আমি এখানে, দিমিতার! মরিয়া হয়ে চিৎকার করল তাইতা। মেয়ার নিয়ে উন্মত্ত ব্যাঙগুলোর ভেতর যেতে পারছে না, জানে ঘোড়াটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে ওরা। লাগাম টেনে ছড়ি হাতে পিছলে নেমে এলো ও। পুকুরের জলের ভেতর দিয়ে আগে বাড়ল। কিন্তু জলের নিচে একটা ব্যাঙ পায়ে দাঁত বসাতেই যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। ছড়ির আঘাত হানল ব্যাঙটাকে। আঘাতটাকে জোরাল করতে শারীরিক-মানসিক শক্তি সম্পূর্ণ এক করে নিল। ছড়ির ডগা জায়গামতো আঘাত করতেই ধাক্কা অনুভব করল ও। ওকে ছেড়ে দিল জানোয়ারটা। চিত হয়ে জলের উপর উঠে এলো, হতচকিত, খিঁচুনির ঢঙে পা ছুঁড়ছে।
দিমিতার! ওকে জীবন্ত গ্রাস করে নিতে ব্যস্ত ব্যাঙের দল থেকে থেকে আলাদা করে চেনা দায়। চকচকে কালো কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে মানুষ আর পশু।
হঠাৎ গিজগিজে ব্যাঙের ঝাঁকটাকে ফাঁক করে দুটি শীর্ণ বাহু উঠে এলো জলের উপর। দিমিতারের কণ্ঠস্বর কনে এলো ওর। আমি শেষ। আপনাকে একাই যেতে হবে, তাইতা। ওর কণ্ঠস্বর বলে চেনা মুশকিল, কাদা আর বিষাক্ত লাল পানিতে দম বন্ধ হয়ে এসেছে তার। এবং পরক্ষণেই অন্যগুলোর চেয়ে ঢের বড় আকারের একটা ব্যাঙ লাফ দিয়ে উঠে ওর মাথার এক পাশে কামড়ে ধরে শেষবারের মতো পানির নিচে নিয়ে যেতেই থেমে গেল সেটা।
আবার সামনে এগোল তাইতা। কিন্তু ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মেরেন। শক্তিশালী হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে কাদা থেকে তুলে নিল ওকে, তারপর ফিরিয়ে আনল তীরে।
নামাও আমাকে, নিজেকে মুক্ত করতে লড়াই করছে তাইতা। ওকে বিশ্রী জানোয়ারগুলোর হাতে ফেলে রেখে যেতে পারব না। কিন্তু ছাড়ল না মেরেন।
ম্যাগাস, আপনি আহত। নিজের পায়ের দিকে একবার তাকান। ওকে শান্ত করার প্রয়াস পেল মেরেন। লাল কাদার সাথে মিশে যাচ্ছে গলগল করে বেরিয়ে আসা রক্ত। দিমিতার শেষ হয়ে গেছেন, শান্ত কণ্ঠে বলল মেরেন। তাইতাকে মাটিতে নামিয়ে দিল। ধূসর মেয়ারটাকে ধরতে ফিরে গেল ও, ওর কাছে পৌঁছে দিল ওটাকে। তাইতাকে ঘোড়ায় চাপতে সাহায্য করার সময় মৃদু কণ্ঠে বলল, আমাদের যেতেই হবে, ম্যাগাস। এখানে আর কিছু করার নেই। আপনার ক্ষতস্থানের যত্ন নিতে হবে। ব্যাঙের দাঁত বিষাক্ত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর কাদাও এমন জঘন্য যে আপনার মাংসে সংক্রমণ ঘটবে।
কিন্তু আরও খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল তাইতা, বন্ধুর শেষ একটা চিহ্নের খোঁজ করছে। তার শেষ যোগাযোগের সন্ধান করছে। কিন্তু কোনওটাই দেখা গেল না। নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে সামনে ঝুঁকে মেয়ারের লাগাম তুলে নিয়ে সামনে বাড়ল মেরেন, আর প্রতিবাদ করল না তাইতা। পায়ে যন্ত্রণা হচ্ছে, মনে প্রিয়জন হারানোর বেদনা অনুভব করছে ও। প্রবীন সাধু চলে গেছেন, এখন বুঝতে পারছে ওর ওপর কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল ও। এখন একাই ডাইনীর মোকবিলা করতে হবে। ওকে, সম্ভাবনাটা দারুণ হতাশায় ভাবিয়ে তুলল ওকে।
*
নিরাপদে থেবসের প্রাসাদের নিজেদের মহলে পৌঁছানোর পর তাইতাকে গোসল করিয়ে কাদা ধুয়ে ফেলতে বড় গামলা ভর্তি গরম পানি আর বোতল ভর্তি সুগন্ধি মলম পাঠাল রামরাম। ওকে খুব ভালো করে পরিষ্কার করার পর দুজন রাজচিকিৎসক এলেন। তাদের পেছনে একদল সহকারী, ওদের হাতে ওষুধ ও জাদুকরী তাবিজ ভরা বাক্স। তাইতার নির্দেশে ওদের দরজায় থেকেই বিদায় করে দিল মেরেন। মিশরের সবচেয়ে দক্ষ ও জ্ঞানী শল্যচিকিৎসক ম্যাগাস নিজেই তাঁর ক্ষতের পরিচর্যা করছেন। আপনাদের উদ্বেগের জন্যে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
পাতলা মদে ক্ষতস্থান ধুয়ে ফেলল তাইতা। তারপর স্বয়ং-প্রভাবিত ঘোরে বাম পা অবশ করে নিল। তেলের কুপির আগুনে তপ্ত ব্রোঞ্জের একটা চামচ দিয়ে গভীর করে পাটা চিড়ল মেরেন। ওকে শেখানো তাইতার অন্যতম ডাক্তারী বিদ্যা এটা। ওর কাজ শেষে হলে উঠে দাঁড়াল তাইতা, উইন্ডস্মোকের এক গোছা লেজ সুতো হিসাবে ব্যবহার করে ক্ষতস্থানের দুপ্রান্ত সেলাই করল। নিজের বানানো মলম লাগিয়ে লিনেনে ব্যান্ডেজ বাঁধল। কাজটা শেষ করতে গিয়ে ব্যথায় ক্লান্ত হয়ে গেল ও, দিমিতারকে হারানোর শোকে পূর্ণ। মাদুরে শুয়ে চোখ বুজল ও।
দরজার কাছে শোরাগোলের শব্দে চোখ মেলে তাকাল ও। পরিচিত কর্তৃত্বপূর্ণ একটা কণ্ঠ চিৎকার করে বলছে, তাইতা, কোথায় তুমি? তোমাকে চোখের আড়ালে পাঠিয়ে কি নিশ্চিন্ত থাকতে পারব না, এমন একটা বিপদ বাধালে যে? তোমার লজ্জা হওয়া উচিত! তুমি এখন আর কচি খোকাটি নও! এই কথা বলে রোগীর ঘরে পা রাখলেন জগতের বুকে ঐশী ঈশ্বর ফারাও নেফার সেতি। লর্ড ও পরিচারকের দল অনুসরণ করল তাঁকে।
মনে হচ্ছে, তাইতার প্রাণশক্তি বেড়ে গেছে। ওর দৈহিক শক্তিও ফিরে এসেছে। যেন। নেফার সেতির দিকে তাকিয়ে হাসল ও। কোনওমতে কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল।
তাইতা, লজ্জা নেই তোমার? ভেবেছিলাম মরতে চলেছ তুমি, অথচ এখন দেখছি বোকার মতো মুখে হাসি নিয়ে আরামে শুয়ে আছো?
জাঁহাপনা, এটা স্বাগত জানানোর হাসি, আপনাকে দেখে সত্যিই খুশি হয়েছি।
ওকে ঠেলে আবার বালিশে শুইয়ে দিলেন নেফার সেতি। তারপর সঙ্গীদের দিকে তাকলেন। মাই লর্ডস, আমাকে ম্যাগাসের কাছে রেখে যেতে পারো, ও আমার পুরোনো বন্ধু-শিক্ষক। প্রয়োজনে তোমাদের তলব করব। চেম্বার থেকে পিছু হটে বের হয়ে গেল ওরা। তাইতাকে আলিঙ্গন করতে সামনে ঝুঁকলেন ফারাও। আইসিসের বুকের মিষ্টি দুধের দোহাই, তুমি নিরাপদে আছে দেখে খুশি হয়েছি, যদিও শুনেছি তোমার সঙ্গী ম্যাগাস গত হয়েছে। সব কিছু শুনতে চাই আমি, তবে তার আগে মেরেন ক্যাম্বিসেসকে স্বাগত জানানোর সুযোগ দাও। মেরেনের দিকে তাকালেন তিনি। দরজায় পাহারায় রয়েছে সে। তাঁর সামনে এক পা ভাঁজ করে দাঁড়াল মেরেন। কিন্তু ওকে টেনে দাঁড় করালেন ফারাও। আমার সামনে নিজেকে খাট করো না, লাল পথের সাথী। আন্তরিক আলিঙ্গনে ওকে বুকে টেনে নিলেন নেফার সেতি। তরুণ বয়সে এক সাথে যোদ্ধা হওয়ার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ওরা; রথ চালানো, তলোয়ার চালনা ও তীর নিক্ষেপে দক্ষতার পরীক্ষা। পরীক্ষিত ও সুপরিচিত যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দল বেঁধে লড়াই করেছেন ওরা, পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছুতে বাধা দিতে হত্যাসহ যেকোনও অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি ছিল। একসাথে বিজয় লাভ করেছিলেন ওরা। লাল পথের সাথীরা যোদ্ধার রক্তের সম্পর্কে ভাই, জীবনের জন্যে এক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেরেন নেফার সেতির বোন রাজকুমারী মেরিকারার সাথে বাগদত্ত। ফারাও আর ও বলতে গেলে বোন জামাই আর সম্মন্ধী। এতে ওদের বাধন আরও জোরাল হয়েছে। মেরেন হয়তো থেবসে উঁচু পদ ধারণ করতে পারত, কিন্তু তার বদলে তাইতার নবীশ হিসাবে নাম লিখিয়েছে।
