আমার স্ত্রী আছে, জানাল হাবারি। কিন্তু পাঁচ বছর ওর মুখ ঝামটা থেকে বাঁচতে পারলেই বরং খুশি আমি, দশ কি আরও বেশি হলেও ক্ষতি নেই। যদি আপনার দরকার হয়, কর্নেল। এই যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হলো বাকি তিনজন।
কর্নেল, আমাদের জমিনের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হলে যেখানে মিলবে সেখানেই মেয়েমানুষ বেছে নিতে পরব, বলল হিলতে-বার-হিলতো, বুড়ো হিলতোর ছেলে, অনেক আগেই মারা গেছে সে। দশ-হাজারের-ভেতর-সেরা ছিল সে, প্রশংসার স্বর্ণ জয় লাভ করেছিল; ইসমালার যুদ্ধে নকল ফারাওকে উচ্ছেদ করার পর খোদ ফারাও পরিয়ে দিয়েছিলেন ওর গলায়।
সত্যিকারের সৈনিকের মতো কথা, হেসে বলল মেরেন। যার যার প্লাটুন বাছাই করার ক্ষমতা নির্বাচিত চারজনের হাতে তুলে দিল ও। দশ দিনেরও কম সময়ের ভেতর গোটা মিশরিয় সেনাবাহিনী থেকে নিখুঁত এক শো জন যোদ্ধা বাছাই করে ফেলল ওরা। প্রত্যেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, দুটো চার্জার ও একটা প্যাক মিউল বেছে নিতে আস্তাবলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ওদের। ফারাওর নির্দেশ মোতাবেক থেবস থেকে নতুন চাঁদ ওঠার দিন যাত্রা শুরু করতে তৈরি হলো ওরা।
বিদায়ের দুই দিন আগে নদী পেরুল তাইতা, রানি মিনতাকার কাছ থেকে বিদায় নিতে মেমননের প্রাসাদে গেল। আগের চেয়ে বেশ কৃশ হয়ে গেছেন তিনি, চেহারা মলিন। ওদের সাক্ষাতের প্রথম কয়েক মিনিটের ভেতরই ওর কাছে কারণ ব্যাখ্যা করলেন তিনি।
ওহ, তাতা, প্রিয় তাতা। ভীষণ একটা ঘটনা ঘটেছে। সোয়ে উধাও হয়ে গেছেন। আমার কাছে বিদায় না নিয়েই চলে গেছেন। তুমি ওকে আমার আম দরবারে দেখার তিনদিন পরেই উধাও হয়ে যান তিনি।
অবাক হলো না তাইতা। সেদিনই ছিল দিমিতারের ভীতিকর মৃত্যুর ক্ষণ।
ওর খোঁজে সম্ভাব্য সব জায়গায় লোক পাঠিয়েছি। তাইতা, জানি, আমার মতোই বিচলিত বোধ করবে তুমি। ওকে চিনতে, সমীহ করতে। ওর মাঝে মিশরের মুক্তি দেখেছিলাম আমরা। তোমার বিশেষ জাদুকরী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ওকে খুঁজে বের করে আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে পারবে না? তিনি চলে যাওয়ায় আমি আর কোনওদিনই আমার বাচ্চাদের মুখ দেখতে পাব না। মিশর ও নেফার চিরন্তন যন্ত্রণায় ভুগবে। নীলও আর কখনওই বইবে না।
ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করল তাইতা। বুঝতে পারছে রানির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, হতাশার চাপে ওর গর্বিত চেতনা ভেঙে পড়ার উপান্তে পৌঁছে গেছে। মিনতাকাকে আশা দেওয়ার সময় মনে মনে ইয়োস ও তার অপকর্মের শাপশাপান্ত করল ও। মেরেন আর আমি দক্ষিণ সীমান্তের ওধারে অভিযানে যাচ্ছি। যাবার পথে প্রতিটি কোণে সোয়ের খোঁজ করাটাকে আমার প্রথম দায়িত্বে পরিণত করব। আমার ধারণা সে বেঁচে আছে, কোনও ক্ষতি হয়নি। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি ও ঘটানপ্রবাহ হুট করে আপনাকে না জানিয়েই বিদায় নিতে বাধ্য করেছে তাকে, মহারানি। তবে নতুন নামহীন দেবীর নামে মিশন চালু রাখতে প্রথম সুযোগেই ফিরে আসার ইচ্ছে রয়েছে তার। সবই আসলে যুক্তিসঙ্গত অনুমান, নিজেকে বলল তাইতা। এবার আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আপনার কথা সব সময় আমার মনে আর অনুগত ভালোবাসায় থাকবে।
এখন নীল নদে জাহাজ চালানোর উপায় নেই, তাই মৃতপ্রায় নদীর তীর বরাবর ওয়্যাগন রোড বেছে নিল ওরা। প্রথম এক মাইল তাইতার পাশাপাশি এগোলেন ফারাও, নির্দেশ ও পরামর্শে ভারাক্রান্ত করে তুললেন ওকে। তিনি ফিরতি পথ ধরার আগে বাহিনীর উদ্দেশে আন্তরিক উদাত্ত আহবান জানিয়ে ভাষণ দিলেন: আশা করছি সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করবে, শেষ করলেন তিনি, তারপর ওদের সামনে তাইতাকে আলিঙ্গন করলেন। উল্লাস করে তাকে দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে দিল ওরা।
এমনভাবে যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ের পরিকল্পনা করেছে তাইতা যাতে রোজ সন্ধ্যায় নীলের তীর বরাবর অবস্থিত উচ্চ রাজ্যের অসংখ্য মন্দিরের কোনও একটার কাছে পৌঁছাতে পারে। প্রতিটি মন্দিরেই দেখা গেল ওর আগেই ওর খ্যাতি পৌঁছে গেছে। প্রধান পুরুত ওকে স্বাগত জানাতে আর লোকজনকে আশ্রয় দিতে বেরিয়ে এলেন। ওদের আপ্যায়ন ছিল আন্তরিক, কারণ মেরেনের কাছে রাজার বাজপাখির সীলমোহর রয়েছে, প্রতিটি শহরের পাহারায় নিয়োজিত সামরিক দুর্গের কোয়ার্টার মাস্টারদের কাছ থেকে বাড়তি খাবার সংগ্রহে সাহায্য করছে সেটা। পুরোহিতদের আশা এর ফলে ওদের সামান্য খাদ্য মওজুত আরও বেড়ে উঠবে।
রোজ সন্ধ্যায় খাবার ঘরে সামান্য খাবারের পর মন্দিরের অভ্যন্তরীণ খাসমহলে অবস্থান নিচ্ছে তাইতা। শত শত বা এমনকি হাজার বছর ধরে এইসব জায়গায় উপাসনার যোগাড়যন্ত্র করা হচ্ছে। পূজকদের উৎসাহ আধ্যাত্মিক প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে, এমনকি ইয়োসের পক্ষেও যা ভেদ করা কঠিন হবে। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ডাইনীর নজরদারী থেকে দূরে থাকতে পারবে ও। ওকে বেপথু করতে ডাইনীর পাঠানো অশুভ অভিশাপের ভয় না করেই আপন দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করতে পারবে। প্রতিটি মন্দিরের নির্দিষ্ট দেবতার উদ্দেশে ডাইনীর বিরুদ্ধে আসন্ন লড়াইয়ের জন্যে শক্তি ও নির্দেশনা পেতে প্রার্থনা করল ও। এমনি পরিবেশের নির্জনতা ও প্রশান্তির ভেতর শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে নিজেকে বলীয়ান করে তুলতে সক্ষম হলো।
