এত শত শত আগ্নেয়গিরি থাকতে এটাকেই সবার আগে পরখ করার জন্যে বেছে নিলে কেন? জিজ্ঞেস করলেন নেফার সেতি।
কারণ মিশরের অনেক কাছে এটা, নীল নদের ঠিক উৎসের মুখে।
বুঝতে পারছি তোমার যুক্তি অকাট্য। খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে, বললেন নেফার সেতি। সাত বছর আগে নীল নদ মরে যাবার সময় দাদীর অভিযান সম্পর্কে তুমি যা কিছু বলেছিল সব মনে পড়ে যায় আমার, তাই আরেকটা বাহিনী একই মিশনে উৎসে গিয়ে নদীর মরে যাবার কারণ অনুসন্ধানে পাঠিয়েছিলাম। নেতৃত্বে দিয়েছিলাম কর্নেল আহ-আখতনকে।
এই খবর আমার জানা ছিল না, বলল তাইতা।
তার কারণ আলোচনার করার জন্যে ছিলে না তুমি। মেরেন আর তুমি বিদেশের মাটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে। নেফার সেতির কণ্ঠে ভৎর্সনা। আমার সাথে থাকা উচিত ছিল তোমার।
অনুশোচনার একটা ভাব ধরল তাই। আমাকে যে আপনার প্রয়োজন সেকথা আমার জানা ছিল না, আঁহাপনা।
তোমাকে সব সময়ই আমার প্রয়োজন হবে, ভালোই খুশি হয়েছেন তিনি।
দ্বিতীয় এই অভিযানের খবর কী? চট করে সুযোগটা লুফে নিল তাইতা। ফিরে এসেছে?
না, ফেরেনি। কুচকাওয়াজ করে যাওয়া আটশো লোকের একজনও ফেরেনি। দাদীর সেই দলের চেয়ে আরও ভালোভাবে উধাও হয়ে গেছে। ডাইনী কি ওদেরও শেষ করেছে?
সেটা খুবই সম্ভব, জাঁহাপনা, নেফার সেতি এরই মধ্যে ডাইনীর অস্তিত্ব মেনে নিয়েছেন, বুঝতে পারল তাইতা। তাকে ধাওয়া করার জন্যে নতুন করে বিশ্বাস করানো বা উৎসাহিত করার দরকার হলো না।
আমাকে কখনও নিরাশ করোনি তুমি, তাইতা, কেবল যখন একমাত্র দেবতারাই জানেন কোথায় বেড়াতে চলে যাও তখন ছাড়া। ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন নেফার সেতি। এখন আমি আমার শত্রুর পরিচয় জানি, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। এতক্ষণ পর্যন্ত আমার জনগণের উপর থেকে এই ভয়ঙ্কর আক্রমণগুলো দূর করতে অসহায়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। কেবল কুয়ো খনন, শত্রুর কাছে খাবার ভিক্ষা আর ব্যাঙ মারায় পর্যবসিত হয়েছিল আমার সব কাজ। এখন আমার সমস্যার সমাধানের পথ স্পষ্ট করে দিয়েছ তুমি। ডাইনীটাকেই খতম করতে হবে!
লাফ দিয়ে উঠে খাঁচায় বন্দি সিংহের মতো অস্থিরভাবে পায়চারি শুরু করলেন তিনি। কাজের লোক তিনি, তলোয়ার হাতে নিতে সব সময় প্রস্তুত। যুদ্ধের ভাবনা তাঁর চেতনাকে তরতাজা করে দিয়েছে। ওর দিকে তাকিয়ে রইল তাইতা ও মেরেন, একের পর এক নানা বুদ্ধির জোয়ার খেলে যাচ্ছে তার মাথায়। খানিক পরপরই পাশের তলোয়ারের খাপে চাপড় মারছেন, চিৎকার করে বলে উঠছেন, হ্যাঁ, হোরাস ও অসিরিসের দোহাই, তাই করব! অবশেষে তাইতার দিকে ফিরলেন তিনি। ইয়োসের বিরুদ্ধে আরেকটা বাহিনীর নেতৃত্ব দেব আমি।
ফারাও, এরই মধ্যে দু-দুটি মিশরিয় বাহিনী গ্রাস করে নিয়েছে সে, ওকে মনে করিয়ে দিল তাইতা।
একটু স্থির হলেন নেফার সেতি। ফের পায়চারি শুরু করলেন। থামলেন আবার। ঠিক আছে। এতনায় দিমিতার যেমন করেছে তুমিও ঠিক তেমনি ওই ডাইনীর বিরুদ্ধে এমন এক জাদু শক্তি কাজে লাগাবে যাতে পাহাড় থেকে টসটসে পাকা ফলের মতো মাটিতে পড়ে ফেটে যাবে সে। তোমার কী মত, তাতা?
জাঁহাপনা, ইয়োসকে ভুল বুঝবেন না। দিমিতার আমার চেয়ে ঢের বড় মাপের ম্যাগাস ছিলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাইনীর মোকবিলা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওকে ধ্বংস করে দিয়েছে সে। বলতে গেলে কোনও রকম কষ্ট ছাড়াই। ঠিক যেভাবে আপনি দুহাতের আঙুলে কাঠি ভেঙে ফেলেন। দুঃখের সাথে মাথা নাড়ল তাইতা। আমার জাদু জেভলিনের মতো। দূরে ছুঁড়ে দিলে দুর্বল হয়ে যাবে, তখন তার বর্মে ঠিকরে গিয়ে সহজেই ব্যর্থ হবে। তার কাছাকাছি গিয়ে ঠিক মতো অবস্থান বের করতে পারলে আমার নিশানা অনেক ভালো হবে। তাকে চোখের সামনে পেলে হয়তো আমার তীর তার বর্ম ভেদ করতে পারবে। এত দূর থেকে ওকে স্পর্শ করতে পারব না।
সে দিমিতারকে খতম করার মতো ক্ষমতাধর হয়ে থাকলে তোমারও একই দণা করল না কেন? চট করে নিজের প্রশ্নে জবাব দিলেন তিনি। কারণ তোমাকে নিজের চেয়ে শক্তিশালী মনে করে সে।
ব্যাপারটা এত সহজ হলেই ভালো ছিল। না, ফারাও, তার কারণ এখনও সম্পূর্ণ ক্ষমতায় আমাকে আক্রমণ করেনি সে।
বিভ্রান্ত দেখাল নেফার সেতিকে। কিন্তু দিমিতারকে হত্যা করেছে সে, আমার সাম্রাজ্যকে বৈরিতার ঘানিতে দুমড়ে দিয়েছে। তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে কেন?
দিমিতারকে তার আর দরকার ছিল না। আপনাকে তো বলেছি ওর হাতে বন্দি থাকার সময় কীভাবে বিশাল রক্তচোষার মতো তাঁর সব বিদ্যা আর দক্ষতা শুষে নিয়েছিল সে। ও পালিয়ে যাবার পর তেমন মরিয়া হয়ে ওর খোঁজ করেনি। ওর জন্যে হুমকি ছিলেন না তিনি। ওর কাছে কিছু পাওয়ারও ছিল না। মানে, ওর সাথে আমার ঐকবদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত। তখন আবার তার আগ্রহ দেখা দেয়। আমরা একসাথে এমন তাৎপর্যময় শক্তিতে পরিণত হয়েছিলাম যে আমার উপস্থিতি বুঝতে পারছিল সে। দিমিতারের মতো আমাকেও শুষে শেষ না করে ধ্বংস করতে চাইবে না সে, তবে আমাকে নিঃসঙ্গ না করা পর্যন্ত ফাঁদে ফেলতে পারবে না। তাই আমার মিত্রকে শেষ করেছে।
তোমাকে তার অশুভ উদ্দেশ্যে বন্দি করতে চাইলে তোমার সাথে আমার সেনাবাহিনীকেও নিয়ে যাব আমি। তুমি হবে আমার শিকারের ঘোড়া। তোমাকে প্রয়োজনীয় দূরত্বে আসার টোপ হিসাবে ব্যবহার করব, তুমি ওর মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করার পর দুজনে মিলে আক্রমণ করব ওকে। প্রস্তাব রাখলেন নেফার সেতি।
