খাস কামরার দরজায় ওর অপেক্ষায় ছিল মেরেন। আপনার লোকজন নদীর পানি তৈরি করে রেখেছে, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে আপনার ফেরার অপেক্ষায় ছিল। পথ চলায় ক্লান্ত থাকায় ঘুমের প্রয়োজন ছিল ওদের। মেরেনের কণ্ঠে আবছা ভর্ৎসনার সুর। নিজের লোকদের যত্ন নিজেই নিয়ে থাকে সে। আশা করছি পচা পানির ভাণ্ড নিয়ে সারা রাত জেগে থাকার পরিকল্পনা করেননি। মাঝরাতের আগেই আপনাকে নিতে আসব, কারণ তেমনটি হতে দেব না আমি।
হুমকি অগ্রাহ্য করে তাইতা জানতে চাইল, পানিতে ঢালার জন্যে আমার বানানো আরক জলে মিশিয়েছিল শোফার?
হেসে উঠল মেরেন। যেমন বললাম, লাল পানির চেয়ে আরও বেশি দুর্গন্ধ ওটায়। চারটে ভাণ্ড যেখানে উতরাচ্ছিল তাইতাকে ওখানে নিয়ে গেল সে। ধোয়া উঠছে ওগুলো থেকে। আগুনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছিল সাহায্যকারীরা, ওকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল; তারপর পাত্রের ডালার ভেতর লম্বা লাঠি ঢুকিয়ে আগুনের উপর থেকে নামাল ওগুলো। পানি যথেষ্ট ঠাণ্ডা হওয়ার অপেক্ষা করল তাইতা, তারপর পাত্রগুলোর পাশ দিয়ে আরক ঢালতে ঢালতে সামনে বাড়ল। একটা কাঠের খুনতি দিয়ে প্রত্যেকটায় ঘুটা দিল শোফার। সে যখন শেষ পাত্রটা নাড়তে যাবে, থামল তাইতা।ফেনের উপহার, বিড়বিড় করে বলল ও, টিউনিকের কোণার গিঁট খুলল। শেষ পাত্রে চুনা পাথরের পাউডার ঢেলে দিল। ভালো ফল পেতে লখ্রিসের সোনালি মাদুলিটা পাত্রের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে এনে শক্তির শব্দ নিউবে! উচ্চারণ করল।
বিস্মিত চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল চার সহকারী।
পাত্রগুলো সকাল পর্যন্ত এভাবেই থাকতে দাও, নির্দেশ দিল তাইতা, বিশ্রামে যাও তোমরা। ভালো কাজ দেখিয়েছ, ধন্যবাদ।
মাদুরে গা এলিয়ে দিতেই মরার মতো ঘুমে তলিয়ে গেল তাইতা, স্বপ্ন হানা দিল না, এমনকি মেরেনের নাকের গর্জনও বিরক্ত করতে পারল না ওকে। ভোরে যখন জেগে উঠল, দোরগোড়ায় দরাজ হাসি মুখে নিয়ে শোফারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। জলদি আসুন, মহান ম্যাগাস। আপনার স্বস্তি পাওয়ার মতো একটা কিছু দেখাবার রয়েছে আমাদের।
গত রাতের আগুনের শীতল হয়ে আসা কয়লার পাশে রাখা পাত্রগুলোর কাছে। ছুটে এলো ওরা। যার যার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাবারি ও অন্য ক্যাপ্টেনরা। সবাইকে নতুন নির্দেশ দেওয়ার জন্যে হাজির করা হয়েছে। বর্মের সাথে তলোয়ারের খাপ বইছে ওরা, এমনভাবে উল্লাস করছে যেন তাইতা কোনও বিজয়ী জেনারেল, যুদ্ধ ক্ষেত্রের দখল বুঝে নিচ্ছে। চুপ করো! গর্জে উঠল তাইতা। আমার মাথা ভেঙে ফেলবে তোমরা! কিন্তু আরও জোরে উল্লাস করল ওরা।
প্রথম তিনটা পাত্র বমি জাগিয়ে তোেলা কালো তরলে ভর্তি হয়ে আছে, কিন্তু চতুর্থ পাত্রের পানি একেবারে টলটলে পরিষ্কার। সামনে ঝুঁকে আঁজলা ভরে পানি নিয়ে দ্বিধার সাথে মুখে দিল ও। মিষ্টি নয়, কিন্তু মাটির সোঁদা গন্ধে ভরা, ছেলেবেলা থেকে ওদের বাঁচিয়ে রাখা নীলের কাদার পরিচিত সুবাস।
এর পর থেকে প্রতিদিন রাতের বিশ্রামের সময় নদীর জলে চুনের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিতে লাগল; পরদিন সকালে পানি রাখার চামড়ার পাত্রগুলো ভরে নিল। অচিরেই পিপাসায় দুর্বল ঘোড়াগুলো আবার শক্তি ফিরে পেতেই বেড়ে উঠল যাত্রার গতি। নয় দিন পর আসৌনে পৌঁছাল ওরা। সামনেই ছয়টি বিশাল জলপ্রপাতের প্রথমটি। নৌকার পক্ষে ভীতিকর বাধা ওগুলো, কিন্তু ঘোড়ার দল উপরের ক্যারাভান রোডে নিয়ে যেতে পারবে ওদের।
আসৌন শহরে ঘোড়া আর লোকজনকে টানা তিনদিন বিশ্রাম দিল মেরেন। রাজকীয় গোলাঘর থেকে শস্যের বস্তা ভরে নিল। জলের ধারের প্রমোদগুহাগুলোতে যাবার অনুমতি দিয়ে লোকজনকে যাত্রার পরবর্তী দীর্ঘ পর্যায়ের জন্যে বলীয়ান হয়ে নেওয়ার সুযোগ দিল। নিজের পদমর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন বলে মেকি নির্বিকার চেহারায় বানিয়ে স্থানীয় সুন্দরীদের বেপরোয়া দৃষ্টির আমন্ত্রণ ও তোষামোদ এড়িয়ে গেল।
প্রথম জলপ্রপাতের নিচের জলাশয়টা শুকিয়ে তুচ্ছ পুকুর হয়ে গেছে। তো তাইতাকে ছোট দ্বীপে পৌঁছে দিতে কোনও মাঝির দরকার হলো না, ওখানে দাঁড়িয়ে আছে আইসিসের সবুজ মন্দির। ওটার দেয়ালে খোদাই করা দেবী, তাঁর স্বামী অসিরিস ও ছেলে হোরাসের দানবীয় প্রতিমা আঁকা।
ওকে সরাসরি ওখানে নিয়ে গেল উইন্ডস্মোক। নদীর পাথুরে তলদেশে খটাখট শব্দ তুলল ওটার খুর। ওকে স্বাগত জানাতে সমবেত হলেন সব পুরোহিত, পরের তিনটি দিন ওদের সাথেই কাটাল ও।
দক্ষিণের নুবিয়ার অবস্থা সম্পর্কে ওকে জানানোর মতো তেমন কোনও তথ্য ছিল না ওদের কাছে। সুসময়ে নীলের বান যখন নির্ভরযোগ্য, শক্তিশালী ও সত্যি ছিল তখন একটা বাণিজ্য জাহাজের বিরাট বহর নদীর উজানে দুই নীলের সঙ্গমস্থল সেই কেবুই অবধি যাতায়াত করত। হাতির দাঁত, শুকনো মাংস এবং বুনো পশুর চামড়া, গাছের গুঁড়ি, তামার দণ্ড আর নীলের প্রধান শাখা আতবারা নদীর তীরের খনি থেকে সোনা নিয়ে ফিরে আসত ওরা। এখন বান না ডাকায় চলার পথের পুকুরগুলোর অবশিষ্ট জল রক্তে পরিণত হয়েছে, হাতে গোণা পর্যটকই কেবল পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ার পিঠে এই মরুপথে যাতায়াত করার সাহস দেখায়। পুরোহিতরা সতর্ক করে বললেন যে, দক্ষিণের রাস্তা ও এর বরাবর চলে যাওয়া পাহাড় পর্বত অপরাধী ও অস্পৃশ্যদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
