আরও একবার পুরোহিতদের কাছে মেকি দেবীর কথা জানতে চাইল ও। ওরা বললেন, গুজব রটেছে যে সোয়ে পয়গম্বররা আবর্জনা থেকে হাজির হয়ে উত্তরে কারনাক ও ডেল্টার দিকে গেছে, কিন্তু কেউই ওদের সাথে যোগাযোগ করেনি।
রাত নামার পর দেবী মাতা আইসিসের মন্দিরের অভ্যন্তরীণ খাসমহলে চলে এলো তাইতা, তার প্রতিরক্ষায় ধ্যান ও প্রার্থনা করতে স্বস্তি বোধ করল। নিজের পৃষ্ঠপোষক দেবতাকে আহ্বান জানালেও ধ্যানের প্রথম দুই রাত তার কাছ থেকে কোনও সাড়া পেল না। তারপরেও কেবুই ও তার ওধারে অচেনা দেশ ও জলাভূমিতে যাবার পথে অপেক্ষমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যে নিজেকে বেশ শক্তিশালী ও তৈরি মনে হতে লাগল ওর। ইয়োসের সাথে অনিবার্য মোকাবিলা এখন অনেক কম ভীতিকর ঠেকছে। ওর শক্তিশালী দেহ ও স্থৈর্য তরুণ সেনা ও অফিসারদের সাথে চলার ও থেবস ছাড়ার পর থেকে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের ফল হয়ে থাকতে পারে। তবে দেবী লস্ত্রিস, বা এখন নিজেকে যেমন ফেন নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করছে সে, কাছাকাছি আছে জানা থাকায় নিজেকে যুদ্ধের জন্যে আরও বেশি তৈরি করেছে ভাবতে ভালো লাগছে ওর।
শেষ সকালে সূর্যের প্রথম আলোক রশ্মি ফুটে ওঠামাত্র জেগে উঠল ও। ফের আইসিস ও কাছাকাছি থাকতে পারেন এমন যেকোনও দেবতার আশীর্বাদ ও প্রতিরক্ষার জন্যে প্রার্থনা জানাল। খাস কামরা থেকে বের হবে, এমন সময় আইসিসের মূর্তির দিকে একবার তাকাল ও। লাল গ্রানিট পাথর কুঁদে বের করা হয়েছে ওটা। ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে মূর্তিটা, ছায়ায় হারিয়ে গেছে ওটার মাথা, পাথরের চোখজোড়া অটল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে। বেনী করা প্যাপিরাসের মাদুরের পাশে রাখা ছড়ি তুলে নিতে উবু হলো ও, রাতে ওটার উপরই ঘুমিয়েছে। সোজা হওয়ার আগেই কানের কাছে শিরা দপদপ করে লাফাতে শুরু করল, কিন্তু নগ্ন উর্ধ্বাংশে কোনও রকম শীতল স্পর্শ বোধ করল না। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল ওর দিকেই তাকিয়ে আছে মূর্তিটা। জীবন্ত হয়ে উঠেছে চোখজোড়া, সেখানে যেমন করে কেউ ঘুমন্ত শিশুর দিকে তাকায় ঠিক তেমনি কোমল দৃষ্টি ফুটে উঠেছে।
ফেন, ফিসফিস করে বলে উঠল তাইতা। লস্ত্রিস, তুমি এসেছ? ওর মাথার অনেক উপরে পাথরের ছাদ থেকে হাসির প্রতিধ্বনি কানে এলো, কিন্তু নীড়ে ফিরে যাওয়া বাঁদুরের কালো ডানার ঝাপ্টা ছাড়া আর কিছু দেখল না ও।
আবার মূর্তির দিকে ফিরে এলো ওর চোখ। পাথুরে মাথাটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে এখন, ফেনের মুখ ওটা। মনে আছে, তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি আমি, ফিসফিস করে বলল সে।
কোথায় পাব তোমাকে? কোথায় খুঁজতে হবে বলে দাও, অনুনয় করল তাইতা।
আর কোথায় চাঁদ মাছের খোঁজ করবে? পরিহাস করল ফেন। অন্য মাছের ভেতর লুকোনো অবস্থায় পাবে আমাকে।
কিন্তু কোথায় সেই মাছগুলো? মিনতি করল ও। ইতিমধ্যে পাথরে পরিণত হতে চলেছে ওর জীবন্ত চেহারা। ফের ম্লান হয়ে আসছে উজ্জ্বল চোখজোড়া।
কোথায়? চিৎকার করে উঠল তাইতা। কখন?
অন্ধকারের দূত থেকে সাবধান। ওর কাছে ছুরি আছে। সেও তোমার অপেক্ষা করছে। বিষণ্ণ সুরে ফিসফিস করে বলল ফেন। এবার আমাকে যেতে হচ্ছে। বেশিক্ষণ আমাকে থাকতে দেবে না সে।
কে থাকতে দেবে না? আইসিস, না অন্য কেউ? এই পবিত্র স্থানে ডাইনীর নাম মুখে আনা অপবিত্রতার সামিল হবে। কিন্তু মূর্তির ঠোঁট জমে গেছে।
বাহুর উপরের অংশে কারও হাতের খোঁচা লাগল। চমকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ও। ভেবেছিল আরও একটা প্রেতাত্মার আবির্ভাব হচ্ছে বুঝি; কিন্তু স্রেফ প্রধান পুরুতের মুখই দেখতে পেল ও। তিনি বললেন, ম্যাগাস, কী হয়েছে আপনার? চিৎকার করছিলেন কেন?
স্বপ্ন দেখছিলাম। বাজে স্বপ্ন।
স্বপ্ন কখনও বাজে হয় না। অন্তত আপনার সেটা জানার কথা। স্বপ্ন হচ্ছে দেবতাদের কাছ থেকে আসা সতর্কবাণী ও বার্তা।
পবিত্র পুরুষের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আস্তাবলে চলে এলো ও। ওর কাছে ছুটে এলো উইন্ডস্মোক। খুশিতে মাটিতে পা ঠুকছে। মুখের কোণে ঝুলছে এক গোছা খড়।
ওরা তোমাকে নষ্ট করে দিচ্ছে, বুড়ি ছিনাল কোথাকার। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখ ঘোড়ার বাচ্চার মতো গিলছ, ইয়া বড় পেট হয়েছে। আদুরে গলায় বকল ওকে তাই। কারনাক সফরের সময় একজন অসতর্ক সহিস ফারাওর প্রিয় স্ট্যালিয়নগুলোর একটাকে ওটার কাছে আসতে দিয়েছিল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ওকে পিঠে চাপার সুযোগ করে দিল ঘোড়াটা। তারপর মেরেনের সেনাদল যেখানে শিবির গোটাচ্ছে সেখানে নিয়ে এলো। কলাম তৈরি হওয়ার পর যার যার ঘোড়ার মাথার কাছে দাঁড়িয়েছে লোকেরা, বাড়তি ঘোড়া ও প্যাক অ্যানিমেলের লাগাম ধরে আছে। হাতে। অস্ত্র ও সরঞ্জাম পরখ করতে করতে সারির ভেতর দিয়ে এগোল মেরেন। সবাই যার যার তামার পানির পাত্র ও চুনের ব্যাগ খচ্চরের পিঠে নিয়েছে, নিশ্চিত হয়ে নিল।
উঠে পড়ো! কলামের পেছন থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দিল। এগোও! হট! ছোট! কাঁদতে কাঁদতে একদল মহিলা পাহাড়ের পাদদেশ অবধি অনুসরণ করল ওদের। মেরেনের চলার গতির সাথে আর তাল রাখতে না পেরে তারপর পিছিয়ে গেল।
তেতো বিদায়, তবে স্মৃতি অনেক মধূর, হিলতো-বার-হিলতো মন্তব্য করল, হেসে উঠল তার বাহিনী।
উঁহু, হিলতো, নিজের কলামের মাথা থেকে বলে উঠল মেরেন, শরীর মিষ্টি, কিন্তু তারচেয়ে মিষ্টি তার স্মৃতি।
