ছয় আঙুল পথ দেখাবে, ফিসফিস করে বলল তাইতা।
আমি আপনার দিকে ইঙ্গিত করতে চাইনি, ম্যাগাস। আমি কোনওদিনই ইচ্ছাকৃতভাবে ওভাবে আপনাকে অসম্মান করতে যাব না। গুঙিয়ে উঠল টিপটিপ।
না, টিপটিপ, আমার দারুণ উপকার করেছ তুমি। আমার কৃতজ্ঞতা আর বন্ধুত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারো।
ব্রাদার নুবাঙ্ককে বলে দেবেন না তো?
না। তোমাকে কথা দিচ্ছি।
আপনার উপর হাথরের আশীর্বাদ বর্ষিত হোক, ম্যাগাস। এবার যাই, ব্রাদার নুবাঙ্ক এলে দেখে ফেলবেন আমাকে। কাঁকড়ার মতো পাশ কেটে চলে গেল টিপটিপ। তাকে কিছুটা এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিল তাইতা, তারপর লাইব্রেরির ফিরতি পথ ধরল। মেরেন ও দিমিতার ওর আগেই এসে পড়েছে। টিপটিপকে গালমন্দ করছে নুবাঙ্ক: ছিলে কোথায়?
ল্যাট্রিনে গিয়েছিলাম, ব্রাদার, আমাকে ক্ষমা করে দিন। এমন কিছু খেয়েছি, পেটে গোলমাল বেধে গেছে।
আমার পেটেও গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছ তুমি, ব্যাটা দুর্গন্ধঅলা মলের টুকরো। ওখানেই নিজেকে রেখে আসা উচিত ছিল তোমার। টিপটিপের জন্মদাগের উপর আঘাত করল সে। যাও, এবার পুব সাগরের দ্বীপের বর্ণনাঅলা স্ক্রলগুলো নিয়ে এসো।
দিমিতারের পাশে বসে তেনমাস ভাষায় তাই বলল, বেচারার ডান হাতের দিকে একবার তাকান।
ওর ছয়টা আঙুল, বলে উঠলেন দিমিতার। ছয় আঙুল পথ দেখাবে! ওর কাছে কিছু জানতে পেরেছেন, নাকি পারেননি?
নীল মাতার ডান দিকের শাখা ধরেই উৎসের দিকে যেতে হবে আমাদের। ওখানেই এক বিরাট হ্রদের ধারে আগ্নেয়গিরির দেখা পাব। আমি নিশ্চিত ওখানেই লুকিয়ে আছে ইয়োস।
*
পরদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই হাথরের মন্দির ত্যাগ করল ওরা। অনীহার সাথে ওদের বিদায় জানাল নুবাঙ্ক-এখনও পঞ্চাশটা আগ্নেয়গিরির বর্ণনা দেওয়া বাকি রয়ে গেছে তার। থেবসের নীচে নীলের ঘাটে যখন পৌঁছাল ওরা, তখনও অন্ধকার কাটেনি। পথ দেখিয়ে ওদের নদীর জলে নিয়ে এলো হাবারি ও মেরেন। তাইতা ও দিমিতার অনুসরণ করল। কিন্তু দুটি দলের মাঝে খানিকটা দূরত্ব তৈরি হলো। নেতারা দুর্গন্ধময় লাল পুকুরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পথে আধাআধি আগে বাড়ার পর কাদা ভেঙে এগোতে শুরু করল দিমিতারের উট। ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের উপর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করা একটা বৈরী প্রভাব সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠল তাইতা। বাতাসে এক ধরনের শীতলতা টের পেল। কানের পাশে শিরাটা দপদপ করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চট করে ঘাড় ফিরিয়ে মেয়ারের নিত্যস্বর উপর দিয়ে পেছনে তাকাল ও।
এইমাত্র ছেড়ে আসা তীরে এক নিঃসঙ্গ কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের সাথে তার কালো জোব্বা মিশে গেলেও নিমেষে তাকে চিনে ফেলল তাইতা।
অন্তর্চক্ষু খুলতেই সোয়ের ভিন্ন ধরনের আভা দেখা দিল, মানুষটাকে যেন ঢেকে ফেলছে, অনেকটা বনফায়ারের শিখার মতো: রঙটা হিংস্র লাল, এখানে ওখানে পিঙ্গল ও সবুজ ছোপ। এমন ভয়ঙ্কর আভা এর আগে কখনও দেখেনি তাই।
সোয়ে এখানে! পালকিতে শোয়া দিমিতারের উদ্দেশে তাগিদ ভরা কণ্ঠে বলে উঠল ও। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। একটা আঙুল তুলে উটের পার হওয়ার পথের পুকুরের তলের দিকে ইঙ্গিত করল সোয়ে। যেন তার নির্দেশে সাড়া দিচ্ছে, এমনভাবে পানি থেকে লাফ দিয়ে উঠল একটা বিশাল কুনো ব্যাঙ, কামড়ে উটের বাম পায়ের উরুর উপরের অংশ থেকে খানিকটা মাংস তুলে নিল। ব্যথায় আর্তনাদ ছাড়ল জানোয়ারটা, পুকুর থেকে লাফ দিল। ওপারে যাবার বদলে ঘুরে দাঁড়াল, তারপরই নদীর তলদেশের উপর দিয়ে ছুটল সবেগে। প্রবলবেগে এপাশ ওপাশ দোল খেতে লাগল দিমিতারের পালকি।
মেরেন! হাবারি! মেয়ারের পেটে লাথি হাঁকিয়ে ছুটন্ত উটের পিছু ধাওয়া শুরু করে চেঁচিয়ে উঠল তাইতা। বাহন ঘুরিয়ে নিল মেরেন ও হাবারি, পিছু ধাওয়ায় ওদের সামিল করতে তাগিদ দিতে লাগল।
শক্ত করে ধরে রাখুন, দিমিতার! চিৎকার করল তাইতা। আমরা আসছি! ওর পাছার নিচে যেন উড়াল দিচ্ছে উইন্ডস্মোক। কিন্তু দিমিতারের নাগাল পাওয়ার আগেই আরেক পুকুরে পৌঁছে গেল উটটা, জলের ধারা ছিটিয়ে ছুটতে লাগল সেটার ভেতর দিয়ে। তখুনি ওটার সামনেই ফাঁক হয়ে গেল পুকুরের জল, আরেকটা ব্যাঙ লাফিয়ে উঠে আতঙ্কিত উটের মাথায় চড়াও হয়ে বুলডগের মতো মরণ কামড় বসাল। নিশ্চয়ই কোনও স্নায়ুতে আঘাত করে থাকবে, উটের সামনের পাজোড়া ভেঙে পড়ল। লুটিয়ে পড়ে ব্যাঙের কামড় থেকে নিজেকে বাঁচাতে এপাশওপাশ মাথা নাড়তে লাগল ওটা। উটের নিচে চাপা পড়ে গেছে পালকিটা, ভারে নাজুক বাঁশের কাঠামো মড়মড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
দিমিতার! ওকে বাঁচাতেই হবে! চিৎকার করে মেরেনের উদ্দেশে বলল তাইতা। আরও জোরে ছোটার তাগিদ দিল মেয়ারকে। কিন্তু ওটা পুকুরের কিনারে পৌঁছার আগেই জলের নিচ থেকে উঠে এলো দিমিতারের মাথা। কোনওভাবে পালকি থেকে বের হয়ে এসেছেন তিনি। কিন্তু কাদায় অর্ধেকটা ডুবে গেছেন। মাথায় আস্তরণ পড়ে গেছে, ক্রমাগত কাশছেন বেচারা, বমি করছেন, নড়াচড়া নাজুক, ভ্রান্তিময়।
আমি আসছি! চিৎকার করে বলল তাইতা। হাল ছাড়বেন না! তারপরই সহসা কুনো ব্যাঙে টগবগ করে ফুটতে শুরু করল গোটা পুকুর। তলা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দিমিতারের উপর, যেন এক পাল বুনো কুকুর কোনও গেযেল হরিণকে আক্রমণ করেছে। আর্তনাদ করার প্রয়াসে মুখ হাঁ হয়ে ছিল বুড়ো মানুষটার। কিন্তু কাদা বাধা দিচ্ছে। ব্যাঙের দল টেনে পানির নিচে নিয়ে গেল ওকে, ফের যখন সংক্ষিপ্ত সময়ে জন্যে উঠে এলেন তিনি, ওর লড়াই প্রায় শেষের দিকে। জলের নিচের ব্যাঙগুলোই ওর নড়াচড়ার কারণ, খাবলা খাবলা মাংস তুলে নিচ্ছে ওরা।
