেউয়ের প্রতি আরো বেশি নাজুক হয়ে যাবে। আর জাহাজ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

ফ্রান্সিস পানি মাপার কাঠিটা হাতে ফিরে এলো। “ছয় ইঞ্চি।”

“খারাপ না।” তবে টম কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি না। “পালগুলো গোটানো হলেই সবাইকে পানি সেচতে পাঠিয়ে দেবে। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর লোক বদল করবে।”

“আচ্ছা।” বলে ফ্রান্সিস দৌড়ে গেলো আদেশ পালন করতে। টম ঘুরে দেখলো অ্যানা আর সারাহ শাল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“ঝামেলা কি খুব বেশি?” সারাহ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো। বাতাসের তোড়ে ওর মাথার চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছে।

“আমাদের সামনে আরো একশো মাইল খোলা সাগর,” টম বললো। “কেস্ট্রেল অনেক ভালো একটা জাহাজ। তাই ভাগ্যের সহায়তা পেলে আশা করছি ঝড়ের আগেই জায়গাটা পেরিয়ে যেতে পারবো।”

“আর এখন?” সারাহ বললো। “আমি আর মিস দুয়ার্তে কি করতে পারি?”

“নিচে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকো। আর প্রার্থনা করো যেনো ঝড় চলে যায় দ্রুত।”

*

বাতাসের বেগ বাড়তেই লাগলো। সাগর ফুলে ফুলে উঠছে। ঢেউগুলো একেকটা এতো বড় যে ওটার উপর দিয়ে ওপাশে আর দেখার উপায় রইলো না। কেস্ট্রেল একবার ঢেউয়ের মাথায় উঠছে আবার ঝপাস করে আছড়ে পড়ছে। পানির তোড়ে ডেক-এর উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে টমের। রাত নামলো একসময়, তবে দিনের বেলাতেই এতো বেশি অন্ধকার ছিলো যে তফাতটা খুব বেশি বোঝা গেলো না। কেউ ঘুমাতে পারলো না। টম ডেক-এ পায়চারি করতে লাগলো, হালীকে এই বৈরি সাগরেরো ঠিকভাবে হাল ধরে রাখতে সাহায্য করলো। জাহাজের ছেঁড়া দড়াদড়ি আর মাস্তুলের দিকে কড়া নজর রাখলো। এতো দ্রুত ঝড়টা এগিয়ে এলো যে অর্ধেক ভোলা পালটা নামানোরও সময় পেলো না টম। শেষ পর্যন্ত ওর জাহাজের কোনো অংশ আস্ত থাকবে কিনা সেটা নিয়েই চিন্তায় পড়ে গেলো

ওর আশংকাই সত্যি হলো। মাঝরাতের একটু পরে, জাহাজটা প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠলো। এতো জোরে শব্দ হলো যে ঝড়ের মাঝেও স্পষ্ট শোনা গেলো। আলফ উইলসন দৌড়ে এলো অন্ধকার থেকে।

“সামনের পরীটা ভেঙ্গে পড়েছে।”

“এখুনি ওটাকে কেটে ফেলো, এখুনি।” আদেশ দিলো টম।

পরীটার ভাঙা অংশটুকু ডেক-এ টেনে আনতেই টম টের পেলো যে ওর জাহাজ উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। যদি জাহাজটা বাতাসের আড়াআড়ি চলে আসে, তাহলে বাতাস ধাক্কা দিয়ে জাহাজটা একটা পিপার মতো করে উল্টে ফেলবে। হালী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে আবার আগের দিকে ঘোরাতে। কিন্তু জড়তার কারণে পারছে না। সাগর আজ এতো শক্তিশালী যে, যে কোন সময় পুরো হালটাই ভেঙ্গে যেতে পারে।

টম নিজে সব কাজে নেতৃত্ব দিতে লাগলো। জাহাজের উপর যে ঢেউগুলো। এসে পড়ছে সেগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। ওগুলোকে আটকানো অসম্ভবই বটে, কোমরে রশি বেঁধে না রাখলে জাহাজ থেকে পড়েই যেতো। চেহারায় ঢেউয়ের বাড়ি খেলো, চোখে ছোবল খেলো। বলা যায় অন্ধই হয়ে গেলো ও, হাতের কুড়ালটা দিয়ে যে জাহাজের কিনারে বাঁধা দড়াদড়ি কেটে দেবে সেই উপায়ও রইলো না। আরো একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়লো।

জাহাজের সবচে বড় মাস্তুলের সাথে বাধা দড়িটার দিকে কুড়াল চালালো। টম। প্রবল বাতাসে ওটা টানটান হয়েই ছিলো। ওটা কাটা না হলে পুরো মাস্তুলটাকেই ভেঙ্গে ফেলতো।

ওর কুড়ালের কোপে কেটে গেলো দড়িটা। আচমকা প্রচণ্ড টান মুক্ত হওয়ায় ওটার মুক্ত প্রান্ত বাতাস কেটে একদিকে ছুটে গেলো। টম তীরবেগে ওটার পথ থেকে সরে গেলো। এক ইঞ্চির জন্যে সেটা ওর চোখে এড়িয়ে পিছনের লোকটার চেহারায় গিয়ে লাগলো। চিৎকার করে উঠে পড়ে গেলো লোকটা। সাথে সাথে একটা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো তাকে। তারপর একটানে জাহাজের কিনারে টেনে নিয়ে গেলো।

লোকটার কোমরে একটা দড়ি বাঁধা, কিন্ত জাহজ থেকে পড়ে গেলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না। কেউ তাকে জাহাজের খোলের গায়ে পিষে মারবে। টম দৌড় দিলো। ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে আছে তক্তাগুলো। ও ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার কোমর আঁকড়ে ধরে টেনে নিয়ে আসলো, ঠিক সেই মুহূর্তে আর একটা ঢেউ ভেঙ্গে পড়লো ওদের উপর।

দড়াম করে একটা শব্দ হয়ে পুরো ডেক কেঁপে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্যে টমের মনে হলো একটা মাস্তুল বুঝি ভেঙ্গে পড়েছে। ও উপরে তাকালো, ভেবেছে দেখবে যে ওটা ভেঙ্গে ওর উপরেই পড়ছে। কিন্তু দেখা গেলো মাস্তুল ঠিকই আছে, একটা ছেঁড়া পাল ওটা থেকে পতপত করে উড়ছে।

“কিছুতে বাড়ি খেয়েছি নাকি আমরা?” এই অঞ্চলে পানির কোনো নিচে লুকানো পাহাড় বা প্রবাল প্রাচীর নেই। তবে ঝড়ের তোড়ে ওরা যে কোথায় এসেছে সে সম্পর্কে টমের কোনো ধারণাই নেই।

“পরীটা স্যার, আলফ চেঁচিয়ে জবাব দিলো। “কেটে ফেলার পর ডেক এ আছড়ে পড়েছে।”

টম জাহাজের পিছন দিকে সরে আসতেই দেখে ফ্রান্সিস উপরে ওঠার হ্যাচটা দিয়ে উঠে আসছে। টলতে টলতে ও এগিয়ে এলো টমের দিকে। ওর হাত ফোস্কায় ভরে গিয়েছে।

“পানি বাড়ছে।” ঝড়ের ভিতরে কথাগুলো টমের কানে পৌঁছাতে ওকে ফুসফুসের সবটুকু বাতাস খরচ করতে হলো। “এতো বেশি উঠছে যে আমরা সেঁচে সারতে পারছি না।”

“চেষ্টা করে যাও। তুমিই আমার শেষ ভরসা।”

*

রাতটা মনে হচ্ছিলো শেষই হবে না। ঝড়ের বেগ এক ফোঁটাও কমলো না। কখন যে ভোর হয়ে সকাল হয়েছে কেউ টেরই পায়নি। যখন বৃষ্টি চোখে পডলো তখন টম ব্যাপারটা ধরতে পারলো। ও নিজের লবণে ভরা চোখটা ডলে জাহাজের দিকে নজর দিলো। শুধু পরীটা না, জাহাজের সামনের আর মূল মাস্তুলটাও ভেঙ্গে পড়েছে, ওগুলোয় বাঁধা দড়িগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। পালগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ফিতার মতো ঝুলছে। বাকি মাস্তুলটাও পুরোপুরি ফাঁকা। তবে তাতেও জাহাজটার গতি খুব একটা কমেনি। সেই সাথে বাতাসের বেগও মনে হচ্ছে আরো বেড়েছে।

“আরো খারাপ হতে পারতো অবস্থা,” নিজেকে সান্ত্বনা দিলো টম। জাহাজটা এখনো ভাসছে, আর ওর সব লোকজনই এখনো অক্ষত। ওদের কাছে এখনো যথেষ্ট ক্যানভাস কাপড় আর অতিরিক্ত মাস্তুল আছে যা দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করে মাদ্রাজ পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে। কুয়োর ভিতরের পানি বেড়েই চলেছে, তবে এখন দিন হওয়ায় খোলের গায়ের ছিদ্রগুলো মেরামত করা সম্ভব হবে। ফ্রান্সিস সারা রাত খোলের ভিতরেই ছিলো। নিজেও পালাক্রমে পানি সেঁচেছে আবার অক্লান্তভাবে অন্যদেরকেও উৎসাহ দিয়েছে। টমের বুক ভরে গিয়েছে ওকে দেখে।

আরো খানিকটা আলো বাড়লো। মাঝে মাঝে জাহাজটা ঢেউয়ের মাথায় উঠে দুলে উঠছে, ঝাপসাভাবে হলেও তখন দিগন্তে শান্ত পানি দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত কেটে যাচ্ছে ঝড়টা।

“ওটা কি?” হালী বলে উঠলো।

টম সেদিকে তাকালো। “কি?”

কিন্তু জাহাজটা তখন ঢেউয়ের মাথা থেকে নেমে যাওয়ায় কিছুই দেখা গেলো না। আবার জাহাজটা আর একটা ঢেউয়ের মাথায় চড়ে বসতেই টম দিগন্তে সাদাটে কিছু একটা দেখা গেলো।

“ডুবো পাহাড়,” চিৎকার দিয়ে উঠলো একজন নাবিক। “সামনেই ডুবো পাহাড়।”

টম একটা পাই গ্লাস নিয়ে চোখে লাগালো। “অসম্ভব। আমরা পাড় থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ মাইল দূরে থাকার কথা।”

আবারও কেস্ট্রেল ঢেউয়ের মাঝে নেমে যেতেই সামনের দৃশ্যটা অদৃশ্য হয়ে গেলো। এক মুহূর্ত পরেই আর একটা ঢেউয়ের মাথায় চড়ে বসলো জাহাজটা। আর এবার স্পষ্ট দেখা গেলো সবকিছু।

“ডাঙা।” ডাঙাটা এতোক্ষণ অদৃশ্য হয়ে ছিলো। কালো আকাশের কারণে আবছায়ায় কারো চোখে পড়েনি। কিন্তু ডুবো পাহাড়ের সারি স্পষ্ট বোঝ যাচ্ছে। দিগন্তে একসারি ধারালো দাঁতের মতো কিড়মিড় করছে ওগুলো।

হতে পারে ওটা আসলে একটা অজানা প্রবাল প্রাচীর বা কোনো উপকূলের শেষ মাথা, যেটা ওখানে থাকার কথা না। এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই টমের। আর এই মুহূর্তে এটা নিয়ে ভাবারও বিন্দুমাত্র সময় নেই।

কেবিনের দরজা খুলে সারাহ এসে হাজির হলো। হাতে বিস্কুট আর একটা লবণ মাখানো মাংসের টুকরো। জাহাজের দুলুনির সাথে তাল রেখে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো ও।

“সারা রাত কিছু খাওনি। কিছু খেতে হবে এখন।” তারপর টমের মুখের ভঙ্গি দেখে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে?”

“সামনেই ডাঙা,” টম বললো। “কিভাবে এখানে আসলো জানিনা। স্রোতের ধাক্কায় মনে হয় ধারণার চাইতেও দূরে চলে এসেছি।” তারপর টের পেলো কথা বলে ওর মহামূল্যবান সময়ের অপচয় করছে। “যেটাই হোক, এখন সামনেই ডাঙা, আর দ্রুত কিছু করতে না পারলে সোজা ওটায় গিয়ে ধাক্কা খাবো।”

সারাহ টমের চেহারা দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলো। এতো বছর একসাথে সমুদ্রে কাটিয়ে এতো এতো ভয়াল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরেও ও খুব কমই টমকে এতোটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে দেখেছে।

টম ডেক-এর মাঝখানে দৌড়ে গেলো। “জাহাজকে ঘুরিয়ে ফেলতে হবে।”

আলফ উইলসন ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। “এই আবহাওয়ায়? জাহাজের সবগুলো মাস্তুল ভেঙ্গে যাবে তো-আরো খারাপ কিছু হতে পারে।”

“সেটা না করলে সোজা ডাঙ্গায় গিয়ে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবো।”

সেটা সবাই বুঝতে পেরেছে। দড়াদড়ির যেটুকু অবশিষ্ট ছিলো তাই নিয়েই দৌড়ে গেলো নাবিকেরা। একটা পাল খাটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাতাসের কারণে কাজটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। ক্যানভাসটা বার বার ফুলে উঠে হাত থেকে ছুটে যেতে লাগলো। শত চেষ্টা করেও ধরে রাখা গেলো না। মূল মাস্তুলের অবশিষ্টাংশ ভেঙে সাগরে গিয়ে পড়লো।

“এরপরে দেখা যাবে নাবিকদের কেউ পানিতে গিয়ে পড়েছে,” আলফ বললো।

“যদি পাল খাটানোনা যায় তাহলে আমরা সবাই ডুবে মরবো।”

পাল ছাড়া এই বাতাসের বিরুদ্ধে লড়ে ওরা কিছুতেই ডাঙা থেকে দূরে যেতে পারবে না। এমনকি পাল খাটানোর পরেও পুরো নিশ্চয়তা নেই। এই ফুঁসে ওঠা প্রমত্তা সাগর আর প্রবল বাতাসের বিরুদ্ধে গিয়ে জাহাজটা উল্টো দিকে চালাতে হবে ওদের। আর হাতে আছে খুবই কম সময়।

“উপকূল কাছিয়ে আসছে,” আলফ বললো। ঝড়ের কারণে কিছুই। ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, তাই টম বুঝতে পারছে না যে ওরা আসলে ঠিক কতোদূরে আছে। এখান থেকে স্পষ্ট সৈকতের সাদা বালু আর বাতাসের তোড়ে সারসের গলার মতো বেকে যাওয়া পাম গাছগুলো দেখা যাচ্ছে।

ঈশ্বর, মাঝে যেনো কোনো পাথর বা প্রবাল না থাকে, মনে মনে প্রার্থনা করলো টম। ও ঢেউয়ের দিকে তাকালো, ওদিক থেকে আবার বিপদ আরো বাড়ে কিনা নজর রাখছে।

একজন নাবিক ধপ করে ডেক এর উপর পড়ে গেলো। টম ভাবলো লোকটার হাত-পা কিছু ভেঙ্গে টেঙ্গে গেলো কিনা। তবে লোকটা পিঠ ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়ালো। পড়ার পর ডেক-এ পিছলে যাওয়ার কারণে জ্বলছে সেখানে।

“পাল খাটানো হয়েছে স্যার।”

টম উপরে তাকিয়ে দেখে অবশেষে ক্যানভাসের টুকরোটা বশ মেনেছে। যদিও বাকা হয়ে ঝুলছে ওটা। ঠিকমতো বাঁধতে না পারায় ফাঁকা জায়গা দিয়ে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে এতেও চলবে।

“ঘুরিয়ে ফেলো জাহাজ।”

“সোজা দিকে জায়গা নেই অতো,” আলফ মনে করিয়ে দিলো।

“ক্লাব হলিং করে ঘোরাবো জাহাজকে,” টম ঠিক করলো। ক্লাব হলিং হচ্ছে শেষ ভরসা। এই কৌশলে জাহাজের সামনের দিকটাকে জবরদস্তির মাধ্যমে বাতাসের বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এখন ওদের আর কোনো উপায় নেই। নাবিকেরা নোঙ্গরের গায়ে এক কাছি দড়ি বেঁধে জাহাজের সামনের দিকে বেঁধে দিলো।

“আপনি কি নিশ্চিত?” মেট বললো। “নোঙ্গরটা গেলে কিন্তু আমরা পুরোপুরি সাগরের দয়ায় পড়ে যাবো।”

“আমাদেরকে ডাঙা থেকে দূরে সরে যেতে হবে,” টম চেঁচিয়ে জবাব দিলো। “নোঙ্গর ছুঁড়ে মারো।”

নোঙ্গর পানিতে গিয়ে পড়লো। একই সাথে সর্বশক্তি দিয়ে হাল টেনে ধরা হলো। খুবই আস্তে, একটু একটু করে ঘুরে যেতে লাগলো জাহাজের মুখ। ঢেউয়ের সাথে সমান্তরালে চলে আসায় জাহাজ কাত হয়ে গেলো একদিকে। প্রচণ্ড জোরে কাঁপছে।

“দড়ি কেটে দাও।” কুড়াল হাতের লোকগুলো নোঙ্গরের সামনের দিকের দড়ি কেটে দিলো। জাহাজটা ঝাঁকি দিয়ে ভারমুক্ত হলো। এবার জাহাজের পিছনের দিকের দড়িতে টান পড়লো। আর জাহাজটা ঘুরতে লাগলো।

তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না ব্যাপারটা। ঢেউ আর বাতাস একসাথে দুটো প্রতিপক্ষের কারণে, জাহাজটা পর্যাপ্ত গতি পাচ্ছিলো না। আবার ওটা বাতাসের দিকে ঘুরে যেতে লাগলো।

আরো দুজন লোক হালীর সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে টেনে ধরলো। হাল। জাহাজের নাকটা সোজা রাখতে কষ্ট হচ্ছে। আচমকা ওরা সবাই হুড়মুড় করে ডেক-এর উপড় আছড়ে পড়লো। আর হালের চাকাটা বনবন করে ঘুরতেই লাগলো। ওটার সাথে আর কোনো কিছুর সংযোগ নেই।

“হালটা গেলো,” চেঁচিয়ে উঠলো হালী।

“সাথে পাল-ও,” বললো আলফ। পালটা একেবারে মাঝ বরাবর ফেসে গিয়েছে। জামার সামনের দিকের মতো লাগছে এখন ওটাকে।

কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কেস্ট্রেল আবার পিছনে সরে গেলো। ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগলো ওটার খোলের উপর। আস্তে আস্তে আবার সমুদ্রের সমান্তরালে চলে আসছে ওটা। টম জাহাজের বামপাশে তাকাতেই দেখলো বিশাল একটা ঢেউ ওদের মাথার উপর দিয়ে এগিয়ে আসছে।

“সাবধান!”

ঢেউটা একদম সোজা কেস্ট্রেল-এর পাশে এসে আঘাত করলো। জাহাজটা উল্টে যেতে যেতে গেলো না। দুনিয়াটাই উল্টে গেলো যেনো। জাহাজের পাটাতন একেবার সমুদ্রতলের সাথে লম্ব হয়ে গিয়েছিলো প্রায়। মাস্তুলগুলো এতোটাই ঝুঁকে গিয়েছিলো যে ঢেউ স্পর্শ করলো ওগুলো। যারা কিছু আঁকড়ে ধরার সময় পায়নি, তারা অকস্মাৎ খেয়াল করলো পায়ের নিচে কিছু নেই। সোজা সমুদ্রে গিয়ে পড়লো তারা। কয়েকজন দড়িদড়া আকড়ে ধরেছিলো; বাকিরা ভেসে গেলো। টম দেখলো একটা লোকের মাথা সোজা নোঙ্গরের কপিকলের একটা কাঠে গিয়ে বাড়ি খেলো। সাথে সাথে ডুবে গেলো লোকটা, আর ভাসলো না।

ডানদিকের একটা কামানের বাধন আলগা হয়ে গিয়ে গড়াতে গড়াতে উল্টো দিকের কিনারাটা গুঁড়িয়ে পানিতে ডুবে গেলো। বাকি কামানগুলোও টান টান হয়ে থাকলো।

“মাস্তুলগুলো গোড়া থেকে কেটে ফেলো,” চিৎকার করে ডাকলো টম। একটু পরেই জাহাজটা আবার সোজা হবে, আর তখন মাস্তুলগুলো এটাকে একটা পেন্ডুলামের মতো উল্টোদিকে বাঁকিয়ে ফেলবে। আর এভাবে হতে থাকলে জাহাজটা দুলতে দুলতে উল্টেই যাবে।

কয়েকজনের হাতে তখনও কুড়াল ধরা ছিলো। ফেনায় ভরা ডেক-এ পিছলে পড়তে পড়তে ওরা দৌড়ে গেলো বড় মাস্তুলটার দিকে। বেশি কষ্ট করতে হলো না। সামান্য কেটে দিতেই অভিকর্ষ আর সাগরই বাকি কাজটা সারলো। দড়াদড়ি আর ক্যানভাস সহ ওটা ঝপাস করে গিয়ে পড়লো সাগরে। লোকজন লাফ দিয়ে ওটার রাস্তা থেকে সরে গেলো।

আবার সোজা হতে শুরু করলো কেস্ট্রেল। ডেক পুরো নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে উল্টোদিকে বেঁকে যেতে লাগলো। আরো, আরো… এতো বেশি যে পাশ দিয়ে পানি উঠে এলো।

ভাঙা মাস্তুলটাই বাঁচিয়ে দিলো ওদেরকে। পানিতে ঝুলে থাকায় ওটার ভর জাহাজটাকে সোজা রেখে উল্টে যাওয়া থেকে বিরত রাখলো। অল্পের জন্যে রক্ষা পেলো ওরা।

সব শেষ, টম ভাবলো। জাহাজের ডানপাশ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছে; সেদিক দিয়ে কলকল করে পানি ঢুকছে। কিছুক্ষণের মাঝেই জাহাজ ডুবে যাবে। সব দেখে কাউকে যে কিছু করতে আদেশ দেবে সেই মনোবল ওর থাকলো না।

ফ্রান্সিস ওর হাত ধরে ফেললো। টম ওকে ডেক-এ উঠে আসতে দেখেনি। “জাহাজের খোল পানিতে ভরে গিয়েছে; পাম্পগুলোও আর কাজ করছে না।”

কথাগুলো টমের শেষ আশাটাকেও মরীচিৎকার মতো মিলিয়ে দিলো। “জাহাজ ছেড়ে নেমে যাও,” আদেশ দিলো ও। “নৌকা নামাও।”

নৌকা নামানোর কথা কারো মাথায় ছিলো না। নৌকায় নামার সিঁড়িগুলো ভেসে গিয়েছে। টম নৌকার দড়িগুলো কেটে দিতেই ওগুলো বাঁকা হয়ে থাকা ডেক থেকে পিছলে পানিতে গিয়ে পড়লো। ঢেউ ওটাকে ভাসিয়ে নেওয়ার আগেই লোকজন যতো দ্রুত সম্ভব হুড়োহুড়ি করে নৌকায় চড়ে বসলো।

সারাহ কেবিন থেকে উপরে উঠে এলো। ওর হাতে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। ঝড়ের অমানিশার মাঝেও উজ্জ্বলতা কমছে না জিনিসটার। ওটা হচ্ছে। সেই নেপচুন তরবারি, গিলটি করা খাপে ভরা। টম যে কতোটা খুশি হলো বলতে পারবে না। সারাহ জানে এই ভাঙা জাহাজ থেকে একটা জিনিস যদি টম বাঁচাতে চায় তাহলে সেটা হচ্ছে এই তরবারিটা।

“নৌকায় ওঠো।” বলে টম পিছল ডেকটায় সারাহের হাত ধরে নিয়ে চললো যাতে ও পড়ে না যায়। আর একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। সারাহ লাফ দিলো। নৌকায় পড়া মাত্র ওর ধাক্কায় নৌকাটা উল্টেই গিয়েছিলো প্রায়। তবে ও তরবারিটা ছাড়লো না।

“এবার তুমি,” ফ্রান্সিসকে বললো টম। ওকেও ও এই ধ্বংসস্তূপের ভিতরে হাত ধরে নিয়ে চললো।

“লাফ দাও।”

ফ্রান্সিস না দিয়ে বললো। “অ্যানা কোথায়?”

টম চারপাশ তাকালো। ডেক ফাঁকা।

“ও সম্ভবত নৌকায় উঠে পড়েছে।” দেরি করার সময় নেই। টম ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে নৌকায় ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ দিলো। একেবারে ফ্রান্সিসের উপর এসে পড়লো ও। দুজনে জড়াজড়ি করে গড়িয়ে গেলো আর নৌকাটাও দুলে উঠলো প্রচণ্ডভাবে।

ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। “অ্যানা কোথায়?” আবার বললো ও।

টম আশেপাশের মুখগুলো জরিপ করলো। অ্যানা নৌকায় নেই।

“ও তো আমার সাথেই কেবিনের দিকে গিয়েছিলো,” সারাহ বললো।

ফ্রান্সিসের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। “আর উপরে আসেনি?”

“আমাকে বলেছিলো তোমাকে খুঁজতে যাবে।”

জাহাজটা কেঁপে উঠলো। একটা আহত জন্তুর মতো গোঙ্গাচ্ছে ওটা। কাটা মাস্তুলটা বিচ্ছিন্ন হয়ে সাগরে পড়ে গেলো। এতো কাছে যে আর একটু হলে নৌকার উপরেই পড়তো। টম ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রেখে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, “এখন আর কিছুই করার নেই।”

“না”

আচমকা একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে এতো উপরে তুলে দিলো যে ওটা জাহাজের খোলের গায়ে বাড়ি খাওয়ার উপক্রম হলো। টম কিছু করার আগেই লাফ দিলো ফ্রান্সিস। চিৎকার দিয়ে উঠে আতংকিত চোখে টম দেখলো যে ফ্রান্সিস উন্মত্ত সাগর পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে জাহাজের দিকে। ওর বাড়িয়ে রাখা দুই হাত পাখির ডানার মতো বাতাসে ঝাঁপটাচ্ছে। একটা ঢেউ এসে জাহাজের উপর আছড়ে পড়তেই ও ডুবে গেলো পানির নিচে। টমও ঝাঁপ দিতে গেলে কিন্তু ঐ ঢেউটাই নৌকাটাকে এক ধাক্কায় জাহাজ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিলো।

তবে ফ্রান্সিস তখনও টিকে আছে। ফেনা সরে যেতেই টম দেখলো ফ্রান্সিস জাহাজের একটা রশি আঁকড়ে ভেসে আছে, আর জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসা পানির বিপরীতে নিজেকে টেনে সামনে আগানোর চেষ্টা করছে।

“আমাদেরকে ওকে উদ্ধার করতে হবে,” আলফের উদ্দেশ্যে চেঁচালো টম।

কিন্তু বলামাত্র আরো একটা ঢেউ এসে নৌকাটাকে আরো দূরে নিয়ে গেলো। অর্ধেক দাঁড় পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। আর বাকি অর্ধেক ভাঙা। যদি এখন ওরা সাগরের সাথে লড়াই করতে যায় তাহলে নৌকা উল্টে সবাই ডুবে যাবে।

ফ্রান্সিসের এখন নিজেকেই যা করার করতে হবে।

৪. ফ্রান্সিস কেস্ট্রেল

ফ্রান্সিস কেস্ট্রেল-এর ভাঙা দিকটা দিয়ে নিজেকে টেনে তুললো। তারপর কাত হয়ে থাকা ডেক ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। মনে মনে প্রার্থনা করছে যেনো কোনো কামান দড়ি ছিঁড়ে ছুটে না আসে। হ্যাচের কাছে পৌঁছে মাথা গলিয়ে দিলো ভিতরে। নিচে নামার সিঁড়িটা ভেঙ্গে গিয়েছে। খোলের ভিতর আস্তে আস্তে পানিতে ভরে যাচ্ছে। ওর বুকটা ধড়াস করে উঠলো। কেউ কি এর মধ্যে বেঁচে আছে? ওর মনে হচ্ছে না।

শুধু কালো রঙের পানি দেখা যাচ্ছে।

অ্যানা?” চিৎকার করে ডাকলো ও।

কোনো উত্তর এলো না।

খোলের আরো খানিকটা ভেঙ্গে পড়তেই জাহাজটা আরো একটু কাত হয়ে গেলো। ওর হাতে একদম সময় নেই। ও কিনারটা আঁকড়ে ধরে নিচের পানিতে নেমে এলো। নিচের দিকটা পানিতে পুরোপুরি ভরে গেলেও উপরের দিকে ঠিকই বাতাস আছে। ও জাহাজের এটা সেটা ধরে ধরে পানির উপর নাক উঁচিয়ে সামনে আগাতে লাগলো।

জাহাজটা উল্টে গেলেই এর ভিতর আটকে যাবো, ভাবলো ফ্রান্সিস। জোর করে নিজেকে আতংকিত হওয়া থেকে বিরত রাখলো ও ভারসাম্য রাখতে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই কি যেন একটা ঠেকলো

লাশ। ঠাণ্ডা আর ভেজা, তবে ও নিশ্চিত যে ওটা একটা মানুষের শরীর। এই অন্ধকারে ওর পক্ষে বলা সম্ভব না যে এটা অ্যানা কিনা। ও শরীরটাকে নিজের দিকে টেনে এনে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বের করলো মাথাটা। তারপর ঘাড়ে হাত রাখতেই মৃদু পালস টের পেলো।

জাহাজটা আবারও কাত হলো কিছুটা, পানিও ঢুকলো আরো। ফলে ফাঁকা জায়গা আর থাকলো না। পানিতে ডুবে যাওয়ার আগে ফ্রান্সিস আর মাত্র একবার শ্বাস নিতে পারলো।

হ্যাচের কাছে যাও, নিজেকে বললো ও। পানি ওকে ঠেলে ছাদের সাথে ঠেসে ধরছে। অজ্ঞান শরীরটা হাত দিয়ে চেপে ধরে ও ডুব দিলো। নোনা জলের ভিতরে চোখ খোলা রাখতে খবর হয়ে যাচ্ছে। আবার ভোলা না রেখেও উপায় নেই। হ্যাচের খোলা জায়গাটা দিয়ে সূর্যের কিরণ দেখেতে পাওয়া মাত্র মরিয়া হয়ে পানিতে পা চালালো ও। ভাঙা কাঠের টুকরো এসে আঘাত করলো ওকে। একটুর জন্যে ছাদে আটকানো একটা লোহার হুক চোখে বিধলো না। তবে শেষমেশ ঠিকই হ্যাচ-এর কাছে পৌঁছাতে পারলো। এবার সাগরই বরং সাহায্য করলো ওকে। ফুলে ওঠা পানিই ওকে হ্যাচ দিয়ে বের করে ভাঙা সিঁড়ির উপর দিয়ে ডেক-এ টেনে তুললো।

এতোক্ষণে ও দেখতে পেলো কাকে উদ্ধার করেছে। অ্যানাকেই-অবশ্য এখন এখান থেকে যেতে না পারলে এতো কষ্টের কোন মানেই থাকবে না। ওদের হাতে কয়েক সেকেন্ড সময় আছে মাত্র। জাহাজ ডুবে যাচ্ছে।

“জাহাজ ছেড়ে যেতে হবে,” ফ্রান্সিস চিৎকার করলো। চারপাশের পানি জাহাজের ভাঙা টুকরো টাকরা দিয়ে ভরে গিয়েছে। এর ভিতর দিয়ে সাঁতরাতে গেলে ওগুলোর আঘাতে ভর্তা হয়ে যেতে হবে। তবে মাস্তুলটা সবকিছুর উপর দিয়ে একটা সাঁকোর মতো শুয়ে আছে। ওটার অমসৃণ গা ওটাকে সরতে দিচ্ছে না।

ওর কোলে অ্যানা নড়ে উঠলো। চোখ খুলে তাকালো সাথেসাথেই।

“কি-?”

“সময় নেই।” ফ্রান্সিস ওর পিঠে চাপড় দিলো। একগাদা নোনা পানি বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। “নড়তে পারবে তুমি?”

অ্যানা মাথা ঝাঁকালো। “মনে হয়।”

“তাহলে চলো, জাহাজ থেকে নামতে হবে।” ফ্রান্সিস অ্যানার হাত ধরে মাস্তুলটার কাছে নিয়ে গেলো। কাছে গিয়ে ওকে বলতে হলো না, একাই ওটা ধরে হামাগুড়ি দিয়ে পানির উপর দিয়ে আগাতে লাগলো। ফ্রান্সিসও আগালো পিছু পিছু।

এ যেনো এক বুনো ঘোড়ার পিঠে চড়া। এখনো পোষ মানেনি, গায়ে স্যাডলও পরানো নেই-এরকম কোনো ঘোড়া। মাস্তুলটা ক্রমাগত নড়ছে। মোচড়াচ্ছে, ঢেউয়ের আঘাতে দুলছে। ফ্রান্সিস চার হাত পা দিয়ে গুঁড়িটা আঁকড়ে ধরে ইঞ্চি ইঞ্চি করে আগাচ্ছে। মাঝে মাঝে উপরে উঠে আসছে, বাকি সময়টা গাছে ঝোলা বানরের মতো হাত পা দিয়ে ধরে ঝুলে থাকছে। ঠিক নিচেই গর্জন করছে ঢেউ।

সামনেই দেখতে পেলো জাহাজ থেকে আশেপাশে নজর রাখতে ক্রোজ নেস্ট নামের গোল গামলার মতো যে জায়গাটা ব্যবহার করা হয়, সেটা তখনও মাস্তুলের সাথে আটকে আছে। হামাগুড়ি দিয়ে ওটায় গিয়ে নামলো ফ্রান্সিস। অ্যানা আগেই নেমে একটা পাশ আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ফ্রান্সিস-ও অ্যানার পাশে হেলান দিয়ে বসলো। অবশেষে একটা আশ্রয় মিললো, যদিও ঝড় থেকে এখানে ওদের নিরাপত্তা খুবই কম।

ওখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। জাহাজটা এখনো ঝড়ের ধাক্কায় ঘুরছে; যে কোনো সময় মাস্তুলটা গড়ান খেয়ে ওদেরকে শুঙ্কু পানির নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওরা ধ্বংসাবশেষের অংশটুকু পেরিয়ে এসেছে, কিন্তু এখনো একটা ঢেউই ওদের কম্ম কাবার করে দিতে পারে। ফ্রান্সিস ঝড়ের মাঝেই চেষ্টা করলো নৌকাটাকে দেখার, আশা করছে টম আর বাকিরা নিরাপদেই আছে। কিন্তু ওদের কোন নিশানা পেলো না ও।

“সাঁতরাতে পারবে তুমি?” ফ্রান্সিস চিৎকার করে বললো অ্যানাকে।

অ্যানা মাথা নাড়লো। ফ্রান্সিস আর দেরি করলো না। অ্যানাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কয়েকশো গজ দূরেই ডাঙা দেখতে পাচ্ছে। তবে ও সোজা ওটার দিকে সাঁতরালো না। তার বদলে সমস্ত : শক্তি ব্যয় করলো শুধু ভেসে থাকার পিছনে। ও অ্যানার কোমরের নিচে হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে যাতে ওর মাথাটা পানির উপরে থাকে। অর্থাৎ স্রোতের কাছেই নিজেদের সঁপে দিয়েছে। স্রোতই ভাঙা জাহাজটা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে ওদেরকে। একসময় ধ্বংসস্তূপের শেষ অংশটাও পেরিয়ে এলো ওরা। এরপরেই শুরু করলো সাঁতার।

এতো কষ্টের পর আসলে ফ্রান্সিস স্রোতের ধাক্কা আর অনুভবই করছিলো না। ওগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারও চেষ্টা করলো না। স্রোতের টানে পানির নিচে ডুবে গেলো একবার, তারপর আবার লাথি মেরে মেরে উপরে উঠে এলো। আচমকা ও পায়ের নিচে শক্ত কিছু একটা অনুভব করতে পারলো। যে ঢেউগুলো ওদের এই ক্ষতির জন্যে দায়ী, সেই ঢেউই অবশেষে কৃপা করলো : ওদেরকে তুলে নিয়ে সৈকতের বালিতে আছড়ে ফেললো।

শরীরের শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে অ্যানাকে টেনে পানি থেকে দূরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেলো ফ্রান্সিস। যাতে স্রোতের টানে আবার ভেসে না যায়। সামনেই একসারি পাম গাছ দেখা গেলো। ওগুলোর নিচে গেলে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচা যায়, কিন্তু ফ্রান্সিস ফাঁকা জায়গাতেই থাকবে ঠিক করলো। বাতাসের চোটে গাছগুলো উলুখাগড়ার মতো বেঁকে যাচ্ছে, গাছের পাতা আর ফল প্রচণ্ড বেগে ছুটে যাচ্ছে একেক দিকে। গাছ থেকে পড়া নারিকেল কামানের গোলার মতোই মারাত্মক।

ফ্রান্সিসের সারা শরীর ব্যথা করছে। সাঁতার কেটে পা-গুলো এতোটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটাও আর নেই। ঝড়ো বাতাস এসে বিঁধছে ওর গায়ে। ইচ্ছে করছে বালি খুঁড়ে তার ভিতর শুয়ে থেকে ঝড় থামার অপেক্ষা করে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। টম এখনো সমুদ্রে, সাথে আছে সারাহ আর বাকি সব লোকজন।

ফ্রান্সিস অ্যানাকে শুইয়ে রেখে বাকিদের খুঁজতে বের হলো। অ্যানার জ্ঞান নেই প্রায়। কিছু জায়গা ফ্রান্সিস হামাগুড়ি দিলো, কোথাও দৌড়ে দৌড়ে সৈকত ধরে এগিয়ে চললো। উষ্ণ বৃষ্টির পানি পড়তে লাগলো ওর চেহারায়। বাতাসের ধাক্কায় বালি উড়ে এসে লাগতে লাগলো সারা গায়ে। কিন্তু তবুও থামার কথা চিন্তাও করলো না। টমের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সারা সৈকত খুঁজতে লাগলো। একসময় নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হতে লাগলো ওর। শেষে কাউকেই না পেয়ে সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই সর্বনাশা দুর্যোগের ভিতরে ওই ছোট্ট নৌকাটা টেকার সম্ভাবনা খুবই কম।

আর একটু এগিয়ে, সৈকতের পাশেই ফ্রান্সিস দেখলো বালির উপর একগাদা কাঠ পড়ে আছে। দৌড়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো ও। ওটা একটা ডিঙ্গি নৌকা, দুমড়ে মুচড়ে উল্টে পড়ে আছে। তবে এখনো আস্তই আছে। ওটার পাশের কালো অবয়বগুলো আসলে মানুষ। নৌকা থেকে যে যেখানে পড়েছে সেখানেই শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস দৌড়ে সবার কাছে গিয়ে দেখতে লাগলো। এক সময় সারাহকে খুঁজে পেলো, সবার শেষে পেলো টমকে।

“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আপনাদেরকে খুঁজে পেয়েছি।”

“আর অ্যানা?” সমুদ্রের দিকে ভীত চোখে তাকিয়ে বললো টম।

ফ্রান্সিস যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে দেখালো। “ও নিরাপদেই আছে।”

“আমরা এখন কোথায়?” খড়খড়ে কণ্ঠে বলে উঠলো সারাহ। লবণাক্ত পানি ঢুকে ওর গলা ছুলে গিয়েছে। পাশের বালিতে হাত ডুবিয়ে দিলো ও। টম নেপচুন তরবারির ঝিলিক দেখতে পেলো। এতো কিছুর পরেও সারাহ কিভাবে যেনো ঠিকই ওটাকে ধরে রেখেছে।

টম কাঁধ ঝাঁকালো। “বেচে আছি-এখন এটাই একমাত্র ব্যাপার।” জোর করে ও জাহাজডুবির ফলে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে সেসব ভাবা থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। সেসব নিয়ে পরেও ভাবা যাবে।

সারাহ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ধপ করে চার হাত-পায়ে বসে পড়ে বালির উপর বমি করে দিলো।

“এখানেই অপেক্ষা করো,” বললো টম।

টম আর ফ্রান্সিস অ্যানাকে আনতে গেলো। ওখানে পৌঁছে দেখে অ্যানার জ্ঞান ফিরেছে পুরোপুরি। কিন্তু নিজেই হেঁটে যাবে বলে জোর করে উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে আবার ফ্রান্সিসের গায়ে ঢলে পড়লো।

“আমি ভেবেছিলাম আমি মরেই গিয়েছি।”

“আমি সেটা হতে দিতাম না।”

টম বুঝলো ঝড়টা ফ্রান্সিসকে বদলে দিয়েছে। ওর মনের জোর এখন অন্য এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। ফ্রান্সিস অ্যানাকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো, আর টম অ্যানার চোখের দৃষ্টি খেয়াল করলো। সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতার চাইতেও আরো বেশি কিছু আছে। এখন আর অ্যানা ফ্রান্সিসকে একটা বাচ্চা ছেলে মনে করছে না, বরং পুরুষ হিসেবে দেখছে। হঠাৎ টমের নিজেকে কাবাবমে হাড্ডি মনে হতে লাগলো।

“আমাদের এখন যাওয়া উচিত।”

বেলা বাড়তেই পড়ে গেলো বাতাস, বৃষ্টির জোরও কমে গুঁড়ি গুঁড়ি পড়তে লাগলো। কিন্তু স্রোতের চেহারা পাল্টালো না; সৈকতে তাণ্ডব চালাতেই লাগলো। প্রতিবার আছড়ে পড়ার সময় শব্দ শুনে মনে হতে লাগলো যেনো বজ্রপাত হচ্ছে। নৌকাটা গায়েব হয়ে গিয়েছে। স্রোতে টেনে নিয়ে আছাড় মেরে গুড়ো গুড়ো করে ফেলেছে হয়তো। টমের প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগতে লাগলো, কিন্তু তবুও ও পুরো সৈকত চষে ফেলে কেস্ট্রেল-এর যে কয়জন তীরে আসতে পেরেছিলো তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করলো। আলফ উইলসনকে এদের মধ্যে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ও। তারপর সবাইকে নিয়ে যতোদূর সম্ভব সৈকতের উপরে উঠে গিয়ে, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে বসে রইলো।

সাগরে তখনও কেস্ট্রেল-এর খোলটা দেখা যাচ্ছে। স্রোত ভেঙ্গে পড়ছে। ওটার উপর। মাঝে মাঝে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আবার ভাসছে। একবার সেদিকে তাকিয়েই টম বুঝলো যে ওটার পক্ষে আর কোনোদিন সমুদ্রে নামা সম্ভব হবে না। ওটার পিছন দিক ভেঙ্গে গিয়েছে, ফলে খোলটা একেবার হা হয়ে খুলে আছে। মুল মাস্তুলের শুধু গোড়াটুকু আছে। বাকি দুটো ভেসে গিয়েছে কোথায় কে জানে? জাহাজের অর্ধেক তক্তা ভেসে ভেসে সৈকতে চলে এসেছে। ওটার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা জিনিসপত্রের উপর সামুদ্রিক পাখি এসে বসছে। যেনো কোনো শকুন একটা লাশকে ঠুকরে খাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

দৃশ্যটা সহ্য হলো না টমের। তারপরেই মনে পড়লো মারা যাওয়া লোকগুলোর কথা, লজ্জিত বোধ করতে লাগলো ও। লোকগুলোর জীবনের বিনিময়ে এই জাহাজ, মালপত্র সব আরো দুইবার হলেও দিয়ে দিতে রাজি টম।

“আমরা এখন কি করবো?” ফ্রান্সিস বললো।

“উপায় একটা বের হবেই,” সারাহ বললো। চেহারায় রঙ ফিরেছে ওর। নড়েচড়ে বেড়াতে পারছে এখন। তাই নাবিকদের ক্ষতের পরিচর্যা করছে যতোটা সম্ভব। যার যার গায়ের কাপড় ছিঁড়েই তাদের ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে। ভেসে আসা কাঠ দিয়ে চটা বানাচ্ছে।

“বসে বসে নাকি কান্না কাঁদলে কখনো কিছু ঠিক হয়ে যায় না,” বলতে বলতে টম উঠে দাঁড়ালা। তারপর সৈকত ধরে আরো খানিকটা উঠে এসে পাম গাছের গায়ের কাটা দাগগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলো ও। দা দিয়ে নারিকেল কাটার দাগ ওগুলো।

“কেউ এই গাছগুলো লাগিয়েছে। কাছেই কোনো গ্রাম আছে নিশ্চয়ই।”

কিছুদূর আরো আগাতেই ওরা একটা ছোট্ট খাড়ি দেখতে পেলো যেটা ভিতরের দিকে চলে গিয়েছে। ওটার পাড় দিয়ে একটা পায়ে চলা পথে দেখা গলো। কাদার ভিতরে অনেকগুলো পায়ের ছাপ সেখানে।

“আমি আর ফ্রান্সিস গিয়ে দেখে আসছি,” নেপচুন তরবারিটা কোমরে বেঁধে বললো টম। “সারাহ আর অ্যানা, আলফ আর বাকিদের সাথে থাকো।”

“না,” জোর গলায় বললো সারাহ। “আজ একটুর জন্যে আমরা বেঁচে গিয়েছি। আমি আর তোমার কাছ ছাড়া হবো না।”

টম জানে যে তর্ক করে লাভ নেই। আলফকে বাকিদের দায়িত্বে রেখে ওরা চারজন রাস্তাটা ধরে এগিয়ে চললো। একটা নারিকেল আর কাঁঠাল গাছের বনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে রাস্তাটা। লাল মাটির উপর উজ্জ্বল সবুজ। বৃষ্টির কারণে বনের ভিতর থেকে অদ্ভুত সব ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। বাতাস তাই সোদা মাটি আর কচি কান্ডের ঘ্রাণে ভারি হয়ে আছে।

কিছুদূর আগানোর পরেই ফ্রান্সিস চিৎকার দিয়ে উঠলো। সেদিকে তাকিয়ে সামনেই একটা কাঁটা ঝোঁপের বেড়া দেওয়া বাড়ি দেখতে পেলো বাকিরা। বাড়িটা ছোট, মাটির তৈরি। সামনে এক চিলতে উঠোন। ওটার পরেই খাড়ির ধারে আরো অনেকগুলো বাড়ি দেখা গেলো। প্রতিটা বাড়িই নির্দিষ্ট দুরত্বে বানানো। সব মিলে গ্রামটা আধা মাইলটাক চওড়া। খাড়িতে একজন মহিলা কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে কাপড় ধুচ্ছে। মহিলা বেশ কৃশকায়, আর কোমরে বাঁধা ছোট্ট একটা পাতলা কাপড় বাদে গায়ে আর কোন কাপড় নেই। এই শুলির মতো জোরালো বৃষ্টিতেও কোনো বিকার নেই তার।

“এদের কি কোনো লজ্জা শরম নেই নাকি?” ফ্রান্সিস অবাক হলো।

“আমরা লন্ডনের সমাজ থেকে এখন বহু দূরে,” টম মনে করিয়ে দিলো।

“এদের ধর্মে নগ্নতায় লজ্জার কিছু নেই,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “আর এই আবহাওয়ায় কাপড় আসলে খুব একটা গায়ে রাখাও যায় না।”

মহিলা ওদের গোলার আওয়াজ পেয়ে মুখ তুলে তাকালো। তারপর চিৎকার দিয়ে হাতের কাপড়চোপড় এক করে ডাঙ্গার দিকে দিলো দৌড়।

“দাঁড়ান,” টম ডাকলো। মহিলা কাছের একটা কুঁড়েতে ঢুকে গেলো, চেঁচানো থামছেই না। টম কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুঁড়ের ভিতর থেকে এক লোক শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। এর পরনেও মহিলাটার মতোই পোশাক। হট্টগোল শুনতে পেয়ে অন্য কুঁড়েগুলো থেকেও লোকজন বেরিয়ে এলো। একটু পরেই সারা গ্রাম এসে জড়ো হলো ওদের পাশে। বিচিত্র ভাষায় ওদেরকে দেখিয়ে কি সব বলতে লাগলো।

চুল-দাড়ি সাদা হয়ে যাওয়া এক কুজো বুড়ো এগিয়ে এলো সামনে। সম্ভবত ইনি-ই হচ্ছেন গ্রামের মাতবর। অ্যানা প্রথমে পর্তুগিজ ভাষায় তার সাথে কথা বললো। তারপর ভারতীয় একটা ভাষায়। কিন্তু মাতবরের মুখের ভঙ্গি বদলালো না। টেনে টেনে কথা বলতে লাগলো সে।

“তুমি এদের কথা বুঝতে পারছো?” অ্যানাকে জিজ্ঞেস করলো টম।

“মালায়ালম ভাষার একটা কথ্য রূপে কথা বলছে এরা, অ্যানা জানালো। “অনেকটা তামিলের মতোই। তাই ইনি কি বলছেন বুঝতে পারছি।”

“বলো যে আমাদের খাবার লাগবে। আর কাছের বন্দরটা কোথায় সেটা জিজ্ঞেস করো।”

অ্যানা কথা বলতে লাগলো। আলাপ শেষ হওয়ার পর মাতবর কিছু একটা আদেশ দিলেন। একটা তালপাতার সেপাই ছেলে বনের ভিতর দৌড়ে গেলো। কয়েকজন মহিলা গেলো খাবার আনতে। আর একজন মহিলা শুকিয়ে আসা কাদার মতো দেখতে কিছু একটা হাতে নিয়ে পাশের একটা কুঁড়েতে ঢুকে গেলো। প্রথমে সে জিনিসটা ফেটে যাওয়া মাটির মেঝেতে লেপে দিলো, তারপর সারা দেওয়ালে একই কাজ করতে লাগলো।

“কি করছেন উনি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।

“বাড়িটা পরিষ্কার করছে।”

“কাদা দিয়ে?”

অ্যানা মুখ টিপে হাসলো। “ওটা কাদা না, গোবর।”

“গোবর?” আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রান্সিস। খুবই অবাক হয়েছে। ময়লা জিনিস দিয়ে ওরা ঘর পরিষ্কার করে?”

“গরু এদের কাছে খুব পবিত্র,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “ওটার বর্জ্যও তাই ঘরকে শূচি করে।”

মহিলাটা বেরিয়ে এলে মাতবর ওদেরকে ভিতরে যেতে ইঙ্গিত করলো।

“উনি আমাদেরকে ভিতরে যেতে বলছেন।”

টম ঢুকে গেলো। দরজাটা অনেক নিচু। আর ভিতর কোনো জানালা-ও নেই। শুধু দেয়ালের ফাটা থেকে চুঁইয়ে কিছু আলো আসছে। বেশি ফাটা জায়গায় আবার গোবর দিয়ে পট্টি মারা। তবে মেঝেটা শুকনো, বৃষ্টি ঢুকছে না ভিতরে। মাঝখানে একটা পাথরের চক্রের ভিতরে ছোট্ট একটা আগুন জ্বলছে।

তবুও জায়গাটা মানুষের থাকার জায়গার বদলে জন্তু জানোয়ারের থাকার জায়গা বলে মনে হতে লাগলো। টমের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, এই অজানা দেশে, অচেনা মানুষের মাঝে এরকম বদ্ধ ঘরে প্রবেশ করতে ওকে নিষেধ করতে লাগলো।

“আমার বাইরেই ভালো লাগছে।”

অ্যানা গ্রামবাসীকে সেটা বললো। হয় ওরা ব্যাপারটা বুঝলো না অথবা ব্যাপারটা ওদের কাছে আদবের বিশাল একটা বরখেলাফ। ওরা কোর্টনীদের চারপাশে জড়ো হয়ে জোর করে দরজার দিকে ঠেলে দিতে লাগলো। অনেকেই আবার টমের কোমরে বাধা নেপচুন তরবারিটা ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। ওটার কারিগরি নৈপুণ্য আর বাটে বানো নীলকান্তমণিটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নানান কথা বলাবলি করছে সবাই।

মেঝেতেই বসলো ওরা সবাই, আর গ্রামবাসীরা দরজায় অপেক্ষা করতে লাগলো। বৃষ্টিতে ভিজছে, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। উলঙ্গ বাচ্চারা তাদের বাবা মায়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে ওদেরকে দেখার জন্যে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মহিলারা ওদের জন্যে এক বাটি ভাত আর আঙ্গুরের বিশাল একটা পাতায় করে ডাল নিয়ে এলো। টম গোগ্রাসে গিলতে লাগলো সেসব। পেট পুরে খেয়েও খিদে মিটলো না ওর। কিন্তু সবার হাড্ডিসার শরীর দেখে বুঝতে পারলো, ওদের যা কিছু ছিলো তার সবই সম্ভবত মেহমানদারিতে শেষ করে ফেলেছে।

খাওয়া শেষ করে টম দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু লোকজন একটুও নড়লো না।

“ওরা বলছে আমাদেরকে নাকি এখানেই থাকতে হবে,” আনা জানালো।

“কেন?”

“আমি যতোদূর বুঝতে পারছি, ওরা সম্ভবত ওদের স্থানীয় সর্দারকে খবর দিতে গিয়েছে,” অ্যানা ব্যাখ্যা করলো। “উনি আসলে হয়তো আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবেন।”

টম নিজের জাগায় ফিরে গিয়ে হতাশ হয়ে মাটিতে বসে মেঝেতে আঙুল দিয়ে ড্রাম বাজাতে লাগলো। “আমরা কোথায় আছি সেটা কি বলেছে ওরা?”

“না। আমাদের জাহাজের নিশানা যা ছিলো তাতে আমরা কোনদিকে আসছিলাম সেটা বলতে পারেন না?”

টম কাঁধ ঝাঁকালো। ঝড়টা এতো জোরে আমাদেরকে টেনে এনেছে যে পঞ্চাশ মাইলের ভিতরে কোথায় কি আছে তা বুঝতে পারছি না। জায়গাটা সিলন হতে পারে…”

“এটা সিলন না,” অ্যানা বললো। “ওদের ভাষা আলাদা।”

“তার মানে ভারত। মালাবার উপকূল সম্ভবত।”

অ্যানা মাথা ঝাঁকালো। “সেটাই মনে হয়-তাহলে আমাদের জন্যে ভালোই হবে। উপকূল জুড়ে ব্রিটিশ আর পর্তুগিদের কুঠি আছে। আমরাও একটা খুঁজে বের করতে পারবো।”

“ওরা আমাদেরকে সাহায্য করবে?” ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।’

“আমাদের জাহাজ গভীর পানিতে ডোবেনি,” সারাহ বললো। “ঝড় কমলে হয়তো ওটার মালপত্রগুলো উদ্ধার করা যাবে। দরকার হলে তা দিয়েই ওদের সাহায্য কিনে নেওয়া যাবে। মানে যদি ওরা আমাদেরকে এমনিতে সাহায্য করতে না চায় আরকি।”

“তবে আমার মনে হচ্ছে বেশিরভাগ মালই নষ্ট হয়ে যাবে,” টম বললো। “আইভরিগুলো হয়তো উদ্ধার করা যাবে। আর ডোরিয়ান আর আবোলির কাছে তো সেন্টারাস আছেই। ওদের সাথেও ভালো ব্যবসা করার মতো যথেষ্ট মালামাল আছে। আমরা যদি জায়গামতো না পৌঁছাই, ওরা কেপ টাউনে ফিরে যাবে। আর আমরা যদি ফিরে যাওয়ার মতো কোনো জাহাজ পেয়ে যাই, তাহলে এবারের মতো অল্পের উপর দিয়ে বেঁচে যাবো আশা করি।”

ওরা অপেক্ষা করতেই লাগলো। মাথার উপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। কিন্তু গ্রামবাসীরা নড়লো না।

“ওদেরকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা কিছু একটার জন্যে অপেক্ষা করছে,” ফ্রান্সিস মন্তব্য করলো।

“ওদের সর্দারের জন্যে,” অ্যানা বললো। ও বসেছে ফ্রান্সিসের পাশে। উষ্ণতার জন্যে ওর গায়ের সাথে গা লাগিয়ে আছে। “এই লোকগুলো এদের। সর্দারকে সাংঘাতিক ভয় পায়। অনুমতি ছাড়া এক পা-ও নড়বে না।”

“আশা করি এদের সর্দারের কাছে আমার মাপের এক সেট শুকনো কাপড় পাবো,” সারাহ বললো। এতোক্ষণ ধরে ভেজার পরে এই লবণ মাখা জামাটা পরে থাকতে থাকতে ওর গায়ে চুলকানি শুরু হয়েছে। কিন্তু ওগুলো পাল্টে পরার মতো কিছুই নেই সাথে।

“সাথে আমাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে একটা জাহাজ,” বললো ফ্রান্সিস।

“সাথে একটা খাসীর ঠ্যাং,” ঘুম জড়ানো গলায় বললো টম। মাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে ও। আগুনের তাপে উষ্ণ হতে শুরু করেছে। গত দুই দিন এক ফোঁটা ঘুমায়নি। ওর চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো।

ঘুমিয়ো না, নিজেকে বললো টম। এখনো নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাওনি।

ঘুম তাড়ানোর আশায় নিজের গালে চিমটি কাটলো ও। কিন্তু কিছুই অনুভব করতে পারলো না। আর ওর পক্ষে জেগে থাকা সম্ভব না। নিজের মনের এক অতল কালো গর্তের ভিতর ডুবে যেতে লাগলো ও।

*

টমের ঘুম ভাঙলো কারো হাতের ঝাঁকুনিতে। সারাহকে স্বপ্নে দেখছিলো ও। তাই প্রথমে মনে হলো সারাহই বুঝি ঝাঁকাচ্ছে ওকে।

ঝট করে চোখ খুললো টম। ওরা আর এখন কুঁড়ের ভিতর একা না। কয়েকজন গ্রামবাসী ভিতরে ঢুকে ওকে ধরে টানছে। টেনে তারা সোজা দাঁড় করিয়ে দিলো ওকে। সারাহ আর বাকিদের খোঁজে চারপাশে তাকালো ও, কিন্তু কাউকেই দেখা গেলো না। সহসা ও পুরো সজাগ হয়ে গেলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লোকগুলোর হাত ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিলো। তারপর দরজার চৌকাঠ দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো বাইরে।

সারাহ, অ্যানা আর ফ্রান্সিসকে ঘিরে গ্রামবাসীরা বিশাল একটা চক্র করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সামনেই সাতজন অদ্ভুতদর্শন লোক ঘোড়ার পিঠে বসা। প্রত্যেকের চেহারাই কঠোর, মুখে কাটাকুটির দাগ; গায়ে বর্ম, আর মাথার পাগড়িটা ইস্পাতের শিরস্ত্রাণের উপরে পেচানো। প্রত্যেকেই ভারি অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত। কোমরে পিস্তল আর ছোট আকারের তরবারিও দেখা গেলো। চারজনের হাতে বর্শা, বাকি তিনজন তরবারি হাতে।

টম, সারাহ আর অ্যানার সামনে গিয়ে ওদেরকে আড়াল করে দাঁড়ালো। “কারা এরা?” জানতে চাইলো ও।

সর্দার মতো লোকটা ঘোড়ায় লাথি মেরে সামনে এগিয়ে ওদের চারপাশে চক্কর দিতে দিতে অগ্নিদৃষ্টিতে ওদেরকে দেখতে লাগলো। লোকটার মাথার পাগড়িতে একটা হলুদ রঙের পাখির পালক গোজা, আর ওর বুকের বর্মটার চারপাশ স্বর্ণ দিয়ে বাঁধানো। একটা সরু ক্ষতচিহ্ন তার কপাল বেয়ে চোখের মাঝ দিয়ে নাকে এসে থেমেছে। তাতে চেহারায় একটা আলাদা শয়তানি ভাব প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। যেনো ওর মাথাটা কেউ দুই ভাগ করে দিয়েছিলো, তারপর আবার কোনোমতে জোড়ে লাগিয়ে দিয়েছে।

লোকটা চিৎকার করে গ্রামের মাতবরকে কিছু একটা বললো। মাতবর আমতা আমতা জবাব দিল প্রশ্নের। কথা বলার সময় দুই হাত ক্ষমার ভঙ্গিতে জড়ো করে মাথা নিচু করে রেখেছে।

“এই ব্যাটার নাম হচ্ছে টুঙ্গার,” অ্যানা অনুবাদ করে শোনালো। “ও এখানকার স্থানীয় প্রশাসক, চিত্তাত্তিঙ্কারা-র রানির একজন সুবলদার।”

টুঙ্গার জুলজুলে চোখে নেপচুন তরবারিটার নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো। টমও হাতলে হাত রেখে চেয়ে রইলো ওর দিকে।

“ওকে বল যে আমাদের জাহাজ ভেঙ্গে পড়েছে, আর আমরা শুধু একটু খাবার চাই আর নিরাপদে কাছাকাছি ইউরোপিয়ান কোনো উপনিবেশে যেতে চাই, আর কিছু না।”

অ্যানা বললো, কিন্তু বোঝা গেলো টুঙ্গারের ওর কথার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। এমনকি ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই ও বেয়াদবের মতো রূঢ় ভাষায় অ্যানাকে থামিয়ে দিলো।

“কি বলে ও?” টম জিজ্ঞেস করলো।

“বলছে এদেশে যে-ই আসুক না কেন, তাকে নাকি রানিকে কিছু একটা উপঢৌকন দিতে হবে।”

“ওকে বল যে আমাদের সব কিছুই জাহাজডুবিতে ভেসে গিয়েছে।”

অ্যানা কথাটা বলতেই টুঙ্গার টমের দিকে টিটকারির ভঙ্গিতে হাসলো। তারপর সামনে ঝুঁকে ঘোড়ার চাবুকটা দিয়ে ওর নেপচুন তরবারিটা দেখালো।

“না,” টম মাথা নাড়লো। “এটা কোনোদিনও না। এটা আমার পারিবারিক ঐতিহ্য। যাই হোক। আমাদের জাহাজে আইভরি ছিলো কিছু। সাগর শান্ত হলে আমরা ওগুলো উদ্ধার করে এনে রানিকে উপহার দেবো।”

টুঙ্গার লম্বা চাবুকটার প্যাঁচ খুলে, জ্যান্ত সাপের মতো সামনে ছুঁড়ে মারলো। ওটার আগা গিয়ে টমের কবজি পেঁচিয়ে ধরে, ওর হাতটাকে আঁকি দিয়ে তরবারির হাতল থেকে সরিয়ে দিলো। তারপর পায়ের গুতোয় টুঙ্গার ওর ঘোড়াটাকে পিছিয়ে নিতে গলো যতক্ষণ না চাবুকটা টানটান হয়ে যায়। দুজন লোক ঘোড়া থেকে নেমে এসে তরবারিটা নিতে গেলো। টম ওদের দিকে লাথি ছুঁড়ে মোচড় দিয়ে সরে গেলো একদিকে। আরো দুজন লোক নেমে এসে টমকে ঘিরে ধরলো। ওদের বর্মগুলো টমের বুক বরাবর তাক করা। রেগেমেগে টম বাম হাত দিয়ে তরবারিটা খাপ থেকে বের করে এনে ওকে ঘিরে থাকা লোকগুলোকে ভয় দেখাতে লাগলো।

কিন্তু সারাহ চিৎকার করে উঠলো, “ওদেরকে দিয়ে দাও ওটা, টম! ঈশ্বরের দোহাই, এই তরবারির জন্যে মরতে হবে না তোমাকে। ওরা ছয়জন আর তুমি একা। কুচি কুচি করে কেটে ফেলবে ওরা তোমাকে।”

টমও জানে ব্যাপারটা। ও তরবারিটা নামিয়ে টুঙ্গারের দিকে ছুঁড়ে দিলো। তরবারিটার ডগার দিকটা মাটিতে গেঁথে ঠরঠর করে কাঁপতে লাগলো। কবজির একটা মাত্র মোচড়ে টুঙ্গার টমের হাত থেকে ওর চাবুকটা ছাড়িয়ে নিয়ে সামনে বাড়ার জন্যে ঘোড়ার পেটে গুতো দিলো।

সামনে এগিয়ে ও ঘোড়ার পিঠ থেকেই ঝুঁকে তরবারিটার হাতল ধরে টান দিয়ে ছুটিয়ে নিলো। তারপর সেটাকে সোজা টমের চেহারা বরাবর তাক করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো। টম অনড় দাঁড়িয়ে রইলো। সারাহ চিৎকার দিয়ে ওর দিকে দৌড় দিলো যাতে টমকে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করতে পারে। কিন্তু অ্যানা আর ফ্রান্সিস ওকে টেনে ধরে রাখলো।

একেবারে শেষ মুহূর্তে টুঙ্গার তরবারিটা সরিয়ে নিয়ে হাতলের নীলাটা দিয়ে টমের কপালের মাঝখানে আঘাত করে ওকে ছাড়িয়ে কিছুদূর সামনে এগিয়ে গেলো। টম কপালের জায়গাটা চেপে ধরে বসে পড়লো মাটিতে। ওখান থেকে রক্ত বেরিয়ে ওর মুখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে লাগলো।

টুঙ্গার ওর ঘোড়াকে আবার ফিরিয়ে এনে টমের সামনে এসে দাঁড়ালো। মুখে শয়তানি হাসি, টমকে এভাবে ভড়কে দিতে পেরে নিজের উল্লাস লুকানোর কোনো চেষ্টাই করছে না।

“এই শুয়োরের বাচ্চাটা বলছে কি?” অঝোর ধারায় কাঁদছে সারাহ।

“ও বলছে ওর মালকিন, মহামহিম রানি, এই উপহার পেয়ে খুবই খুশি হবেন। আর উনি এমনকি আমাদেরকে কিছু খাবার ভিক্ষাও দিতে পারেন, তারপর যেখান থেকে এসেছি সেখানেই পাঠিয়ে দেবেন।”

টুঙ্গারের মজা নেওয়া শেষ। সে দাঁড়ানো লোকগুলোকে ধমক দিয়ে কিছু একটা বলতেই সবাই মাথা ঝুঁকিয়ে বসে পড়লো। চলে যাওয়ার আগে ও অ্যানার দিকে চেয়ে কিছু একটা বললো, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে ঝড়ের বেগে প্রস্থান করলো। একটু পরেই খাড়িটা ধরে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেলো সবাই।

সারাহ টমের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলো, “বেশি ব্যথা পেয়েছো?”

টম ওর কপাল থেকে রক্ত মুছলো। কাটাটা খুব বেশি গভীর না, তবে বিশাল একটা কালশিটে পড়ে যাবে। “এরচে খারাপ অবস্থা বহুবার হয়েছে।”

কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো ওর। “যাওয়ার সময় কি বলে গেলো শয়তানটা?”

“উপকূল ধরে কয়েক মাইল গেলে নাকি একটা টুপিওয়ালাদের থাকার জায়গা আছে। গ্রামের মাতবরকে বললে একজন লোক সাথে দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবে।”

“টুপিওয়ালা?” টম মাথা ঝাঁকিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করলো।

“ইউরোপিয়ানদের ওরা এই নামে ডাকে। এরা পাগড়ি পরে, আমরা পরি টুপি।”

“হুম, ঠিকই আছে,” টম বললো।

অ্যানা ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে যাওয়ার জন্যে গ্রামের মাতবরের সাথে ওদের সাথে একজনকে দেওয়ার ব্যাপারে আলাপ করলো। টম লোকটাকে পুরস্কার হিসেবে ওর তরবারিটার বেল্টটা দেবে বলে কথা দিলো। ওটার আর কোনো দরকার নেই। কিন্তু লোকটা খুশি হয়ে গেলো ওটা পেয়ে।

গ্রাম ছাড়িয়ে আগে আলফ উইলসন আর কেস্ট্রেল-এর বেঁচে যাওয়া বাকি লোকদের খুঁজতে গেলো ওরা।

তারপর ওদের গাইড উপকূলের বন ধরে উত্তর দিকে যাওয়া শুরু করলো। রাস্তাটা সম্ভবত ব্যবহার হয় না অনেক দিন। কখনো বন ছাড়িয়ে খোলা সৈকত দিয়ে আগালো ওরা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট নদী বা সাগরের জমে থাকা পানি হেঁটে পার হতে হলো।

দলের প্রত্যেকেই ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আছে, গায়ে একদমই শক্তি নেই। পথিমধ্যে কয়েকটা পচা আম পাওয়া গেলো, যারা পেড়েছিলো, তারাই সম্ভবত ফেলে গিয়েছে।

অবশেষে বড়সড় একটা নদীর কিনারে এসে পৌঁছালো ওরা। নদীটা সাগরে গিয়ে মিশেছে। নদীর অপর পাড়ে একটা পাথরের দুর্গ দেখা যাচ্ছে। ওটার চুড়ায় ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা উড়ছে লাল আর সাদা ডোরা কাটা আর এক কোনায় ইউনিয়ন জ্যাক (ব্রিটেনের পতাকা)।

দুর্গের সামনে ভারী ব্রেকার (ঢেউ ভেঙে দেওয়ার জন্যে বসানো বাধ) বসানো। ঢেউ আছড়ে পড়ে ফেনায়িত হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে চারদিকে। পানির সীমার উপরে, বালির ভিতর কয়কেটা চোখা মাথার নৌকা তুলে রাখা হয়েছে। দুর্গের পিছনে ছয়টা গোডাউন আর গোলাঘর, ওখানে কোম্পানির মালামাল রাখা হয়। পাম গাছের পাতা দিয়ে ছাওয়া কয়েকটা কুটির দেখা গেলো ওগুলোর পাশে।

“এই পতাকাটা দেখে যে কোনোদিন এতো খুশি হবো, তা স্বপ্নেও ভাবিনি,” টম স্বগোক্তি করলো।

ওদের গাইড শিষ বাজাতেই কয়েকজন স্থানীয় মাঝি নৌকা নিয়ে এগিয়ে এলো। ওদেরকে পার করে দিতে প্রস্তুত। নদীর অপর পাড়ে পৌঁছাতেই দেখলো দুর্গ থেকে কয়েকজনের একটা দল ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাল পোশাক পরা প্রায় ডজনখানেক সৈন্য দেখতে পেলো টম। নীল পোশাক পরা কর্মচারীরাও আছে সাথে। তিন চারজন মহিলাকেও দেখা গেলো তাদের ছোট ছোট ছাতার নিচ থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মনে হলো অবশেষে ওরা আবার সভ্য কোনো জায়গায় পৌঁছেছে। এবার ওদের কষ্টের অবসান হবে।

দর্শকদের ভেতর থেকে লাল রঙের আঁটসাঁট পোশাক পরা দশাসই এক লোক এগিয়ে এলো। এই ভ্যাপসা গরমের মাঝেও সে একটা পরচুলা পরে আছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে মুখের পাউডার ধুয়ে মুখ আর কাপড়ে সাদা রঙের সর্পিল রেখা একে দিয়েছে।

“আপনারা কারা? কি চান এখানে?” ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো সে।

“আমার আসল নাম বলো না,” ফিসফিসিয়ে বললো টম সবাইকে। “এখানে গাই-এর লোক থাকতে পারে। গাই যদি টের পায় যা আমরা ওদের সদর দরজায় এসে হাজির হয়েছি তাহলে কি দশা হবে মনে রেখো।”

“টম উইল্ড,” মোটা লোকটাকে বললো টম। “আমার ভাতিজা ফ্রান্সিস, আমার স্ত্রী সারাহ। আমাদের সফরসঙ্গী অ্যানা দুয়ার্তে।”

টম জানে ওদেরকে কতোটা উস্কুখুস্কু আর নোংরা দেখাচ্ছে। সে কারণেই সম্ভবত লোকটা ওদের দিকে চরম বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

“লরেন্স ফয়,” লোকটা জানালো। “আমি ব্রিঞ্জোয়ানের ব্রিটিশ কুঠির গভর্নর।”

“ঝড়ে আমাদের জাহাজ ডুবে গিয়েছে,” টম ব্যাখ্যা করলো।

“জাহাজ?” ফয় সন্দেহের দৃষ্টিতে টমকে দেখতে লাগলো। “কোন জাহাজ?”

“কেস্ট্রেল। কেপ টাউন থেকে গুড হোপ হয়ে মাদ্রাজে যাচ্ছিলাম আমরা।”

“এই নামের কোম্পানির কোনো জাহাজের কথা তো শুনিনি,” ফয় বললো। “ইন্টারলোপার নাতো আপনারা?”

টম প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেলো। “এই মুহূর্তে স্যার, আমরা কয়েকজন ভাগ্যবিড়ম্বিত নাবিক বাদে আর কিছুই নই।”

ফয় নাক সিটকালো। “হায় ঈশ্বর, আপনার গা থেকে আসছে।”

“কাপড় বদলাতে পারলে আমরাও বেঁচে যাই,” টম বললো।

ফয় নিজের ঠোঁট চেপে ভাবলো কিছু একটা। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুব কষ্টে আছে-যেনো বায়ু ত্যাগ করতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। টম মনে মনে হাসলো। ও জানে ফয় আপ্রাণ ভেবে বের করার চেষ্টা করছে যে, এই অনাহূত নোকগুলোর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার ভদ্র কোনো উপায় আছে কি না।

“ঠিক আছে ভিতরে এসে আগে খুলে বলুন সব,” কর্কশ কণ্ঠে বললো ফয়।

ওদেরকে দুর্গের ভিতরে নিয়ে গেলো ফয়। এক নজর দেখেই টম বুঝলো এখানে নিয়ম শৃঙ্খলা ঠিকভাবে মানা হয় না। দরজায় কোনো পাহারাদার নেই, শুধু দুর্গের ছাদে একজনকে দেখা গেলো, সে-ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটা কার্ণিশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে গভর্নরের থাকার জায়গাটা কাঠ দিয়ে বানানো, উপরে তালপাতার ছাউনি। গরমের মৌসুমে এই জিনিস বন ফায়ারের মতো জ্বলবে।

“এখানকার লোকজনের সাথে নিশ্চয়ই খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আপনার?” টম জিজ্ঞেস করলো।

ফয় হাত নেড়ে একটা মাছি তাড়ালো। “ওরা মাঝে মাঝে একটু আধটু ঝামেলা করে, কিন্তু উপযুক্ত জবাব পেয়ে ওদের টনক নড়েছে।”

টমের ঐ ঘোড়সওয়ারটার কথা মনে পড়লো, যে ওর তরবারিটা কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সে সম্পর্কে কিছু বললো না। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখা গেলো মেঝে বালিতে ভরে আছে, বাতাসের বেগ তখনো কমেনি। একজন অর্ধ উলঙ্গ ছোট ভারতীয় বাচ্চা বসে বসে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করছে। তাতে বাতাসের স্রোতের দিক বদল হচ্ছে শুধু, গরম এক বিন্দুও কমছে না।

ফয় ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লো। এক বাটি খেজুর তার সামনের ডেস্কে রাখা। ও একসাথে তিনটা মুখে পুরে দিলো, কিন্তু অতিথিদেরকে নেওয়ার জন্যে বললো না। এমনকি বসতেও বললো না। ক্ষুধায় টমের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো।

“আচ্ছা,” মুখভর্তি ফল নিয়ে বললো ফয়। “আপনাদের জাহাজডুবি হয়েছে বলছেন। কি ছিলো আপনাদের জাহাজে?”

প্রশ্নটা শুনে টম অবাক হয়ে গেলো। “সেটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক, স্যার।”

“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।” সরু চোখে টমের দিকে তাকিয়ে বললো ফয়। টম টের পেলো এই ভালোমানুষি পোশাকটার নিচে আসলে ফয় একটা কুৎসিত আর কূট বুদ্ধির মানুষ।

“আইভরি, কাপড়, কিছু হাতে বোনা জিনিস।”

“ইউরোপিয়ান মালপত্র।”

“আমরা কেপ টাউন থেকে কিনেছি সব।”

“সেটা তো আপনাদের কথা। আপনাদের কাছে লগ বই আছে? বা কোনো ইশতেহার? রশিদ? মানে আপনাদের কথার প্রমাণের পক্ষে কিছু আছে?”

রাগ সামলাতে কষ্ট হলো টমের। “আমাদের সব কাগজপত্র জাহাজের সাথেই ডুবে গিয়েছে।”

“তাই নাকি?” বলে ফয় মুখ থেকে খেজুরের বিচি ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে। “কোম্পানি ইন্টারলোপারদের কি করে জানেন তো? আমি চাইলে আপনাদেরকে গ্রেপ্তার করে ডাণ্ডা বেড়ি পরিয়ে আবার ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠাতে পারি। বোম্বেতে পাঠিয়ে গভর্নর কোর্টনীর হাতে তুলে দিতে পারি। বোম্বেতে কিন্তু ইংরেজ আইন সবসময় চলে না। ওখানে গভর্নরের আদেশই আইন।”

ফয় চুপ করে কিছুক্ষণ কি যেনো ভাবলো। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। “তবে আমরা যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি তাহলে ভিন্ন কথা।”

শালা ঘুষ চায়! টম বুঝলো। কিছুটা শান্ত হলো ও। এধরনের পরিস্থিতিতে বহুবার পড়েছে ও, তাই ব্যাপারটা ভালোই বুঝতে পারছে।

“কিন্তু জাহাজডুবির পর আমরা এখন নিঃস্ব,” খুবই হতাশার একটা ভঙ্গি করলো টম।

ফয় ওর আঙুল তুললো। “খুবই দুঃখজনক।”

“যাইহোক,” টম বলে চললো। “আমাদের সাথে আইভরির একটা চালান ছিলো। যদি ঝড়ে আমাদের জাহাজের তলা ফেটে না যায় তাহলে ওটা জাহাজের ভিতরেই থাকবে। আর জাহাজ কম পানিতেই ডুবেছে। আমাদেরকে যদি একটা নৌকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে ওখান থেকে যা উদ্ধার হবে তার চার ভাগের এক ভাগ আপনাকে দিতে আমার আপত্তি নেই।”

“এটা আবার কি ধরনের প্রস্তাব?” ফয় এমনভাবে মুখ বিকৃত করলো যাতে টম বুঝতে পারে যে ও আসলে কতোটা আহত হয়েছে। “আমিতো চাইলে নিজেই সব উদ্ধার করে আমার বলে দাবি করতে পারি।”

“কিন্তু সেজন্যে আপনাকে লন্ডনের নৌ আদালতে যেতে হবে,” টম বললো। ডাওজার-এর ক্যাপ্টেন ইঞ্চবার্ডের সাথে ওর কথোপকথন মনে পড়লো টমের। “লন্ডনে আমার প্রভাবশালী বন্ধুবান্ধব আছে। একবার যদি ওখানে কেস ওঠে তাহলে আপনার সব বাণিজ্যের চালান খতিয়ে দেখা হতে পারে। তখন কিন্তু আপনার সারা বছরের সব মুনাফাই হারাবেন।”

ফয় গরগর শব্দ করে উঠলো, ঠিক যেনো একটা অসন্তুষ্ট কুকুর। “আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন স্যার?”

“আরে না, না! কি যে বলেন। আমি আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছি যে আমরা চাইলেই এমন একটা সমঝোতায় আসতে পারি যেটায় দুজনেরই লাভ হয়।”

ফয় ভ্রু কুঁচকে ডেস্কে রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর আবার একটা খেজুর মুখে পুরে শব্দ করে চাবাতে লাগলো।

“অর্ধেক,” ফয় বললো।

“আচ্ছা,” টম রাজি হলো। “তবে আমাদের বাড়ি ফেরার উপায় হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনার এখানেই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।”

“আপনারা সৈন্যদের ব্যারাকে থাকতে পারবেন, আর কোম্পানির ক্যান্টিনে খাবেন। আমি সব খরচ পরে কেটে নেবো।” তারপর অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললো, “এখন আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার হাতে যথেষ্ট কাজ আছে।”

টম ভাবলো এ আবার ওদের সম্পর্কে গাইকে লিখে জানাবে না-তো? ও দরজার সামনে থেমে দাঁড়ালো। “আপনি বোম্বের গভর্নর কোর্টনীর কথা বললেন। আপনারা কি পরিচিত?”

ফয়ের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে গেলো। শুধু পরিচিত? খুবই ঘনিষ্ট আমরা। গাই কোর্টনী আমার গুরুর মতো-না, আমার বন্ধু। ওনার জন্যেই আজ আমি এই অবস্থানে এসেছি। অবশ্য আমিও ওনাকে সুরাটের সওদাগরদেরকে ঠাণ্ডা করতে ছোটখাটো কিছু সাহায্য করেছিলাম।”

টম মনে মনে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলো যে ও ফয়কে নিজের আসল পরিচয় বলেনি। “উনি ভালো আছেন?”

“আছেন ভালো মন্দ মিলিয়ে। এই বাজে আবহাওয়ায় ইদানিং আর ঘর ছেড়ে তেমন একটা বের হন না।”

“আর ওনার পরিবার? ওনারতো একটা ছেলে ছিলো, তাই না?”

টমের পাশ সারাহ নাক সিটকালো। ও কনুই দিয়ে টমের পাজরে তো দিলো কিন্তু ফয় তখন গাই-এর সাথে নিজের ঘনিষ্টতা প্রমাণে ব্যস্ত, তাই খেয়াল করলো না ব্যাপারটা।

“আহ! ওনার ছেলেটা আসলে একটা কুলাঙ্গার। বড়সড় কুলাঙ্গার,” আবার বললো ও। “বাবার আদেশ অমান্য করে পালিয়ে গিয়েছে বাড়ি ছেড়ে। এরপর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। গাই বলেন যে এটা ওর মায়ের প্রভাবে হয়েছে।”

টম আরো কিছু জিজ্ঞেস করবে ভেবেছিলো, কিন্তু ফয় দেরিতে হলেও টমের কণ্ঠে আগ্রহের ব্যাপারটা খেয়াল করে ফেললো। ওর চোখে কেমন একটা ঈর্ষা দেখতে পেলো টম।

“আপনারা পরিচিত নাকি?”

“বহু দিন আগের কথা,” টম বললো। “উনি এই ফ্যাক্টরির খোঁজ খবর রাখেন নাকি?”

“নাহ! উনি এখন পর্যন্ত একবারও তার পদধূলি দেননি এখানে।” ব্যাপারটা নিয়ে যায় যে আসলেই দুঃখিত তা স্পষ্টতই বোঝা গেলো। “তবে তার ভায়রা এখানে আছেন। এই দুর্গেই এখন আছেন উনি।”

একটা ঠাণ্ডা স্রোত টমের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেলো। ওকে কি চিনে ফেলেছে? ‘গাইয়ের ভায়রা’ মানে? টম আর গাই দুই বোনকে বিয়ে করেছে, কিন্তু ওরা তো আপন ভাই।

“বুঝলাম না,” যতোটা সম্ভব নির্মোহ গলায় বললো টম। ঘরের ভিতর একটা অস্ত্রের খোঁজে তাকালো ও। ব্যবহার করতে পারে এরকম যে কোন কিছু। দরজার প্রহরীর কাছ থেকে মাস্কেটটা কেড়ে নেবে কিনা ভাবলো। গুলির আওয়াজ পাওয়া গেলো সৈন্যদলের এখানে পৌঁছাতে কতোক্ষণ লাগতে পারে?

ফয় নিজের কপালের ঘাম মুছলো। ওর কথা শুনে টমের কি অবস্থা হচ্ছে সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। “ক্যাপটেন হিকস আর তার স্ত্রী জানুয়ারী থেকে ব্রিঞ্জোয়ানে আছেন। গাই-ই এক প্রকার জোর করে ওদেরকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন।”

টম থেমে গেলো। কি বলছেন এসব? বলতে চাইলো ও। কিন্তু কিছু বলার আগেই সারাহ কথা বলে উঠলো।

“ও আচ্ছা,” খুশি হওয়ার ভঙ্গিতে বললো ও। “ক্যাপ্টেন হিকস অ্যাগনেস বিয়াত্তিকে বিয়ে করেছেন। গাইয়ের স্ত্রী ক্যারোলিনের বোন। আহা অ্যাগনেস। ইয়র্কে থাকার সময় আমরা খুবই কাছের বান্ধবী ছিলাম।”

টম ডেস্কের উপর ঝুঁকে এলো। “আপনি বলতে চাচ্ছেন অ্যাগনেস বিয়াত্তি আছে এখানে?”

“উনি এখন অ্যাগনেস হিকস। আজ সকালেই তো দেখলাম। ওনার স্বামী আমাদের সৈন্যদলের প্রধান।” ফয়-এর চোখে এখন আর টমের প্রতি তাচ্ছিল্যের ভাবটা নেই। কারণ এরা ওর ধারণার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তবে ও ঠিক নিশ্চিত না যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই ব্যাপারটাই ওকে উদ্বিগ্ন। করে তুললো। ওর পেশাগত উন্নতির পুরোটাই হয়েছে গাই কোর্টোনীর লেজুড়বৃত্তি করে। আর গাই অসম্ভষ্ট হলে তোটা রেগে যায়, সেটা ওর ভালোই জানা আছে। আবার যদিও যতোটা ভাব দেখাচ্ছে আসলে গাই-এর সাথে ও ততোটা ঘনিষ্ট, কিন্তু তবুও ও জানে যে গাই নিইজের পরিবারের লোকদেরকে খুব বেশি গোণে না। খুব কৌশলে সব সামলাতে হবে ওকে।

আগে এই অতিথিদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাক। ও চওড়া একটা হাসি দিলো। “আপনারা থাকার জায়গা চেয়াছিলেন। আমি নিশ্চিত ক্যাপ্টেন হিকস আর তার স্ত্রী আপনাদেরকে খুশি মনেই স্বাগত জানাবেন। আমি এখুনি আপনাদেরকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি।”

*

যাওয়ার পথে টম স্বাভাবিক কৌতূহলবশতই চারপাশ দেখতে লাগলো। দুর্গের দেয়াল খুবই শক্ত, পাথরের তৈরি, ফাঁকে ফাঁকে তিনকোণা গম্বুজ। ওখান থেকে গুলি করা সহজ। তবে পুরো দুৰ্গটাই বালির উপরে বানানো।

“দুর্গে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা কি?” জিজ্ঞেস করলো টম।

“নদী থেকে পানি আনা হয়,” ফয় জবাব দিলো। আবারও দরদর করে ঘামতে আরম্ভ করেছে সে। হাত দিয়ে নদীর ঘাট পর্যন্ত একটা পথ দেখালো। প্রায় চারশ গজ মতো দূরে।

“কেউ অবরোধ করলে তো পানির অভাবেই মরে যাবেন,” মন্তব্য করলো ফ্রান্সিস।

“ওহ! সেরকম কিছু হবে না। এই কালাগুলোর লড়াই করারই হিম্মত নেই। একটা গুলিই যথেষ্ট, সোটার শব্দেই ওরা জঙ্গলে গিয়ে পালাবে।”

সারাহ হাচি দিলো একটা। ওরা গোডাউনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। আর কালো মরিচের গন্ধে ওর নাকে সুড়সুড়ি লাগছে। গোলাঘরের দরজাগুলো বন্ধ, কারণ এখন উপসাগরে কোনো জাহাজ নেই।

“বর্ষাকাল শুরু হয়ে গিয়েছে, এখন আর এদিক দিয়ে কোনো জাহাজ যাবে না। শরতের আগ পর্যন্ত ব্যবসা বাণিজ্য পুরো বন্ধ।” দুঃখিত গলায় বললো ফয়।

“মরিচ কি আপনার মূল ব্যবসা নাকি?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।

ফয় মাথা ঝাঁকালো। “আগের মতো এখন আর দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজগুলোতে করে নির্দিষ্ট পরিমাণ মশলা সবসময় পাঠাতেই হয়। স্থানীয়দের সাথে চুক্তির কারণে এখানকার যতো মরিচ চাষ হয়। সবকিছুর একচেটিয়া খরিদ্দার আমরা, তাই কেনা আর বেচা দুটো ব্যবসা-ই আমাদের। যদি ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে তাহলে সামান্য কিছু লাভ শেষ পর্যন্ত থাকে।”

টম বুঝতে পারলো ‘ঠিক ব্যবস্থাপনা’ বলতে ফয় আসলে কি বুঝিয়েছে। ও যতোদূর শুনেছে, কোম্পানির এসব ছোট ছোট দূরবর্তী কুঠিকে সেখানকার গভর্নরেরা নিজেদের ব্যক্তিগত জায়গীর মনে করে। এরা স্থানীয়দেরকে যেমন ঠকায়, তেমন এদের উপরওয়ালাদের সাথেও দুই নম্বরি করে। ফয় যেটুকু লাভই করুক না কেন, তার খুব সামান্যই লেডেনহল স্ট্রিটে পৌঁছায়।

“এখানকার চাষীরা এতে খুশি?” অ্যানা জানতে চাইলো।

“খুশি?” ফয় যেনো আঁতকে উঠলো কথাটা শুনে। “আমার দেওয়া দামে যদি ওরা খুশি থাকে তাহলে সেটাকে আমি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নেবো।”

“ব্যবসা ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে হলে উভয় পক্ষকেই লাভবান হতে হয়।”

“আবার বলছি, এরা হচ্ছে অশিক্ষিত বর্বর একেকটা। এক মাস আগে কয়েকজন স্থানীয় চাষী আমার কাছে মাল বেচতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি ওদের গলায় একটা তরবারি ধরে সোজা মাল আনতে পাঠিয়ে দেই। ওদের কিছু করার নেই। ওদের রানির আদেশ এমনই।”

টম থমকে দাঁড়ালো। “চিত্তাত্তিঙ্কারা-র রানি?”

আবারও ফয় সন্দিহান চোখে ওর দিকে তাকালো। “ওনার সাথেও আপনার খাতির আছে নাকি?”

“ডাঙায় ওঠার পর ওনার কিছু লোকের সাথে দেখা হয়েছিলো। আমার কাছ থেকে একটা দামি জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছে ওরা।”

“দামি? কি রকম?” ফয়ের চেহারা আগ্রহে উজ্জ্বল হয়ে গেলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ওরা ভারতীয় কায়দায় বানানো একটা একতলা কিন্তু চওড়া বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। এধরনের বাড়িকে বলে বাংলো। “চলে এসেছি।”

ফয় দরজায় টোকা দিলো। পিছনে সারাহ আর টম উদ্বিগ্ন দৃষ্টি বিনিময় করলো। সারাহ ওর বোনকে সর্বশেষ দেখেছে সেই ষোল বছর আগে। এখনো কি ও আগের মতো আছে?

একটা ভারতীয় কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিলো। ফয়কে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখালো সে।

“তোমার মালকিনকে বলো যে কয়েকজন মেহমান এসেছেন।”

কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই একজন মহিলাকে দেখা গেলো দরজায়। এসে দোরগোড়ায় দাঁড়ানো দলটাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো সে। ভাল মতো দেখার জন্যে কয়েকবার চোখ পিটপিট করতে হলো তাকে।

“সারাহ?” দম আটকে বললো মহিলাটা। “আমি কি স্বপ্নে দেখছি নাকি?”

আনন্দের অতিশয্যে কাঁপতে শুরু করলো সে। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে ভেবে টম দ্রুত গিয়ে তাকে ধরলো।

“অ্যাগনেস, কান্না চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করে কোনোমতো বললো সারাহ। “আমিতো ভেবেছিলাম তোমার পুরনো বন্ধু সারাহ উইল্ডকে চিনতেই পারবে না।”

ফয় সরু চোখে ওদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে।

“আপনার এক বোনের নামও না সারাহ ছিলো, মিসেস হিকস?”

“বেচারি, কয়েক বছর আগে সে মারা গিয়েছে।” অ্যাগনেস বুদ্ধি করে বললো। ও সারাহের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলো। “ভিতরে আসো। তোমার সাথের ওদেরকেও আসতে বলল।” টম, ফ্রান্সিস আর অ্যানার দিকে ইঙ্গিত করলো ও। “ইশ! কতদিন পর। অনেক গল্প হবে আজ। আপনিও থাকবেন নাকি, মি. ফয়?”

“দুঃখিত, আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।” টুপির কোনা ধরে বললো ফয়। “আজকের মতো আসি। গুড ডে।”

ফয় যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হতেই অ্যাগনেস এক প্রকার ঝাঁপিয়েই পড়লো সারাহের উপর। এতো জোরে জড়িয়ে ধরলো যে সারাহের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো।

“সারাহ,” নিচু স্বরে কাঁদতে লাগলো অ্যাগনেস। “আসলেই তুমি? আমি ভেবেছিলাম তুমি আফ্রিকাতে মারা গিয়েছে।”

“মরতে মরতে বেঁচেছি-তাও কয়েকবার।” অ্যাগনেসের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললো সারাহ। তারপর ওর চেহারা থেকে কান্নায় ভিজে যাওয়া চুলগুলো সরিয়ে দিলো। “কিন্তু এইতো দেখা হলো।”

“তুমি এখনো বেঁচে আছে সেটা আমাকে জানাওনি কেন?”

“তুমি কোথায় আছ সেটা তো জানা ছিলো না। আর চিঠি দিলেও সেটা যে গাই-এর হাতে পড়বে না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলাম না।”

তারপর একটু সরে টমের দিকে মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করলো।

“টম কোর্টনীকে মনে আছে?”

অ্যাগনেস আসলে অধিক আনন্দে পাথর হয়ে গিয়েছে। টমের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো ও। তারপর নরম স্বরে বললো, “তার মানে ক্যারোলিনের কথা-ই সত্যি। তুমি আর সারাহ জাঞ্জিবার থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে।”

টম কুর্নিশের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালো। “শেরপা-তে করে আমরা প্লইমাউথ থেকে চলে আসি।” সারাহ আর অ্যাগনেস তখন অনেক ছোট। এমনকি তখন টম ওদের দুজনকে আলাদা করে চিনতো-ও না। ও তখন ওদের বড় বোন ক্যারোলিনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সে শেষমেশ গাইকে বিয়ে করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত দুই বোনের চেহারায় যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। সারাহের তুলনায় অ্যাগনেসের চুল বেশি কালো, আর গায়ের রঙ বেশি ফর্সা। চেহারার টানটানে ভাব দেখেই বোঝা যায় ভালোই যত্ন নেয় ও নিজের। একসময় যে দুরন্ত কিশোরি ছিলো, তা আর এখন নেই। অবশ্য ওরা কেউই আর আগের মতো নেই।

সবাই অ্যাগনেসের বসার ঘরে বসলো। পনের বছর আগে সারাহ আর টম গাই-এর কাছ থেকে জাঞ্জিবার ছেড়ে পালানোর পর থেকে যা যা হয়েছে সব খুলে বললো সারাহ। আফ্রিকায় ওদের অভিযান, কেপ টাউনে বিয়ে করার কথা থেকে শুরু করে ফ্রান্সিসের সাথে দেখা হওয়া আর এখানে এসে জাহজডুবি, সবকিছুই সংক্ষেপে জানালো অ্যাগনেসকে।

অ্যাগনেস মোহাবিষ্টের মতো চুপচাপ শুনে গেলো সব। পুরোটা সময় ও সারাহের হাত ধরে রাখলো, এমন ভাব যেনো ছেড়ে দিলে সারাহ আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে।

“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি আমার সামনে বসে আছো,” ফ্যাসফেসে গলায় বললো ও। “আর উইলিয়াম কোর্টনীর ছেলে ফ্রান্সিস এতো বড় হয়ে গিয়েছে। পুরোটাই অলৌকিক লাগছে আমার কাছে।”

“ভাগ্যের নির্মম খেলায় আমরা আবার একসাথে হলাম,” টম স্বীকার করলো। “তবে এখন আগে ভাবতে হবে এই ঝামেলা থেকে পালাবো কিভাবে। আপনার স্বামীকে কি বিশ্বাস করা যায়?”

অ্যাগনেস মাথা ঝাঁকালো। “ক্যাপ্টেন হিকসের সাথে গাই কোর্টনীর কোনো খাতির নেই। বোম্বেতে গাই যতোভাবে পারে আমাদেরকে অপমান করেছে। আমার মনে হয় সে আমাদেরকে দেখতেই পারে না। গাই নিজে শয়তানি করে আমার স্বামীকে এই জঘন্য জায়গায় পাঠিয়েছে।”

“আর মিস্টার ফয়?” ফ্রান্সিস জিজ্ঞে করলো।

“মিস্টার ফয় আছে শুধু নিজের ধান্দায়। গভর্নর হিসেবে উনি এখানকার সৈন্যদলের প্রধান, আর সেটা আমার স্বামীকে বারবার মনে করিয়ে দিতে ছাড়েন না। ওনার বৌ-টাও ওরকম। তবে আমি আর আমার স্বামী খেয়াল রাখবো যাতে ওরা আমাদের আসল সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই না জানে।”

“তাহলে ঠিক আছে, সারাহ বললো। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।”

বলেই ও জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে অ্যাগনেসের কোলের উপর পড়ে গেলো।

“হায় হায়,” আর্তনাদ করে উঠলো অ্যাগনেস। “করেছি কি? আপনারা সবাই না খেয়ে, ভেজা কাপড়েই বসে আছেন। আর আমি কিনা বকবক করেই যাচ্ছি। আপনাদের এখন খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম করা দরকার।”

টম আর ফ্রান্সিস ধরাধরি করে সারাহকে ভিতরে নিয়ে গেলো। ওর গা গরম হয়ে আছে, জ্বর আসছে সম্ভবত। ওকে এতো কষ্ট দেওয়ার জন্যে টম মনে মনে নিজেকে গালাগাল করতে লাগলো। বিছানায় শুইয়ে একটা কম্বল দিয়ে সারাহের শরীরটা ঢেকে দিলো ও। অ্যাগনেস ডাল আর লেবুর তৈরি একটা স্যুপ নিয়ে এলো। তারপর সারাহের পাশে বসে যত্ন করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগলো।

সদর দরজা খুলে গেলো। সামনের ঘর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ অ্যাগনেসের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভিতরে এসে ঢুকলো। কয়েক মুহূর্ত পর এঘরের দরজায় দেখা গেলো তাকে। একজন লম্বা, একহারা লোক। বালু রঙের চুল একেবারে খুলির সাথে লাগিয়ে কাটা। চামড়া রোদে পুড়ে লাল হয়ে আছে। বোম্বে রেজিমেন্টের লাল, সবুজে মেশানো পোশাক পরনে ওনার।

“ফয় বললো বাসায় নাকি মেহমান এসেছে।” আগন্তুকদের দিকে নজর বুলাতে বুলাতে সে হাত বাড়িয়ে দিলো। “এলিয়াহ হিকস, অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।”

“টম…” টম ইতস্তত করলো। “টম কোর্টনী।”

“কোর্টনী?” হিকসের স্বর বিস্ময় আর সন্দেহে ভারী হয়ে গেলো। সে অ্যাগনেসের দিকে ফিরলো। “তুমি এদেরকে…”

“এরা সবাই ঘরের লোক, সারাহের ফ্যাকাশে, উষ্ণ গাল মালিশ করতে করতে অ্যাগনেস বললো। “এ হচ্ছে আমার বোন সারাহ। বিশ বছর পরে ওকে দেখলাম আমি। আমাদের ভাতিজা ফ্রান্সিস কোর্টনী। উইলিয়ামের ছেলে।”

হিকস কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। টম আর ফ্রান্সিসের সাথে করমর্দন করে অ্যানার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো ও। তারপর অ্যাগনেস সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিলো। “ওর বিশ্রাম দরকার। এখানে এতে হৈ চৈ করলে হবে না। যাও সবাই!”

মহিলাদেরকে ওখানে রেখে আবার বসার ঘরে ফিরে এলো বাকিরা। হিকস ছেলেদের জন্যে বোয়া জামা আর পায়জামা এনে দিলো। ফ্রান্সিসের ঠিকমতোই হলো, তবে টম জামার বোতাম লাগাতে গলদঘর্ম হয়ে গেলো।  ওয়াইন দিয়ে ওদেরকে আপ্যায়ন করলো হিকস। সামান্য পরেই টেবিলে মাছ আর ভাত সাজিয়ে ওদেরকে ডাক দিলো কাজের মেয়েটা।

“এই জঘন্য গরম,” হিকস অভিযোগের সুরে বললো। “ঈশ্বর জানে কিভাবে এখনো টিকে আছি।”

খাওয়া শেষে আবার ওয়াইন খেতে খেতে বৃষ্টি পড়া দেখতে লাগলো ওরা। হিকস কম কথার মানুষ, আর এখন এই সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদেরকে ও কি বলবে সেটাই ভেবে পাচ্ছিলো না।

টম ও গ্লাসটা দুর্গের দিকে তাক করে বললো, “জায়গাটায় নিরাপত্তা দেখলাম তেমন ভালো না।”

হিকস মুখ বেজার করে বললো, “এসব ফয়ের কারবার। লোকটা এতো বেশি হিংসুটে যে আমি যা-ই বলি না কেন, তার কাছে মনে হয় যে তাকে ছোট করার জন্য বলছি। তাই আমার পরামর্শের উল্টোটা করে সবসময়। আমি আমার লোকদের নিয়ে মহড়া করতে পারি না, বা এলাকাটা একটু টহলও দিতে পারি না। সে কোন না কোনো ছুতো তুলে আমার কাজে বাগড়া দেবেই।”

টম খুশি হলো যে এখানকার এই দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যে অ্যাগনেসের স্বামী কোনোভাবেই দায়ী না। সত্যি কথা বলতে লোকটার সোজা সাপ্টা হাবভাব আর সরাসরি সত্যিটা বলার মানসিকতা টমের খুবই পছন্দ হলো। এমন একজনকে ওদের পক্ষে পেয়ে ভালোই হয়েছে।

আর এ হচ্ছে আমার ভায়রা ভাই, মনে মনে ভাবলো টম। এতোদিন পর পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকা দুই বোন আবার ভাগ্যের ফেরে কিভাবে একত্রিত হলো সেটা ভেবে টম অবাক হলো।

“স্থানীয় লোকজন কেমন?”

“খুব বেশি পছন্দ করে না আমাদেরকে। ফয় তাদেরকে ক্রমাগত খুঁচিয়েই চলে। তার শুধু নিজের লাভের চিন্তা। তাই এসব করতে গিয়ে ও যে আসলে কি ক্ষতিটা করছে সেটা চোখে পড়ে না। লোকজন না খেয়ে মরলেও ফয় নিজের মর্জির বাইরে এক দানা মরিচও কেনে না। এখানকার ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করে ওর বলা দামে সব বিক্রি করতে। যদি তারা রাজি না হয় তাহলে কি করে তা আর না-ই বলি।”

“ওরা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কিছু করে না?”

“ফয়ের বিশ্বাস রানি এসব সামাল দেবেন।”

টমের চেহারা বাঙলা পাঁচের মতো হয়ে গেলো। “এই নিয়ে তৃতীয়বার এই রানির কথা শুনলাম। কে ইনি?”

“স্থানীয় রানি। বয়স খুবই কম। কিন্তু আমি যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে মানসিকতার দিকে থেকে সে আসলে একটা সাপের চাইতে কম না। তার দরবারে দুটো পক্ষ। একদল আমাদের সাথে ব্যবসা করতে রাজি, আর একদল আমাদেরকে তাড়িয়ে দিতে চায়। সে এদের দুই দলকেই সামলে রাখে। তবে উপায়টা খুব বেশি সুন্দর না।” :

“কিন্তু আমিতো দেখলাম রানির লোকজন ইংরেজদের সাথে খুব বেশি ভালো আচরণ করে না।”

টম, হিকসকে গ্রামের ঘটনাটা খুলে বললো। হিকস মাথা ঝাঁকালো।

“টুঙ্গারকে চিনি। রানির সেনাপতিদের একজন। ও ইংরেজদের পছন্দ করে না। কারণ আমরা আসার আগে ওর চাচা-ই মরিচের ব্যবসা সব নিয়ন্ত্রণ করতো।”

“ও আমার মূল্যবান একটা জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছে। একটা তরবারি। আমার পরিবারের কাছে কয়েক প্রজন্ম ধরে আছে ওটা। ওটাকে উদ্ধার করতে হবে।”

খাওয়াদাওয়া আর শুকনো কাপড় পাওয়ার পর টমের মন আপনাআপনি আবার নীলাখচিত তরবারিটার দিকে চলে যাচ্ছে। ওটা শুধু একটা অস্ত্র না, ওর কাছে ওটা কোটনী পরিবারের গৌরব আর ইজ্জতের প্রতিনিধি। এখনতো হাই উইন্ডও হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। আছে শুধু তরবারিটাই। টম ওখানে বসেই একটা প্রতিজ্ঞা করলো : তরবারিটা উদ্ধার না করে ও এই জায়গা ছেড়ে নড়বে না।

“ফয়ের ইচ্ছা আগামী তিনদিনের মধ্যে রানির দরবারে দেখা করতে যাবে, হিকস বললো। “শুনে টুঙ্গার আবারও ঝামেলা করছে। তাই ফয় ওর একটা বিহিত করতে চাচ্ছে। আপনিও এই ফাঁকে রানির সাথে ওটা ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে আলাপ করতে পারেন। তবে রানি উপহার নিতেই পছন্দ করেন, মনে হয় না ফেরত দিতে সম্মত হবেন। সে-ও মিস্টার ফয়-এর মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ।”

“তাহলেতো ভালোই ঝামেলা হবে মনে হচ্ছে,” চিন্তিত মুখে শেষমেশ বললো টম।

*

সেরাতে টম মরার মতো ঘুমালো। ঘুম থেকে উঠে দেখে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। সারাহের অবস্থাও আগের চাইতে ভালো। তবে সকালে অ্যাগনেস যখন ওকে খাওয়াতে গেলো তখন কয়েক চামচের বেশি খেতে পারলো না।

একজন কাজের লোক একটা চিরকুট এনে টমকে দিলো। ফয় পাঠিয়েছে। টম ভেবে পেলো না কি এমন খবর যে ফয় নিজে ওর অফিস থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে এই বাসায় এসে দিতে পারলো না।

আশা করি আপনি আমাদের মধ্যকার চুক্তিটা ভুলে যাননি, চিরকুটে লেখা।

“তার মানে সে এখনি আমাকে জাহাজডুবির ওখানে গিয়ে দেখতে বলছে যে কিছু পাওয়া যায় কিনা,” টম বুঝতে পারলো। “বুঝতে পারছি যে আমরা যদি খরচাপাতি পরিশোধ করতে না পারি তাহলে তার জন্যে বাড়তি ঝামেলা হয়ে দাঁড়াবো।”

“আমি যাবো নাহয় আপনাদের সাথে,” হিকস বললো।

“তাহলেতো ভালোই হয়,” কৃতজ্ঞচিত্তে বললো টম। “তবে এখানে আপনার কাজের যেনো আবার গাফিলতি না হয়।”

হিকস মুখ দিয়ে অবজ্ঞাসূচক একটা শব্দ করলো। আমি সারাদিনে যা করি, তার চাইতে নারিকেল কুড়ানো ভালো। মিস্টার ফয় সারাদিনে আমার চেহারা না দেখতে পেলে বরং খুশিই হবেন।”

টম কেস্ট্রেল-এর লোকদের মধ্যে আটজনকে পেলো যারা এখনো অক্ষত দেহে আছে। হিকস ওর লোকদের মধ্য থেকে চারজন সেপাইকে নিলো ওদের সাথে। নেতৃত্বে থাকলো মোহিত নামের এক হাবিলদার। লোকটার মোচটা বেশ দর্শনীয়। হাবিলদার হচ্ছে বোম্বের সেনাবাহিনির সার্জেন্টের সমতুল্য। দুজনের মধ্যেকার আন্তরিকতা দেখেই টম বুঝলল হিকস এর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে।

একটা ভাড়া করা স্থানীয় নৌকায় রওনা দিলো ওরা। এগুলোকে গালিভাত বলে ডাকা হয়। জাহাজের ডিঙির সমানই বড়, তবে পাল খাটানো যায়। টম চিন্তিত মুখে আকাশের দিকে খেয়াল করতে লাগলো। তবে ঝড়টা শেষ পর্যন্ত কেটেই গিয়েছে। বাতাসের টানে মসৃণভাবে ভেসে চললো গালিভাত। ওটার তিনকোণা পালটা একদম পুরোটা ফুলে ফেঁপে আছে।

“ডোরিয়ান থাকলে ভালো হতো,” আক্ষেপ করে টম বললো। “ও ঠিকই ভাঙা জাহাজ থেকেও অনেক কিছু বের করে ফেলতো।”

“ভাগ্য ভালো হলে, কয়েকদিন পরেই উনি গনের সৈকতে বসে আবোলির সাথে কফি খেতে খেতে কেমন কামাই করলেন সেসব হিসাব করবেন,” ফ্রান্সিস বললো।

ব্রিঞ্জোয়ানে ওরা এসেছিলো হাটা পথে, টম সেসময় সৈকতের কিছুই দেখতে পায়নি। দিগন্ত বরাবর কয়েক ঘণ্টা নৌকা চালালো ওরা। আকাশ পুরোপুরি মেঘমুক্ত না, যেকোনো সময় আবার প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যেতে পারে।

ওরা একটা ছোট বেরিয়ে থাকা চড়া পেরিয়ে একটা লম্বা কিন্তু অগভীর অংশে এসে পৌঁছালো। টমের মনে হলো কেঁদেই দেবে। কেস্ট্রেলকে দেখা যাচ্ছে সামনে। একটা বিশাল ধ্বংসস্তূপ। বাতাস আর ঢেউ ওটাকে তীরের কাছাকাছি ঠেলে এনেছে। পানি এখানে এতো কম যে ওটার ভাঙা ডেক পানির উপরে উঠে আছে।

তবে জাহাজটা খালি না। তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে ওটার উপর। সৈকতে দাঁড়ানো আরো একদল লোককে চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। সৈকতের লোকগুলো একপাল ষাঁড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের গায়ে একটা শেকল বেঁধে অপর প্রান্ত বাধা হয়েছে ষাঁড়গুলোর সাথে। টম দেখলো লোকগুলো সপাং করে ষাড়ের গায়ে বাড়ি দিলো আর জম্ভগুলো ঝাঁকি মেরে সামনে বাড়লো। ওদের গায়ে বাঁধা শেকলগুলোর সমুদ্রের পানি থেকে বেরিয়ে এলো। পানি ঝরছে ওগুলো থেকে। বঁড়গুলো সৈকত ধরে উঠতে উঠতে গাছের সারির ওপাশে হারিয়ে গেলো। ওখানে কিছু পাম গাছ কেটে জায়গা করা হয়েছে।

“ওরা কি পুরো জাহাজটাকেই ডাঙায় টেনে তুলবে নাকি?” ফ্রান্সিস অবাক হলো।

হিকস হাতের টেলিস্কোপটা দিয়ে সৈকতের দিকে নজর রাখছে। ও সেটা টমের হাতে ধরিয়ে দিলো। ওটা দিয়ে টম পানির নিচে একটা কালো হাঙরের আকৃতির জিনিস দেখতে পেলো।

ষাঁড়গুলো ওটাকে ঢেউয়ের নিচ থেকে টেনে তুলতেই দেখা গেলো ওদের জাহাজের নয় পাউন্ডের কামানগুলোর একটা। ওটা পানির উপরে উঠে আসতেই লোকজন দৌড়ে গিয়ে ওটাকে থেকে একটা কাঠের খাঁচার মধ্যে তুলে দিলো যাতে আর গড়িয়ে না যেতে পারে।

“এরা করছেটা কি?”

“ইউরোপিয়ান কামান এখানকার লোকের কাছে সাত রাজার ধনের মতো,” হিকস বললো। “ওদের রানি এগুলোর জন্যে এগুলোর ওজনের সমান স্বর্ণ দিতে রাজি। কিন্তু তোমার ভাই গাই পর্যন্ত অস্ত্র বেচা-কেনা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করেছে। লাভ যতোই হোক, এগুলো যে একসময় কোম্পানির জাহাজ বা কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কি?”

টম আবার সৈকতটা পর্যবেক্ষণ করলো। কামানটা গাছের সারির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর ষাঁড়গুলোকে আবারও নিয়ে আসা হলো পানির কাছে। দুজন লোক শেকলের মাথা হাতে নিয়ে ভাঙা জাহাজটার দিকে এগিয়ে গেলো। বোঝাই যাচ্ছে ওরা সবগুলো কামানই উদ্ধার করতে চায়।

টেলিস্কোপ দিয়ে টম ওদের সর্দারকে দেখতে পেলো। লম্বা, চওড়া কাধ, অন্য সবার চাইতে তার মাথা উঁচিয়ে আছে। লোকটার উর্ধাঙ্গে কোনো কাপড় নেই। কোমরে পিস্তল গোজা, আর বুকে কোনাকুণিভাবে ঝুলছে কার্তুজের বেল্ট। দুটো তরবারিও দেখা গেলো। ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে কাজ করাচ্ছে সে। তবে লোকগুলোর যেভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে কাজে ছুটছে সেটা দেখে অবাক হলো টম। এরা যে খুব ভালমতো প্রশিক্ষিত তা-ই না, এরা লোকটাকে প্রচণ্ড ভয়ও পায়।

“একেবারে জবরদস্ত এক লোক দেখি,” টম বিড়বিড় করে বললো। লোকটাকে দেখে মনে কু ডাক ডাকছে ওর। “এ আবার কে?

হিকস টেলিস্কোপটা নিলো আবার। “একে আগে কখনো দেখিনি। সম্ভবত রানির নতুন লোক।”

“অথবা ডাকাতও হতে পারে।”

“রানির এলাকা থেকে জাহাজডুবির মাল লুট করতে হলে বুকের পাটা থাকতে হবে। আর কামান সরানো আর লোকজনের টাকার ব্যাগ মেরে দেওয়া এক জিনিস না। এতো গুলো লোক নিয়ে আসা, এতোগুলো ষাড় জোগাড় করা… আর নিয়ে যাওয়ার ঝামেলার কথা বাদই দিলাম। রানির অনুমতি ছাড়া এতোসব সম্ভব না।”

“তাহলেতো দেখা যাচ্ছে রানির সাথে দেখা করতে গেলে আমার তরবারির সাথে সাথে আরো অনেক কিছুই ফেরত চাইতে হবে।”

হিকসের ভ্রু কুঁচকে গেলো। “আমার এসব পছন্দ হচ্ছে না। ওই মহিলা নিশ্চিত কোনো শয়তানি ফন্দি আঁটছে। আমি নিশ্চিত।”

সৈকতের লোকেরা গালিভাতটাকে দেখতে পেলো। চিৎকার করে হাত ছুঁড়তে লাগলো তারা। তবে ওদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে নাকি সরে যেতে হুশিয়ার করছে সেটা বোঝা গেলো না। টম আবার টেলিস্কোপে চোখ দিলো।

“সোজা যেতে থাকো,” হাল ধরে রাখা আলফ উইলসনকে বললো টম। “ওরা সংখ্যায় অনেক, আর আমরা যে ওদেরকে এসব করতে দেখে ফেলেছি। সেটা বুঝতে দেওয়া যাবে না।” ওর মনে হয় না যে সৈকতের লোকগুলোর কাছে কোনো স্পাই গ্লাস থাকবে। ভাগ্য ভালো হলে ওরা বুঝবেই না যে নৌকার লোকগুলো বিদেশি।

হিকস ওর চিন্তা ধরতে পারলো। “যদি বোঝাতে চান যে আমরা নিরীহ যাত্রী, তাহলে টেলিস্কোপটা নামিয়ে রাখলেই ভালো হবে। এখানকার জেলেরা এরকম কিছু ব্যবহার করে না।”

তবুও টম আরো একবার সর্দার লোকটাকে না দেখে পারলো না। কিন্তু ও টেলিস্কোপটা চোখে দিতেই লোকটাও সোজা ওর দিকে তাকালো। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ কাকতালীয়, কিন্তু টমের মনে হলো এতো দূর থেকেও সে টের পেয়ে গিয়েছে। লেন্সের ভিতর দিয়ে লোকটার চোখ দেখতে পেলো টম। ও নিশ্চিত যে একে জীবনেও কখনো দেখেনি, কিন্তু তবুও চেহারাটা নজরে আসতেই মেরুদণ্ড। বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো। অব্যাখ্যেয় কোন কারণে ওর মনে হলো একে বহুদিন ধরে চেনে, মনে হলো যেনো আয়নায় নিজের চেহারাটাই দেখতে পেলো।

ও টেলিস্কোপটা নামিয়ে আবার চামড়ার ব্যাগে রেখে দিলো। শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে, হয় ভুল দেখেছে নইলে ওর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।

হঠাৎ কেপ টাউনে দেখা সেই সবুজ দ্যুতির কথা মনে পড়লো ওর। একটা আত্মা আবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসবে।

টেলিস্কোপ ছাড়া সৈকতের লোকটাকে এখন পিঁপড়ার মতো ছোট লাগছে। কিন্তু তবুও টম ওর উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। ওরা জায়গাটা চক্কর দিয়ে আবার উল্টোদিকে ফিরে যেতে যেতে যখন জায়গাটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো, তখনই টম চোখ নামালো।

আবারও ব্রিঞ্জোয়ানে ফিরতে লাগলো ওরা। হিকসের সতর্কবার্তাটা কানে বাজছে টমের। ওই মহিলা নিশ্চিত কোনো শয়তানি ফন্দি আঁটছে।

*

পেটের উপর ভর দিয়ে ক্রিস্টোফার খাড়া পাহাড়টার ধার দিয়ে নিজেকে টেনে তুললো। ওখান থেকে একটা পচা গাছের উপর দিয়ে উঁকি দিতেই দেখতে পেলো নিচের বহরটা। সবার সামনে আছে একটা পর্দায় ঘেরা পালকি, আটজন ডুলি বইছে সেটা। পিছনে আছে বিশজন সশস্ত্র লোক।

তামান্না উঠে এলো ওর পাশে। “বলেছিলাম না যে অপেক্ষা করলে ভালো

এই একই বহরটাকে তিনদিন আগে এই রাস্তা দিয়েই উল্টোদিকে যেতে দেখেছে ওরা। ক্রিস্টোফার চেয়েছিলো তখনই আক্রমণ করতে, কিন্তু তামান্না বলেছিলো ধৈর্য ধরতে। “এরা ব্রিঞ্জোয়ানের ইংরেজ কুঠিতে কাপড় নিয়ে যাচ্ছে। যখন ফিরে আসবে তখন এদের কাছে থাকবে বিক্রি করে পাওয়া স্বর্ণ।”

এখন সেটার সত্যতা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে ক্রিস্টোফার। তিন দিন আগের বহরে প্রায় একশো স্থানীয় কুলি ছিলো পালকিটার পিছনে। সবার মাথায় ছিলো নিখুঁতভাবে বোনা সৃতি কাপড়ের গাঁটরি। এখন আর ওরা নেই। তার বদলে আছে একটা মাত্র খচ্চর। ওটার পিঠের বস্তাটার যে অনেক ওজন তা জটার চলার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে। এতোগুলো পাহারাদারের ভীড়ে ওটা যে নির্ভয়ে চলছে। তাতেই ক্রিস্টোফার বেশ অবাক হলো। সব দেখে একটু পিছনে সরে এলো ও।

মনের ভিতর কেমন যেনো একটা আশংকা দোলা দিয়ে গেলো ওর, কেনো এমনটা হলো ভেবে পেলো না। ব্যাপারটা যে ওর বিবেকের দংশন না সেটা ও নিশ্চিত। ছয় মাস হয় ও তামান্নার ডাকাত দলে যোগ দিয়েছে, আর এর মাঝে কতোবার যে এই কাজ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। একাকী পথচারীদেরকে ছিনতাই করে খুন করেছে, কড়া পাহারায় থাকা ক্যারাভানও লুট করেছে। অব্যাহত সফলতার কারণে ওদের নাম ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। লাভ ক্ষতি দুটোই হয়েছে তাতে। লাভ হচ্ছে ওদের দলে এখন এক ডজন লোক। আর ঝামেলা হচ্ছে ওদেরকে আরো উত্তরে চিত্তাত্তিস্কারাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে। কারণ আগের জায়গার রাজা ওদেরকে ধরার জন্যে মরণ পণ করেছিলেন।

“এখনই আক্রমণ করবো?”

তামান্না একটা শয়তানি হাসি হাসলো। “বেচারা খচ্চরটার পিঠটাই ভেঙে যাবে যদি আমরা ওর পিঠের বোঝাটা কমিয়ে না দেই। ভয় পাচ্ছো নাকি?”

“আরে নাহ।”

“তাহলে ওরা পালানোর আগেই ফাঁদটা পেতে ফেলা যাক।”

জায়গাটা আক্রমণের জন্যে একেবারে উপযুক্ত। রাস্তাটা এখানে মোড় নিয়ে একটা সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে। কাদা কাদা অবস্থা। উপরের চড়াটা ভাঙা পাথরের টুকরো দিয়ে ভরা, ফলে লুকিয়ে থাকার জন্যে প্রচুর জায়গা পাওয়া যায়। প্রহরীরাও জানে ব্যাপারটা। ক্রিস্টোফার দেখলো প্রহরীরা সবাই নিজেদের তরবারি খাপমুক্ত করে হাতে তুলে নিলো। এদের সর্দার হচ্ছে লাল পাগড়ি পরা বিশালকায় একটা লোক। সে কিছু একটা আদেশ দিলো। ওদের চারজনের হাতে বন্দুক আছে, তারা সবাই বন্দুকের ঘোড়ায় আগুন জ্বেলে প্রস্তুত করে নিলো, যাতে দরকার হওয়া মাত্র গুলি ছুঁড়তে পারে। খাড়া ধারটায় কড়া নজর রেখে আগাতে লাগলো ওরা, সামান্য নাড়াচাড়াও চোখ এড়াচেই না। তবে ক্রিস্টোফারও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ওস্তাদ। দম বন্ধ করে পড়ে রইলো ও।

ক্যারাভানটা বাঁক ঘুরতেই একটা আতংকিত চিৎকার শোনা গেলো আর দলটা থেমে পড়লো। একটা গাছ ভেঙে পড়ে পুরো রাস্তা আটকে দিয়েছে। প্রহরীরা খচ্চরটাকে ঘিরে একটা চক্র করে দাঁড়িয়ে গেলো, চেহারা পাথরগুলোর দিকে। ক্রিস্টোফার দেখলো সর্দার লোকটা গাছের গোড়াটা পরীক্ষা করে দেখছে। নিজের কাজ ভালোই জানে সে। যদি খুঁড়িটায় কুড়ালের আঘাতের চিহ্ন থাকে তাহলে ঠিকই বুঝে যাবে যে ইচ্ছা করে গাছটা ফেলা হয়েছে।

কুড়ালের কোনো দাগ নেই। ক্রিস্টোফারের লোকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাটি খুঁড়ে এমন অবস্থা করে রাখে যাতে গাছগুলো নিজের ভারেই ঢলে পড়ে। তাতে করে মনে হয় যে ব্যাপয়ারটা আপনাআপনিই ঘটেছে।

সর্দারও ধোকা খেয়ে গেলো ব্যাপারটায়। বন্দুকধারী লোকগুলো পাহারায় থাকলো আর বাকিরা অস্ত্র নামিয়ে রেখে গাছটা ঠেলে সরানোর কাজে লেগে গেলো। ঝটপট কাজ করতে লাগলো তারা। মুলত জানের ভয়েই যতো দ্রুত সম্ভব এলাকাটা পার হতে চায়। সেই সাথে সর্দারের গালাগাল তো আছেই। কয়েক মিনিটের ভিতরে ওরা ভারি গাছটাকে ঠেলে সরিয়ে ফেললো। কোনো আক্রমণ এলো না দেখে ওদের দুশ্চিন্তাও কমলো কিছুটা। ক্রিস্টোফার ওদের ঠোঁটে হাসি দেখতে পেলো, হাসির শব্দও কানে এলো ওর। এতে ভয় পেয়ে যাওয়ায় এখন সবাই কেমন লজ্জা পাচ্ছে। পালকির পর্দার ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এলো। ইশারায় রওনা দেওয়ার জন্যে আদেশ করছে।

প্রথম তীরটা সরাসরি সর্দারের গলা এফোড় ওফোড় করে দিলো। পরেরটা লাগলো খচ্চরের গায়ে। তামান্নার লোকেদের বন্দুক আছে, কিন্তু ওরা সবসময় প্রথম আক্রমণটা করে তীর দিয়ে। এতে করে শিকার দিশেহারা হয়ে। যায়। কারণ তীর ছুড়লে কোনো ধোয়া বা অন্য কিছু দেখা যায় না যা দিয়ে কেউ অনুমান করবে যে আক্রমণ ঠিক কোথা থেকে আসছে।

সর্দার না থাকায় দলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। এলোপাথাড়ি গুলি করতে লাগলো ওরা। খামাখা বন্দুকের গুলিও খরচ হলো আবার গুলির ধোঁয়ায় নিজেরাই কিছু দেখতে পেলো না আর। বন্দুকে আবার গুলি ভরতে পারার আগেই তামান্না আর ওর লোকেরা ঢাল বেয়ে নেমে এসে আক্রমণ করলো। ক্রিস্টোফার উরুমিটা অবমুক্ত করে যোগ দিলো ওদের সাথে। ধোয়ার ভিতর দিয়েও দেখতে পেলো একজন প্রহরী মরিয়া হয়ে বন্দুকে গুলি ভরার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উরুমিটা সোজা উড়ে গিয়ে ওর বুকটা চিরে দিলো। দক্ষ হাতে ক্রিস্টোফার আবার ওটাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে হাতল ঘুরিয়ে আর একটা প্রহরীর দিকে ছুঁড়ে দিলো। তার হাঁটু কেটে বেরিয়ে এলো ওটা। আর্তনাদ করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো লোকটা।

কিছুদিন আগেও ক্রিস্টোফারও ছিলো এরকমই একজন প্রহরী। ধোয়ার ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলো ও, কিন্তু তামান্নার লোকেরা আগেই সব সেরে রেখেছে। উরুমিটা আর ব্যবহার করতে হলো না ওকে। কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেলো আটজন ডুলি বাদে আর কেউই জ্যান্ত নেই। শরীরের উর্ধাংশে কিছুই নেই লোকগুলোর আক্রমণের প্রচণ্ডতা আর দ্রুততায় ওরা আর জায়গা ছেড়ে নড়ার সময় পায়নি।

হাতে অস্ত্র থাকলে এরাও কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারতো। তবে ক্রিস্টোফার ভারত সম্পর্কে একটা জিনিস জানে, এখানে জাত ব্যাপারটা খুব কড়াভাবে মানা হয়। একজন ডুলি কখনো লড়াই করবে না, আবার একজন যোদ্ধা কখনো গরুর দুধ দুইবে না। একজন লোকের জন্মই তার নিয়তি ঠিক করে দেয় এখানে।

তাই ওরা যখন পালকি ফেলে ছুট দিলো তখন ক্রিস্টোফার বিশেষ অবাক হলো না। এমনটাই আশা করেছিলো এদের কাছ থেকে। ওদেরকে যেতে দিয়ে পালকিটার দিকে আগালো ও।

পর্দা সরে গেলো। একজন বেটে, মোটাসোটা লোক মাথা বের করলো ভিতর থেকে। পরনে সবুজ রঙের রেশমি কাপড়। বাইরের দৃশ্য চোখে পড়তেই চেহারার প্রচণ্ড রাগের অনুভূতি পাল্টে নির্জলা আতংক ভর করলো সেখানে। ক্রিস্টোফার ঠিক সামনেই তার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।

লোকটা হাতের আংটিগুলো খুলে ক্রিস্টোফারের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিতে শুরু করলো। মোটা আঙুল থেকে আংটি খোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা দেখে খুব মজা পেলো ক্রিস্টোফার।

“এর চাইতে আঙুলগুলো কেটে দিলে তাড়াতাড়ি খুলবে,” সাহায্য করার ভঙ্গিতে বললো ক্রিস্টোফার।

লোকটা বিলাপ করতে করতে আরো জোরে চেষ্টা করতে লাগলো। কার্নেলিয়ান আর চুনি বসানো একটা আংটি এতো বেশি এঁটে ছিলো যে খোলার সময় চামড়া সমেত উঠে এলো। রক্ত উপচে পড়তে লাগলো ক্ষত থেকে।

ক্রিস্টোফার তরবারির ডগাটা লোকটার গলায় ঠেকালো। যেনো নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেলো লোকটা।

“এতো কষ্ট করতে হবে না। তোকে মারার পর আমি নিজেই খুলে নেবো।”

ভয় পেয়ে আবার নিজের পালকির ভিতরে সেধিয়ে গেলো লোকটা। টান দিয়ে পর্দাগুলো ছিঁড়ে ফেললো ক্রিস্টোফার। ভিতরে দেখা গেলো অনেকগুলো নকশা করা বালিশ। ওগুলো থেকে সুগন্ধ ভেসে আসছে। ক্রিস্টোফারের পছন্দ হলো বালিশগুলো। এগুলোতে রক্ত যাতে না লাগে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

“দয়া করুন,” লোকটা অনুনয় করলো। “আপনি কি জানেন, আমি কে?”

“না,” ক্রিস্টোফার বললো।

ওর চোখ লোকটার টাকা পয়সার হিসাব কষতে ব্যস্ত থাকায়, সওদাগরের চোখের ধূর্ত দৃষ্টিটা খেয়াল হলো না।

“আমার নাম মহেন্দ্র পুলা। আমার ভাইয়েরা সব বড় বড় ব্যবসায়ী। আমাকে ছেড়ে দিলে ওনারা অনেক টাকা দেবেন।”

“আমরা কাউকে অপহরণ করি না,” শান্ত স্বরে ব্যাখা করলো ক্রিস্টোফার।

“আমার ভাইয়েরা এখান থেকে কাছেই থাকে। সব কিছুর ব্যবস্থা করতে কয়েকটা দিন লাগবে মাত্র।” লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে অনুনয় করতে লাগলো। “সামনেই বর্ষাকাল আসছে, তখন রাস্তাঘাটে আর পালকি চলবে না। বর্ষার আগে তাই বড়সড় একটা দাও মারতে পারলে আপনাদেরই লাভ।”

“ঐ খচ্চরে যে স্বর্ণ আছে তা দিয়েই হেসে খেলে চলে যাবে অনেকদিন।”

সওদাগরের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। “ওটার জন্যে আপনারা আমার লোকগুলোকে মেরেছেন? ওই খচ্চরের পিঠের জিনিসের জন্যে?”

“তাছাড়া কি?” ক্রিস্টোফার কোপ দেওয়ার জন্যে তরবারি তুললো। লোকটার চেহারার আতংক তারিয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। বালিশ জাহান্নামে যাক। ওগুলো কোনো অশিক্ষিত চাষীর কাছে বেঁচে দেবে। রক্তের দাগ নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা থাকার কথা না। তরবারি নামিয়ে কোপ দিলো ও।

“থামো।”

তামান্নার গলা শুনে সওদাগরের ঘাড়ের এক ইঞ্চি আগে ক্রিস্টোফারের তরবারি থেমে গেলো। এই একটা মাত্র কণ্ঠই ক্রিস্টোফারকে থামাতে পারে। ঘুরে দেখে তামান্না একটা মোটা সোটা বস্তা নিয়ে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। সওদাগর ততোক্ষণে আকূল হয়ে কাঁদতে শুরু করেছে।

“কি হয়েছে?”

কোনো কথা না বলে তামান্না লোকটাকে টেন দাঁড় করিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বললো, “স্বর্ণ সব কোথায়?”

“খচরে নেই?” জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার।

বাম হাত দিয়ে তামান্না উপুড় করে দিলো বস্তাটা। চেরির বানানো ব্রান্ডির ছোট একটা বোতল মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেলো। তারপরেই কাগজে মোড়া আরো কিছু জিনিস ধুপধাপ পড়তে লাগলো মাটিতে। ক্রিস্টোফার তরবারির ডগা দিয়ে একটা মোড়ক ছিঁড়ে ফেলতেই ভেতর থেকে কিছু ধাতব খণ্ড বেরিয়ে এলো। একটা তুলে নিয়ে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই বেকে গেলো সেটা।’

“সীসা?”

সওদাগর একটা আক্রমণ আশা করে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করলো। কিন্তু ক্রিস্টোফার টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে জিজ্ঞেস করলো, “স্বর্ণ কোথায়?”

“স্বর্ণ নেই।”

“তাহলে তিনদিন আগে ব্রিঞ্জোয়ানে যে কাপড়গুলো নিয়ে গেলি সেগুলোর কি হয়েছে?” তামান্না জানতে চাইলো।

“ওখানকার ইংরেজ লোকটা একটা পাক্কা চোর। আমার জিনিস নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু টাকা দেয়নি। তার বদলে আপাতত এই সীসা দিয়েছে। গরমের সময় আসলে বাকি টাকা স্বর্ণে পরিশোধ করবে বলেছে।”

“মিথ্যা কথা,” ঠাণ্ডা স্বরে বললো তামান্না। “এর কাপড়চোপড় সব খুলে পরীক্ষা করে দেখো, আর যদি কাপড়ের নিচে কিছু না পাও তাহলে চামড়া খুলে দেখো কোথায় লুকিয়ে রেখেছে স্বর্ণ।”

“না,” আর্তনাদ করে উঠলো লোকটা। “আমি মরে গেলে আপনাদের কোনোই লাভ হবে না। জ্যান্ত থাকলে কিন্তু লাভ করতে পারবেন।”

“এ চাচ্ছে আমরা যেনো ওকে না মেরে ওর ভাইদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করি,” ক্রিস্টোফার বললো।

“আমরা কাউকে অপহরণ করি না,” সোজাসুজি বলে দিলো তামান্না। “আর ধরা না পড়ে মুক্তিপণ আদায় করবোই বা কিভাবে? তোর পরিবারের লোকজন আমাদের সাথে দরদরি করতে চাইবে। আর প্রতিবার খবর দেওয়া নেওয়ার সময়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।”

“কোন দরাদরি করতে হবে না,” সওদাগর ওয়াদা করলো। “কতে চান বলুন শুধু। আমি আমার ভাইদের কাছে খবর পাঠাবো যাতে বিনা বাক্যব্যয়ে টাকাটা দিয়ে দেয়। আপনারা যেখানে চান সেখানেই ওরা টাকাটা রেখে আসবে।”

“যদি তোকে জ্যান্ত ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে ওরা কেনোই বা টাকা দেবে?”

“কারণ তাহলে আমাকে ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর থাকবে না।” সওদাগরের চেহারার রঙ ফিরে আসছে আবার। সে হাতের শেষ আংটিটা খুলে তামান্নার সামনে তুলে ধররলো। “আমি এক সামান্য ব্যবসায়ী। চলুন এমন কিছু করি যাতে দুজনেই লাভবান হতে পারি।”

*

“আমি একে বিশ্বাস করি না, তামান্না বললো। একটা পাথরের আড়ালে হামাগুড়ি দিয়ে বসে নিচু স্বরে কথা বলছে ওরা। গভীর রাত এখন। আকাশে চাঁদ আছে, কিন্তু চাঁদনী নেই। ফলে অন্ধকার আরো জাঁকিয়ে বসেছে। ব্যাপারটা অবশ্য কাকতালীয় কিছু না। আজকের সব কিছু অনেকবার আলোচনা আর তর্কাতর্কির পর ঠিক করা হয়েছে। স্থান, সময়, দিক নির্দেশনা-সব। প্রায় ডজনখানেক পরিকল্পনা নাকচ করে শেষে এটা নির্ধারণ করেছে ওরা। ক্রিস্টোফার বেশ কয়েকবার ভেবেছে তামান্না বোধহয় বন্দিকে খুন করে সব তর্ক অবসান করে দেবে। এখনো অবশ্য সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় নি।

রাতের বাতাসে একটা অস্পষ্ট পেঁচার ডাক ভেসে এলো। কিন্তু ডাকটা হুবহু পেঁচার মতো না। ক্রিস্টোফার শক্ত হয়ে গেলো।

“সংকেত দিচ্ছে।”

পাহাড়ের উপর একটা পাথুরে গুহা নির্ধারণ করেছে ওরা। রাস্তা বা গ্রাম থেকে বহু দূরে। রাস্তা ভরে পাহারাদার রেখেছে, যাতে ওরা কোনো চালাকি করার চেষ্টা করলে সাথে সাথে ধরা পড়ে যায়। এখনই প্রমাণ হবে পুলা কি আসলেই কথা দিয়ে কথা রাখে কিনা।

“টাকা পেলেও আমাদের কিন্তু ওকে মেরেই ফেলা উচিত, তামান্না অস্থির হয়ে উঠছে। “ও আমাদের চেহারা আর নাম দুটোই জানে। ও বাড়ি ফিরেই রানির কাছে অভিযোগ করবে, আর রানিও আমাদের ধরার জন্যে সৈন্য পাঠিয়ে দেবে।”

“এ একটা বলদ,” ক্রিস্টোফার বললো। “জান নিয়ে যে পালাতে পারছে সে জন্যেই ওর ঈশ্বরদের ধন্যবাদ দেবে। আর এতেই সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। তাছাড়া, মুক্তিপণ নেওয়ার পরেও যদি খুন করি তাহলে কথাটা জানাজানি হয়ে যাবে। পরের বার কাউকে অপহরণ করলে আর কেউ টাকা দেবে না।”

তামান্না কাঁধ ঝাঁকালো, “আমাদের যথেষ্ট স্বর্ণ আছে।”

“যথেষ্ট স্বর্ণ বলে দুনিয়াতে কোনো কিছু নেই।”

পাথুরে মেঝেতে পদশব্দ পেতেই ওরা চুপ করে গেলো। দুজন কুলি এসে দাঁড়ালো গুহাটার মুখে। পিঠে বিশাল ওজনের দুটো সিন্দুক। চাপে ওদের পিঠ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ওরা সিন্দুক দুটো নামিয়ে রেখে হাত ডলতে ডলতে অন্ধকারে ইতিউতি তাকাতে লাগলো।

“মালিক পুলাকে নিতে এসেছি আমরা,” একজন বললো।

ক্রিস্টোফার টের পেলো তামান্না পিস্তল তুলে নিচ্ছে। ক্রিস্টোফার ওকে বাধা দিলো। “আগে শুনে নেই কি বলে?”

“আমরা বলেছিলাম মাত্র একজন পাঠাতে,” জিজ্ঞেস করলো তামান্না। ওর কথা পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো। ফলে কোথা থেকে কথা বলছে। সেটা বোঝা গেলো না। কুলিগুলো এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। এই অন্ধকারেও ওদের আতংকিত চেহারা দেখতে পেলো ক্রিস্টোফার।

“সিন্দুকটা একজনের পক্ষে টেনে আনা সম্ভব না,” একজন কুলি উচ্চস্বরে মিনতি করলো।

“তাহলে তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না।”

“মালিকের কি হবে?”

“টাকা গোণা শেষ হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এখন ভাগ।” তামান্না পিস্তল তুলে ফাঁকা গুলি ছুঁড়লো। প্রতিধ্বনির কারণে মনে হলো যেনো পুরো এক কোম্পানি বন্দুকধারী সৈনিক একযোগে গুলি ছুঁড়েছে।

কুলিগুলো যাওয়ার পরেও ক্রিস্টোফার আর তামান্না নড়লো না। গুহার মাঝখানে একটা প্যাগান বেদীর মতো বসে আছে সিন্দুকটা। হাতের তালু চুলকাতে লাগলো ক্রিস্টোফার। সিন্দুকটা খুলতে আর তর সইছে না। কিন্তু প্রহরী এসে সব ঠিক আছে সেই সংকেত দেওয়ার আগ পর্যন্ত ওঠার উপায় নেই।

“ওরা একারাই এসেছিলো,” নিশ্চিত করলো লোকটা। “এমনভাবে পালিয়েছে যেনো বাঘে তাড়া করছে।”

ক্রিস্টোফার সিন্দুকটার দিকে এগিয়ে গেলো। ভারি মেহগনী কাঠ দিয়ে বানানো ওটা। গায়ে চমৎকার নকশা। জিনিসটা সম্ভবত মশলা অথবা ওষুধ রাখার কাজে ব্যবহার হতো। কারণ ভিতর থেকে মৌরির সুঘ্রাণ ভেসে আসছে।

টান দিয়ে ঢাকনাটা খুললো ও। এই মরা চাঁদের আলোতেও ঝিকমিকিয়ে উঠলো ভিতরটা।

এক হাতা মুদ্রা তুলে নিলো ক্রিস্টোফার। ধাতুগুলো আঙুলের ফাঁক দিয়ে নাড়াচাড়া করতেই অন্যরকম একটা অনুভূতি হতে লাগলো ওর। তামান্না সেগুলো ওর হাত থেকে ফেলে আবার ঢাকনাটা বন্ধ করে দিলো।

“পরে। আগে এখান থেকে ভাগতে হবে। ওই কুলিগুলো লোকজন নিয়ে ফিরে আসতে পারে আবার।”

“আর পুলা?”

তামান্নার চোখের জ্বলজ্বলে ভাব দেখেই ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো ওর মনের ভিতর কি চলছে। ও নিজের আঙুলে একটা ছুরির ধার পরীক্ষা করলো।

ক্রিস্টোফার সিন্দুকটায় লাথি মেরে বললো, “একবার ডাকাতি করে যতো টাকা পাওয়া যায় তার চাইতে বহু গুণ এর ভিতর আছে।”

“ওর জিভটা কেটে দেওয়া যায় যাতে আর আমাদের কথা কাউকে বলতে না পারে, তামান্না জবাব দিলো।

“ও কিন্তু লিখতে পারবে,” ক্রিস্টোফার ধরিয়ে দিলো।

“তাহলেতো হাতটাও কেটে ফেলতে হবে।”

“ওর পরিবার কিন্তু ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেবে না,” ক্রিস্টোফার বোঝানোর চেষ্টা করলো। এরকম জরুরি অবস্থায় তামান্না কি ওর সাথে মজা করছে নাকি আসলেই এসব বলছে তা ও ধরতে পারছে না।

কোনো জবাব না দিয়ে তামান্না ওর লোকদের শিষ দিয়ে পুলাকে আনতে বললো। ওরা ঠেলতে ঠেলতে পুলাকে গুহার ভিতরে নিয়ে এলো। পুলার চোখ বাধা, হাতও পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে। আর এই ভ্যাপসা গরম রাতেও ও ঠকঠক করে কাঁপছে সে।

ক্রিস্টোফার তামান্নার মুখোভঙ্গি পড়ার চেষ্টা করছে। তবে অনেক চেষ্টা করেও ওর উদ্দেশ্যটা ধরতে পারছে না।

“আচ্ছা টাকাই যদি আসল না হয়, তাহলে আমরা এসব করছি কেনো?” ক্রিস্টোফার শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো।

তামান্না ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে ছুরিটা ওর বেল্টের খাপে ঢুকিয়ে রেখে দিলো। চুপিসারে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ক্রিস্টোফার। পুলার জন্যে ওর বিন্দুমাত্র দরদ নেই। লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও নিজেই খুশি মনে পুলার উপর যতো ইচ্ছা অত্যাচার করতো। কিন্তু এখন ওকে অক্ষত ছেড়ে দেওয়াই লাভ বেশি।

“তুই এখানেই থাক,” তামান্না পুলাকে বললো। “আর মনে মনে ভগবানকে ডাক যাতে সাপ আর হায়েনার আগেই তোকে অন্য কেউ যেনো খুঁজে পায়।”

“দয়া করে বাঁধন খুলে দিয়ে একটা তরবারি রেখে যান,” অনুনয় করলো পুলা।

“ভালোমতো টানাটানি করলে বাধন এমনিই খুলে যাবে,” তামান্না বললো। “আর তোর বাড়ির লোকেরাও খুঁজতে খুঁজতে চলে আসবে।”

কথাটা বলে যাওয়ার জন্যে ঘুরলো তামান্না।

“আগে টাকাটা গুনে নিলে ভালো হতো না?” ক্রিস্টোফার বললো। “যদি ওরা কম দেয়?”

“তাহলে ওরা দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, সেখানে গিয়ে ওদের খুন করে আসবো। ওদের বৌ বাচ্চা সবগুলোকে মারবো। এমনকি ভাই, বোন, চাকরবাকর সব। আর সবার শেষে মারবো একে।” বলে পুলার গায়ে একটা লাথি হাকালো। “বুঝতে পেরেছিস?”

“হ্যাঁ,” গোঙাতে গোঙাতে বললো পুলা। “ওরা একটা পয়সাও কম দেবে না। ভগবানের কসম।”

“এখানে দেরি করা মানেই ধরা পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া-আর সাথেও কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ও থাকলে আমাদের ঝামেলা বাড়বে। আর তুমি যেহেতু একে বাঁচিয়ে রাখতে এতো বেশি আগ্রহী…” বলে ও কাঠের সিন্দুকটার দিকে ইঙ্গিত করলো। “তুমিই তাহলে নাও ওটা।”

ক্রিস্টোফার সিন্দুকটা তুলতে গিয়ে বুঝতে পারলো যে কুলিগুলো এটার ওজন সম্পর্কে বাড়িয়ে বলেনি কিছু। ও অনেক শক্তিশালী, তবুও ওটাকে কাঁধ পর্যন্ত তুলতে পারলো না। ব্যথায় কাতরে উঠতেই দুজন লোক দৌড়ে এলো সাহায্য করতে। দুজনে দুপাশের দুটো হাতল ধরলো কিন্তু জায়গাটা সমতল না হওয়ায় হোঁচট খেয়ে গেলো পড়ে। তামান্না এগিয়ে গিয়ে ওদেরকে বকতে লাগলো।

পাহাড় থেকে নেমে এসে নিচের ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেলো ওরা। এখানে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। শুধু বন্য প্রাণী আর ডাকাতেরা ঘরে এদিক দিয়ে। ক্রিস্টোফারের হাতের ব্যথা বাড়তেই লাগলো। পুলার প্রতি প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা জন্ম নিলো ওর। শেষে মনে মনে কিভাবে পুলাকে মারা যায় সেসব কল্পনা করে ব্যথাটা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে লাগলো।

অবশেষে একটা ফাঁকামতো জায়গায় এসে তামান্না থামার আদেশ দিলো। ক্রিস্টোফার যেইমাত্র সিন্দুকটা খুলে স্বর্ণমুদ্রাগুলো গোনা শুরু করলো তখনি যাদুমন্ত্রের মতো ওর হাতের ব্যথা দূর হয়ে গেলো। প্রায় আধা ঘণ্টা লাগলো গুণে শেষ করতে। শেষ করার পর দেখা গেলো সবার মুখেই চওড়া হাসি। পুরোটাই আছে এখানে। এমনকি তামান্নাও কঠিন ভাব ছেড়ে ক্রিস্টোফারের পাশে এসে বসে ওর পায়ের উপর হাত রেখে উরুতে চিমটি দিতে লাগলো।

“বেশিক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া যাবে না কিন্তু,” সাবধান করলো তামান্না। “একটা। শহরে পালিয়ে যেতে হবে, বড় কোনো শহরে। যেখানে আমাদেরকে কেউ খেয়াল করবে না বা চিনবেও না। ওখানে রসদপত্র কিনে বর্ষাটা কাটিয়ে দেবো। তারপর একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করে অপেক্ষা করতে থাকবো। আবার যখন লোকজন রাস্তাটা ব্যবহার শুরু করবে তখন কাজে নেমে পড়বো।”

বর্ষাকালের দীর্ঘ বৃষ্টিময় বিকেলগুলোর কথা মাথায় ঘুরতে লাগলো ক্রিস্টোফারের। ও আর তামান্না কিভাবে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পারবে সেটা জানা আছে ওর। ভাবনাটা মাথায় আসতেই পায়জামার ভিতরে একটা শিহরণ অনুভব করলো যেনো। তামান্নার হাতটা টেনে নিয়ে নিচের দিকে ঠেলে দিলো ও। তামান্নাও হেসে দুষ্টুমিভরা চোখে চাইলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্রিস্টোফারের হাত ধরে টেনে জঙ্গলের আরও ভিতরে একটা ঘাসে ছাওয়া জায়গায় নিয়ে এলো। পা দিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে ঘাস মাড়িয়ে দিলো যাতে সাপ খোপ থাকলে সরে যায়।

মুহূর্ত পরেই এই জগত ছেড়ে অন্য আর এক অলৌকিক জগতে হারিয়ে গেলো যেনো ওরা। যে জগতে কামনা আর সুখ বাদে আর কিছু নেই।

*

ওরা জেগে উঠে একজন আর একজনের বাহুডোরে শুয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কি জন্যে ঘুম ভেঙেছে বুঝতে পারছে না ক্রিস্টোফার। আশেপাশে টু শব্দটাও নেই, কেমন একটা অশুভ নীরবতায় ছেয়ে আছে চারপাশ। ভয়ানক আতংক ছড়িয়ে বুকের ওপর চেপে বসছে সেটা।

“কি হয়েছে?” তামান্না বলতে গিয়েও থেমে গেলো, কারণ দুজনেই কুকুরের ডাক শুনতে পেয়েছে। ওরা দ্রুত উঠে পড়ে ত্রস্ত হাতে কাপড় খুঁজতে লাগলো।

ক্রিস্টোফার তামান্নার হাত ধরলো। “ওরা শিকারে বেরিয়েছে, আর আমরা হচ্ছি শিকার।”

“স্বর্ণটা নিয়ে আসি চলো।”

“এখন ওসব নেওয়া যাবে না। ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারবো না। এক মাইল যাওয়ার আগেই কুকুর ধরে ফেলবে। তাড়াতাড়ি!” ওরা যেখানে ওদের সঙ্গীসাথী আর স্বর্ণে ভরা সিন্দুকটা রেখেছিলো সেখানে দৌড়ে গেলো।

লোকজন এলোমেলো ভাবে জায়গাটায় ছড়িয়ে শুয়ে আছে। বেশিরভাগই আরকের বোতল খুলে বসেছে। ক্রিস্টোফার গালাগাল করতে করতে সবচে কাছের লোকটার গায়ে লাথি ছুড়লো।

“ওঠ, শালা মাতালের দল।”

“ছাড়ো ওদের, যা আসছে তা ওদের প্রাপ্য, তামান্না আদেশ দিলো ক্রিস্টোফারকে। “পকেটে যতোটা সম্ভব স্বর্ণ নিয়ে নাও, তারপরেই আমরা পালাবো।”

সিন্দুকটা তখনও মাঝে রাখা। ওরা দৌড়ে গেলো ওটার দিকে। ক্রিস্টোফার ঢাকনা খুলে যতোগুলো পারলো স্বর্ণের প্যাগোড়া নিজের পকেটে ভরে নিলো।

“হয়েছে!” তামান্না দড়াম করে ঢাকনাটা লাগিয়ে দিলো। তারপর কান পেতে আশেপাশে শোনার চেষ্টা করলো। কুকুরের ডাক আরো জোরে শোনা গেলো, আর ক্রিস্টোফারের মনে হলো ওগুলোর পায়ের ধাক্কায় জমি থরথর করে কাঁপছে।

“ঘোড়া!” অবাক হলো ক্রিস্টোফার। “তার মানে ওরা আসলেই আমাদের পিছু নিয়েছে।” এতোগুলো মাস ধরে ওরা এসব রাস্তায় চরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়জনের বেশি ঘোড়সওয়ার চোখে পড়েনি। যার একটা ঘোড়া পালার সামর্থ্য আছে, তাকে ভয় না পেয়ে উপায় নেই। ক্রিস্টোফার আবার মাথা কাত করে শোনার চেষ্টা করলো। শুনে মনে হলো পুরো একটা অশ্বারোহী দল ওদেরকে ধরতে বেরিয়েছে।

তামান্নার হাত ধরে জঙ্গলের ভিতরের দিকে দৌড় দিলো ও। মাটি আগাছায় ভরে, আর ওগুলোর অনেকগুলোই কাঁটাওয়ালা। আধা মাইল যাওয়ার আগেই দুজনের হাত পা ছড়ে রক্ত ঝরতে লাগলো। পিছনে ঘোড়ার হ্রেষা ডাক আরো কাছিয়ে আসছে। মাতাল লোকগুলো আর স্বর্ণ ভরা সিন্দুকটা খুঁজে পাওয়া মাত্র ওদের ধাওয়াকারীদের উল্লাস ধ্বনিও কানে আসলো।

ক্রিস্টোফার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আশা করলো যাতে গাছের ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণটা চোখে পড়ে। কারণ রাতের অন্ধকারে ও কোনদিকে যে দৌড়াচ্ছে তার কিছুই ঠাহর করতে পারছে না। ওরা শুধু পিছনের ঘোড়ার শব্দের আগে আগে দৌড়ে চললো। সূর্য পুরোপুরি ওঠার আগ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যেও থামলো না।

আচমকা ওদের সামনে জঙ্গল শেষ হয়ে গেলো। ঝোঁপ জঙ্গল মাড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলো ওরা। তাই ব্যাপারটা প্রথমে খেয়াল করতে পারলো না। একেবারে শেষ মুহূর্তে ক্রিস্টোফারের চোখে পড়লো যে সামনে কিছুই নেই। ও তামান্নাকে টান দিয়ে একটা হাত দিয়ে কাঁধের পিছন দিকে জড়িয়ে ধরলো। একটুর জন্যে বেঁচে গেলো ওরা। নইলে দুজনেই একসাথে খাড়া খামায় পা হড়কে সোজা কয়েকশো ফুট নিচে এক শুকনো পাথুরে নদীবক্ষে গিয়ে পড়তো।

বর্ষাকালে নদীটা প্রমত্তা হয়ে ওঠে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন সেটা চোখা পাথরের ভরা একটা খাদ বাদে আর কিছু না।

কিছুক্ষণ ওটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তামান্না। তারপর মাথা ঘুরিয়ে পিছনের শব্দ শোনার চেষ্টা করলো। কুকুরগুলো খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। ওদের ঘ্রাণ কাছিয়ে আসায় উত্তেজনায় গরগর করছে।

“আমি এদের হাতে ধরা দেবো না।” তামান্না মন ঠিক করে ফেললো। তারপর ক্রিস্টোফারের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, “আমি লাফ দিচ্ছি।”

“না, আমি তা করতে দেবো না।” ক্রিস্টোফার আরো জোরে তামান্নার কবজি চেপে ধরলো। পিছনে ঘোড়া আর কুকুরের আগমন ও নিজেও টের পাচ্ছে। সেই সাথে এখন যোগ হয়েছে মানুষের পদশব্দ।

“তাড়াতাড়ি মরবো এতে। ওরা যদি ধরতে পারে, তাহলে এতো অত্যাচার করবে যা সহ্য করার চেয়ে মরাই ভালো।”

“আই লাভ ইউ, ক্রিস্টোফার ওর মুখের সামনে বললো। “আর আমরা যতোক্ষণ বেঁচে আছি, ততোক্ষণ কোনো না কোনো উপায় বের হবেই।”

তামান্না হাত মুচড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। আমি একবার তোমার কথা শুনে এখন পস্তাচ্ছি। আর না। জীবন থাকতে আমি ওদের হাতে ধরা দেবো না।”

তামান্না মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে প্রায় ছাড়িয়েই নিয়েছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার আচমকা ওর উপর নিজের সমস্ত ভর চাপিয়ে দিয়ে জোর করে মাটিতে শুইয়ে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রথম কুকুরটা ওদের পিছনের আগাছার জঙ্গল থেকে লাফ দিয়ে সামনে বাড়লো। কুকুরগুলোর পরে উর্দিপরা লোকজন ছুটে এলো পিছনে। হাতে মুগুর। ওরা দৌড়াতে গিয়ে সোজা মাটিতে পড়ে থাকা ক্রিস্টোফার আর তামান্নার উপর হোঁচট খেলো। তখনও ধ্বস্তাধস্তি করে যাচ্ছে ওরা। সৈন্যরা হাতের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে অর্ধ অচেতন করে ফেললো ওদেরকে। তারপর ঝটপট হাতে হাতকড়া পরিয়ে গলায় শেকল বাঁধা। বেড়ি পরিয়ে দিলো। শেকলের অপর প্রান্ত দুটো ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা। ঘোড়া দিয়ে টেনে ওদেরকে আবার সেই ফাঁকা জায়গাটায় নিয়ে ব্রাসা হলো। যেখানে ওরা সিন্দুকটা আর মাতাল সঙ্গীদের ছেড়ে গিয়েছিলো।

সেখানে পৌঁছার পর ক্রিস্টোফার ওদের বন্দিকারীদের দেখতে পেলো। এরা সবাই নির্ভীক সৈনিক আর খুব ভালো ঘোড়সওয়ার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সবার পরনে একই রকম ভারী কাপড়ের উর্দি, ইস্পাতের শিরস্ত্রাণ, আর কোমরে কমলা রঙের একটা কাপড় বাধা। দেখেই বোঝা যায় এদের আত্মবিশ্বাস পাহাড় সমান। ক্রিস্টোফার ঠিক করলো যে ও মোটেও আগ্রাসী মনোভাব দেখাবে না, বা ও যে দক্ষ যোদ্ধা সেটাও প্রকাশ করবে না, বরং বিনয়ী আর ভদ্র ভাব দেখাবে। সেজন্যেই চোখ নিচু করে ওরা যা যা বললো তা শুনতে লাগলো।

ওদের সাবেক বন্দী, পুলা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে মাঝখানে। এইতো খানিকক্ষণ আগেও যে ও নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে তোতলাচ্ছিলো বারবার তা বোঝার কোনো উপায় এখন নেই। নতুন কাপড় পরেছে সে। চুল দাড়ি আচড়ে সোজা হয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রিস্টোফার আর তামান্নাকে দেখতে পেয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সে।

“বাতাস এখন উল্টোদিকে মনে হচ্ছে, কাষ্ঠ হাসি হেসে বললো ও।

“এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে খুঁজে পেলেন আমাদের?” কণ্ঠে যতোটা সম্ভব ভয় ঢেলে জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার।

“স্বর্ণের গন্ধ পাই আমি।” পুলা কাঠের সিন্দুকটায় লাথি মেরে বললো। তারপর ঢাকনা খুলে নাক টেনে লম্বা একটা দম নিলো। “এটা থেকে যে মৌরির ঘ্রাণ আসছে সেটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছিস? তোদের ধারণা আমার বাড়ির লোকজন মুক্তিপণের টাকা খামাখা এরকম একটা ভারি সিন্দুকে ভরে পাঠিয়েছে শুধু তোদেরকে একটু কষ্ট দেওয়ার জন্যে? প্রতিবার যখনই এটাকে মাটিতে নামিয়ে রেখেছিস, তখনি সেখানে একটা করে চিহ্ন থেকে গিয়েছে। আরো ভালো করে বললে গন্ধ থেকে গিয়েছে। টুঙ্গার আর ওর কুকুরগুলোর সেই গন্ধ শুঁকে পিছু নিতে তাই কোনো কষ্টই হয়নি।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে ইঙ্গিতে দেখালো পুলা। চলনে বলনে সব দিক থেকে পুলা-র উল্টো সে। পুলা হচ্ছে বেঁটে, মোটা আর চেহারা গোল আলুর মতো। টুঙ্গার লম্বা, দেখতে ভয়ঙ্কর। চেহারার মাঝ বরাবর একটা কাটা দাগ। এতো জোরে আঘাত পাওয়ার পরেও লোকটা বেঁচে আছে কিভাবে ভেবে পেলো না ক্রিস্টোফার। পাগড়িতে একটা হলুদ রঙের পাখির পালক আটকানো। লোকটাকে দেখেই বোঝা যায় হুকুম করার জন্যেই জন্ম হয়েছে তার।

“আর আপনি তাহলে আসলে কে?” ক্রিস্টোফার জিজ্ঞে করলো।

“আমি কোনো সওদাগর না,” পুলা জবাব দিলো। আমি মহামান্য চিত্তাত্তিস্কারার রানি-র একজন উপদেষ্টা। উনি তার প্রজাদের দুঃখ কষ্ট একদম পছন্দ করেন না। তাকে যারা অসন্তুষ্ট করে উনি তাদের কেমন শিক্ষা দেন তা তোরা একটু পরেই দেখতে পাবি।”

টুঙ্গারের লোকজন সাথে আনা একটা গাড়িতে সিন্দুকটা তুলে নিলো। তামান্নার দলের সবাইকেই ঘোড়ার পিছনে শেকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দলটা আগে বাড়লো।

ক্রিস্টোফার ঠিক জানে না যে কতোদূর হাঁটতে হলো ওদের। টুঙ্গার যখন থামার আদেশ দিলো তখন ওর পা এতো বেশি ব্যথা করে উঠলো যে মনে হলো আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না। বন্দীরা সবাই ধপ ধপ করে রাস্তার ধারে শুয়ে পড়লো। মাছি এসে বসতে লাগলো ক্রিস্টোফারের উপর; পিঁপড়া আর নানা পোকামাকড় ওর ছড়ে যাওয়া পায়ের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু হাত বাঁধা থাকায় ওগুলোকে তাড়িয়েও দিতে পারলো না।

কয়েকজন প্রহরী বনের ভিতরে চলে গেলো। এই ব্যথার ভিতরেও ক্রিস্টোফার কাঠ কাটার ছন্দময় কুড়ালের শব্দ শুনতে পেলো। সম্ভবত ওরা রান্না করার জন্যে লাকড়ি কাটছে। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও।

“আমাদেরকে কি করবেন?” পুলাকে জিজ্ঞেস করলো ক্রিস্টোফার। ওর মাথায় একটা বুদ্ধির উদয় হয়েছে। “রানির কাছে নিয়ে যাবেন?”

পুলা অবজ্ঞাসূচক একটা শব্দ করলো। “তোর মতো একটা অসভ্য ইতরের জন্যে আমি মহামান্য রানির সময় নষ্ট করাবো না।”

“আমদেরকে ওনার কাছে নিয়ে যান, ক্রিস্টোফার অনুনয় করল। “আমার যে দক্ষতা তা ওনার ভালোই কাজে লাগবে।”

“হ্যাঁ, তোর জন্যে ওনার একটা কাজ আছে,” পুলা গোমড়া মুখে ওকে আশ্বস্ত করল। “তবে সেজন্যে ধৈর্য ধরা ছাড়া আর কিছুই করা লাগবে না।”

প্রহরীরা বনের ভিতর থেকে একটা গাছ টেনে নিয়ে আসলো। একজন মানুষের বাহুর সমান মোটা। ওরা বাকল চেঁছে ফেলে এক প্রান্ত কেটে একটা সূচালো গজালের মতো বানিয়ে ফেললো। বাকিরা হাতের শাবল দিয়ে রাস্তার ধারেই একটা গর্ত খুঁড়তে লাগলো। বন্দী ডাকাতেরা চেয়ে রইলো সেদিকে। গলায় বেড়ি পরে থাকার পরেও তারা আতংকে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো ওরা। বুঝতে পেরেছে যে ওদেরকে দিয়ে এরা কি করতে যাচ্ছে।

পুলা ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর হাতটা অর্ধেক তুলে সবার দিকে একে একে তাক করতে লাগলো, যেনো সে কসাইয়ের দোকানের কোনো খরিদ্দার, ঠিক বাছাই করতে পারছে না কোনটা থেকে মাংস নেবে। ক্রিস্টোফারের উপর ওর দৃষ্টি এসে স্থির হলো।

“তুই সবার শেষে,” ওকে বললো পুলা। “তোর সামনে একে একে তোর সব সঙ্গী সাথী মরবে এখন।”

ক্রিস্টোফারের পাশে বসে থাকা একজনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো ও। কৃশকায় একজন লোক, নাম বিজয়। বিজয়ের দায়িত্ব ছিলো পুলার দিকে নজর রাখা। আর দায়িত্ব পালনের সময় ও মোটেও খুব বেশি ভালো আচরণ করেনি। টুঙ্গারের লোকেরা ঘোড়া থেকে শেকলটা খুলে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে এসে দাঁড় করালো ওকে। ধ্বস্তাধস্তি শুরু করলো বিজয়। কিন্তু সৈন্যেরা ওকে উপুড় করে মাটির সাথে চেপে ধরলো। টুঙ্গার এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো ওর পাশে।

টুঙ্গারের হাতে এক টুকরো খাসীর চর্বি দেখা গেলো। এটা দিয়ে রাইফেলের কার্তুজে তেল দেয় ও। চর্বিটা ও চোখা খুটিটার গায়ে লেপে দিলো। ওর লোকেরা উল্লাস করে নোংরা ইংগিত করতে লাগলো।

বিজয় মোচড়ামুচড়ি করতে করতে এতো জোরে চিৎকার করতে লাগলো যে প্রহরীরা ওর মুখের ভিতরে একটা ন্যাকড়া ঢুকিয়ে দিলো।

যে প্রহরীগুলো বিজয়ের পা ধরে রেখেছিলো, তারা ও দুটোকে দুদিকে টেনে ধরলো। আরও দুজন লোক এসে সূচালো দণ্ডটা এনে ওর নিতম্বের মাঝে চেপে ধরলো। ক্রিস্টোফারের সহ্য হলো না দৃশ্যটা। চোখ বন্ধ করে ফেললো। তবে হাত বাঁধা থাকায় কান চাপা দিতে পারলো না। বিজয় ওর মুখের ন্যাকড়াটা ঠেলে ফেলে দিয়েছে। শুলটা ওর পায়ুপথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতেই প্রচণ্ড আর্তনাদে জঙ্গল দুই ভাগ হয়ে গেলো যেনো। এরা এদের কাজ কর্ম ভালোই পারে। বিজয়ের চিৎকার থেকেই ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো যে এরা এমনভাবে শূলটা ঢুকিয়েছে যাতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঙ্গে খোঁচা না লাগে। তাহলে খুব তাড়াতাড়ি মরে যাবে বন্দী।

ক্রিস্টোফার চোখ খুললো। বিজয় পড়ে আছে মাটিতে, চিৎকার চলছেই। চিৎকার দ্বিগুণ হয়ে গেলো যখন প্রহরীরা শূলটা সোজা উপরের দিকে তুলে ধরলো। বিজয় দণ্ডটা বরাবর নিচে নেমে এলো, আর চোখা মাথাটা ওর শরীরের আরো গভীরে ঢুকে গেলো। কিন্তু প্রহরীরা দণ্ডটার মাঝ বরাবর একটা আড়কাঠ লাগিয়ে দিয়েছে যাতে খুব বেশি ভিতরে না ঢোকে। বিজয় তড়পাতে তড়পাতে একসময় নিস্তেজ হয়ে শিকে ঢোকানো মুরগির মতো ঝুলে রইলো। ওর পায়ু দিয়ে রক্ত বেরিয়ে নিচেই একটা ছোটোখাটো পুকুর হয়ে গিয়েছে। মাছির দল তাতে মহানন্দে সাঁতার কাটছে।

প্রহরীরা শূলটার গোড়া একটু আগে খোঁড়া গর্তে ঢুকিয়ে আবার মাটি আর পাথর দিয়ে ভরে দিলো, যাতে ওটা খাড়া হয়ে থাকে। তারপর পিছনে সরে এসে নিজেদের কাজ উপভোগ করতে লাগলো। নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। বিজয় কতক্ষণ টিকবে তা নিয়েও নিজেদের মধ্যে বাজি ধরতে শুনলো ক্রিস্টোফার। বেশিরভাগই বললো দুই কি তিন দিন। বিজয় এখন আর চিৎকার করছে না, ফোঁপাচ্ছে আর বাতাসের জন্যে হাঁসফাস করছে। কারণ দণ্ডটার খোঁচায় ওর ফুসফুস ছ্যাদা হয়ে গিয়েছে।

পুলা সামনে এগিয়ে এসে চেহারায় একজন ধর্ষকামীর আনন্দ নিয়ে ক্রিস্টোফারের দিকে চেয়ে রইলো।

“এখান থেকে চিত্তাত্তিঙ্কারা প্রায় বিশ মাইল। প্রতি দুই মাইল পর পর তোর একজন লোকের এই হাল করবো আমি। তারপর যখন রানির মহলে পৌঁছাবো, তখন তোকে আর তোর ঐ মাগীটাকে সদর দরজার দুই পাশে গেঁথে রাখবো। তাহলেই সবার শিক্ষা হবে যে যারা রানির কর্মচারীদের গায়ে আঙুল তোলে বা তার ব্যবসায় বাধা দেয়, তাদের কি অবস্থা হয়।”

*

পরের দুই দিন ধরে পুলা তার হুমকি অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো। একে একে সবগুলো ডাকাতকেই ধরে নিয়ে রাস্তার ধারে শূলে চড়িয়ে দেওয়া হলো। অবশেষে যখন ওরা পাহাড়ের নিচের মহলে পৌঁছালো তখন শুধু ক্রিস্টোফার আর তামান্নাই বাকি আছে।

ক্রিস্টোফার ভেবেছিলো বারবার একই দৃশ্য দেখতে দেখতে হয়তো ওর আর এ বাপারে কোনো অনুভূতি থাকবে না। কিন্তু দেখা গেলো এতে করে। আতংক আরো কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। যতোবার ও কারো পিছন দিক। দিয়ে গজাল ঢুকে যাওয়া দেখলো, ততোবার ওর নিজের পায়ুর পেশিও সঙ্কুচিত হতে লাগলো। শত চেষ্টা করেও এই ভয়ানক দৃশ্য থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলো না। টানা কয়েকদিন দানা পানি না পেয়ে ও উল্টাপাল্টা দেখা আরম্ভ করলো। স্বপ্নে দেখতে লাগলো যে ও ওর বাবার পড়ার ঘরে উপস্থিত, পায়জামা গোড়ালি পর্যন্ত নামানো, একটা চেয়ারের উপর বাঁকা হয়ে অপেক্ষা করছে কখন চাবুকের বাড়ি পড়বে। আর ওর মা চুপচাপ ঘরের এ কোণে বসে ওকে শক্ত হতে বলছে। একবার স্বপ্নে দেখলো ও তামান্নাকে আদর করছে। আবেশে তামান্না হাত ক্রিস্টোফারের পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তামান্না যখন ওর হাত সামনে আনলো, ক্রিস্টোফার দেখলো সেই হাত দিয়ে ওর পিঠ থেকে এক তাল মাংস খুবলে নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয় দিন বিকেলের শেষে ওরা মহলের সদর দরজায় গিয়ে পৌঁছালো। ওদের ঠিক উপরে আকাশে পাখিরা চক্কর দিচ্ছে। যেন ওরা আগেই টের পেয়েছে যে একটু পরেই ওদের ভোজের জন্যে পচা মাংস পাওয়া যাবে। মহলের ভিতরের লোকেরাও বেরিয়ে এলো কাহিনি দেখার জন্যে।

টুঙ্গারের লোকেরা জঙ্গলে থাকতেই গাছ কেটে, এক প্রান্ত চোখা বানিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছে। ক্রিস্টোফার আর তামান্নাকে উলঙ্গ করে রাস্তার মাঝে বসিয়ে দিলো সৈন্যরা। দুজনের মাঝে দূরত্ব কয়েক ফুট। পুলা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে সমাগত লোকজনের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে লাগলো। ওর উচ্চ কিন্তু আত্মম্ভরি গলায় ক্রিস্টোফার আর তামান্নার সকল অপরাধের গা শিউরানো বর্ণনা দিলো প্রথমে। দর্শকেরা সবাই আঁতকে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের ঘামে ভেজা চোখ দিয়েও ওদের চেহারা পড়তে পারলো ক্রিস্টোফার। ভয় পেলেও ওরা সবাই মজা দেখতে আগ্রহী।

পুলা তার বক্তব্য শেষ করলো রানির অকুণ্ঠ প্রশংসা করার মধ্য দিয়ে। ক্রিস্টোফার ইতিউতি তাকাতে লাগলো। রানি ওর শাস্তি দেখতে এসছেন কিনা দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাকে কোথাও দেখা গেলো না। পুলা টুঙ্গারের দিকে ইংগিত করতেই ও ওর একজন লোককে কিছু একটা আদেশ দিলো।

ওরা শূল দুটো নিয়ে এলো! উঁচিয়ে ধরে রেখেছে যাতে দর্শকেরা ওটার তীক্ষ্ণতা ভালোমতো দেখতে পায়। ওগুলো কিভাবে ওদের শরীরে ঢুকে যাবে সেটা ভেবে অনেকেই শিহরিত হলো। শূল দুটো দেখেই ক্রিস্টোফারের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়লো। উল্টোপাল্টা বকতে আরম্ভ করলো ও। ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিচু গলায় বিড়বিড় করতে লাগলো। “আমাকে মাফ করে দাও। আমি ভালো হয়ে যাবো। দরকার হলে জ্বলন্ত কয়লার উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে রানির পায়ে চুমু খাবো। আমি ওনার দাস হয়ে থাকবো। সারাজীবন ওনার সেবা করবো। ও ঈশ্বর, আমাকে বাঁচাও।”

দর্শকেরা মজা পেয়ে হাসতে লাগলো। ওকে নকল করে ভেংচি কাটতে লাগলো অনেকে। আতংকের চোটে না বুঝেই ক্রিস্টোফার ইংরেজিতে বকবক আরম্ভ করেছে। এমনকি তামান্নাও ওকে আগে কখনো ইংরেজিতে কথা বলতে শোনেনি।

“চোপ,” নিজের ভাষায় বললো তামান্না। “মরবি তো মাথা উঁচু করে মর।”

পুলা বিরক্ত হয়ে, ভ্রু কুঁচকে লোকদেরকে দ্রুত কাজ শেষ করতে বললো। শুলটা প্রস্তুত করে ফেললো সৈন্যরা। ডগা থেকে খাসীর চর্বি ঝরে পড়ছে।

কিন্তু টুঙ্গারের মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলছে। ও পুলাকে ডেকে নিয়ে ক্রিস্টোফারকে দেখিয়ে রেগেমেগে কিছু একটা বলা শুরু করলো। মাথা ঠিকমতো কাজ না করায় ক্রিস্টোফার বুঝতে পারলো না যে ওরা কি বলছে। তবে বোঝা গেলো যে ব্যাপারটা জরুরি। সম্ভবত ওদেরকে অত্যাচার করার নতুন কোনো পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করছে।

তবে নতুন কোনো আদেশ নিষেধ আসার আগেই ওর নিতম্বের ভিতর দিয়ে ঢুকে গেলো শূল। টানা দুই দিন ধরে দেখতে থাকা ভয়ানক দৃশ্যগুলোর কারণে শূলটা শরীর স্পর্শ করা মাত্র চেঁচিয়ে উঠলো ক্রিস্টোফার। উপুড় হয়ে ধুলোর মধ্যে শুয়ে ও তামান্নার চোখের দিকে তাকালো। ও একদম সোজা হয়ে আছে। একটু শব্দ করছে না।

“ভালোবাসি তোমাকে,” ঠোঁট নেড়ে বললো তামান্না।

ওর মনের জোর দেখে লজ্জা লাগলো ক্রিস্টোফারের। ও-ও ঠোঁট কামড়ে পড়ে রইলো যতোক্ষণ না রক্ত বের হয়। শূলটা. প্রবেশের ব্যথা গিলে নেওয়ার চেষ্টা করলো পুরোটা। প্রহরীরা ওর সাথে শয়তানী করছিলো আরো বেশি। সামান্য একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে নিচ্ছিলো। প্রতিটা কাতর ধ্বনিতে মজা পাচ্ছিলো ওরা। মারা পড়তে কতোক্ষণ লাগবে সেটাই ভাবছিলো ক্রিস্টোফার।

আবার ওটাকে বের করে নেওয়া হলো। একেবারে পুরোটা। ক্রিস্টোফার নিজেকে শক্ত করে নিলো। ওরা নিশ্চিত এবার এক ধাক্কায় পুরোটা একবারে সেঁধিয়ে দেবে। ওকে চিরে একেবার শরীরের ভিতরটা পর্যন্ত চলে যাবে শূল।

কিন্তু আর খোঁচা দিলো না কেউ। টুঙ্গার ওর লোকদেরকে চিৎকার করে কিছু একটা বললো। আর পুলা টুঙ্গারের সাথে রাগারাগি করতে লাগলো। ক্রিস্টোফার তার এক বর্ণও বুঝলো না। দর্শকেরা দুয়ো ধ্বনি দিতে শুরু করলো। তবে টুঙ্গার একবার চোখ গরম করে তাকাতেই পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো ভীড়ে