অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ওরা, খাপ দিয়ে ঢালের উপর তাল ঠুকতে লাগল।
এখন হাসছে, শুকনো কণ্ঠে বলল তাইতা, কিন্তু মরুভূমির চুল্লীতে পৌঁছানোর পরেও হাসতে পারছে কিনা দেখা যাবে।
জলপ্রপাতের গহ্বরের দিকে তাকাল ওরা। ক্রুদ্ধ জলের কোনও গর্জন নেই। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁইগুলো এমনিতে নৌচলাচলের পথে বিরাট বিপদ হয়ে থাকে, কিন্তু এখন শুকনো নাঙা হয়ে আছে। বুড়ো মোষের পালের পিঠের মতোই শুকনো, কালো। উপরের প্রান্তে গহ্বরের ঠিক নিচে একটা ব্লাফে একটা লম্বা গ্রানিটের অবিলিস্ক দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন ওদের ঘোড়া আর খচ্চরকে পানি খাওয়ানোর সময় ক্লিফ বেয়ে সৌধের কাছে এলো তাইতা ও মেরেন, ওটার পায়ের কাছে দাঁড়াল ওরা। জোরে জোরে খোদাই লিপি পড়ল তাইতা:
আমি, মিশরের রিজেন্ট ও ফারাও, এ ধারায় অষ্টম মেমোজের বিধবা পত্নী, রানি লস্ত্রিস, আমার পরে মিশরের দুই রাজ্যের হবু অধিপতি যুবরাজ মেমননের মা, এই সৌধ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি।
এটা মিশরের জনগণের প্রতি আমার শপথের চিহ্ন ও প্রমাণ, বর্বরদের হটিয়ে বনবাস থেকে ওদের কাছে আবার ফিরে আসব আমি।
আমার শাসনকালের প্রথম বছরে স্থাপন করা হয়েছে এই পাথরখণ্ড-ফারাও চিপসের মহান পিরামিড নির্মাণের পর নয় শত নম্বর।
আমি না ফেরা পর্যন্ত যেন এই পাথর অটল থাকে।
.
স্মৃতিরা ভিড় করে আসার সাথে সাথে অশ্রুতে ভরে উঠল তাইতার চোখ। অবিলিস্ক স্থাপনের দিন লখ্রিসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে ওর: তখন ওর বয়স ছিল বিশ বছর, রাজকীয় ও নারীসুলভ মহিমায় ছিল গর্বিত।
ঠিক এখানেই আমার কাঁধে প্রশংসার স্বর্ণ তুলে দিয়েছিল রানি লস্ত্রিস, মেরেনকে বলল ও। অনেক ভারি ছিল, কিন্তু ওর অনুকম্পার তুলনায় অনেক সস্তা। ঘোড়ার কাছে এসে পিঠে চেপে বসল ওরা।
বিশাল কোনও অগ্নিকুণ্ডের শিখার মতো ওদের ঢেকে ফেলল মরুপ্রান্তর। দিনের বেলায় চলতে পারছিল না ওরা, তো নদীর পানি সেদ্ধ করে তাতে চুনাপাথর ছিটাচ্ছে, তারপর ক্ষিপ্র বেগে ছোটা পশুর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে খুঁজে পাওয়া কোনও ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। সূর্য পশ্চিম দিগন্ত স্পর্শ করার পর রাত ভর এগিয়ে চলছে ওরা। জায়গায় জায়গায় মোটা ক্লিফটা নদীর উপর এমনভাবে ঝুঁকে পড়েছে। যে সংকীর্ণ পথ দিয়ে কেবল একটা সারিতে এগোতে পারছে ওরা। লুটিয়ে পড়া কুঁড়ে ঘর পাশ কাটাল ওরা, এক কালে ওদের আগে এপাথে যাওয়া পর্যটকদের আশ্রয় ছিল ওগুলো। কিন্তু এখন পরিত্যক্ত। আসৌন ছেড়ে পথে নামার পর দশ দিনের আগে নতুন কোনও মানুষের চিহ্ন পেল না। আরেকটা পরিত্যক্ত ছাপরার সারিতে এসে পৌঁছুল, এখানে এক কালে একটা গভীর পুকুর ছিল। সম্প্রতি কারও দখলে ছিল এটা: অগ্নিকুণ্ডের ছাই এখনও টাটকা, মচমচে। কুঁড়েয় ঢোকার সাথে সাথে ডাইনীর ক্ষীণ অথচ সন্দেহাতীত আভাস পেল ও। ছায়ায় চোখজোড়া সয়ে এলে দেয়ালের গায়ে কয়লার টুকরো দিয়ে লেখা হিয়েটিক হরফের লিপি দেখতে পেল।
ইয়োস মহান। ইয়োস আবির্ভূত হন। অল্প দিন আগেই ডাইনীর কোনও ভক্ত গেছে এ পথে। দেয়ালের পায়ের কাছে যেখানে দাঁড়িয়ে আবেদনের কথা লিখেছে সে, সেখানে ধূলির বুকে পায়ের ছাপ পড়েছে। সর্যোদয়ের সময় হয়ে এসেছে প্রায়। দিনের উত্তাপ দ্রুত ধেয়ে আসছে ওদের দিকে। শিবির খাটানোর জন্যে সেনাদলকে নির্দেশ দিল মেরেন। এমনকি ধসে পড়া কুঁড়েগুলোও নিষ্ঠুর সূর্যের কবল থেকে কিছুটা ছায়া বিলোতে পারে। এসব যখন ঘটছে, উত্তাপ অসহনীয় হয়ে ওঠার আগেই, ইয়োসের উপাসকদের খোঁজ করল তাইতা। দক্ষিণে চলে যাওয়া নুড়িপাথরের পথে পায়ের ছাপ দেখতে পেল। সেগুলোর অবস্থান দেখে বুঝতে পারল ঘোড়াটা নিশ্চিতভাবেই দশাসই একজন লোককে বয়ে নিয়ে গেছে। দক্ষিণে, কেবুইয়ের দিকে গেছে খুরের ছাপ। মেরেনকে ডাকল তাইতা, জিজ্ঞেস করল, এই ছাপ কতদিন আগের? দক্ষ স্কাউট ট্র্যাকার মেরেন।
নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, ম্যাগাস। তিন দিনের বেশি তবে দশদিনের কম।
তাহলে আমাদের ফেলে অনেক দূর চলে গেছে ইয়োসের পুজক।
*
ওরা কুঁড়ের আশ্রয়ে ফিরে আসার সময় শিবিরের মাথার উপর থেকে একজোড়া কালো চোখ ওদের প্রতিটি নড়াচড়া নিরীখ করে চলল। ওই কালো, গম্ভীর চোখজোড়া ইয়োসের পয়গম্বর সোয়ের, রানি মিনতাকাকে যে জাদু করেছে। কুঁড়ের দেয়ালের লেখাগুলো তারই কাজ। এখন নিজের অস্তিত্ব এভাবে ফাঁস করে দেওয়ায় অনুতাপ হলো তার।
মাথার উপরের পাহাড় চূড়ার ছড়ানো এক চিলতে ছায়ায় শুয়ে আছে সে। তিনদিন আগে পথের একটা ফোকরে হোঁচট খেয়ে সামনের পা ভেঙে ফেলেছে তার ঘোড়া। এক ঘণ্টার মধ্যেই নেকড়ের পাল এসে হাজির হয়েছে পঙ্গু জানোয়ারটাকে ছিঁড়ে খেতে। ওটা পা ছুঁড়ে চিৎকার করার সময়ই শরীর থেকে মাংস খুবলে গিলেছে। আগের রাতে অবশিষ্ট পানিটুকই শেষ করেছে সোয়ে। এই ভীতিকর জায়গায় আটকা পড়ে মৃত্যুর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল, তাকে আর বেশি সময় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।
তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে, ওকে নিদারুণ পুলকিত করে উপত্যকা বরাবর ঘোড়ার খুরের এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পেয়েছে সে। নবাগতদের স্বাগত জানিয়ে সাথে করে ওকে নেওয়ার আবেদন জানানোর বদলে এখানে গা ঢাকা দিয়ে ওদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছে। দলটা দৃষ্টিসীমায় আসামাত্র ওটাকে রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর একটা ডিটাচমেন্ট হিসাবে শনাক্ত করল সে। প্রত্যেকে ভালোভাবেই সজ্জিত, দারুণ সব ঘোড়ায় চেপেছে। ওরা যে বিশেষ অভিযানে নেমেছে এটা পরিষ্কার, সম্ভবত স্বয়ং ফারাওর নির্দেশেই। এমনও হতে পারে যে ওকে পাকড়াও করে ফের কারনাকে ফিরিয়ে নিতেই পাঠানো হয়েছে ওদের। থেবসের ভাটিতে নদীর কিনারে ম্যাগাস তাইতা ওকে দেখেছিল, এব্যাপারে সে নিশ্চিত, এও জানে, ম্যাগাস রানি মিনতাকার আস্থাভাজন। রানি সম্ভবত তাইতাকে সব বলে দিয়েছেন এবং রানির সাথে সোয়ের সম্পর্কের কথা সে জানে, এটা বুঝতে খুব বেশি কল্পনা শক্তি লাগে না। সোয়ে নিশ্চিতভাবে বৈরিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অপরাধী, ফারাওর আদালতে রেহাই পাওয়ার কোনওই আশা নেই। এইসব কারণেই কারনাক থেকে সটকে পড়েছে সে। এখন যেখানে সে শুয়ে আছে ঠিক তার নিচেই সেনাদলের মাঝে তাইতাকে শনাক্ত করতে পেরেছে।
