মন্দিরগুলো প্রতিটি সম্প্রদায়ের কেন্দ্রবিন্দু ও শিক্ষার ভাণ্ডার। পুরোহিতদের অনেকেই মোটামাথার লোক হলেও তাদের মধ্যে কেউ কেউ কিন্তু শিক্ষিত ও আলোকিত, চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সজাগ তারা, দলের মনোভাব সম্পর্কে অবগত। তথ্য ও গোপন বিষয়ের নির্ভরযোগ্য উৎস ওরা। ওদের সঙ্গে আলোচনার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিল তাইতা। নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করল ওদের। সবাইকেই একই প্রশ্ন করল: তোমাদের লোকদের ভেতর কারও ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানোর কথা শুনেছ, এক নতুন ধর্মের প্রচার করছে?
প্রত্যেকেই জানালেন, হ্যাঁ শুনেছেন। পুরোনো দেবতারা ব্যর্থ হতে চলেছেন বলে প্রচার করছে ওরা, তাঁরা আর মিশরকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন না। নতুন এক দেবীর কথা বলছে যিনি আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হবেন, তারপর নদী ও দেশের উপর থেকে অভিশাপ তুলে নেবেন। তিনি এসে প্লেগকে বিদায় জানাবেন, তখন নীল মাতার বুকে ফের বান ডাকবে, মিশরকে আবার সৌন্দর্য ফিরিয়ে দেবে। লোকজনকে ওরা বলছে যে ফারাও ও তার পরিবার এই নতুন দেবীর গোপন অনুসারী। অচিরেই নেফার সেতি পুরোনো দেবতাদের প্রত্যাখ্যান করে নতুন দেবীর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করবেন। তারপর উদ্বিগ্ন জানতে চাইলেন, মহান ম্যাগাস, আমাদের বলুন, এটা সত্যি? ফারাও সত্যিই এই বিদেশী দেবীর কাছে মাথা নোয়াবেন?
এমন কিছু ঘটার আগে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো সব তারা খসে পড়বে। ফারাও হোরাসের ভক্ত, কায়মনোবাক্যে, ওদের আশ্বস্ত করেছে ও। তবে একটা কথা বলো, লোকজন এই ভণ্ডদের কথায় বিশ্বাস করছে?
ওরা তো মানুষ। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বিরাট গাড্ডায় পড়েছে এখন, যেই ওদের এই দুর্দশা থেকে মুক্তির কথা বলবে তাকেই মানবে।
এই যাজকদের কারও সাথে তোমাদের দেখা হয়েছে?
কারওই না। ওরা গোপনে গা বাঁচিয়ে চলছে, বললেন একজন। ওদের বিশ্বাস ব্যাখ্যা করে বোঝানোর আমন্ত্রণ জানিয়ে বার্তাবাহক পাঠালেও কেউই আসেনি।
কারও নাম জানতে পেরেছ?
মনে হচ্ছে সবাই একই নাম ব্যবহার করছে।
সেটা কি সোয়ে? জানতে চাইল তাইতা।
হ্যাঁ, ম্যাগাস, এ নামটাই ব্যবহার করছে ওরা। সম্ভবত এটা নামের চেয়ে বরং কোনও পদবীই হবে।
ওরা মিশরিয় নাকি বিদেশী? মাতৃভাষার মতোই আমাদের ভাষায় কথা বলে?
শুনেছি তাই বলে, আমাদের মতো একই রক্তের দাবী করছে ওরা।
এই যাত্রা যার সাথে কথা বলছিল ও, তাঁর নাম সেনাপি, উচ্চ মিশরের তৃতীয় নোমর খুম মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। তাঁর বক্তব্য শোনার পর তাই এবার আরও মামুলি প্রসঙ্গে ফিরে এলো: প্রাকৃতিক জ্ঞানের একজন বিশারদ হিসাবে আপনি কি এমন কোনও পথ বের করার চেষ্টা করেছেন যাতে নীলের লাল পানি আবার মানুষের ব্যবহারের উপযোগি করে তোলা যায়?
একথা শুনে ভীত হয়ে উঠলেন মার্জিত ও শিক্ষিত মানুষটা। ওটা অভিশপ্ত নদী। ওখানে কেউ ম্লান করতে যায় না, কেউ ওই পানি মুখে নেয় না। যারা খায়, অল্পদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় তারা, অক্কা পায়। নদীটা এখন রাক্ষুসে লাশখেকো কুনো ব্যাঙের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। মিশর বা অন্য কোনও দেশে এমন ঘটনা কোনও দিন দেখা যায়নি। হিংস্রভাবে পচা পুকুরগুলো পাহারা দিচ্ছে ওরা। কেউ আগে বাড়লেই হামলা করছে। ওই বিষ মুখে তোলার চেয়ে বরং মরতে রাজি আছি। জবাব দিলেন সেনাপি, তার অভিব্যক্তি বিতৃষ্ণার ভঙ্গিতে বেঁকে গেল। এমনকি মন্দিরের নবীশরাও বিশ্বাস করে যে কোনও ক্ষুব্ধ দেবতা নদীকে অভিশপ্ত করে দিয়েছেন।
তো তাইতা নিজেই লাল স্রোতের আসল প্রকৃতি জানা ও নীলের জলকে বিশুদ্ধ করে তোলার একটা উপায় বের করতে বেশ কয়েকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে হাত দিল। সেনাদলকে কষ্টকর গতিতে দক্ষিণে ঠেলে নিয়ে চলছিল মেরেন। জলের সামান্য সরবরাহে কোনও রকম সংযোজন করতে না পারলে অচিরেই ঘোড়াগুলো পিপাসায় প্রাণ হারাবে, এটা জানে সে। ফারাওর সদ্য খোঁড়া কূপগুলো বেশ দূরে দূরে অবস্থিত, কঠোরভাবে আগে বাড়ানো প্রায় তিনশো ঘোড়ার প্রয়োজনের তুলনায় ওগুলোর সরবরাহ অপ্রতুলই বলা চলে। এটা ছিল যাত্রার সহজতম পর্যায়। প্রথম শাখা ধারার শাদা পানির উপরে ওঠার পর নদীটা কঠিন ভীতিকর মরুভূমির ভেতর দিয়ে হাজার হাজার লীগ চলে গেছে, ওখানে কোনও কুয়োর দেখা মিলবে না। শত বছরে একবার বৃষ্টি হয় ওখানে, কাঁকড়া বিছা আর ওরিক্সের মতো বুনো প্রাণীর আখড়া, এরা নিষ্ঠুর সূর্যের রাজত্বে ভূপৃষ্ঠের পানি ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারে। পানির নির্ভরযোগ্য একটা উৎসের খোঁজ করতে না পারলে অমন প্রচণ্ড গা পোড়ানো বন্ধ্যাভূমিতে শেষ হয়ে যাবে এই অভিযান, কোনওদিনই নীলের উৎসে পৌঁছাতে পারবে না, সফল হওয়া তো পরের কথা।
প্রতিটি নিশি-শিবিরে পরীক্ষার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছে তাই। মেরেনের চারজন তরুণ ট্রুপার স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করছে। মহান ম্যাগাসের সাথে কাজ করতে পেরে গর্বিত ওরা: এই গল্প নাতীপুতিদের বলে বেড়াবে। তাই নির্দেশ দেওয়ার সময় দৈত্য-দানোর ভয় করছে না ওরা। কারণ ওদের রক্ষা করার বেলায় তাইতার ক্ষমতায় ওদের অগাধ বিশ্বাস। রাতের পর রাত খেটে চলেছে ওরা, কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু এমনকি ম্যাগাসের মেধাও পচা পানিকে সুপেয় করে তোলার মতো কোনও উপায় বের করতে পারল না।
