কারনাক থেকে রওয়ানা দেওয়ার সতের দিন পর কোম ওম্বোয় নদীর তীরে হাথরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির এলাকায় পৌঁছাল ওরা। যথারীতি বিখ্যাত ম্যাগাসকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন প্রধান পুরোহিতীনি। নীলের পানি সেদ্ধ করতে সাহায্যকারীদের তামার পাত্র চুলোর উপর বাসাতে দেখে ব্যাপারটা ওদের উপর ছেড়ে দিল তাইতা, তারপর মন্দিরের অভ্যন্তরীণ খাস মহলে চলে গেল।
ভেতরে পা রাখতে যা দেরি, পরক্ষণেই এক ধরনের করুণাময় প্রভাবের উপস্থিতি টের পেল ও। গরু দেবীর প্রতিমার সামনে চলে এলো ও। ওটার সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসল। দিমিতার ওকে বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত করতে ওর দেখা ডাইনীর গড়ে তোলা লস্ত্রিসের ছবি প্রায় বিশ্বাসের অতীত মন্তব্য করার পর আর রানিকে আহ্বান করার সাহস করে ওঠেনি। তবে এখানে দেবনিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী দেবী হাথরের প্রতিরক্ষা রয়েছে ওর। পৃষ্ঠপোষকরা সবাই মেয়ে হওয়ায় তিনি নিশ্চিতভাবেই লস্ত্রিসকে নিজের খাসমহলে আশ্রয় দেবেন।
উপাস্যের মুখোমুখি হতে তিনবার প্রয়োজনীয় মন্ত্র উচ্চারণ করে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে অন্তর্চক্ষু খুলে নীরবতার ছায়ায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল ও। ক্রমশঃ কানের কাছে নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনে নীরবতা ভঙ্গ হতে লাগল। ওর দিকে এগিয়ে আসা আধ্যাত্মিক সত্তার আভাস জোরাল হয়ে উঠল, ঠাণ্ডা অনুভূতি আচ্ছন্ন করার অপেক্ষায় রইল ও। বাতাসে শীতলতার প্রথম স্পর্শেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে প্রস্তুত। শান্ত ও আমোদিতভাবে উষ্ণ রইল খাসমহল। বেড়ে উঠল ওর নিরাপত্তা ও শান্তির বোধ। ঘুমে ঢলে পড়ার অবস্থা হলো। চোখ বুজতেই স্বচ্ছ জলের একটা ছবি দেখতে পেল, তারপরই ছেলেমানুষি কণ্ঠে নিজের নাম উচ্চারিত হতে শুনল: তাইতা, তোমার কাছে আসছি আমি! জলের গভীরে কী যেন ছলকে উঠতে দেখল ও। ভাবল রূপালি মাছ বুঝি ভেসে উঠছে। তারপরই বুঝতে পারল ভুল হয়েছে ওর: ওটা ছিপছিপে ফর্শা একটা বাচ্চা, সাঁতরে ওর দিকে আসছে। পানির উপরে উঠে এলো একটা মাথা, বছর বার বয়সের একটা মেয়ের মাথা ওটা, বুঝতে পারল তাইতা। লম্বা ভেজা চুলের গোছা সোনালি পর্দার মতো মুখ আর বুকে নেমে এসেছে।
তোমার ডাক শুনেছি, প্রফুল্ল শোনাল হাসির আওয়াজ। সহানুভূতির সাথে হাসল তাইতা। সঁতরে ওর দিকে এগিয়ে এলো বাচ্চাটা। পানির ঠিক নিচে শাদা বালির কিনারে পৌঁছে উঠে দাঁড়াল। একটা মেয়ে, এখনও ওর কোমর ঠিক নারীসুলভ বাঁক নেয়নি, আর কেবল ওর পাঁজরের রেখাই উর্ধ্বাংশকে অলঙ্কৃত করেছে।
কে তুমি? জানতে চাইল ও। মাথা ঝাঁকিয়ে চুল সরাল মেয়েটা, উন্মুক্ত হয়ে পড়ল চেহারা। তাইতার বুক ফুলে উঠতে লাগল, এক সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হলো ওর। লস্ত্রিস।
ধিক তোমাকে, আমাকে চিনতে পারোনি, আমি ফেন, বলল সে। নামটার মানে চাঁদ মাছ।
আগাগোড়া তোমাকে আমি চিনি, মেয়েটাকে বলল তাইতা। প্রথম দেখার সময় যেমন ছিলে ঠিক তেমনই আছো। তোমার চোখদুটো কখনও ভুলবার নয়। ওগুলো তখন যেমন ছিল এখনও তেমনি মিশরের সবচেয়ে সবুজ ও সুন্দর চোখই আছে।
মিথ্যে বলছ, তাই। আমাকে তুমি চিনতে পারোনি। চোখা গোলাপি জিভ বের করল সে।
তোমাকে অমন না করতে শিখিয়েছিলাম।
তাহলে ঠিকমতো শেখাতে পারোনি।
ফেন তোমার ছোটবেলার নাম ছিল, ওকে মনে করিয়ে দিল তাইতা। তোমার প্রথম লাল চাঁদ দেখা দেওয়ার পর পুরোহিতরা তোমার নাম নারীসুলভ করে দিয়েছিলেন।
জলকন্যা, ওর দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কাটল মেয়েটা। এ নামটা কোনওদিনই ভালো লাগেনি আমার। লস্ত্রিস শুনলে কেমন হাস্যকর, আড়ষ্ট ঠেকে।
তারচেয়ে ফেনই আমার পছন্দ।
তাহলেই ফেনই সই, বলল তাইতা।
তোমার অপেক্ষায় থাকব আমি, কথা দিল মেয়েটা। তোমার জন্যে একটা উপহার নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু এখন ফিরে যেতে হচ্ছে আমাকে। ওরা আমাকে ডাকছে। কমনীয় ভঙ্গিতে ঝাঁপ দিল সে, তলিয়ে গেল পানির নিচে, শরীরের দুপাশে হাত রেখে সরু পাজোড়া নাড়তে নাড়তে ক্রমে গভীরে চলে যাচ্ছে। পেছনে সোনালি পতাকার মতো আভা বিলোচ্ছে ওর চুল।
ফিরে এসো, পিছু ডাকল তাইতা। কোথায় অপেক্ষা করবে বলে যেতে হবে। কিন্তু চলে গেল সে। কেবল ওর হাসির ক্ষীণ একটা প্রতিধ্বনি ফিরে এলো ওর কাছে।
জেগে ওঠার পর তাইতা বুঝতে পারল, রাত হয়ে গেছে, কারণ মন্দিরের বাতিগুলো জ্বলতে শুরু করেছে। একাধারে ক্লান্ত ও তরতাজা মনে হলো নিজেকে। ডান হাতে একটা কিছু ধরে আছে, সজাগ হয়ে উঠল ও। সাবধানে হাতের মুঠি খুলল। মুঠির ভেতর শাদা পাউডার দেখতে পেল। এটাই ফেনের উপহার কিনা ভাবল। হাতটা নাকের কাছে তুলে এনে সাবধানে গন্ধ শুকল।
চুন! চেঁচিয়ে উঠল ও। নদীর কিনারা বরাবর প্রতিটি গ্রামে একটা করে আদিম ভাটা রয়েছে, এখানে গ্রামবাসীরা চুনাপাথরের চাই পুড়িয়ে এই পাউডার বানায়। এ জিনিস দিয়ে ঘরবাড়ি ও গোলাঘর রঙ করে ওরা। শাদা আস্তরণ সূর্যের রশ্মি ঠিকরে দেয় বলে ভেতরটা ঠাণ্ডা থাকে। পাউডারটুকু ছুঁড়ে ফেলতে যাবে, পরক্ষণে বিরত রাখল নিজেকে। দেবীর দেওয়া উপহার সম্মানের সাথে রাখতে হবে। নিজের বিপদে নিজেই হেসে উঠল ও। মুঠোর চুনা পাউডারটুকু টিউনিকের এক কোণে গেরো দিয়ে বেঁধে বাইরে এলো ও।
